ইসলামী ডেস্ক: শামীম হোসাইন / দিগন্ত বাংলা নিউজ
ঢাকা: ইসলাম ও মানবজীবনের আধ্যাত্মিক পরিক্রমায় মহান সৃষ্টিকর্তা আল্লাহ রাব্বুল আলামিনের প্রতি নিখাদ বিশ্বাস ও সুদৃঢ় আস্থা রাখা ঈমানের অন্যতম প্রধান স্তম্ভ। একজন মুমিন তার জীবনে কতটুকু সফল হতে পারবে, তা অনেকাংশেই নির্ভর করে আল্লাহর প্রতি তার দৃষ্টিভঙ্গির ওপর। কিন্তু মানুষের মনের ভেতরে যখন শয়তানের প্ররোচনায় আল্লাহ সম্পর্কে নেতিবাচক বা সন্দেহজনক ধারণার জন্ম নেয়, তখন তা এক মারাত্মক আধ্যাত্মিক ও মানসিক ব্যাধিতে রূপান্তর হয়। ইসলামে সৃষ্টিকর্তা আল্লাহ সম্পর্কে যেকোনো ধরণের কুধারণা বা নেতিবাচক চিন্তা পোষণ করা অত্যন্ত গুরুতর ও ভয়ংকর এক কবিরা গুনাহ বা মহাপাপ হিসেবে সাব্যস্ত করা হয়েছে। এই কুৎসিত মানসিকতা মানুষের দীর্ঘদিনের অর্জিত ঈমানকে নিমিষেই দুর্বল করে দেয়, আল্লাহর অসীম রহমত থেকে মানুষকে চরমভাবে নিরাশ করে এবং সর্বোপরি আল্লাহর সার্বভৌম ক্ষমতার প্রতি এক ধরণের গভীর অবিশ্বাসের মনোভাব তৈরি করে দেয়।
আল্লাহ সম্পর্কে কুধারণার সংজ্ঞায়ন ও এর কুফল
ইসলামী শরিয়ত ও ফিকাহশাস্ত্রের পরিভাষায়, আল্লাহ সম্পর্কে কুধারণা (Bad Thoughts about Allah) বলতে বোঝায়—জগৎসমূহের প্রতিপালক, যিনি পরম বিশ্বাস, ভক্তি ও অবিচল আস্থার একমাত্র যোগ্য সত্তা, তাঁর কোনো ফয়সালা বা প্রতিশ্রুতির প্রতি মনে মনে গভীর সন্দেহ, চরম অনীহা, অবিশ্বাস ও নেতিবাচক মনোভাব লালন করা। আরও সহজ ও স্পষ্ট ভাষায় বলতে গেলে, যখন কোনো ব্যক্তি বা গোষ্ঠী মনে করে যে—মহান আল্লাহ তাঁর প্রেরিত সত্য দ্বীনকে পৃথিবীতে সাহায্য করবেন না, আল্লাহ তাঁর পবিত্র বাণী ও সত্যকে বাতিলের সামনে বিজয়ী করবেন না, কিংবা কোনো বান্দা বিপদে পড়লে আল্লাহ তার জন্য যথেষ্ট নন, অথবা আল্লাহ তাকে কখনোই ক্ষমা করবেন না কিংবা দয়া করবেন না (নাউজুবিল্লাহ); তখন এই সমস্ত চিন্তাকেই আল্লাহ সম্পর্কে মারাত্মক কুধারণা বলা হয়।
এই ধরণের নেতিবাচক ও ধৃষ্টতাপূর্ণ চিন্তা মানুষের জীবনের ওপর মহান আল্লাহর তীব্র অসন্তোষ, ক্রোধ এবং দুনিয়া ও আখিরাতের অভিশাপ ডেকে আনে। এর সম্পূর্ণ বিপরীত মেরুতে অবস্থান করে মহান আল্লাহ সম্পর্কে সবসময় ‘সুধারণা’ বা ইতিবাচক বিশ্বাস লালন করা প্রতিটি প্রকৃত মুসলমানের জন্য অন্যতম প্রধান ঈমানি ও শরিয়তি দায়িত্ব। একজন মুমিন সর্বদা দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করবে যে, মহান আল্লাহ তাঁর অসীম দয়া, ক্ষমা, রহমত, রিজিক এবং সত্যের বিজয়ের যে সমস্ত অমোঘ প্রতিশ্রুতি পবিত্র কোরআনে দিয়েছেন, তা প্রতিটি অক্ষরে অক্ষরে বাস্তবায়িত হবে। কাজেই, বর্তমান বা অতীতের যেকোনো ক্রান্তিলগ্নে যদি কোনো ব্যক্তি মনে করে যে, পৃথিবীর বুকে অন্যায়, মিথ্যা ও বাতিল শক্তি চিরকাল সত্যের ওপর ছড়ি ঘোরাবে এবং বিজয়ী থাকবে, তবে সে মূলত আল্লাহ সম্পর্কে চরম অসন্তুষ্টি ও কুধারণা লালন করছে।
আরও পড়ুন: কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই প্রযুক্তি ব্যবহার করে হালাল উপার্জনের আধুনিক উপায়সমূহ
ইমাম ইবনুল কাইয়্যিম (রহ.)-এর দৃষ্টিতে কুধারণার প্রধান ৮টি দৃষ্টান্ত
ইসলামের ইতিহাসের প্রখ্যাত সুফি, তাত্ত্বিক ও কালজয়ী আলেম ইমাম ইবনুল কাইয়্যিম (রহ.) তাঁর বিশ্বখ্যাত এবং অনন্য গ্রন্থ ‘জাদুল মাআদ’ (Zad al-Ma'ad)-এ মানব হৃদয়ের এই গোপন ব্যাধি ও আল্লাহ সম্পর্কে কুধারণার বহুবিধ রূপ ও দৃষ্টান্ত অত্যন্ত নিখুঁতভাবে আলোচনা করেছেন। তাঁর সেই ঐতিহাসিক গবেষণা থেকে আমাদের বর্তমান সমাজ, সময় এবং মানসিকতার প্রেক্ষাপটের সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ প্রধান ৮টি মারাত্মক ভ্রান্ত ধারণা নিচে সবিস্তারে উপস্থাপন করা হলো:
১. আল্লাহর অসীম রহমত ও করুণা থেকে সম্পূর্ণরূপে নিরাশ হওয়া: একজন মানুষ যখন জীবনের কোনো কঠিনতম পরীক্ষায় পতিত হয়ে বা নিজের কৃত পাপের ভারে জর্জরিত হয়ে মনে করে যে, আল্লাহর দয়া হয়তো তার কাছে আর পৌঁছাবে না এবং সে পরম করুণাময়ের অনুগ্রহের আশা চিরতরে ছেড়ে দেয়, তখন সে মূলত আল্লাহ সম্পর্কে কুধারণা করে। কারণ আল্লাহ নিজেই বলেছেন, তাঁর রহমত থেকে কেবল পথভ্রষ্টরাই নিরাশ হয়।
২. সত্য কখনো বাতিলের বিরুদ্ধে বিজয়ী হবে না বলে বিশ্বাস করা: ইসলাম ও ন্যায়ের পথ সবসময় নিপীড়িত থাকবে এবং জালিম ও বাতিল শক্তিই স্থায়ীভাবে পৃথিবীর বুকে রাজত্ব ও বিজয় ধরে রাখবে—এমন বিশ্বাস লালন করা আল্লাহর মহিমা, প্রজ্ঞা, শক্তি এবং তাঁর পরিপূর্ণতার সম্পূর্ণ পরিপন্থী। আল্লাহ সর্বদা সত্যের সহায়।
৩. আল্লাহর ঐশ্বরিক ফয়সালা বা তাকদিরের পেছনে গভীর প্রজ্ঞাকে অস্বীকার করা: এই পৃথিবীতে ভালো কিংবা মন্দ যা কিছুই ঘটে, তার পেছনে মহান আল্লাহর কোনো গভীর প্রজ্ঞা বা উদ্দেশ্য নেই বলে মনে করা এবং সবকিছুকে কেবলই কাকতালীয় বা অর্থহীন মনে করা আল্লাহর ‘রবুবিয়্যাত’ বা বিশ্ব-সার্বভৌমত্বকে সরাসরি অস্বীকার করার শামিল।
৪. নেককার ও পাপাচারী মানুষকে আল্লাহ সমানভাবে শাস্তি দেবেন বলে ভাবা: যে ব্যক্তি মনে করে যে, আল্লাহ তাঁর একনিষ্ঠ, ইবাদতগুজার ও সৎকর্মশীল বান্দাদেরও পরকালে তাঁর চরম শত্রু ও পাপাচারী জালিমদের মতো একইভাবে আজাব বা শাস্তি দেবেন, সে প্রকৃতপক্ষে আল্লাহর ন্যায়বিচার ও দয়ার গুণাবলী সম্পর্কে মারাত্মক ও কুৎসিত ধারণা পোষণ করছে।
৫. পরকালের বিচার দিবস, আখিরাত ও পুনরুত্থানকে মনে-প্রাণে অবিশ্বাস করা: মৃত্যুর পর সমস্ত মানুষকে যে পুনরায় জীবিত করে আল্লাহর দরবারে দাঁড় করানো হবে, সৎকর্মশীলদের জান্নাত দ্বারা পুরস্কৃত করা হবে এবং পাপাচারীদের জাহান্নামের শাস্তি দেওয়া হবে—এই চিরন্তন সত্যকে অস্বীকারকারী ব্যক্তি আল্লাহ সম্পর্কে সবচেয়ে বড় কুধারণা লালন করে।
৬. মনে করা যে আল্লাহ বান্দার আন্তরিক নেক আমল এমনিতেই নষ্ট করে দেবেন: সারা জীবন আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য করা কোনো ব্যক্তির আন্তরিক ইবাদত ও নেক আমল আল্লাহ কোনো কারণ ছাড়াই ধ্বংস করে দেবেন, কিংবা সারা জীবন সত্যের বিরোধিতা করা কাফির-মুশরিকদের পরকালে সর্বোচ্চ সম্মান দেবেন—এমন আজগুবি চিন্তা আল্লাহর ইনসাফের পরিপন্থী।
৭. আন্তরিক দোয়া ও তাওয়াক্কুলের পরও আল্লাহ সাড়া দেবেন না এমন সংশয় রাখা: যখন কোনো বান্দা অত্যন্ত বিনীতভাবে ও একাগ্র চিত্তে আল্লাহর কাছে কিছু প্রার্থনা করে এবং তাঁর ওপর পূর্ণ ভরসা রাখা সত্ত্বেও মনের ভেতর এই সংশয় রাখে যে, আল্লাহ হয়তো তাকে শূন্য হাতে তাড়িয়ে দেবেন এবং তার দোয়া কবুল করবেন না; তখন সে আল্লাহর ‘মুজিব’ (দোয়া কবুলকারী) গুণের প্রতি অবিচার করে।
৮. আল্লাহকে অসন্তুষ্ট করার পর অন্য কোনো সৃষ্টিকে ত্রাতা বা আশ্রয় মনে করা: কোনো ব্যক্তি আল্লাহ তাআলার অবাধ্য হয়ে বা তাঁকে অসন্তুষ্ট করার পর যদি কোনো ফেরেশতা, নবী, অলি-আউলিয়া, জীবিত কিংবা মৃত কোনো মানুষকে আল্লাহর বিকল্প হিসেবে নিজের আশ্রয় মনে করে এবং বিশ্বাস করে যে তারা তাকে আল্লাহর আজাব থেকে রক্ষা করতে পারবে, তবে সে সবচেয়ে বড় কুধারণা ও শিরকি আকিদায় লিপ্ত হলো।
ইমাম ইবনুল কাইয়্যিম (রহ.) অত্যন্ত আক্ষেপের সাথে আরও উল্লেখ করেছেন যে, এই পৃথিবীর সিংহভাগ মানুষই আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তাআলা সম্পর্কে যথার্থ ও সঠিক ধারণা পোষণ করতে ব্যর্থ হয়। তারা জীবনের প্রতিটি ছোট-বড় পদক্ষেপে নিজেদের ব্যাপারে এবং অন্যদের সামাজিক ও রাজনৈতিক ফয়সালা সম্পর্কে নানামুখী কুধারণায় লিপ্ত থাকে।
মানবজাতির মধ্যে কেবল সেই সমস্ত সৌভাগ্যবান ব্যক্তিরাই এই মারাত্মক ঈমান বিধ্বংসী আধ্যাত্মিক ব্যাধি থেকে নিজেদের মনকে সম্পূর্ণ মুক্ত ও পবিত্র রাখতে পারেন, যারা মহান আল্লাহকে খুব কাছ থেকে চিনেছেন, যিনি আল্লাহর অতি পবিত্র নামসমূহ (আসমাউল হুসনা), তাঁর ঐশ্বরিক গুণাবলি এবং তাঁর অসীম সৃষ্টির অন্তরালে লুকিয়ে থাকা গভীর প্রজ্ঞাকে নিজের অন্তরে যথাযথভাবে অনুধাবন ও বিশ্বাস করতে পেরেছেন।
তাই একজন প্রকৃত মুমিনের প্রধান দায়িত্ব হলো—যেকোনো কঠিন বিপদ-আপদ, রোগ-শোক, দারিদ্র্য বা বৈশ্বিক ক্রান্তিকালেও নিজের মনের ভেতর আল্লাহর প্রতি ভালোবাসার ও আস্থার প্রদীপ জ্বালিয়ে রাখা। শয়তানের সমস্ত কু-প্ররোচনা ও নেতিবাচক চিন্তার জাল ছিন্ন করে সর্বদা আল্লাহর করুণা, ক্ষমা ও সাহায্যের প্রতি আশাবাদী হওয়াই হলো খাঁটি ঈমানের লক্ষণ। মহান আল্লাহ রাব্বুল আলামিন আমাদের সবাইকে তাঁর প্রতি সঠিক আকিদা লালন করার এবং সমস্ত ধরণের কুধারণা থেকে অন্তরকে পরিচ্ছন্ন রাখার তাওফিক দান করুন। আমিন।
সংক্ষিপ্ত সংবাদ সূত্র: ইমাম ইবনুল কাইয়্যিম (রহ.)-এর বিখ্যাত ‘জাদুল মাআদ’ গ্রন্থ।

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন
আপনার মূল্যবান মতামত আমাদের জানান। কোনো উসকানিমূলক বা অশালীন মন্তব্য করা থেকে বিরত থাকুন।