সীমান্ত ছাড়াল 'তেলাপোকা' আন্দোলন: পাকিস্তানেও নতুন দলগুলোর আত্মপ্রকাশ

সীমান্ত ছাড়াল 'তেলাপোকা' আন্দোলন: পাকিস্তানেও নতুন দলগুলোর আত্মপ্রকাশ

সীমান্ত ছাড়াল 'তেলাপোকা' আন্দোলন: ভারতে আলোড়নের পর এবার পাকিস্তানেও ব্যঙ্গাত্মক দলের আত্মপ্রকাশ!

আন্তর্জাতিক ডেস্ক: শামীম হোসাইন / দিগন্ত বাংলা নিউজ

​ইন্টারনেট এবং সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের যুগে যেকোনো অভিনব আইডিয়া বা ট্রেন্ড মুহূর্তের মধ্যেই সীমান্ত পেরিয়ে বিশ্বজুড়ে ছড়িয়ে পড়ে। সম্প্রতি ভারতের রাজনৈতিক অঙ্গনে জন্ম নেওয়া একটি অদ্ভুত ও ব্যঙ্গাত্মক 'তেলাপোকা' আন্দোলন এখন শুধু ভারতের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নেই, তার ঢেউ সশব্দে আছড়ে পড়েছে প্রতিবেশী রাষ্ট্র পাকিস্তানেও। ভারতে ‘তেলাপোকা জনতা পার্টি’ (Cockroach Janata Party - CJP) নামক একটি প্রতীকী ও স্যাটায়রিক দলের অভূতপূর্ব সাফল্যের পর, সেই একই অনুপ্রেরণায় পাকিস্তানেও একাধিক অদ্ভুত রাজনৈতিক দলের আত্মপ্রকাশ ঘটেছে।

​শুক্রবার (২২ মে) আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম এনডিটিভি (NDTV)-এর একটি বিশেষ প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ভারতে বেকার যুবকদের অধিকার আদায়ের একটি ব্যঙ্গাত্মক প্রতীক হিসেবে শুরু হওয়া এই ভাইরাল 'তেলাপোকা আন্দোলন'টি এখন কাঁটাতার পেরিয়ে পাকিস্তানের ডিজিটাল ও রাজনৈতিক অঙ্গনে ব্যাপক আলোড়ন সৃষ্টি করেছে। এর ফলে পাকিস্তানে রাতারাতি তৈরি হওয়া দলগুলোর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের অ্যাকাউন্টগুলোতে ফলোয়ার সংখ্যা হু হু করে বাড়ছে।

​পাকিস্তানে আত্মপ্রকাশ করা ৩টি 'তেলাপোকা' দল

​ভারতীয় তরুণদের এই অভিনব সামাজিক ও রাজনৈতিক প্রতিবাদের কৌশলটি পাকিস্তানি নেটিজেন এবং বিশেষ করে হতাশ ও বেকার তরুণদের দারুণভাবে আকর্ষণ করেছে। ভারতের দেখাদেখি পাকিস্তানের তরুণরাও নিজেদের দেশের রাজনৈতিক দুরবস্থা এবং বেকারত্বকে উপহাস করতে তিনটি ভিন্ন ভিন্ন দল গঠন করেছে। এগুলো হলো:

  • ​১. তেলাপোকা আওয়ামী লীগ (Cockroach Awami League)
  • ২. তেলাপোকা আওয়ামী পার্টি (Cockroach Awami Party)
  • ৩. মুত্তিহিদা তেলাপোকা মুভমেন্ট (Muttahida Cockroach Movement - MCM)

​এই দলগুলোর মধ্যে সবচেয়ে বেশি আলোচিত হচ্ছে 'তেলাপোকা আওয়ামী লীগ'। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে দলটির অফিসিয়াল পেজের বায়ো বা পরিচিতি পর্বে তারা লিখেছে, “এটি মূলত তরুণদের একটি রাজনৈতিক ফ্রন্ট, যা সম্পূর্ণভাবে তরুণদের দ্বারাই পরিচালিত এবং এটি পাকিস্তানের উজ্জ্বল ভবিষ্যতের জন্য কাজ করবে।”

​মজার ব্যাপার হলো, পাকিস্তানে গঠিত এই নতুন দলগুলো প্রচারণার জন্য যেসব ডিজিটাল লোগো এবং ব্যানার ব্যবহার করছে, সেগুলোর সাথে ভারতের মূল ‘তেলাপোকা জনতা পার্টি’র লোগোর নিখুঁত সাদৃশ্য রয়েছে। ইন্টারনেট দুনিয়ায় এটিকে এখন দক্ষিণ এশিয়ার তরুণদের এক অভিনব "ডিজিটাল ও রাজনৈতিক জোট" হিসেবে দেখা হচ্ছে।

আরও পড়ুন: টিভিতে আজকের যে সব খেলা

টিভিতে আজকের যে সব খেলা

​আন্দোলনের নেপথ্য কারণ: ভারতের সুপ্রিম কোর্টের সেই মন্তব্য

​এই পুরো ঘটনার সূত্রপাত কিন্তু কোনো রাজনৈতিক দলের হাত ধরে হয়নি, বরং এর পেছনে রয়েছে ভারতের সর্বোচ্চ আদালতের একটি অত্যন্ত সংবেদনশীল মন্তব্য। কিছুদিন আগে ভারতের সুপ্রিম কোর্টে একটি মামলার শুনানির সময়, দেশটির প্রধান বিচারপতি দেশের ক্রমবর্ধমান বেকার তরুণদের সামাজিক অবস্থান ও আচরণকে বোঝাতে গিয়ে অসাবধানতাবশত ‘তেলাপোকা’ ও ‘পরজীবী’ (Cockroaches and Parasites)-র সাথে তুলনা করেন।

​দেশের সর্বোচ্চ আদালতের মুখ থেকে এমন অপমানজনক এবং বেদনাদায়ক তুলনা শোনার পর ভারতের তরুণ সমাজের মধ্যে তীব্র ক্ষোভ ও হতাশার সৃষ্টি হয়। প্রচলিত ধারায় ভাঙচুর বা রাজপথে আন্দোলন না করে, এই অপমানের এক অভিনব ও শান্তিপূর্ণ জবাব দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেন ৩০ বছর বয়সী ভারতীয় তরুণ অভিজিৎ দীপকে। তিনি প্রধান বিচারপরতির সেই মন্তব্যকে ব্যঙ্গ করে বা স্যাটায়ার হিসেবে ব্যবহার করে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ‘তেলাপোকা জনতা পার্টি’ (CJP) নামে একটি ডামি বা প্রতীকী রাজনৈতিক দল গঠন করেন।

​বিজেপি ও কংগ্রেসকে পেছনে ফেলে কোটি কোটি ফলোয়ার

​অভিজিৎ দীপকের এই উদ্ভাবনী প্রতিবাদ ভারতের কোটি কোটি বেকার যুবকের হৃদয়ে গিয়ে আঘাত করে। যুবসমাজ এই অপমানকে নিজেদের শক্তি বানিয়ে দলটির ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে যোগ দিতে শুরু করে। পরিস্থিতি এমন পর্যায়ে পৌঁছায় যে, খুব অল্প সময়ের মধ্যেই তাদের অফিশিয়াল ইনস্টাগ্রাম (Instagram) অ্যাকাউন্টে ফলোয়ার বা যুক্ত হওয়া মানুষের সংখ্যা ২ কোটি (২০ মিলিয়ন) পার হয়ে যায়!

​ডিজিটাল দুনিয়ার এই সংখ্যাটি কতটা বিশাল তা বোঝা যায় যখন এর সাথে ভারতের মূল ধারার রাজনৈতিক দলগুলোর তুলনা করা হয়। বর্তমানে ভারতের ক্ষমতাসীন দল ভারতীয় জনতা পার্টি (BJP) এবং প্রধান বিরোধী দল ইন্ডিয়ান ন্যাশনাল কংগ্রেস (INC)-এর অফিশিয়াল সোশ্যাল মিডিয়া ফলোয়ার সংখ্যার চেয়েও এই ব্যঙ্গাত্মক 'তেলাপোকা জনতা পার্টি'র ফলোয়ার সংখ্যা অনেক বেশি। এটি স্পষ্ট প্রমাণ করে যে, সাধারণ তরুণ সমাজ প্রচলিত রাজনীতির চেয়ে এই সৃজনশীল প্রতিবাদের সাথে নিজেদের বেশি কানেক্ট করতে পারছে।

​দক্ষিণ এশিয়ার তরুণদের অভিন্ন সংকট ও স্যাটায়ারের শক্তি

​সমাজবিজ্ঞান ও ভূ-রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, ভারতের এই আন্দোলন পাকিস্তানের তরুণদের মধ্যে এত দ্রুত ছড়িয়ে পড়ার মূল কারণ হলো—দুই দেশের তরুণদের বর্তমান সামাজিক ও অর্থনৈতিক সংকট হুবহু এক। ভারত ও পাকিস্তান—উভয় দেশেই উচ্চশিক্ষিত তরুণদের মধ্যে বেকারত্বের হার আকাশচুম্বী। মুদ্রাস্ফীতি, অর্থনৈতিক মন্দা এবং রাজনৈতিক দলগুলোর পারস্পরিক কাদা ছোঁড়াছুড়ির কারণে সাধারণ যুবসমাজ আজ চরম দিশেহারা।

​যখন ভারতের তরুণরা নিজেদের 'তেলাপোকা' হিসেবে মেনে নিয়ে সিস্টেমকে উপহাস করা শুরু করল, তখন পাকিস্তানের তরুণরাও বুঝতে পারল যে তাদের দেশের পরিস্থিতিও ভিন্ন কিছু নয়। করাচি, লাহোর বা ইসলামাবাদের তরুণরাও চাকরি না পেয়ে, ভবিষ্যৎ নিয়ে অনিশ্চয়তার মধ্যে দিন কাটাচ্ছে। তাই তারা এই ব্যঙ্গাত্মক আন্দোলনের মাধ্যমে নিজেদের দেশের শাসকগোষ্ঠী ও নীতি-নির্ধারকদের একটি শক্ত বার্তা দিতে চাইছে। রাজনীতিতে এই ধরনের ব্যঙ্গ বা 'পলিটিক্যাল স্যাটায়ার' সবসময়ই খুব শক্তিশালী ভূমিকা পালন করে, যা বড় বড় বুলেট বা কামানের চেয়েও দ্রুত সাধারণ মানুষকে জাগ্রত করতে পারে।

​উপসংহার

​'তেলাপোকা আওয়ামী লীগ' কিংবা 'তেলাপোকা জনতা পার্টি' হয়তো কখনো সরাসরি নির্বাচনে অংশ নেবে না বা ব্যালট পেপারে এদের নাম থাকবে না; কিন্তু ইন্টারনেট ও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে এদের এই হু হু করে বেড়ে চলা জনপ্রিয়তা একটি বড় সামাজিক অ্যালার্ম বা সতর্কবার্তা। এটি বিশ্বকে দেখায় যে, দক্ষিণ এশিয়ার তরুণ প্রজন্ম প্রচলিত শাসনব্যবস্থা এবং কর্মসংস্থানের অভাব নিয়ে কতটা ক্ষুব্ধ ও বিরক্ত। এই প্রতীকী আন্দোলন যদি দুই দেশের নীতিনির্ধারকদের চোখ খুলে দিতে পারে এবং তরুণদের কর্মসংস্থান সৃষ্টিতে বাধ্য করতে পারে, তবেই এই 'তেলাপোকা' শব্দের সার্থকতা প্রমাণিত হবে।

 

Post a Comment

আপনার মূল্যবান মতামত আমাদের জানান। কোনো উসকানিমূলক বা অশালীন মন্তব্য করা থেকে বিরত থাকুন।

নবীনতর পূর্বতন