ব্রেকিং নিউজ

ইরানের সাথে চুক্তি নিয়ে ট্রাম্পের সুরবদল: তাড়াহুড়া না করার নির্দেশ

ইরানের সাথে চুক্তি নিয়ে ট্রাম্পের সুরবদল: তাড়াহুড়া না করার নির্দেশ

আন্তর্জাতিক ডেস্ক, দিগন্ত বাংলা নিউজ:

 বিশ্ব রাজনীতির রঙ্গমঞ্চে ওয়াশিংটন ও তেহরানের মধ্যকার সম্পর্কের বরফ গলার যে আভাস পাওয়া যাচ্ছিল, তাতে নতুন এক নাটকীয় মোড় এসেছে। ইরানের সাথে বহুল প্রতীক্ষিত একটি দ্বিপাক্ষিক চুক্তিতে পৌঁছানোর বিষয়ে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সাম্প্রতিক অবস্থানে এক বড় ধরণের সুরবদল বা রদবদল লক্ষ্য করা গেছে। যেখানে মাত্র কয়েকদিন আগেও মার্কিন প্রেসিডেন্ট এই সমঝোতা চুক্তিটিকে ‘প্রায় চূড়ান্ত’ বলে ঘোষণা দিয়েছিলেন, সেখানে এখন তিনি সুর নরম করে মার্কিন কূটনীতিবিদ ও আলোচক দলকে ‘কোনো রকম তাড়াহুড়া না করার’ জন্য স্পষ্ট নির্দেশ দিয়েছেন। ট্রাম্পের এই আকস্মিক ডিগবাজি বা অবস্থান পরিবর্তনের ফলে মধ্যপ্রাচ্যের ভূ-রাজনীতি এবং বিশ্ব জ্বালানি বাজারের ভবিষ্যৎ নিয়ে নতুন করে ধোঁয়াশা ও চুলচেরা বিশ্লেষণ শুরু হয়েছে।

​হোয়াইট হাউস এবং আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমের সূত্র অনুযায়ী, প্রস্তাবিত এই সমঝোতার মূল উদ্দেশ্য হলো মধ্যপ্রাচ্যে চলমান তীব্র সামরিক উত্তেজনা প্রশমন করা। এই চুক্তির খসড়াতে মূলত তিনটি বড় বিষয়ের ওপর জোর দেওয়া হয়েছে—চলতি যুদ্ধবিরতির মেয়াদ আরও ৬০ দিনের জন্য বৃদ্ধি করা, বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহের প্রধান রুট বা ধমনী খ্যাত ‘হরমুজ প্রণালি’ বাণিজ্যিক জাহাজের জন্য পুনরায় পুরোপুরি উন্মুক্ত করে দেওয়া এবং ইরানের বিতর্কিত পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে ভবিষ্যতে আরও গভীর ও দীর্ঘমেয়াদী আলোচনার একটি রূপরেখা তৈরি করা।

​ট্রাম্পের সামাজিক মাধ্যমের বার্তা ও ইরানের প্রতিক্রিয়া

​সরাসরি কোনো আনুষ্ঠানিক প্রেস ব্রিফিং না করে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প তাঁর নিজস্ব সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে একটি দীর্ঘ পোস্টের মাধ্যমে ওয়াশিংটনের এই নতুন অবস্থানের কথা বিশ্ববাসীকে জানান। ট্রাম্প তাঁর পোস্টে উল্লেখ করেন যে, তেহরানের সাথে মার্কিন প্রতিনিধি দলের ‘গঠনমূলক’ ও ইতিবাচক আলোচনা বেশ ভালোভাবেই সামনের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে। তবে এই ধরণের একটি স্পর্শকাতর আন্তর্জাতিক বিষয়ে তাড়াহুড়া করা মোটেও বুদ্ধিমানের কাজ হবে না। ট্রাম্পের মতে, "উভয় পক্ষকেই পর্যাপ্ত সময় নিতে হবে এবং পুরো বিষয়টিকে শতভাগ সঠিকভাবে ও নিখুঁতভাবে সম্পন্ন করতে হবে।" অথচ গত শনিবারও ট্রাম্পের কণ্ঠে ছিল ভিন্ন সুর, যখন তিনি গণমাধ্যমকে বলেছিলেন যে চুক্তিটি চূড়ান্ত হওয়ার একদম শেষ পর্যায়ে রয়েছে এবং যেকোনো মুহূর্তে বড় ঘোষণা আসতে পারে।

​অন্যদিকে, ট্রাম্পের এই কৌশলী অবস্থানের সমান্তরালে ইরানি কর্মকর্তাদের গলাতেও কিছুটা সাবধানী ও কূটনৈতিক সুর শোনা গেছে। চলিত সপ্তাহের শেষভাগে ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র ইসমাইল বাঘাই দুই দেশের এই আলোচনার অগ্রগতি নিয়ে মন্তব্য করতে গিয়ে একটি চমৎকার রূপক ব্যবহার করেছেন। তিনি বলেন, একটি চূড়ান্ত এবং ফলপ্রসূ চুক্তিতে পৌঁছানোর ক্ষেত্রে ওয়াশিংটন এবং তেহরান একই সাথে ‘খুব কাছে’ এবং একই সাথে ‘অনেক দূরে’ অবস্থান করছে। অর্থাৎ, টেবিলে কিছু বিষয়ে ঐক্যমত হলেও মূল জটিল জায়গাগুলো এখনো অমীমাংসিতই রয়ে গেছে।

আরও পড়ুন: মুচলেকা দিয়ে স্থগিতাদেশ মুক্ত শাকিব খানের ‘প্রিন্স’: প্রদর্শনে আর বাধা নেই

মুচলেকা দিয়ে স্থগিতাদেশ মুক্ত শাকিব খানের ‘প্রিন্স’: প্রদর্শনে আর বাধা নেই

​পর্দার আড়ালের জটিলতা ও মার্কিন রাজনীতিতে বিভক্তি

​মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের শীর্ষস্থানীয় রাজনৈতিক ও সামরিক গণমাধ্যমগুলোর ভেতরের খবর অনুযায়ী, এখন যে চুক্তিটি নিয়ে আলোচনা চলছে তা কোনো স্থায়ী বা চূড়ান্ত শান্তি চুক্তি নয়। এটি মূলত একটি সাময়িক কৌশলগত সমঝোতা বা ‘স্টপ-গ্যাপ ডিল’। এই খসড়া চুক্তিতে বেশ কিছু অত্যন্ত জটিল ও দীর্ঘস্থায়ী বিতর্কিত বিষয়কে ভবিষ্যতের আলোচনার টেবিলের জন্য তুলে রাখা হয়েছে। এর মধ্যে অন্যতম প্রধান বিষয়গুলো হলো—ইরানের ওপর মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের আরোপিত কঠোর অর্থনৈতিক ও বাণিজ্যিক নিষেধাজ্ঞা সম্পূর্ণ প্রত্যাহার করার দাবি, আন্তর্জাতিক ব্যাংকিং সিস্টেমে জব্দ হয়ে থাকা কোটি কোটি ডলারের ইরানি অর্থ ও তহবিল অবিলম্বে অবমুক্ত করা এবং অন্য দিকে ইরানের ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ ও পারমাণবিক সক্ষমতাকে একটি নির্দিষ্ট সীমার মধ্যে আটকে রাখার ওয়াশিংটনের কঠোর শর্ত।

​এদিকে, ইরানের প্রতি ডোনাল্ড ট্রাম্পের এই নরম ও নমনীয় নীতি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে, বিশেষ করে ট্রাম্পের নিজস্ব দল রিপাবলিকান পার্টির ভেতরেই এক তীব্র অসন্তোষ ও বিভক্তির জন্ম দিয়েছে। দলের কট্টরপন্থী ও প্রভাবশালী বেশ কয়েকজন নেতা প্রকাশ্যেই ট্রাম্পের এই উদ্যোগের সমালোচনা করছেন। তাঁদের দাবি, এই চুক্তিটি ইরানের ইসলামি বিপ্লবী সরকারের প্রতি মার্কিন প্রশাসনের অতিরিক্ত নমনীয়তা এবং দুর্বলতার বহিঃপ্রকাশ। ট্রাম্পের দলের ভেতরের এই অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক চাপও তাঁর এই ‘তাড়াহুড়া না করার’ পেছনের অন্যতম বড় কারণ বলে মনে করছেন আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকরা।

​পটভূমি: ফেব্রুয়ারি যুদ্ধ ও হরমুজ প্রণালির ক্রাইসিস

​বর্তমান এই কূটনৈতিক সংকটের সূত্রপাত ঘটেছিল চলতি বছরের গত ২৮ ফেব্রুয়ারি, যখন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এবং তার প্রধান মিত্র ইসরায়েল যৌথভাবে ইরানের অভ্যন্তরে এবং তাদের বিভিন্ন সামরিক ঘাঁটিতে একযোগে ব্যাপক ও বিধ্বংসী বিমান হামলা চালায়। এই আকস্মিক হামলার জবাবে ইরানও দমে যায়নি; তারা ইসরায়েলের মূল ভূখণ্ড এবং পারস্য উপসাগরীয় অঞ্চলে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক লক্ষ্যবস্তুগুলোতে পাল্টা ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা চালায়। এই সংঘাতের সবচেয়ে বড় ধাক্কাটি আসে যখন ইরান কৌশলগতভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ‘হরমুজ প্রণালি’ কার্যত সম্পূর্ণ বন্ধ করে দেয়। উল্লেখ্য, বিশ্বের মোট উৎপাদিত খনিজ তেল এবং তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাসের (LNG) প্রায় ২০ শতাংশ এই সরু প্রণালিটি দিয়েই আন্তর্জাতিক বাজারে পরিবাহিত হয়। ইরানের এই জলপথ অবরোধের কারণে বিশ্বজুড়ে জ্বালানি তেলের দাম হুট করে আকাশচুম্বী হয়ে পড়ে, যা বৈশ্বিক অর্থনীতিতে বড় মন্দার সৃষ্টি করে।

​পরবর্তীতে দীর্ঘ কূটনৈতিক প্রচেষ্টার পর এপ্রিলের শুরুতে উভয় পক্ষ একটি সাময়িক যুদ্ধবিরতি চুক্তিতে সম্মত হতে বাধ্য হয়। এই যুদ্ধবিরতির ফলে দুই দেশের মধ্যে সরাসরি ক্ষেপণাস্ত্র হামলা বন্ধ হলেও হরমুজ প্রণালির অচলাবস্থা পুরোপুরি কাটেনি। ইরান এখনো পরোক্ষভাবে এই প্রণালির নিয়ন্ত্রণ নিজেদের হাতে রেখে বাণিজ্য জাহাজ চলাচলে বাধা সৃষ্টি করছে, যার বিপরীতে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রও ইরানের প্রধান প্রধান বন্দরগুলোর ওপর কঠোর নৌ-অবরোধ আরোপ করে রেখেছে। ট্রাম্প এই বিষয়ে তাঁর ট্রুথ সোশ্যালে স্পষ্ট হুশিয়ারি দিয়ে বলেছেন, "যতক্ষণ না পর্যন্ত একটি পূর্ণাঙ্গ চুক্তি উভয় পক্ষ দ্বারা চূড়ান্তভাবে অনুমোদিত এবং স্বাক্ষরিত হচ্ছে, ততক্ষণ মার্কিন নৌ-অবরোধ সম্পূর্ণ শক্তি দিয়ে কার্যকর থাকবে।"

​পারমাণবিক অস্ত্র নিয়ে ট্রাম্পের কঠোর বার্তা

​নিজের দীর্ঘ সোশ্যাল মিডিয়া পোস্টে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প অন্যান্য বিষয়ে কিছুটা নরম হলেও ইরানের পারমাণবিক উচ্চাকাঙ্ক্ষা নিয়ে নিজের কঠোর ও আপোষহীন অবস্থান পুনর্ব্যক্ত করেছেন। তিনি তেহরান প্রশাসনকে কড়া ভাষায় সতর্ক করে দিয়ে বলেন যে, ইরানকে অবশ্যই এই সত্যটি অনুধাবন করতে হবে এবং বুঝতে হবে যে তারা কোনো অবস্থাতেই কোনো ধরণের পারমাণবিক অস্ত্র বা পারমাণবিক বোমা তৈরি করতে পারবে না এবং তা অর্জন করার চেষ্টাও করতে পারবে না। অবশ্য আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে তেহরান সবসময়ই এই অভিযোগ অস্বীকার করে আসছে। ইরানের শীর্ষ নেতৃত্ব বারবার দাবি করেছে যে, তাদের পারমাণবিক কর্মসূচি কোনো সামরিক উদ্দেশ্যে নয়, বরং সম্পূর্ণভাবে শান্তিপূর্ণ, চিকিৎসা ও বেসামরিক বিদ্যুৎ উৎপাদনের লক্ষ্যেই পরিচালিত হচ্ছে।

​সবশেষে ট্রাম্প তাঁর বার্তায় কিছুটা ইতিবাচক ইঙ্গিত দিয়ে লিখেছেন যে, অতীতের যেকোনো সময়ের চেয়ে বর্তমানে ইরানের সাথে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের কূটনৈতিক সম্পর্ক অনেক বেশি পেশাদার ও ফলপ্রসূ হয়ে উঠছে। একই সাথে মধ্যপ্রাচ্যে শান্তি ফিরিয়ে আনার এই জটিল প্রক্রিয়ায় পর্দার আড়াল থেকে সমর্থন ও সহযোগিতা করার জন্য ওই অঞ্চলের সবকটি বন্ধু দেশকে ধন্যবাদ জানাতেও ভোলেননি মার্কিন প্রেসিডেন্ট। ওয়াশিংটন ও তেহরানের এই স্নায়ুযুদ্ধ শেষ পর্যন্ত কোন দিকে মোড় নেয়, তা দেখার জন্য পুরো বিশ্ব এখন অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করছে।

​সূত্র: বিবিসি ইন্টারন্যাশনাল ও এএফপি নিউজ এজেন্সি

 

Post a Comment

আপনার মূল্যবান মতামত আমাদের জানান। কোনো উসকানিমূলক বা অশালীন মন্তব্য করা থেকে বিরত থাকুন।

নবীনতর পূর্বতন