আগামী সপ্তাহের মধ্যে ইরানে হামলার প্রস্তুতি নিচ্ছে ইসরায়েল এবং যুক্তরাষ্ট্র

আগামী সপ্তাহের মধ্যে ইরানে হামলার প্রস্তুতি নিচ্ছে ইসরায়েল এবং যুক্তরাষ্ট্র

আন্তর্জাতিক ডেস্ক, দিগন্ত বাংলা নিউজ: 

মধ্যপ্রাচ্যের ভূ-রাজনৈতিক আকাশে আবারও এক মহাবিধ্বংসী যুদ্ধের কালো মেঘ ঘনীভূত হতে শুরু করেছে। পারস্য উপসাগরীয় অঞ্চলে চলমান তীব্র সামরিক ও কূটনৈতিক উত্তেজনার পারদকে সর্বোচ্চ স্তরে নিয়ে, আগামী সপ্তাহের শুরুতেই ইসলামিক প্রজাতন্ত্র ইরানে একযোগে বড় ধরনের বিমান ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলার যৌথ প্রস্তুতি নিচ্ছে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এবং ইসরায়েল। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রভাবশালী সংবাদমাধ্যম 'নিউ ইয়র্ক টাইমস'-এর একটি বিশেষ ও অনুসন্ধানী প্রতিবেদনের বরাতে এই চাঞ্চল্যকর তথ্য প্রকাশ্যে এসেছে, যা সমগ্র আন্তর্জাতিক মহলে এক তীব্র আতঙ্ক ও আলোড়ন সৃষ্টি করেছে।

​মধ্যপ্রাচ্যের নিরাপত্তা ও সামরিক খাতের দুজন উচ্চপদস্থ ও নির্ভরযোগ্য কর্মকর্তার দেওয়া গোপন তথ্যের ভিত্তিতে নিউ ইয়র্ক টাইমস জানিয়েছে, ওয়াশিংটন এবং তেল আবিবের সামরিক কমান্ড বর্তমানে এক অত্যন্ত নিবিড় ও চূড়ান্ত পর্যায়ের প্রস্তুতিমূলক কার্যক্রমে ব্যস্ত রয়েছে। সামরিক বিশ্লেষকরা বলছেন, গত এপ্রিলের শুরুতে চিরবৈরী দুই দেশের মধ্যে পাকিস্তানের বিশেষ মধ্যস্থতায় যে একটি ভঙ্গুর যুদ্ধবিরতি চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়েছিল, তার পর থেকে এখন পর্যন্ত এটিকে মধ্যপ্রাচ্যের বুকে সবচেয়ে বড়, বিপজ্জনক এবং গুরুত্বপূর্ণ যৌথ সামরিক প্রস্তুতি হিসেবে দেখা হচ্ছে। এই যৌথ মহড়া ও সামরিক তৎপরতা ইঙ্গিত দিচ্ছে যে, যেকোনো মুহূর্তে মধ্যপ্রাচ্যের বুকে এক নতুন পূর্ণাঙ্গ যুদ্ধ শুরু হতে পারে।

​বেন গুরিওন বিমানবন্দরে মার্কিন যুদ্ধবিমান ও প্রতিরক্ষামন্ত্রীর কৌশলগত বার্তা

​এই সম্ভাব্য সামরিক অভিযানের সবচেয়ে বড় বাস্তব প্রমাণ মিলেছে তেল আবিবের প্রধান বিমানবন্দরগুলোতে। বিশেষ করে ইসরায়েলের বেন গুরিওন আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে মার্কিন বিমান বাহিনীর (US Air Force) অত্যাধুনিক স্টিলথ ফাইটার জেট, ভারী বোমারু বিমান এবং রসদবাহী সামরিক কার্গো বিমানের অস্বাভাবিক অবস্থান ও লজিস্টিক গতিবিধি লক্ষ্য করা গেছে। প্রতিরক্ষা বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ইসরায়েলি ভূখণ্ডে মার্কিন যুদ্ধবিমানের এই বিশাল উপস্থিতিই প্রমাণ করে যে, হামলার ব্লুপ্রিন্ট ইতিমধ্যেই চূড়ান্ত করা হয়েছে এবং দুই দেশের বিমান বাহিনী এখন শুধু চূড়ান্ত রাজনৈতিক আদেশের অপেক্ষা করছে।

​উদ্ভূত এই চরম যুদ্ধ পরিস্থিতির বিষয়ে মার্কিন প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথ ওয়াশিংটনে আইনপ্রণেতাদের এবং কংগ্রেসের উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাদের একটি বিশেষ রুদ্ধদ্বার বৈঠকে ব্রিফ করেছেন। তিনি স্পষ্টভাবে জানান, ইরানের যেকোনো ধরণের অনাকাঙ্ক্ষিত পাল্টা পদক্ষেপ বা পারস্য উপসাগরে উদ্ভূত যেকোনো পরিস্থিতি কঠোরহস্তে মোকাবিলা করার জন্য আমেরিকার পেন্টাগনের কাছে সুনির্দিষ্ট ও অত্যন্ত নিখুঁত পরিকল্পনা বা 'প্ল্যান-বি' রেডি রয়েছে। হেগসেথ আরও যোগ করেন, ওয়াশিংটন তাদের জাতীয় স্বার্থ রক্ষার্থে প্রয়োজনে মধ্যপ্রাচ্যের রণক্ষেত্রে অতি দ্রুত আরও ভারী সামরিক ও নৌ-শক্তি বৃদ্ধি করতে, কৌশলগতভাবে পিছু হটতে অথবা যুদ্ধক্ষেত্রের গুরুত্বপূর্ণ সামরিক সম্পদ অন্য নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নিতে সম্পূর্ণ প্রস্তুত। তবে মার্কিন প্রতিরক্ষামন্ত্রী এটিও পুনর্ব্যক্ত করেছেন যে, হোয়াইট হাউস এখনই কূটনৈতিক আলোচনার পথ বা ব্যাকচ্যানেল ডায়ালগ একেবারে বন্ধ করে দিতে চাইছে না, যদিও বাস্তব পরিস্থিতি বলছে যে একটি শান্তিপূর্ণ কূটনৈতিক সমাধানের ক্ষেত্র দিন দিন ক্রমেই সংকুচিত হয়ে আসছে।

​ডোনাল্ড ট্রাম্পের তীব্র ক্ষোভ ও সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম বিতর্ক

​অন্য দিকে, মার্কিন যুক্তরাষ্টের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইরানের বর্তমান রাজনৈতিক ও ধর্মীয় নেতৃত্বের ওপর তীব্র ক্ষোভ ও চরম অসন্তোষ প্রকাশ করেছেন। আমেরিকার জনপ্রিয় সংবাদমাধ্যম 'ফক্স নিউজ' (Fox News)-কে দেওয়া এক এক্সক্লুসিভ সাক্ষাৎকারে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প অভিযোগ করেন, তেহরান আন্তর্জাতিক মহলে আলোচনার ভন্ডামি করছে।

আরও পড়ুন: আরব আমিরাতের পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রে ড্রোন হামলা, অল্পের জন্য রক্ষা

আরব আমিরাতের পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রে ড্রোন হামলা, অল্পের জন্য রক্ষা

তিনি দাবি করেন, ইরান এর আগেও একাধিকবার ব্যাকচ্যানেল আলোচনায় বিভিন্ন শান্তিচুক্তির শর্তে মৌখিকভাবে সম্মত হয়েছিল, কিন্তু পরবর্তীতে নিজেদের স্বার্থ হাসিল হওয়ার পর তারা সেই চুক্তিগুলো চূড়ান্তভাবে মেনে নিতে পরিষ্কার অস্বীকৃতি জানিয়েছে।

​ট্রাম্প নিজের স্বভাবসুলভ ক্ষুরধার ভাষায় বলেন, ‘প্রতিবার একটি আন্তর্জাতিক চুক্তি হওয়ার পরদিনই তেহরানের আচরণ সম্পূর্ণ বদলে যায়। তারা আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের সাথে এমন আচরণ শুরু করে যেন এই বিষয়ে পূর্বে কোনো ধরণের আলোচনাই হয়নি!’ মার্কিন প্রেসিডেন্ট পূর্ববর্তী আলোচনার একটি অন্যতম প্রধান ও গোপন শর্তের কথা উল্লেখ করে বলেন, শান্তিচুক্তির মূল ভিত্তিই ছিল ইরানকে তাদের উৎপাদিত সমস্ত সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম (Enriched Uranium) সম্পূর্ণরূপে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের কাছে হস্তান্তর করতে হবে। ওয়াশিংটনের পরিকল্পনা ছিল সেই ইউরেনিয়াম নিজেদের নিয়ন্ত্রণে নিয়ে পরবর্তীতে মার্কিন প্রযুক্তির সাহায্যে মাটির গভীর থেকে চিরতরে নিষ্কাশন ও অকেজো করে ফেলা, যাতে ইরান কখনোই পারমাণবিক বোমা বা 'নিউক্লিয়ার ওয়েপন' তৈরি করতে না পারে। কিন্তু ইরান সেই মূল শর্ত থেকে বারবার সরে গেছে।

​রেজাইয়ের ৯০% ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণের হুমকি ও ট্রাম্পের চূড়ান্ত আলটিমেটাম

​নিউ ইয়র্ক টাইমসের বিশেষ প্রতিবেদনে ইরানের অভ্যন্তরীণ প্রতিক্রিয়াও তুলে ধরা হয়েছে। প্রতিবেদন অনুযায়ী, পারস্য উপসাগরে মার্কিন-ইসরায়েলি যৌথ হামলা যদি পুনরায় আরম্ভ হয়, তবে ইরান তার পারমাণবিক সক্ষমতাকে এক অভূতপূর্ব স্তরে নিয়ে যাবে। ইরানি পার্লামেন্টের অত্যন্ত প্রভাবশালী জাতীয় নিরাপত্তা ও পররাষ্ট্র নীতি বিষয়ক কমিটির প্রধান মুখপাত্র ইব্রাহিম রেজাই এক কড়া পাল্টা বিবৃতিতে হুঁশিয়ারি দিয়েছেন যে, পশ্চিমা দেশগুলো যদি লেবানন বা সিরিয়ার পর সরাসরি ইরানের মূল ভূখণ্ডে আঘাত করে, তবে তেহরান তাদের ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণের মাত্রা তাৎক্ষণিকভাবে ৯০ শতাংশে (যা পারমাণবিক বোমা তৈরির জন্য সরাসরি উপযুক্ত বা উইপন-গ্রেড) উন্নীত করতে বাধ্য হবে।

​ইরানি মুখপাত্রের এই পরমাণু বোমার প্রচ্ছন্ন হুমকির জবাবে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প আরও বেশি আক্রমণাত্মক অবস্থান নিয়েছেন। তিনি স্পষ্ট করে জানান, তিনি ইরানি পারমাণবিক স্থাপনাগুলো কেবল দূর থেকে বিমান হামলা বা দূরপাল্লার ক্ষেপণাস্ত্র দিয়ে ধ্বংস করে সেই ইউরেনিয়ামকে মাটির নিচে চাপা দেওয়ার চেয়ে, সামরিক শক্তি প্রয়োগ করে সেটি সরাসরি সম্পূর্ণ নিজেদের নিয়ন্ত্রণে নিতে বেশি পছন্দ করবেন। ইরানের বর্তমান সরকারকে একটি চূড়ান্ত সময়সীমা বা 'লাস্ট আলটিমেটাম' দিয়ে ট্রাম্প বলেন, তেহরানের সামনে এখন কেবল দুটি পথই খোলা রয়েছে—হয় তারা মার্কিন শর্ত মেনে একটি স্থায়ী ও কঠোর পরমাণু চুক্তিতে আসবে, অন্যথায় তাদের সম্পূর্ণ সামরিক ও অর্থনৈতিক ধ্বংসের মুখোমুখি হতে হবে। যেকোনো সুস্থ ও কাণ্ডজ্ঞানসম্পন্ন মানুষ এই ধরণের পরিস্থিতিতে নিজের দেশকে বাঁচাতে চুক্তির পথ বেছে নেবে উল্লেখ করে তিনি মন্তব্য করেন, ইরানের বর্তমান নেতৃত্ব হয়তো পুরোপুরি কাণ্ডজ্ঞানহীন ও আত্মঘাতী আচরণ করছে। ট্রাম্প হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেন, মার্কিন প্রশাসন ও পেন্টাগন তেহরানের এই খামখেয়ালিপনার প্রতি আর বেশিদিন অলস ধৈর্য দেখাবে না এবং আগামী সপ্তাহের মধ্যেই মধ্যপ্রাচ্যের ইতিহাসের সবচেয়ে বড় সামরিক সিদ্ধান্তের সাক্ষী হতে যাচ্ছে বিশ্ব।

​সূত্র: নিউ ইয়র্ক টাইমস

 

Post a Comment

আপনার মূল্যবান মতামত আমাদের জানান। কোনো উসকানিমূলক বা অশালীন মন্তব্য করা থেকে বিরত থাকুন।

নবীনতর পূর্বতন