ব্রেকিং নিউজ

আরব আমিরাতের পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রে ড্রোন হামলা, অল্পের জন্য রক্ষা

আরব আমিরাতের পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রে ড্রোন হামলা, অল্পের জন্য রক্ষা

মধ্যপ্রাচ্যে চলমান তীব্র সামরিক উত্তেজনা এবং ভূ-রাজনৈতিক অস্থিরতার মাঝে এক নজিরবিহীন ও অত্যন্ত বিপজ্জনক ঘটনা ঘটেছে। 

আন্তর্জাতিক ডেস্ক, দিগন্ত বাংলা নিউজ: 

সংযুক্ত আরব আমিরাতের (UAE) রাজধানী আবু ধাবিতে অবস্থিত দেশটির একমাত্র এবং অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রে শক্তিশালী ড্রোন হামলার ঘটনা ঘটেছে। এই আকস্মিক আত্মঘাতী ড্রোন হামলার পরপরই বিদ্যুৎকেন্দ্রের ভেতরে ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডের সূত্রপাত হয়। তবে অত্যন্ত সৌভাগ্যবশত, এই ঘটনায় কোনো প্রাণহানি বা বড় ধরনের হতাহতের খবর পাওয়া যায়নি এবং পারমাণবিক চুল্লির মূল তেজস্ক্রিয়তার মাত্রায় কোনো ধরনের নেতিবাচক প্রভাব পড়েনি। আজ রবিবার (১৭ মে) সংযুক্ত আরব আমিরাতের রাষ্ট্রীয় ও নিরাপত্তা কর্তৃপক্ষ আনুষ্ঠানিকভাবে এই স্পর্শকাতর হামলার তথ্য নিশ্চিত করেছে, যা পুরো বিশ্বজুড়ে তীব্র চাঞ্চল্য ও উদ্বেগের সৃষ্টি করেছে।

​সংযুক্ত আরব আমিরাতের সরকারি সূত্র এবং আবু ধাবি মিডিয়া অফিসের দেওয়া আনুষ্ঠানিক বিবৃতির বরাতে জানা যায়, আজ রবিবার ভোরের দিকে আবু ধাবির প্রত্যন্ত আল ধাফরা অঞ্চলে অবস্থিত বহুল আলোচিত 'বারাকাহ পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র' (Barakah Nuclear Power Plant)-কে লক্ষ্য করে এই ড্রোনটি ছোঁড়া হয়। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া এক জরুরি পোস্টে দেশটির তথ্য মন্ত্রক ও মিডিয়া অফিস জানায়, বারাকাহ পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের মূল স্পর্শকাতর ভেতরের সীমানার ঠিক বাইরে অবস্থিত একটি বিশালাকার বৈদ্যুতিক জেনারেটরকে (Electrical Generator) লক্ষ্য করে এই ড্রোন হামলাটি চালানো হয়। ড্রোনটি সরাসরি জেনারেটরের ওপর আঘাত হানলে সেখানে মুহূর্তের মধ্যে দাউদাউ করে আগুন জ্বলে ওঠে। তবে বিদ্যুৎকেন্দ্রের বিশেষ ফায়ার ফাইটিং টিম এবং নিরাপত্তা কর্মীরা অত্যন্ত দ্রুততার সাথে ও সাহসিকতার সাথে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে সক্ষম হন, যার ফলে আগুন পারমাণবিক চুল্লির মূল ভবনে বা রিঅ্যাক্টরে ছড়িয়ে পড়তে পারেনি।

​তেজস্ক্রিয়তার ঝুঁকি ও পারমাণবিক নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষের বক্তব্য

​আন্তর্জাতিক পরমাণু শক্তি সংস্থা (IAEA) এবং পারমাণবিক বিশেষজ্ঞদের মতে, যেকোনো পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রে হামলা বা অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা মানেই সেখানে চেরনোবিল বা ফুকুশিমার মতো ভয়াবহ তেজস্ক্রিয়তা (Radiation) ছড়িয়ে পড়ার এক চরম ঝুঁকি তৈরি হওয়া। কিন্তু আরব আমিরাতের এই ঘটনায় তেমন কোনো বিপর্যয় ঘটেনি। আবু ধাবি মিডিয়া অফিস তাদের বিবৃতিতে সাধারণ নাগরিক ও আন্তর্জাতিক মহলকে আশ্বস্ত করে বলেছে যে, ড্রোন হামলার এই ঘটনায় তাৎক্ষণিকভাবে কোনো টেকনিক্যাল স্টাফ বা নিরাপত্তা কর্মীর হতাহতের খবর পাওয়া যায়নি। সবচেয়ে বড় স্বস্তির বিষয় হলো, পারমাণবিক নিরাপত্তা ব্যবস্থা সম্পূর্ণ অক্ষত রয়েছে এবং সংলগ্ন এলাকার বায়ুমণ্ডলে তেজস্ক্রিয়তার মাত্রায় বা রেডিয়েশন লেভেলে বিন্দুমাত্র কোনো পরিবর্তন বা ক্ষতিকর প্রভাব লক্ষ্য করা যায়নি।

​সংযুক্ত আরব আমিরাতের পারমাণবিক নিয়ন্ত্রণ বিষয়ক ফেডারেল কর্তৃপক্ষ (FANR) এই ঘটনার পর একটি বিশেষ কারিগরি বুলেটিন প্রকাশ করেছে। তারা অত্যন্ত দৃঢ়তার সাথে জানিয়েছে যে, বারাকাহ পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের সমস্ত গুরুত্বপূর্ণ ও স্পর্শকাতর সামরিক-বেসামরিক সরঞ্জাম এবং পারমাণবিক চুল্লির কুলিং সিস্টেমগুলো সম্পূর্ণ স্বাভাবিকভাবেই কাজ করছে। জেনারেটরের আগুন মূল গ্রিড বা নিউক্লিয়ার সেফটি সিস্টেমকে স্পর্শ করতে পারেনি। ফলে দেশের বিদ্যুৎ সরবরাহ ব্যবস্থায় কোনো বিঘ্ন ঘটেনি এবং এই মুহূর্তে পুরো প্ল্যান্টটি কঠোর রাষ্ট্রীয় নজরদারি ও সম্পূর্ণ নিরাপদ অবস্থায় রয়েছে।

আরও পড়ুন: কোম্পানীগঞ্জের মোস্তফা নগরে বসতবাড়িতে হামলা ও ভাঙচুর: সন্ত্রাসীদের হাত থেকে বাঁচতে প্রশাসনের হস্তক্ষেপ দাবি

​হামলার পেছনে কারা? দায় নিয়ে রহস্য এবং ভূ-রাজনৈতিক সমীকরণ

​তবে এই অত্যন্ত বিপজ্জনক এবং আন্তর্জাতিক আইন লঙ্ঘনকারী সম্ভাব্য ড্রোন হামলার জন্য প্রকৃতপক্ষে কে বা কোন গোষ্ঠী দায়ী, সে বিষয়ে আরব আমিরাতের সামরিক বা বেসামরিক প্রশাসনের পক্ষ থেকে দেওয়া বিবৃতিতে স্পষ্ট করে কিছুই জানানো হয়নি। এখন পর্যন্ত মধ্যপ্রাচ্যের কোনো সশস্ত্র সংগঠন বা আঞ্চলিক পরাশক্তি এই হামলার আনুষ্ঠানিক দায় স্বীকার করেনি, যা এই পুরো ঘটনাকে এক গভীর রহস্যের বৃত্তে বন্দি করেছে। প্রতিরক্ষাবিদদের একাংশের ধারণা, হামলাটি সুদূর কোনো বাঙ্কার থেকে অত্যন্ত নিখুঁত স্যাটেলাইট গাইডেড জিপিএস প্রযুক্তির মাধ্যমে পরিচালনা করা হয়েছে।

​বিশ্ব রাজনীতির বর্তমান প্রেক্ষাপট বিবেচনা করলে দেখা যায়, সাম্প্রতিক সময়ে পারস্য উপসাগরীয় অঞ্চলে ইসরায়েল, যুক্তরাষ্ট্র এবং ইরানের মধ্যকার ত্রিমুখী ও বহুমাত্রিক সামরিক সংঘাত এক চূড়ান্ত রূপ নিয়েছে। এই তীব্র আঞ্চলিক যুদ্ধাবস্থা চলাকালীন সংযুক্ত আরব আমিরাতকে বারবার বিভিন্ন দিক থেকে ছোঁড়া দূরপাল্লার ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র এবং আত্মঘাতী ড্রোন হামলার মুখে পড়তে হয়েছে। এর আগেও দেশটির প্রধান প্রধান বাণিজ্যিক বিমানবন্দর, তেল শোধনাগার, গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি ও সামুদ্রিক বাণিজ্যিক অবকাঠামো লক্ষ্য করে এ ধরনের বেশ কিছু ধ্বংসাত্মক হামলা চালানো হয়েছিল। অতীতে আরব আমিরাতের গোয়েন্দা ও নিরাপত্তা কর্তৃপক্ষ দাবি করেছিল যে, সেই সব জটিল হামলার পেছনে সরাসরি ইরানের মদদপুষ্ট আঞ্চলিক প্রক্সি সংগঠনগুলো (যেমন ইয়েমেনের হুথি বিদ্রোহী বা ইরাকের সশস্ত্র গোষ্ঠী) জড়িত ছিল। রবিবারের এই হামলাও সেই একই ভূ-রাজনৈতিক সংঘাতের একটি নতুন ও বিপজ্জনক সম্প্রসারণ বলে মনে করছেন সামরিক বিশেষজ্ঞরা।

​বারাকাহ বিদ্যুৎকেন্দ্রের গুরুত্ব ও বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারে এর প্রভাব

​সংযুক্ত আরব আমিরাতের জন্য এই 'বারাকাহ পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র' কেবল একটি স্থাপনা নয়, এটি দেশটির ভবিষ্যৎ অর্থনৈতিক রূপরেখা ও 'ভিশন ২০৫০' এর মূল স্তম্ভ। এটি আরব বিশ্বের প্রথম বাণিজ্যিক পারমাণবিক বিদ্যুৎ উৎপাদন কেন্দ্র, যা মোট চার হাজার ৪০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন করে সমগ্র আমিরাতের মোট চাহিদার প্রায় ২৫ শতাংশ পূরণ করে। তেল-নির্ভর অর্থনীতি থেকে বের হয়ে পরিবেশবান্ধব ও টেকসই পারমাণবিক শক্তির দিকে যাওয়ার ক্ষেত্রে এটি আমিরাতের সবচেয়ে বড় সাফল্য।

​আন্তর্জাতিক অর্থনীতিবিদদের মতে, পারস্য উপসাগরের ঠিক মুখে অবস্থিত এই বিদ্যুৎকেন্দ্রে হামলার ঘটনাটি বিশ্বজুড়ে জ্বালানি তেল ও গ্যাসের বাজারে এক নেতিবাচক মনস্তাত্ত্বিক প্রভাব ফেলতে পারে। কারণ, এই অঞ্চলটি বিশ্ব বাণিজ্যের অন্যতম প্রধান অর্থনৈতিক রুট। পারমাণবিক কেন্দ্রে ড্রোন পৌঁছানোর অর্থ হলো এই অঞ্চলের আকাশসীমা এখনো পুরোপুরি সুরক্ষিত নয়, যা আন্তর্জাতিক বড় বড় বিনিয়োগকারী ও বাণিজ্যিক জাহাজ কোম্পানিগুলোর মধ্যে নতুন করে চরম উদ্বেগ ও নিরাপত্তার শঙ্কা তৈরি করবে। জাতিসংঘ ও আন্তর্জাতিক পরমাণু শক্তি কমিশন এই হামলার তীব্র নিন্দা জানিয়ে বলেছে, যেকোনো পারমাণবিক স্থাপনায় হামলা আন্তর্জাতিক যুদ্ধাপরাধের শামিল। এখন দেখার বিষয়, আবুধাবি প্রশাসন তাদের এই রাষ্ট্রীয় সম্পদ রক্ষায় প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা কতটা জোরদার করে এবং এই অদৃশ্য ড্রোন হামলার জবাব কীভাবে দেয়।

​সূত্র: আন্তর্জাতিক সংবাদ মাধ্যম

 

Post a Comment

আপনার মূল্যবান মতামত আমাদের জানান। কোনো উসকানিমূলক বা অশালীন মন্তব্য করা থেকে বিরত থাকুন।

নবীনতর পূর্বতন