মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রীর ভারত সফর: মোদির সঙ্গে আজ মেগা বৈঠক

মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রীর ভারত সফর: মোদির সঙ্গে আজ মেগা বৈঠক

ভূ-রাজনীতির নতুন সমীকরণ: মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও’র ভারত সফর ও মোদির সঙ্গে মেগা বৈঠক

আন্তর্জাতিক ডেস্ক: শামীম হোসাইন / দিগন্ত বাংলা নিউজ

​বিশ্ব রাজনীতির দুই অন্যতম প্রধান অংশীদার মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এবং ভারতের দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ককে আরও এক ধাপ এগিয়ে নিতে আজ শনিবার চার দিনের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ রাষ্ট্রীয় সফরে ভারতে এসে পৌঁছেছেন নবনিযুক্ত মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও। দায়িত্বভার গ্রহণ করার পর দক্ষিণ এশিয়ার পরাশক্তি ভারতে এটিই তাঁর প্রথম আনুষ্ঠানিক ও দ্বিপাক্ষিক সফর। কূটনৈতিকভাবে অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ এই সফরের প্রথম দিনেই আজ তিনি ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির সঙ্গে একটি হাই-প্রোফাইল বৈঠকে মিলিত হবেন বলে নিশ্চিত করেছেন ভারতে নিযুক্ত মার্কিন রাষ্ট্রদূত সের্গিও গোর। এই মেগা বৈঠকের দিকে এখন গভীর নজর রাখছে আন্তর্জাতিক মহল।

​কলকাতায় পা রেখেই মাদার তেরেসার চ্যারিটি পরিদর্শন

​মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও এবং তাঁর স্ত্রী জিনেট ডি রুবিও আজ সকালে ভারতের সাংস্কৃতিক রাজধানী হিসেবে পরিচিত পশ্চিমবঙ্গের কলকাতায় এসে পৌঁছান। বিমানবন্দরে তাঁদের উষ্ণ অভ্যর্থনা জানানো হয়। কলকাতায় পা রাখার পর রুবিও দম্পতি তাঁদের সফরের প্রথম আনুষ্ঠানিক কর্মসূচি হিসেবে সরাসরি চলে যান বিশ্বখ্যাত মানবতাবাদী মাদার তেরেসা কর্তৃক প্রতিষ্ঠিত 'মিশনারিজ অব চ্যারিটি'র সদর দপ্তরে।

​সেখানে তাঁরা সংগঠনটির বর্তমান শীর্ষ কর্মকর্তাদের সঙ্গে আন্তরিক পরিবেশে কথা বলেন এবং বিশ্বের দরিদ্র, অসুস্থ ও অসহায় মানুষের সেবায় মাদার তেরেসার রেখে যাওয়া মানবিক কাজের ভূয়সী প্রশংসা করেন। কূটনৈতিক প্রটোকলের বাইরে গিয়ে মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রীর এই মানবিক প্রতিষ্ঠান পরিদর্শন দুই দেশের জনগণের মধ্যকার আত্মিক ও মানবিক সম্পর্ককে আরও দৃঢ় করবে বলে মনে করা হচ্ছে।

আরও পড়ুন: শাহজাদপুর মখদুমিয়া জামে মসজিদ ও মাজারের সুপ্রাচীন ইতিহাস ও স্থাপত্যশৈলী

শাহজাদপুর মখদুমিয়া জামে মসজিদ ও মাজারের সুপ্রাচীন ইতিহাস ও স্থাপত্যশৈলী

​১৪ বছর পর কলকাতায় কোনো মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী

​মার্কো রুবিও’র এই কলকাতা সফরের পেছনে একটি ঐতিহাসিক ও কূটনৈতিক রেকর্ড রয়েছে। দীর্ঘ ১৪ বছর পর এই প্রথম মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের কোনো পররাষ্ট্রমন্ত্রী ভারতের নতুন দিল্লি বা মুম্বাইয়ের বাইরে এসে সরাসরি কলকাতা সফর করলেন। এর আগে ২০১২ সালে তৎকালীন মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী হিলারি ক্লিনটন কলকাতা সফরে এসেছিলেন। ফলে রুবিও’র এই সফরটি ভারতের পূর্ব ও উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় রাজ্যগুলোর সঙ্গে আমেরিকার অর্থনৈতিক ও কৌশলগত সম্পর্ক বৃদ্ধির ক্ষেত্রে একটি বড় বার্তা হিসেবে দেখা হচ্ছে।

​সফরের ব্যস্ত সূচি: জয়শঙ্করের সাথে বৈঠক ও কোয়াড সামিট

​চার দিনের এই দীর্ঘ সফরে মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রীর ডায়েরি অত্যন্ত ব্যস্ত সূচিতে ঠাসা। আজকের মোদি-রুবিও মেগা বৈঠকের পর, আগামীকাল রবিবার (২৪ মে) তিনি ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী এস. জয়শঙ্করের সঙ্গে একটি দ্বিপাক্ষিক রুদ্ধদ্বার বৈঠকে বসবেন। এই বৈঠকে দুই দেশের পররাষ্ট্র ও প্রতিরক্ষা নীতির নানা খুঁটিনাটি বিষয় নিয়ে আলোচনা হবে।

​সফরের অন্যতম প্রধান আকর্ষণ হিসেবে আগামী মঙ্গলবার ভারতের রাজধানী নতুন দিল্লিতে অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে চার জাতির শক্তিশালী জোট 'কোয়াড' (QUAD - Quadrilateral Security Dialogue)-এর পররাষ্ট্রমন্ত্রীদের সম্মেলন। ভারত, আমেরিকা, জাপান ও অস্ট্রেলিয়াকে নিয়ে গঠিত এই জোটের মূল লক্ষ্য হলো ইন্দো-প্যাসিফিক বা ভারত-প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলে চীনের ক্রমবর্ধমান সামরিক ও অর্থনৈতিক আধিপত্য রুখে দেওয়া। এই হাই-লেভেল কোয়াড সামিটে মার্কো রুবিও মার্কিন প্রতিনিধিদলের নেতৃত্ব দেবেন। কূটনৈতিক কর্মসূচির পাশাপাশি তাঁর ভারতের ঐতিহাসিক আগ্রার তাজমহল এবং রাজকীয় শহর জয়পুর সফরের কথাও রয়েছে।

​আলোচনার মূল এজেন্ডা: যুদ্ধ, শুল্ক বিতর্ক ও জ্বালানি সংকট

​ভারত ও আমেরিকার এই হাই-প্রোফাইল কূটনৈতিক দ্বৈরথে বেশ কিছু জটিল ও সংবেদনশীল বৈশ্বিক ইস্যু আলোচনার টেবিলে স্থান পাবে বলে বিশ্লেষকরা মনে করছেন। এর মধ্যে অন্যতম হলো:

​১. যুক্তরাষ্ট্র-ইরান যুদ্ধ ও তার প্রভাব

​বর্তমানে মধ্যপ্রাচ্যে চলমান যুক্তরাষ্ট্র এবং ইরানের মধ্যকার উত্তেজনা ও সামরিক সংঘাত পুরো বিশ্বের জন্য উদ্বেগের কারণ। এই যুদ্ধের ফলে বৈশ্বিক অর্থনীতিতে যে নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে, তা নিয়ে দুই পক্ষ গভীর আলোচনা করবে। বিশেষ করে আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম নিয়ন্ত্রণ এবং সরবরাহ চেইন ঠিক রাখার বিষয়ে দুই দেশের অবস্থান কী হবে, তা নির্ধারণ করা হবে।

​২. জ্বালানি সরবরাহ পরিস্থিতি

​ভারত তার অপরিশোধিত তেলের (Crude Oil) একটি বড় অংশ মধ্যপ্রাচ্য থেকে আমদানি করে। ইরান-আমেরিকা সংকটের কারণে ভারতের এই জ্বালানি নিরাপত্তা যেন বিঘ্নিত না হয়, সে বিষয়ে মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রীর কাছ থেকে বিশেষ আশ্বাস চাইতে পারে নয়াদিল্লি।

​৩. ট্রাম্প প্রশাসনের নতুন শুল্ক নীতি

​মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প সম্প্রতি ভারতীয় পণ্যের ওপর নতুন করে শুল্ক (Tariff) আরোপের ঘোষণা দেওয়ায় দুই দেশের বাণিজ্যিক সম্পর্কে এক ধরনের শীতলতা তৈরি হয়েছে। বাণিজ্য ক্ষেত্রে সৃষ্ট এই ট্যারিফ যুদ্ধ বা উত্তেজনা প্রশমন করে কীভাবে একটি সুষম অর্থনৈতিক অংশীদারিত্ব বজায় রাখা যায়, তা রুবিও-মোদি বৈঠকের অন্যতম প্রধান এজেন্ডা হতে যাচ্ছে।

​ভারতকে ‘গুরুত্বপূর্ণ মিত্র’ হিসেবে স্বীকৃতি

​ভারত সফর নিয়ে নিজের উচ্ছ্বাস ও সফরের গুরুত্ব প্রকাশ করে মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও সংবাদমাধ্যমকে জানান, “ভারতের সঙ্গে আমাদের যৌথভাবে কাজ করার বিশাল ক্ষেত্র রয়েছে। বৈশ্বিক ও আঞ্চলিক নিরাপত্তার স্বার্থে তারা আমাদের অন্যতম অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ কৌশলগত মিত্র এবং অংশীদার। আমরা দীর্ঘদিন ধরে একসঙ্গে অনেক ভালো ও ইতিবাচক কাজ করছি, তাই বর্তমান বিশ্ব পরিস্থিতির প্রেক্ষাপটে আমার এই সফরটি অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ ও সময়োপযোগী।”

​ভূ-রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মূল্যায়ন

​আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশ্লেষকদের মতে, মার্কো রুবিও’র এই সফরটি মূলত ওয়াশিংটন ও নতুন দিল্লির মধ্যকার সম্পর্ককে এক অভূতপূর্ব উচ্চতায় নিয়ে যাওয়ার একটি সুদূরপ্রসারী কূটনৈতিক উদ্যোগ। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের বর্তমান ডোনাল্ড ট্রাম্প প্রশাসন এবং ভারতের নরেন্দ্র মোদি সরকার—উভয় পক্ষই তাদের দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের গতিশীলতা এবং গভীরতা ধরে রাখতে অত্যন্ত আগ্রহী। যদিও শুল্ক বা বাণিজ্য নীতি নিয়ে দুই দেশের মধ্যে কিছু দ্বিমত রয়েছে, তাসত্ত্বেও চীনকে কাউন্টার বা প্রতিরোধ করার ক্ষেত্রে এবং বৈশ্বিক সন্ত্রাসবাদ দমনে ভারত ও আমেরিকা একে অপরের অপরিহার্য সহযোগী।

​উপসংহার

​মার্কো রুবিও’র এই চার দিনের ভারত সফর কেবল একটি আনুষ্ঠানিক সফর নয়, বরং এটি আগামী দিনের বিশ্ব রাজনীতির মেরুকরণ নির্ধারণের একটি মহড়া। আজ প্রধানমন্ত্রী মোদির সঙ্গে বৈঠক এবং পরবর্তীতে কোয়াড সামিটের সিদ্ধান্তগুলোই বলে দেবে যে ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চল এবং মধ্যপ্রাচ্যের সংকটে ভারত ও আমেরিকা কতটা কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে চলতে প্রস্তুত। বিশ্ববাসী এখন তাকিয়ে আছে দিল্লির এই মেগা কূটনৈতিক নাট্যমঞ্চের দিকে।

 

Post a Comment

আপনার মূল্যবান মতামত আমাদের জানান। কোনো উসকানিমূলক বা অশালীন মন্তব্য করা থেকে বিরত থাকুন।

নবীনতর পূর্বতন