খেলাধুলা ডেস্ক, দিগন্ত বাংলা নিউজ:
ক্রীড়াঙ্গনে ফুটবলকে বলা হয় সৌন্দর্যের খেলা, যেখানে জয়-পরাজয় ছাপিয়ে বড় হয়ে ওঠে খেলোয়াড়সুলভ মনোভাব। কিন্তু স্কটিশ ফুটবলের এক ঐতিহ্যবাহী ম্যাচে সেই চিরন্তন সৌন্দর্য মুহূর্তের মধ্যেই রূপ নিল এক চরম বিশৃঙ্খলা ও কলঙ্কজনক অধ্যায়ে। স্কটল্যান্ডের ঐতিহ্যবাহী ক্লাব সেল্টিকের শিরোপা জয়ের আনন্দ উদযাপনের রেশ কাটতে না কাটতেই মাঠের ভেতর হামলার শিকার হয়েছেন প্রতিপক্ষ দল হার্টসের ফুটবলাররা। এই নজিরবিহীন ও অনাকাঙ্ক্ষিত সহিংসতার ঘটনাটি কেবল স্কটল্যান্ডেই নয়, বরং পুরো বিশ্ব ফুটবলেই ব্যাপক সমালোচনা ও নিন্দার ঝড় তুলেছে।
গত শনিবার স্কটিশ প্রিমিয়ারশিপের এক হাই-ভোল্টেজ ম্যাচে মুখোমুখি হয়েছিল সেল্টিক এবং হার্টস। পুরো মৌসুম জুড়ে দুর্দান্ত পারফর্ম করা সেল্টিকের জন্য এই ম্যাচটি ছিল শিরোপা নিশ্চিত করার ফাইনাল লড়াই। ঘরের মাঠে খেলা হওয়ায় স্টেডিয়াম জুড়ে ছিল সেল্টিক সমর্থকদের উপচে পড়া ভিড়। টানটান উত্তেজনার এই ম্যাচে হার্টসকে ৩-১ গোলের ব্যবধানে পরাজিত করে স্কটিশ প্রিমিয়ারশিপের ট্রফি নিজেদের করে নেয় সেল্টিক। কিন্তু রেফারি ম্যাচের শেষ বাঁশি বাজানোর পরপরই মাঠের চিত্র সম্পূর্ণ বদলে যায় এবং আনন্দের উৎসব রূপ নেয় এক ভীতিকর রণক্ষেত্রে।
ম্যাচের গতিপ্রকৃতি: হার্টসের শুরু ও সেল্টিকের দুর্দান্ত প্রত্যাবর্তন
ম্যাচের শুরুর প্রথমার্ধের দিকে তাকালে বোঝার উপায় ছিল না যে ম্যাচের শেষ পরিণতি এমন হতে যাচ্ছে। রেফারির শুরুর বাঁশির পর থেকেই মাঠের লড়াই ছিল বেশ সমানে সমানে। ঘরের মাঠে সেল্টিক যখন নিজেদের গুছিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করছিল, ঠিক তখনই ম্যাচের শুরুতেই গ্যালারি স্তব্ধ করে দিয়ে এগিয়ে যায় সফরকারী দল হার্টস। হার্টসের অধিনায়ক ও তারকা ফরোয়ার্ড লরেন্স শ্যাঙ্কল্যান্ড এক দুর্দান্ত শটের মাধ্যমে প্রতিপক্ষের জাল কাঁপিয়ে দলকে ১-০ গোলের গুরুত্বপূর্ণ লিড এনে দেন। প্রথমার্ধে এই ব্যবধান ধরে রেখে মাঠ ছাড়ে হার্টস, যার ফলে সেল্টিকের শিরোপা জয় কিছুটা সংকটের মুখে পড়েছিল।
তবে দ্বিতীয়ার্ধে নিজেদের চিরচেনা আক্রমণাত্মক ফুটবল কৌশলে ফিরে আসে সেল্টিক। ড্রেসিংরুম থেকে ফিরে এসে একের পর এক আক্রমণে প্রতিপক্ষের রক্ষণভাগকে কোণঠাসা করে ফেলে তারা। ম্যাচের সমতা ফেরাতে বেশি সময় নেয়নি স্বাগতিকেরা। দলের মিডফিল্ডার আর্নে এঙ্গেলস এক নিখুঁত ফিনিশিংয়ের মাধ্যমে গোল করে সেল্টিককে ১-১ সমতায় ফিরিয়ে আনেন। সমতা ফেরার পর ম্যাচের নিয়ন্ত্রণ পুরোপুরি সেল্টিকের হাতে চলে যায়। ম্যাচের শেষ দিকে হার্টসের ডিফেন্ডারদের পরাস্ত করে দলের দ্বিতীয় গোলটি করেন জাপানি ফরোয়ার্ড দাইজেন মায়েদা। এর ঠিক কিছুক্ষণের মধ্যেই ক্যালাম অসমন্ড দলের হয়ে তৃতীয় গোলটি করলে সেল্টিকের ৩-১ গোলের বড় জয় এবং বহুল কাঙ্ক্ষিত স্কটিশ প্রিমিয়ারশিপের শিরোপা নিশ্চিত হয়ে যায়।
শেষ বাঁশির পর চরম বিশৃঙ্খলা ও অধিনায়কের ওপর হামলা
ম্যাচের ৯০ মিনিটের খেলা শেষ হওয়ার পর রেফারি যখন শেষ বাঁশি বাজান, তখন গ্যালারিতে থাকা হাজার হাজার উচ্ছ্বসিত সেল্টিক সমর্থক কর্ডন ও নিরাপত্তা বেষ্টনী ভেঙে মাঠের ভেতর নেমে পড়েন।
আরও পড়ুন: আগামী সপ্তাহের মধ্যে ইরানে হামলার প্রস্তুতি নিচ্ছে ইসরায়েল এবং যুক্তরাষ্ট্র
প্রিয় দলের ট্রফি জয়ের আনন্দ খেলোয়াড়দের সাথে ভাগ করে নেওয়াই ছিল তাদের উদ্দেশ্য। কিন্তু এই অতি-উচ্ছ্বাসের সুযোগ নিয়ে একদল উগ্র সমর্থক মাঠের ভেতরে থাকা প্রতিপক্ষ হার্টসের খেলোয়াড়দের লক্ষ্য করে চড়াও হয়। মুহূর্তের মধ্যে মাঠের পরিবেশ সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায় এবং ছড়িয়ে পড়ে চরম বিশৃঙ্খলা।
এই বিশৃঙ্খল পরিস্থিতির মধ্যে সবচেয়ে বেশি শারীরিক লাঞ্ছনা ও আক্রমণের শিকার হন হার্টসের অধিনায়ক লরেন্স শ্যাঙ্কল্যান্ড। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে মুহূর্তের মধ্যে ছড়িয়ে পড়া বেশ কিছু ভিডিও ফুটেজে দেখা যায়, মাঠ ছেড়ে ড্রেসিংরুমের দিকে যাওয়ার সময় এক উগ্র সেল্টিক সমর্থক সরাসরি শ্যাঙ্কল্যান্ডের ওপর চড়াও হন এবং তাকে আঘাত করার চেষ্টা করেন। এমন আকস্মিক ও বিপজ্জনক পরিস্থিতির মুখে নিজের আত্মরক্ষার চেষ্টা করতে বাধ্য হন হার্টস অধিনায়ক। এক পর্যায়ে নিজেকে বাঁচাতে তাকেও পাল্টা প্রতিরক্ষামূলক ব্যবস্থা নিতে দেখা যায়। পরিস্থিতি আরও মারাত্মক আকার ধারণ করার আগেই মাঠে দায়িত্বরত স্থানীয় পুলিশ এবং স্টেডিয়ামের বিশেষ নিরাপত্তাকর্মীরা দ্রুত ছুটে আসেন এবং শ্যাঙ্কল্যান্ডকে চারপাশ থেকে ঘিরে ধরে নিরাপদে মাঠ থেকে সরিয়ে ড্রেসিংরুমে নিয়ে যান। তবে এই ঘটনায় হার্টসের আরও কয়েকজন ফুটবলার সামান্য লাঞ্ছিত হয়েছেন বলে জানা গেছে।
নিন্দা ও ফুটবলীয় সংস্কৃতির ওপর বড় আঘাত
এই নজিরবিহীন ও কলঙ্কজনক ঘটনার পর তীব্র ক্ষোভ ও নিন্দা প্রকাশ করেছে ফুটবলারদের ক্লাব হার্টস। ম্যাচ শেষের কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই ক্লাবটির পরিচালনা পর্ষদ থেকে একটি অফিশিয়াল বিবৃতি প্রকাশ করা হয়। বিবৃতিতে তারা এই ঘটনাকে ‘স্কটিশ ফুটবলের ইতিহাসের জন্য একটি লজ্জাজনক কালো দিন’ বলে তীব্র ধিক্কার জানায়। হার্টস কর্তৃপক্ষ স্পষ্ট করে বলেছে, পেশাদার ফুটবলের মাঠে খেলোয়াড়দের নিরাপত্তা সবার আগে। শিরোপা উদযাপনের নামে প্রতিপক্ষ দলের ওপর এই ধরণের কাপুরুষোচিত হামলা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। ক্লাবটি ইতিমধ্যে স্থানীয় পুলিশ প্রশাসনের কাছে আনুষ্ঠানিক অভিযোগ দায়ের করেছে এবং অপরাধীদের চিহ্নিত করে কঠোর আইনি শাস্তি নিশ্চিত করার জন্য সিসিটিভি ফুটেজ ও তদন্তে পূর্ণ সহযোগিতার আশ্বাস দিয়েছে।
এই অনাকাঙ্ক্ষিত সহিংসতার তীব্র প্রভাব পড়েছে ম্যাচের পরবর্তী অফিশিয়াল কার্যক্রমের ওপরও। সাধারণ নিয়ম অনুযায়ী ম্যাচ শেষে দুই দলের কোচ ও খেলোয়াড়দের সংবাদমাধ্যমের মুখোমুখি হয়ে সাক্ষাৎকার দেওয়ার কথা থাকলেও নিরাপত্তার স্বার্থে হার্টসের খেলোয়াড় ও কর্মকর্তাদের সেই দায়িত্ব পালন করতে দেওয়া হয়নি। স্টেডিয়ামের পরিবেশ খেলোয়াড়দের জন্য অনিরাপদ হয়ে ওঠায় এবং পুনরায় হামলার আশঙ্কা থাকায় পুলিশের বিশেষ সুরক্ষায় হার্টস দলকে দ্রুত স্টেডিয়াম ছাড়তে বাধ্য করা হয়। স্কটিশ ফুটবল অ্যাসোসিয়েশন (SFA) এই ঘটনার প্রেক্ষিতে সেল্টিক ক্লাবের বিরুদ্ধে মাঠের নিরাপত্তা বজায় রাখতে ব্যর্থ হওয়ায় বড় ধরণের আর্থিক জরিমানা এবং পরবর্তী ম্যাচগুলোতে দর্শকহীন স্টেডিয়ামে (Closed-door match) খেলার নিষেধাজ্ঞা আরোপ করার কথা বিবেচনা করছে। ফুটবল বিশ্লেষকদের মতে, এই ধরণের ঘটনা কেবল একটি ম্যাচের ফলাফলকেই ম্লান করে দেয় না, বরং সামগ্রিক ফুটবলীয় সংস্কৃতির ওপর এক বিশাল বড় কালো দাগ রেখে যায়।
সূত্র: আন্তর্জাতিক ক্রীড়া সংবাদ


একটি মন্তব্য পোস্ট করুন
আপনার মূল্যবান মতামত আমাদের জানান। কোনো উসকানিমূলক বা অশালীন মন্তব্য করা থেকে বিরত থাকুন।