ব্রেকিং নিউজ

শাহজাদপুরে নিখোঁজের ২ দিন পর সবুজের মরদেহ উদ্ধার: শরীরে আঘাতের চিহ্ন, নেপথ্যে অপরাধ চক্রের দ্বন্দ্ব?

শাহজাদপুরে নিখোঁজের ২ দিন পর সবুজের মরদেহ উদ্ধার: শরীরে আঘাতের চিহ্ন, নেপথ্যে অপরাধ চক্রের দ্বন্দ্ব?
ছবি: সংগৃহীত
 প্রতিবেদক: সুফিয়ান নোমান / দিগন্ত বাংলা নিউজ

শাহজাদপুর: সিরাজগঞ্জ জেলার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ও জনবহুল উপজেলা শাহজাদপুরে এক চাঞ্চল্যকর ও রহস্যময় হত্যাকাণ্ডের ঘটনা ঘটেছে। বাড়ি থেকে বের হওয়ার দীর্ঘ দুই দিন পর এক যুবকের ক্ষতবিক্ষত ও রক্তাক্ত মরদেহ উদ্ধার করেছে স্থানীয় থানা পুলিশ। এই মর্মান্তিক ঘটনাটি উপজেলার হাবিবুল্লাহনগর ইউনিয়নের হাসাকোলা গ্রামে সংঘটিত হওয়ায় পুরো এলাকা জুড়ে ব্যাপক উত্তেজনা, গুঞ্জন এবং রহস্যের দানা বেঁধেছে। নিহতের নাম মো. সবুজ (৩৫)। তিনি দীর্ঘদিন ধরে নিখোঁজ থাকার পর অবশেষে একটি পরিত্যক্ত স্থান থেকে তার লাশ উদ্ধার করা হয়। নিহতের চোখে এবং শরীরের বিভিন্ন সংবেদনশীল অংশে গুরুতর আঘাতের সুনির্দিষ্ট চিহ্ন থাকায় স্থানীয়দের ধারণা, এটি একটি সুপরিকল্পিত হত্যাকাণ্ড। তবে পুলিশের প্রাথমিক অনুসন্ধানে নিহতের একটি চাঞ্চল্যকর অপরাধমূলক অতীত রেকর্ড বা ব্যাকগ্রাউন্ড বেরিয়ে এসেছে, যা এই মৃত্যুর ঘটনাটিকে সম্পূর্ণ নতুন একটি মোড় এনে দিয়েছে।

​২০২৬ সালের ১০ই জুলাই, শুক্রবার সকালের দিকে শাহজাদপুর থানা পুলিশ খবর পেয়ে দ্রুত ঘটনাস্থলে ছুটে যায় এবং স্থানীয় জনতাকে সরিয়ে দিয়ে মরদেহটি সুরতহাল রিপোর্টের জন্য নিজেদের হেফাজতে নেয়। নিহত যুবক সবুজ শাহজাদপুর উপজেলার রতনকান্দি উত্তরপাড়া এলাকার বাসিন্দা এবং স্থানীয় আ. রহিমের ছেলে হিসেবে পরিচিত।

​নিখোঁজের ঘটনা এবং পরিবারের আহাজারি

​পারিবারিক ও স্থানীয় নির্ভরযোগ্য সূত্রে জানা গেছে, মো. সবুজ গত বুধবার (৮ই জুলাই) সপ্তাহের সাধারণ একটি দিনে স্বাভাবিকভাবেই বাড়ি থেকে বের হয়েছিলেন। তবে অন্যান্য দিনের মতো সন্ধ্যার মধ্যে বা রাতে তিনি আর নিজের ঘরে ফিরে আসেননি। গভীর রাত পর্যন্ত সবুজ বাড়িতে না ফেরায় তার স্ত্রী এবং পরিবারের অন্যান্য সদস্যরা চরম উৎকণ্ঠা ও উদ্বেগের মধ্যে পড়েন। আত্মীয়-স্বজনদের বাড়ি থেকে শুরু করে সবুজের যাতায়াত ছিল এমন সম্ভাব্য সমস্ত আড্ডাখানা ও কর্মক্ষেত্রে হন্যে হয়ে খোঁজ করেন তার স্ত্রী।

আরও পড়ুন: সাতকানিয়ায় বন্যাকবলিত এলাকা পরিদর্শনে ডা. শফিক: মাঠের কষ্ট কাগজে অনুধাবন অসম্ভব

​কিন্তু দীর্ঘ সময় পার হওয়ার পরও সবুজের কোনো প্রকার হদিস বা মোবাইল ট্র্যাকিংয়ের সূত্র না পেয়ে পরিবারটি এক ধরণের চরম হতাশার মধ্যে নিমজ্জিত হয়। সবুজের স্ত্রী গণমাধ্যমকে জানান, বুধবারের পর থেকে তার স্বামীর ফোনটি সম্পূর্ণ বন্ধ ছিল এবং কোনো শত্রুতার জেরে তাকে কেউ আটকে রেখেছে কি না, তা তারা বুঝতে পারছিলেন না। অবশেষে দুই দিনের অবর্ণনীয় উৎকণ্ঠার অবসান ঘটে শুক্রবার সকালে, তবে তা কোনো সুসংবাদ নিয়ে নয়, বরং সবুজের এক নিথর ও রক্তাক্ত লাশের বার্তার মধ্য দিয়ে।

​হাসাকোলা গ্রামে যেভাবে মিলল মরদেহ

​শুক্রবার ভোরের আলো ফোটার পরপরই হাবিবুল্লাহনগর ইউনিয়নের হাসাকোলা গ্রামের কিছু সাধারণ পথচারী ও কৃষক মাঠের দিকে যাওয়ার সময় একটি নির্জন স্থানে এক যুবকের মরদেহ পড়ে থাকতে দেখেন। লাশের চোখে ও মুখে ছোপ ছোপ রক্তের দাগ এবং শরীরের বিভিন্ন অংশে আঘাতের চিহ্ন দেখে তারা চিৎকার শুরু করেন। মুহূর্তের মধ্যে এই খবর হাসাকোলা এবং পার্শ্ববর্তী রতনকান্দি উত্তরপাড়া গ্রামে ছড়িয়ে পড়ে।

​শত শত উৎসুক জনতা মৃতদেহটি এক নজর দেখার জন্য এবং পরিচয় শনাক্ত করার জন্য সেখানে ভিড় জমান। একপর্যায়ে নিখোঁজ সবুজের পরিবারের সদস্যরা ঘটনাস্থলে এসে পৌঁছান এবং সবুজের স্ত্রী ও স্বজনরা লাশের পরনের কাপড় ও চেহারা দেখে নিশ্চিত করেন যে, এটিই তাদের নিখোঁজ হওয়া সবুজ। স্বজনদের আকস্মিক কান্না ও আহাজারিতে চারপাশের পরিবেশ ভারী হয়ে ওঠে। স্থানীয় ইউনিয়ন পরিষদের জনপ্রতিনিধিদের মাধ্যমে তাৎক্ষণিকভাবে বিষয়টি শাহজাদপুর থানা পুলিশকে অবহিত করা হয়।

​পুলিশের তদন্ত ও মরদেহে আঘাতের ক্ষতচিহ্ন

​হত্যাকাণ্ড বা রহস্যজনক মৃত্যুর খবর পাওয়া মাত্রই শাহজাদপুর থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) মো. সাইফুল ইসলামের নির্দেশনায় পুলিশের একটি চৌকস টিম এবং ক্রাইম সিনের সদস্যরা হাসাকোলা গ্রামের দুর্ঘটনাস্থলে পৌঁছান। পুলিশ সদস্যরা লাশের চারপাশ ক্রন টেপ দিয়ে ঘিরে ফেলেন এবং সুরতহাল প্রতিবেদন তৈরির কাজ শুরু করেন।

​পুলিশের প্রাথমিক সুরতহালে দেখা গেছে:

  • ​নিহতের চোখের নিচে এবং মাথার পেছনের অংশে ভারী কোনো বস্তু বা অস্ত্র দিয়ে আঘাতের স্পষ্ট ক্ষত রয়েছে।
  • ​শরীরের বিভিন্ন স্থানে কালশিটে দাগ রয়েছে, যা প্রমাণ করে মৃত্যুর পূর্বে তার ওপর ব্যাপক শারীরিক নির্যাতন বা ধস্তাধস্তির ঘটনা ঘটেছিল।
  • ​লাশের অবস্থান এবং পারিপার্শ্বিক আলামত দেখে তদন্ত কর্মকর্তাদের ধারণা, তাকে অন্য কোনো নির্জন স্থানে শ্বাসরোধ বা আঘাত করে হত্যা করার পর লাশটি হাসাকোলা গ্রামের এই নির্দিষ্ট স্থানে ফেলে রেখে যাওয়া হয়েছে।

​অপরাধ জগতের সম্পৃক্ততা: তদন্তে নতুন সমীকরণ

​এই চাঞ্চল্যকর ঘটনার বিষয়ে শাহজাদপুর থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) মো. সাইফুল ইসলাম গণমাধ্যমের কাছে একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও বিস্ফোরক তথ্য প্রকাশ করেছেন। তিনি জানান, নিহত সবুজ কোনো সাধারণ নিরীহ ব্যক্তি ছিলেন না, বরং তিনি স্থানীয় আন্তঃজেলা চোর ও ডাকাত চক্রের একজন অত্যন্ত সক্রিয় ও দুর্ধর্ষ সদস্য ছিলেন। পুলিশের গোপন নথিপত্র এবং ক্রাইম ডাটাবেজ অনুযায়ী, সবুজের বিরুদ্ধে শাহজাদপুর থানাসহ বিভিন্ন থানায় চুরি, ছিনতাই এবং গুরুতর ডাকাতির অপরাধে অন্তত ৬টি নিয়মিত মামলা চলমান রয়েছে। তিনি দীর্ঘদিন ধরে পুলিশের চোখ ফাঁকি দিয়ে বিভিন্ন অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড পরিচালনা করে আসছিলেন।

​ওসির এই বক্তব্যের পর স্থানীয় অপরাধ বিশ্লেষক এবং পুলিশের ধারণা, সবুজের এই রহস্যময় মৃত্যুর পেছনে কয়েকটি সুনির্দিষ্ট কারণ থাকতে পারে:

  • অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্ব: চোর বা ডাকাত চক্রের লুণ্ঠিত মালামালের ভাগবাটোয়ারা বা টাকা-পয়সার হিসাব নিয়ে নিজেদের দলের অন্য কোনো সক্রিয় সদস্যদের সাথে সবুজের তীব্র বিরোধ তৈরি হতে পারে। সেই অভ্যন্তরীণ কোন্দলের জেরে নিজের দলের লোকেরাই তাকে ডেকে নিয়ে হত্যা করতে পারে।
  • প্রতিশোধমূলক হত্যাকাণ্ড: পূর্বের কোনো চুরির ঘটনা বা ডাকাতির ঘটনার শিকার হওয়া কোনো পক্ষ ক্ষুব্ধ হয়ে সবুজের ওপর প্রতিশোধ নেওয়ার জন্য এই ঘটনা ঘটিয়ে থাকতে পারে।
  • গণপিটুনির আড়াল: কোনো এলাকায় চুরি করতে গিয়ে গণপিটুনির শিকার হওয়ার পর অপরাধীরা লাশটি এখানে এনে ফেলে গেছে কি না, তাও খতিয়ে দেখছে পুলিশ।

​আইনি প্রক্রিয়া ও ময়নাতদন্তের সর্বশেষ অবস্থা

​শাহজাদপুর থানা পুলিশ জানায়, মরদেহের প্রাথমিক সুরতহাল কার্যক্রম শেষে লাশটি ময়নাতদন্তের (Post-Mortem) জন্য সিরাজগঞ্জ ২৫০ শয্যা বিশিষ্ট বঙ্গমাতা শেখ ফজিলাতুন্নেছা মুজিব জেনারেল হাসপাতাল মর্গে পাঠানোর ব্যবস্থা করা হয়েছে। ময়নাতদন্তের রিপোর্ট হাতে পাওয়ার পর চিকিৎসকদের মতামত অনুযায়ী নিশ্চিত হওয়া যাবে যে, তাকে ঠিক কত সময় আগে এবং কীভাবে (বিষপ্রয়োগে, আঘাত করে নাকি শ্বাসরোধে) হত্যা করা হয়েছে।

আরও প ড়ুন: সরকারি হাসপাতালে ডেঙ্গু পরীক্ষা ৩১ ডিসেম্বর পর্যন্ত সম্পূর্ণ বিনামূল্যে করার নির্দেশ স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের

​অফিসার ইনচার্জ মো. সাইফুল ইসলাম আরও যোগ করেন, মৃত্যুর প্রকৃত কারণ এখনও শতভাগ নিশ্চিত হওয়া যায়নি। সবুজের বিরুদ্ধে অপরাধের রেকর্ড থাকলেও একজন নাগরিক হিসেবে তার এই অস্বাভাবিক মৃত্যুর ঘটনার সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ তদন্ত করা হবে। আইন নিজের হাতে তুলে নেওয়ার অধিকার কারও নেই। এই ঘটনার পেছনে সুনির্দিষ্ট কারা জড়িত, তা উদ্ঘাটনে পুলিশের বিশেষ ডিটেক্টিভ টিম ইতিমধ্যেই মাঠে নেমেছে এবং ডিজিটাল প্রযুক্তির সহায়তায় সবুজের শেষ কললিস্ট (CDR) পরীক্ষা করা হচ্ছে। খুব দ্রুতই এই ঘটনার মূল রহস্য উন্মোচন এবং আসামিদের গ্রেপ্তার করা সম্ভব হবে বলে আশা প্রকাশ করছে পুলিশ।

​এলাকাবাসীর মধ্যে মিশ্র প্রতিক্রিয়া ও আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি

​সবুজের মতো একজন তালিকাভুক্ত অপরাধীর মরদেহ উদ্ধারের পর হাসাকোলা ও রতনকান্দি এলাকায় এক ধরণের মিশ্র প্রতিক্রিয়া দেখা গেছে। একদিকে পরিবারের পক্ষ থেকে এই ঘটনার তীব্র বিচার দাবি করা হচ্ছে, অন্যদিকে স্থানীয় সাধারণ মানুষ এই চোর চক্রের সক্রিয় সদস্যের মৃত্যুর পর নিজেদের ঘরবাড়ির নিরাপত্তা নিয়ে কিছুটা স্বস্তি প্রকাশ করলেও প্রকাশ্য দিবালোকে এমন খুনের ঘটনায় আতঙ্কিত। "দিগন্ত বাংলা নিউজ" মনে করে, অপরাধী যেই হোক না কেন, দেশের প্রচলিত আইনের মাধ্যমেই তার বিচার হওয়া বাঞ্ছনীয়। এই হত্যাকাণ্ডের প্রকৃত রহস্য উন্মোচিত হলে এলাকার অন্য অপরাধী ও চোর চক্রের নেটওয়ার্কও ভেঙে দেওয়া সম্ভব হবে। শাহজাদপুরের আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় পুলিশ প্রশাসন আরও কঠোর ভূমিকা পালন করবে, এটাই সাধারণ জনগণের প্রত্যাশা।

নিউজ সূত্র: শাহজাদপুর থানার অফিসার ইনচার্জ মো. সাইফুল ইসলাম ও হাসাকোলা গ্রামবাসী।

Post a Comment

আপনার মূল্যবান মতামত আমাদের জানান। কোনো উসকানিমূলক বা অশালীন মন্তব্য করা থেকে বিরত থাকুন।

নবীনতর পূর্বতন