তথ্যপ্রযুক্তি ডেস্ক: শামীম হোসাইন / দিগন্ত বাংলা নিউজ
সিউল, দক্ষিণ কোরিয়া: বর্তমান বিশ্ব অর্থনীতি ও প্রযুক্তি খাতের সবচেয়ে আলোচিত বিষয় ‘কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা’ বা আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স (AI)। আর এই এআই প্রযুক্তির বিশ্বব্যাপী তুমুল ও আকাশচুম্বী চাহিদাকে কাজে লাগিয়ে ব্যবসায়িক ইতিহাসে এক অভূতপূর্ব ও অভাবনীয় সফলতার মুখ দেখছে দক্ষিণ কোরিয়ার বহুজাতিক প্রযুক্তি জায়ান্ট স্যামসাং ইলেকট্রনিক্স (Samsung Electronics)। বিশ্ববাজারের আধুনিক এআই ডেটা সেন্টারগুলোর জন্য অত্যাধুনিক মেমরি চিপের বাড়তি চাহিদার কারণে চলতি বছরের দ্বিতীয় ত্রৈমাসিকে (এপ্রিল থেকে জুন) কোম্পানিটির পরিচালন মুনাফা গত বছরের একই সময়ের তুলনায় এক ধাক্কায় প্রায় ১৯ গুণ বৃদ্ধি পাবে বলে আশা করা হচ্ছে।
আরও পড়ুন: আল্লাহ সম্পর্কে যেসব কুধারণা বা নেতিবাচক চিন্তা মুমিনের ঈমান ধ্বংস করে
আজ মঙ্গলবার (৭ জুলাই, ২০২৬) দক্ষিণ কোরিয়ার সিউলে অবস্থিত স্যামসাংয়ের প্রধান কার্যালয় থেকে প্রকাশিত একটি প্রাথমিক আর্থিক প্রতিবেদনে এই চোখ ধাঁধানো পূর্বাভাসের কথা আনুষ্ঠানিকভাবে জানানো হয়েছে। চলতি জুলাই মাসের শেষ সপ্তাহে কোম্পানিটি তাদের অডিট সম্পন্ন করা চূড়ান্ত ও পূর্ণাঙ্গ বার্ষিক আর্থিক ফলাফল প্রকাশ করবে।
এক ত্রৈমাসিকে সর্বোচ্চ লাভের নতুন রেকর্ড
স্যামসাং ইলেকট্রনিক্সের প্রকাশিত প্রাথমিক তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের এপ্রিল থেকে জুনের শেষ দিন পর্যন্ত এই তিন মাসে কোম্পানিটির মোট পরিচালন মুনাফা (Operating Profit) দাঁড়িয়েছে প্রায় ৮৯.৪ ট্রিলিয়ন কোরিয়ান ওন, যা মার্কিন ডলারে কনভার্ট করলে দাঁড়ায় প্রায় ৫৮.৪ বিলিয়ন ডলার। বৈশ্বিক চিপ বাজারের মন্দা কাটিয়ে এটি টানা তৃতীয়বারের মতো কোম্পানিটির সর্বোচ্চ ত্রৈমাসিক লাভ বা প্রফিট অর্জনের রেকর্ড।
একই সময়ে বিশ্ববাজারে স্যামসাংয়ের বিভিন্ন হাই-টেক পণ্যের সামগ্রিক বিক্রির পরিমাণও জ্যামিতিক হারে বৃদ্ধি পেয়েছে। প্রাথমিক হিসাব মতে, এই তিন মাসে স্যামসাং বিশ্বজুড়ে প্রায় ১৭১ ট্রিলিয়ন ওন মূল্যের বিভিন্ন প্রযুক্তি পণ্য ও সেমিকন্ডাক্টর বিক্রি করতে সক্ষম হয়েছে। বৈশ্বিক অর্থনৈতিক বিশ্লেষকদের চমকে দিয়ে এই বিক্রির পরিমাণ গত বছরের ঠিক একই সময়ের তুলনায় দ্বিগুণেরও বেশি।
বিশ্লেষকদের দৃষ্টিতে চিপের বাজার ও মূল কারণ
আন্তর্জাতিক গ্লোবাল মার্কেট বিশ্লেষকদের মতে, স্যামসাংয়ের এই অবিশ্বাস্য আর্থিক উত্থান প্রযুক্তি খাতের ইতিহাসে অন্যতম সেরা ও শক্তিশালী একটি পারফরম্যান্স হিসেবে স্মরণীয় হয়ে থাকবে। এই অভাবনীয় সফলতার পেছনে মূলত দুটি প্রধান কারণ কাজ করেছে:
এআই ডেটা সেন্টারের চাহিদা: বিশ্বজুড়ে গুগল, মেটা, মাইক্রোসফট ও ওপেনএআই-এর মতো বড় বড় টেক জায়ান্টগুলো তাদের এআই মডেল ও ডেটা সেন্টারগুলোকে শক্তিশালী করতে উন্নত মেমরি চিপের অর্ডার বহুগুণ বাড়িয়ে দিয়েছে।
চিপের বৈশ্বিক ঘাটতি ও মূল্যবৃদ্ধি: বাজারে এই উচ্চ ক্ষমতাসম্পন্ন চিপের সরবরাহ বা সাপ্লাই চেইনে কিছুটা ঘাটতি থাকায় স্যামসাং কৌশলগতভাবে চিপের দাম বাড়াতে পেরেছে। এই বাড়তি দাম সরাসরি ইতিবাচক প্রভাব ফেলেছে তাদের নেট প্রফিট বা মুনাফার খাতায়।
স্যামসাং ইলেকট্রনিক্স বর্তমানে শুধু বিশ্বের অন্যতম শীর্ষ চিপ নির্মাতা প্রতিষ্ঠানই নয়, তারা নিজেদের মোবাইল, গ্যাজেট বা ইলেকট্রনিক্স পণ্যের অভ্যন্তরীণ চাহিদা মেটানোর পাশাপাশি মার্কিন চিপ জায়ান্ট এনভিডিয়া (Nvidia) এবং গুগলের (Google) মতো শীর্ষস্থানীয় আন্তর্জাতিক ও বৈশ্বিক প্রতিষ্ঠানের জন্যও অত্যন্ত বিশ্বস্ততার সাথে চিপ তৈরি বা ম্যানুফ্যাকচারিং করে থাকে। চিপ বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এআই চিপের এই অভাবনীয় ও গ্লোবাল ডিমান্ড আগামী বছর জুড়েও একইভাবে বজায় থাকতে পারে। সেমিকন্ডাক্টর ব্যবসার এই চমৎকার সুবাতাসের কারণে চলতি বছরে বিশ্ব শেয়ারবাজারে স্যামসাংয়ের শেয়ারের দাম ইতোমধ্যে দ্বিগুণেরও বেশি বেড়ে গেছে।
আরও পড়ুন: জাতীয় জাদুঘরে লিওনেল মেসির স্বাক্ষরিত জার্সি: ফুটবলপ্রেমীদের উপচে পড়া ভিড়
তবে বাজারে চিপ খাতের ক্রমবর্ধমান অভ্যন্তরীণ প্রতিযোগিতা এবং ভবিষ্যৎ সাপ্লাই চেইন নিয়ে কিছু বিনিয়োগকারীর মনে সামান্য উদ্বেগ থাকায়, আজ মঙ্গলবার সকালে সিউলের স্টক এক্সচেঞ্জে স্যামসাংয়ের শেয়ারের দাম সাময়িকভাবে প্রায় ৫.৫ শতাংশ হ্রাস পেয়েছে। যদিও বাজার বিশ্লেষকরা একে একটি সাময়িক বাজার কারেকশন বা রি-অ্যাডজাস্টমেন্ট হিসেবেই দেখছেন।
আঁটঘাট বেঁধে নামছে দক্ষিণ কোরিয়া সরকার
ভবিষ্যতে আন্তর্জাতিক চিপের বাজারে নিজেদের একক আধিপত্য ও কর্তৃত্ব ধরে রাখতে কোনো প্রকার ছাড় দিতে রাজি নয় দক্ষিণ কোরিয়া। সেমিকন্ডাক্টর খাতের বৈশ্বিক রেসে নিজেদের অবস্থান এক নম্বরে রাখতে দক্ষিণ কোরিয়ার সরকার স্যামসাং এবং অন্যান্য স্থানীয় টেক চিপ নির্মাতা প্রতিষ্ঠানগুলোর সাথে যৌথভাবে চিপ উৎপাদন খাতে কমপক্ষে ৮৮০ বিলিয়ন মার্কিন ডলার বিনিয়োগের একটি ঐতিহাসিক ও বিশাল জাতীয় মেগা পরিকল্পনা হাতে নিয়েছে।
কারণ হিসেবে কোরিয়ান প্রশাসন দেখছে যে, বর্তমানে জাপান, চীন ও তাইওয়ানের মতো শক্তিশালী প্রতিদ্বন্দ্বী দেশগুলোও চিপ তৈরিতে রাষ্ট্রীয় সহায়তায় বিপুল পরিমাণ অর্থ বিনিয়োগ করছে। ফলে কোরিয়া সরকার এই মেগা প্রজেক্টের মাধ্যমে নিজেদের প্রযুক্তিগত শ্রেষ্ঠত্ব বজায় রাখতে চিপের গবেষণা, উন্নয়ন ও আধুনিক চিপ কারখানা তৈরিতে এই বিপুল অর্থ ব্যয় করবে, যা স্যামসাংয়ের ভবিষ্যৎ পথচলাকে আরও মসৃণ ও দীর্ঘমেয়াদী করবে।
সংক্ষিপ্ত সংবাদ সূত্র: দক্ষিণ কোরিয়ার সিউল থেকে প্রকাশিত স্যামসাংয়ের প্রাথমিক আর্থিক রিপোর্ট।

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন
আপনার মূল্যবান মতামত আমাদের জানান। কোনো উসকানিমূলক বা অশালীন মন্তব্য করা থেকে বিরত থাকুন।