চুক্তি না হলে ইরানের জন্য খুব খারাপ সময় অপেক্ষা করছে: ট্রাম্পের হুঁশিয়ারি

চুক্তি না হলে ইরানের জন্য খুব খারাপ সময় অপেক্ষা করছে: ট্রাম্পের হুঁশিয়ারি

আন্তর্জাতিক ডেস্ক, দিগন্ত বাংলা নিউজ: 

মধ্যপ্রাচ্যে চলমান তীব্র সামরিক ও কূটনৈতিক অচলাবস্থার মাঝেই ইসলামিক প্রজাতন্ত্র ইরানকে চরম ও নজিরবিহীন হুঁশিয়ারি দিয়েছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। তিনি অত্যন্ত কড়া ভাষায় স্পষ্ট করে জানিয়ে দিয়েছেন যে, খুব দ্রুত সময়ের মধ্যে যদি একটি স্থায়ী ও ফলপ্রসূ শান্তিচুক্তি স্বাক্ষরিত না হয়, তবে তেহরানের জন্য সামনে ‘খুব খারাপ সময়’ অপেক্ষা করছে। একই সাথে মার্কিন সংবাদমাধ্যমগুলোর বিশেষ অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে উঠে এসেছে যে, চলমান সংকট নিরসনে ট্রাম্প প্রশাসন ইরানের ওপর বিস্তৃত পরিসরে বড় ধরণের বিমান ও বোমা হামলার এক ভয়াবহ সামরিক পরিকল্পনা চূড়ান্ত করে রেখেছে।

​ফরাসি প্রভাবশালী গণমাধ্যম 'বিএফএমটিভি' (BFMTV)-কে দেওয়া এক একান্ত সাক্ষাৎকারে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ওয়াশিংটন ও তেহরানের মধ্যকার এই স্নায়ুযুদ্ধ নিয়ে খোলামেলা কথা বলেন। তিনি উল্লেখ করেন, একটি চূড়ান্ত চুক্তিতে পৌঁছানোর ক্ষেত্রে কেবল মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের একার নয়, বরং তেহরানেরও নিজস্ব রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক স্বার্থ জড়িত রয়েছে। ট্রাম্পের এই অনমনীয় ও আক্রমণাত্মক বক্তব্য প্রকাশের পর থেকেই আন্তর্জাতিক অঙ্গনে, বিশেষ করে পারস্য উপসাগরীয় অঞ্চলে নতুন করে যুদ্ধের দামামা বাজতে শুরু করেছে। সামরিক বিশ্লেষকরা মনে করছেন, এই হুঁশিয়ারি কেবল কোনো মৌখিক হুমকি নয়, বরং এটি ইরানের বিরুদ্ধে আমেরিকার একটি সম্ভাব্য সামরিক অভিযানের আগাম রূপরেখা।

​মার্কিন উপদেষ্টাদের যুদ্ধপ্রস্তুতি ও নিউইয়র্ক টাইমসের চাঞ্চল্যকর তথ্য

​হোয়াইট হাউসের অভ্যন্তরীণ নীতি নির্ধারণী মহলের বরাত দিয়ে মার্কিন শীর্ষ সংবাদমাধ্যম 'নিউইয়র্ক টাইমস' এক বিশেষ প্রতিবেদনে দাবি করেছে যে, ইরান সংকট নিয়ে যেকোনো মুহূর্তে বড় ধরনের এবং চূড়ান্ত কোনো সিদ্ধান্ত নিতে পারেন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। চলমান পরিস্থিতি কঠোরহস্তে মোকাবিলা করার জন্য ট্রাম্পের শীর্ষ সামরিক উপদেষ্টারা ইতিমধ্যে সম্ভাব্য সব ধরণের সামরিক পদক্ষেপের ব্লুপ্রিন্ট বা প্রস্তুতি সম্পন্ন করে রেখেছেন। এই পরিকল্পনার মধ্যে ইরানের প্রধান সামরিক ঘাঁটি, পারমাণবিক স্থাপনা এবং কৌশলগত বাঙ্কারগুলো লক্ষ্য করে অত্যন্ত বিস্তৃত পরিসরে বোমা হামলা (Widespread Bombing Campaign) চালানোর বিষয়টিও গুরুত্বের সাথে বিবেচনা করা হচ্ছে।

​অবশ্য পেন্টাগন ও হোয়াইট হাউসের উচ্চপদস্থ কর্মকর্তারা সংবাদমাধ্যমকে নিশ্চিত করেছেন যে, মার্কিন সামরিক বাহিনী যুদ্ধের জন্য শতভাগ প্রস্তুত থাকলেও ডোনাল্ড ট্রাম্প এখনো বোমা হামলার চূড়ান্ত বা শেষ আদেশটিতে স্বাক্ষর করেননি। ট্রাম্প প্রশাসন এখনো শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে ব্যাকচ্যানেলে তীব্র কূটনৈতিক তৎপরতাও চালিয়ে যাচ্ছে। তবে ট্রাম্পের এই দ্বিমুখী নীতি—একদিকে আলোচনার প্রস্তাব এবং অন্যদিকে ব্যাপক বিমান হামলার সুনির্দিষ্ট সামরিক প্রস্তুতি—তেহরানের ওপর এক ধরণের মনস্তাত্ত্বিক চাপ সৃষ্টির কৌশল বলেই মনে করছেন আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশেষজ্ঞরা।

আরও পড়ুন: আগামী সপ্তাহের মধ্যে ইরানে হামলার প্রস্তুতি নিচ্ছে ইসরায়েল এবং যুক্তরাষ্ট্র

আগামী সপ্তাহের মধ্যে ইরানে হামলার প্রস্তুতি নিচ্ছে ইসরায়েল এবং যুক্তরাষ্ট্র

​তেহরানের গভীর অবিশ্বাস এবং হরমুজ প্রণালির কৌশলগত গুরুত্ব

​এদিকে ওয়াশিংটনের পক্ষ থেকে নতুন করে কূটনৈতিক আলোচনার বার্তা পাওয়ার কথা আনুষ্ঠানিকভাবে স্বীকার করেছে ইরান। তবে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের এই আলোচনার আসল উদ্দেশ্য নিয়ে তীব্র ও গভীর অবিশ্বাস প্রকাশ করেছে তেহরানের শীর্ষ নেতৃত্ব। ইরানের বিপ্লবী গার্ড কর্পস (IRGC) এবং কূটনৈতিক মহলের মতে, আমেরিকা একদিকে আলোচনার কথা বলে ধোঁকা দিচ্ছে এবং অন্যদিকে ইরানের চারপাশ দিয়ে নিজেদের সামরিক উপস্থিতি বাড়িয়ে চলেছে। দুই পরাশক্তির এমন অনমনীয় এবং উত্তেজনাপূর্ণ অবস্থানের কারণে মধ্যপ্রাচ্যের রাজনৈতিক অচলাবস্থা ভেঙে যেকোনো মুহূর্তে একটি বড় ধরণের সামরিক সংঘাতের আশঙ্কা দিন দিন আরও তীব্র হচ্ছে।

​পশ্চিমা কূটনৈতিকদের মূল লক্ষ্য হলো, যেকোনো উপায়ে আলোচনার মাধ্যমে ইরানকে কৌশলগত ও বাণিজ্যিকভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ জলপথ 'হরমুজ প্রণালি' (Strait of Hormuz) পুনরায় আন্তর্জাতিক বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচলের জন্য খুলে দেওয়ার বিষয়ে রাজি করানো। ভূ-রাজনীতির বিশ্লেষকদের মতে, হরমুজ প্রণালী যদি পুনরায় স্বাভাবিকভাবে চালু করা সম্ভব হয়, তবে ডোনাল্ড ট্রাম্প আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে এটিকে নিজের এক বিশাল কূটনৈতিক এবং ঐতিহাসিক সাফল্য হিসেবে তুলে ধরতে পারবেন। এর পাশাপাশি, মধ্যপ্রাচ্যে আমেরিকার যে অত্যন্ত ব্যয়বহুল, দীর্ঘমেয়াদী এবং প্রাণঘাতী সামরিক অভিযান চলছে, সেটিকে একটি সফল মিশন হিসেবে মার্কিন ভোটারদের সামনে উপস্থাপন করে তিনি নিজের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক অবস্থান এবং জনপ্রিয়তাকেও কয়েক গুণ বাড়িয়ে নিতে পারবেন।

​পারমাণবিক কর্মসূচি ও অতীতের সামরিক সংঘাতের ইতিহাস

​বিশ্ব রাজনীতির ইতিহাস পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি এবং মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন আধিপত্যকে কেন্দ্র করে ওয়াশিংটন ও তেহরানের এই বৈরিতা আজ নতুন কিছু নয়। এর আগেও বিভিন্ন সময়ে ইরানের পারমাণবিক সক্ষমতা গুঁড়িয়ে দেওয়ার লক্ষ্যে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্ররা দেশটিতে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে সামরিক হামলা চালিয়েছিল। বিশেষ করে ওবামা এবং ট্রাম্পের প্রথম মেয়াদের শাসনামলে সাইবার হামলা (যেমন স্টাক্সনেট ভাইরাস) এবং ড্রোন হামলার মাধ্যমে ইরানের শীর্ষ সামরিক কমান্ডার ও বিজ্ঞানীদের টার্গেট করা হয়েছিল, যার জেরে দুই দেশের সম্পর্ক চিরদিনের জন্য তিক্ত হয়ে যায়।

​বর্তমান বাস্তবতায় ইরান তার পারমাণবিক কর্মসূচিকে আরও অনেক দূর এগিয়ে নিয়ে গেছে এবং সমৃদ্ধ ইউরেনিয়ামের মজুদ বহুগুণ বাড়িয়েছে। তেহরানের স্পষ্ট কথা—আমেরিকা যদি একতরফাভাবে তাদের ওপর নিষেধাজ্ঞা জারি রাখে, তবে তারা কোনো অবস্থাতেই হরমুজ প্রণালির নিয়ন্ত্রণ ছাড়বে না। এই পরিস্থিতিতে আন্তর্জাতিক অর্থনীতিবিদরা চরম উদ্বেগ প্রকাশ করে বলেছেন যে, ট্রাম্প যদি কূটনৈতিক পথ পরিহার করে সত্যি সত্যি ইরানের ওপর বিস্তৃত বোমা হামলা শুরু করেন, তবে হরমুজ প্রণালি সম্পূর্ণ অবরুদ্ধ হয়ে পড়বে। আর তার ফলে বিশ্ববাজারে তেলের সরবরাহ বন্ধ হয়ে আন্তর্জাতিক বাজারে অপরিশোধিত জ্বালানি তেলের দাম প্রতি ব্যারেল ২০০ ডলার ছাড়িয়ে যেতে পারে, যা বর্তমান ভঙ্গুর বিশ্ব অর্থনীতিকে এক শতাব্দীর মধ্যে সবচেয়ে বড় মহামন্দার দিকে ঠেলে দেবে। এখন দেখার বিষয়, ট্রাম্পের এই 'খুব খারাপ সময়ের' হুঁশিয়ারি মধ্যপ্রাচ্যকে একটি চুক্তির দিকে নিয়ে যায় নাকি এক মহাবিদ্ধংসী যুদ্ধের মুখে দাঁড় করায়।

​সূত্র: আল জাজিরা

 

Post a Comment

আপনার মূল্যবান মতামত আমাদের জানান। কোনো উসকানিমূলক বা অশালীন মন্তব্য করা থেকে বিরত থাকুন।

নবীনতর পূর্বতন