ব্রেকিং নিউজ

টাঙ্গাইলে রডবোঝাই ট্রাক উল্টে ১৫ জন নিহত: যমুনা সেতুর পূর্ব প্রান্তে মর্মান্তিক দুর্ঘটনা

টাঙ্গাইলে রডবোঝাই ট্রাক উল্টে ১৫ জন নিহত: যমুনা সেতুর পূর্ব প্রান্তে মর্মান্তিক দুর্ঘটনা

টাঙ্গাইল প্রতিনিধি, শামীম হোসাইন, দিগন্ত বাংলা নিউজ: 

দেশের উত্তর ও দক্ষিণবঙ্গের অন্যতম প্রধান প্রবেশদ্বার ঢাকা-বঙ্গবন্ধু সেতু মহাসড়কে আবারও ঘটল এক প্রলয়ঙ্কারী ও অত্যন্ত মর্মান্তিক সড়ক দুর্ঘটনা। টাঙ্গাইলের কালিহাতী উপজেলার যমুনা সেতুর পূর্ব প্রান্তের সংযোগ সড়কে একটি রডবোঝাই ট্রাক নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে উল্টে মহাসড়কের পাশে পড়ে যাওয়ার ঘটনা ঘটেছে। এই ভয়াবহ ও রক্তক্ষয়ী দুর্ঘটনায় ঘটনাস্থলেই ১৫ জন সাধারণ যাত্রী নিহত হয়েছেন। এই আকস্মিক ও হৃদয়বিদারক দুর্ঘটনায় ট্রাকে থাকা আরও বেশ কয়েকজন যাত্রী গুরুতরভাবে আহত হয়েছেন বলে খবর পাওয়া গেছে। মর্মান্তিক এই ঘটনার পর মহাসড়কের ওই অংশে তীব্র যানজট এবং স্থানীয় জনগণের মাঝে গভীর শোকের ছায়া নেমে এসেছে। পুলিশ, ফায়ার সার্ভিস এবং স্থানীয় অধিবাসীরা যৌথভাবে উদ্ধার অভিযান পরিচালনা করছেন।

​আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ও স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, আজ সোমবার (২৫ মে) ভোর আনুমানিক সাড়ে চারটার দিকে উপজেলার যমুনা সেতু পূর্ব থানার অন্তর্গত সরাতৈল এলাকায় এই ভয়াবহ জানমালের ক্ষয়ক্ষতি ঘটে। দুর্ঘটনার খবর ছড়িয়ে পড়ার সাথে সাথেই মহাসড়ক পুলিশ ও স্থানীয় উদ্ধারকারী দল দ্রুত ঘটনাস্থলে পৌঁছে উদ্ধার তৎপরতা শুরু করে।

​দুর্ঘটনার রোমাঞ্চকর বিবরণ ও ক্ষয়ক্ষতি

​যমুনা সেতু পূর্ব থানা পুলিশ এবং প্রত্যক্ষদর্শীদের দেওয়া বিবরণ অনুযায়ী, রাজধানী ঢাকা থেকে ছেড়ে আসা লোহার রডবোঝাই একটি বড় ট্রাক ঢাকার কর্মজীবী এবং সাধারণ যাত্রী নিয়ে উত্তরবঙ্গের উদ্দেশ্যে রওনা হয়েছিল। অতিরিক্ত মুনাফার লোভে পণ্যবাহী ট্রাকে এভাবে যাত্রী পরিবহন করা হচ্ছিল বলে প্রাথমিক তদন্তে জানা গেছে। ভোর সাড়ে চারটার দিকে রডবোঝাই ট্রাকটি যখন কালিহাতী উপজেলার সরাতৈল এলাকার সংযোগ সড়কে পৌঁছায়, ঠিক তখনই চালক হঠাত করেই গাড়ির ওপর থেকে নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফেলেন।

​নিয়ন্ত্রণ হারানোর সাথে সাথেই ভারী রডবোঝাই ট্রাকটি মহাসড়কের পাশে উল্টে ধপাস করে পড়ে যায়। ট্রাকের ওপরে থাকা যাত্রীরা লোহার ভারী রডের নিচে চাপা পড়েন। রডের তীব্র চাপ এবং ট্রাকের নিচে পিষ্ট হয়ে ঘটনাস্থলেই ১৫ জন যাত্রী করুণ মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়েন। ট্রাকের নিচে চাপা পড়ে থাকা আহত ব্যক্তিদের আর্তচিৎকারে ভোরের আকাশ ভারী হয়ে ওঠে। খবর পেয়ে স্থানীয় বাসিন্দারা দ্রুত ছুটে আসেন এবং উদ্ধারে হাত লাগান। পরবর্তীতে পুলিশ ও ফায়ার সার্ভিসের বিশেষ দল ক্রেন ব্যবহার করে ভারী রডগুলো সরিয়ে মরদেহগুলো উদ্ধার করে।

আরও পড়ুন: ইরানের সাথে চুক্তি নিয়ে ট্রাম্পের সুরবদল: তাড়াহুড়া না করার নির্দেশ

ইরানের সাথে চুক্তি নিয়ে ট্রাম্পের সুরবদল: তাড়াহুড়া না করার নির্দেশ

​আহতদের উদ্ধার ও হাসপাতালের চিত্র

​দুর্ঘটনায় অলৌকিকভাবে বেঁচে যাওয়া কিন্তু মারাত্মকভাবে জখম হওয়া বেশ কয়েকজন যাত্রীকে স্থানীয় জনগণ এবং হাইওয়ে পুলিশের সহায়তায় দ্রুত উদ্ধার করা হয়েছে। আহতদের অবস্থা অত্যন্ত আশঙ্কাজনক হওয়ায় তাঁদেরকে দ্রুত চিকিৎসার জন্য টাঙ্গাইল জেনারেল হাসপাতালে পাঠানো হয়েছে। হাসপাতালের জরুরি বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, আহতদের অনেকেরই হাত-পা ভেঙে গেছে এবং মাথায় গুরুতর আঘাত লেগেছে, যার ফলে মৃতের সংখ্যা আরও বাড়তে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।

​হঠাত করেই এতগুলো লাশ এবং আহত মানুষের আগমনে টাঙ্গাইল জেনারেল হাসপাতালে এক হৃদয়বিদারক পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে। স্বজনদের আহাজারি আর হাসপাতালের ডাক্তার-নার্সদের তাড়াহুড়োয় পুরো এলাকা স্তব্ধ হয়ে গেছে। তাৎক্ষণিকভাবে নিহত এবং আহত ব্যক্তিদের পূর্ণাঙ্গ নাম ও পরিচয় নিশ্চিত করা সম্ভব হয়নি। পুলিশ জানিয়েছে, নিহতদের পকেটে থাকা পরিচয়পত্র, মোবাইল ফোন এবং স্বজনদের সাথে যোগাযোগ করে তাঁদের পরিচয় শনাক্ত করার জোর চেষ্টা চালানো হচ্ছে।

​পুলিশ প্রশাসন ও দায়িত্বশীলদের বক্তব্য

​এই বড় ধরণের সড়ক দুর্ঘটনার পর মহাসড়কের নিরাপত্তা ও আইনি ব্যবস্থা নিয়ে পুলিশ প্রশাসনের উচ্চপদস্থ কর্মকর্তারা তৎপর হয়েছেন। যমুনা সেতু পূর্ব থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) ফুয়াদ রোহানী দুর্ঘটনার সত্যতা ও প্রাথমিক বিবরণ নিশ্চিত করে দিগন্ত বাংলা নিউজকে জানান, "ঢাকা থেকে উত্তরবঙ্গগামী একটি রডবোঝাই ট্রাক অসাবধানতাবশত বা অতিরিক্ত গতির কারণে সরাতৈল এলাকায় এসে মহাসড়কের নিয়ন্ত্রণ হারায়। ট্রাকটির ওপরে অনেক যাত্রী অবৈধভাবে ভ্রমণ করছিলেন। গাড়িটি উল্টে যাওয়ার সাথে সাথে ভারী লোহার রডের নিচে চাপা পড়ে ঘটনাস্থলেই ১৫ জন নিহত হন। আমরা দ্রুত আমাদের টিম পাঠিয়ে মরদেহগুলো উদ্ধার করেছি এবং মহাসড়কে যান চলাচল স্বাভাবিক রাখতে কাজ করছি। এই ঘটনায় ট্রাক চালকের অবহেলা ছিল কিনা তা তদন্ত করে আইনগত কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে।"

​কালিহাতী উপজেলা প্রশাসন ও হাইওয়ে পুলিশের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, দুর্ঘটনা কবলিত ট্রাকটিকে রেকার দিয়ে সড়ক থেকে সরিয়ে পুলিশ হেফাজতে নেওয়া হয়েছে। নিহতদের সুরতহাল প্রতিবেদন তৈরি শেষে ময়নাতদন্তের প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে এবং তাঁদের পরিবারকে খবর দেওয়ার প্রক্রিয়া চলছে।

​পণ্যবাহী ট্রাকে যাত্রী পরিবহন ও মহাসড়কের নিরাপত্তা উদ্বেগ

​দেশের পরিবহন বিশেষজ্ঞদের মতে, হাইওয়ে বা মহাসড়কগুলোতে পণ্যবাহী ট্রাক, পিকআপ বা লরিতে যাত্রী পরিবহন করা আইনত সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ হওয়া সত্ত্বেও চালক ও সাধারণ মানুষের অসচেতনতার কারণে এই ধরণের মরণফাঁদ প্রতিনিয়ত তৈরি হচ্ছে। বিশেষ করে রাতের শেষ ভাগে বা ভোরের আলো ফোটার আগে চালকদের ক্লান্তি ও ঘুমের কারণে এই ধরণের বড় বড় দুর্ঘটনা ঘটে থাকে। টাঙ্গাইলের এই ১৫ জনের মৃত্যু আবারও দেশের সড়ক নিরাপত্তা ব্যবস্থার দুর্বলতা এবং হাইওয়ে পুলিশের নজরদারির অভাবকে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিল।

​স্থানীয় সচেতন মহল মনে করেন, মহাসড়কের বিভিন্ন চেকপোস্টে যদি পণ্যবাহী ট্রাকে যাত্রী ওঠানোর বিষয়টি কঠোরভাবে প্রতিহত করা হতো, তবে আজ এই ১৫টি তাজা প্রাণ অকালে ঝরে যেত না। এই ঘটনার পর ঢাকা-বঙ্গবন্ধু সেতু মহাসড়কে যাতায়াতকারী সাধারণ চালক ও যাত্রীদের মধ্যে নতুন করে এক ধরণের আতঙ্ক ও ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে। সাধারণ মানুষ অনতিবিলম্বে মহাসড়কে এই ধরণের অবৈধ যাত্রী পরিবহন বন্ধ এবং ফিটনেসবিহীন দ্রুতগতির ট্রাকগুলোর বিরুদ্ধে স্থায়ী ব্যবস্থা নেওয়ার জোর দাবি জানিয়েছেন।

​সূত্র: যমুনা সেতু পূর্ব থানা পুলিশ ও টাঙ্গাইল জেনারেল হাসপাতাল জরুরি বিভাগ

 

Post a Comment

আপনার মূল্যবান মতামত আমাদের জানান। কোনো উসকানিমূলক বা অশালীন মন্তব্য করা থেকে বিরত থাকুন।

নবীনতর পূর্বতন