ভারতের রাজধানী নয়াদিল্লির রাজপথ এখন কার্যত এক উত্তপ্ত রণক্ষেত্রে পরিণত হয়েছে। রাজনৈতিক দল ‘ককরোচ জনতা পার্টি’ (সিজেপি)-র পূর্বঘোষিত ‘লং মার্চ টু পার্লামেন্ট’ বা পার্লামেন্ট অভিমুখে পদযাত্রা কর্মসূচীকে কেন্দ্র করে সোমবার (২০ জুলাই) সকাল থেকেই কেন্দ্রস্থল দিল্লিতে চরম উত্তেজনা ও সংঘাতের সৃষ্টি হয়। প্রশাসনিক নিষেধাজ্ঞা, ১৪৪ ধারা এবং দফায় দফায় দেওয়া পুলিশের নিরাপত্তা ব্যারিকেড উপেক্ষা করে হাজার হাজার বিক্ষুব্ধ শিক্ষার্থী ও তরুণ রাজপথে নেমে এলে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সঙ্গে তাদের বড় ধরনের সংঘর্ষ বেঁধে যায়। আন্দোলনকারীদের ছত্রভঙ্গ করতে ও রাজপথের নিয়ন্ত্রণ বজায় রাখতে পুলিশ একপর্যায়ে ব্যাপক লাঠিচার্জ ও একাধিক টিয়ারশেল (কাঁদানেগ্যাস) নিক্ষেপ করে।
পরিস্থিতি আশঙ্কাজনক রূপ নিলে অপ্রীতিকর ঘটনা এবং গুজবের বিস্তার রোধে সেন্ট্রাল দিল্লির বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ এলাকায় তাৎক্ষণিকভাবে মোবাইল ইন্টারনেট পরিষেবা সাময়িকভাবে স্থগিত করা হয়েছে।
আরও পড়ুন: রায়গঞ্জে ফুটবল খেলা নিয়ে বিরোধে যুবককে ছুরিকাঘাতে হত্যা!
বিক্ষোভের মূল কারণ: চিকিৎসাবিদ্যার ভর্তি পরীক্ষায় জালিয়াতির অভিযোগ
এই নজিরবিহীন গণবিক্ষোভের মূল নেপথ্যে রয়েছে ভারতের চিকিৎসা বিজ্ঞানের স্নাতক পর্যায়ে প্রবেশের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ জাতীয় পরীক্ষা ‘নিট’ (NEET)-এর ব্যাপক অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগ। সিজেপি এবং বিক্ষুব্ধ ছাত্রসমাজের দাবি, উক্ত ভর্তি পরীক্ষায় মারাত্মক প্রশ্নফাঁস এবং স্বজনপ্রীতি ঘটেছে, যা লাখ লাখ মেধাবী শিক্ষার্থীর ভবিষ্যৎ অন্ধকারের মুখে ঠেলে দিয়েছে।
আন্দোলনকারীদের প্রধান দাবিগুলো নিচে তুলে ধরা হলো:
শিক্ষামন্ত্রীর পদত্যাগ: পরীক্ষা পরিচালনায় চরম ব্যর্থতা ও দুর্নীতির দায় নিয়ে ভারতের কেন্দ্রীয় শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধানের অবিলম্ব পদত্যাগ।
স্বচ্ছ তদন্ত: ভর্তি পরীক্ষার পুরো জালিয়াতি চক্রকে উন্মোচন করে অপরাধীদের সর্বোচ্চ শাস্তি নিশ্চিত করা এবং ক্ষতিগ্রস্ত শিক্ষার্থীদের জন্য পুনর্পরীক্ষার সুব্যবস্থা করা।
যেভাবে রণক্ষেত্রে পরিণত হলো সেন্ট্রাল দিল্লি
প্রত্যক্ষদর্শী ও আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমের সূত্রে জানা গেছে, নির্ধারিত সূচি অনুযায়ী সোমবার সকাল থেকেই সেন্ট্রাল দিল্লির অন্যতম প্রধান বিক্ষোভস্থল হিসেবে পরিচিত ‘যন্তর মন্তর’ প্রাঙ্গণে ভারতজুড়ে আসা হাজার হাজার তরুণ কর্মী ও সাধারণ শিক্ষার্থীরা সুসংগঠিতভাবে সমবেত হতে শুরু করেন। একপর্যায়ে সমাবেশ থেকে হাজার হাজার আন্দোলনকারী ব্যানার ও ফেস্টুন হাতে নিয়ে দেশের পার্লামেন্ট ভবনের দিকে একযোগে পদযাত্রা শুরু করেন।
প্লাবিত মিছিলটি পার্লামেন্টের অভিমুখে যাওয়ার পথে পুলিশ প্রশাসন কয়েক স্তরের ঢাল ও ধাতব ব্যারিকেড দিয়ে পথ অবরুদ্ধ করে রাখে। উত্তেজিত ক্ষুব্ধ তরুণরা একের পর এক সরকারি বাধা ভেঙে ফেলার চেষ্টা করলে পরিস্থিতি দ্রুত নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায়। সেখানে অবস্থানরত পুলিশ সদস্য এবং আন্দোলনকারীদের মধ্যে তীব্র ধস্তাধস্তি ও হাতাহাতির ঘটনা ঘটে। একপর্যায়ে পুলিশ টিয়ারশেল ছুঁড়ে ও লাঠিচার্জ চালিয়ে তাদের পিছু হটতে বাধ্য করে। এই দফায় দফায় সংঘর্ষের ঘটনায় একাধিক তরুণ আন্দোলনকারী এবং বেশ কয়েকজন কর্তব্যরত পুলিশ সদস্য আঘাতপ্রাপ্ত ও সামান্য আহত হয়েছেন।
ককরোচ জনতা পার্টির শান্ত থাকার আকুল আবেদন
সংঘাতময় পরিস্থিতি চরম আকার ধারণ করার পর রাজনৈতিক সংগঠন ‘ককরোচ জনতা পার্টি’ (সিজেপি)-র শীর্ষ নেতৃত্বের পক্ষ থেকে সমর্থকদের প্রতি একজরুরি বার্তা দেওয়া হয়। চরম উত্তেজনার মধ্যেও সবাইকে শান্ত ও সম্পূর্ণ অহিংস থাকার জোর আকুল আবেদন জানানো হয়েছে।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দলটির অফিশিয়াল পেজ থেকে প্রকাশিত বার্তায় বলা হয়:
"দেশের বিভিন্ন পয়েন্টে ও রাজপথে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী যদি আপনাদের আটকে দেয়, তবুও আপনারা বিন্দুমাত্র উত্তেজিত হবেন না। ধৈর্য ধরুন এবং পূর্ণ শান্তি বজায় রাখুন। আমরা দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করি যে সহিংসতা নয়, বরং কেবল সত্য, শান্তি ও ভালোবাসার পথেই আমাদের এই ন্যায়সঙ্গত লড়াই জয়ী হবে।"
আরও পড়ুন: শাপলা চত্বর হত্যাকাণ্ড: শেখ হাসিনা ও জেনারেল আজিজসহ ৪১ জনের বিরুদ্ধে তদন্ত প্রতিবেদন জমা!
আগে থেকেই জারি ছিল ১৪৪ ধারা ও কঠোর পুলিশি নির্দেশ
উল্লেখ্য, পরিস্থিতি অবনতির আগাম আশঙ্কা করে গত রোববারই (১৯ জুলাই) দিল্লি পুলিশ প্রশাসন সিজেপি-র এই পার্লামেন্ট পদযাত্রার আনুষ্ঠানিক অনুমতি বাতিল করে দিয়েছিল। একই সাথে গোটা এলাকা জুড়ে বিশৃঙ্খলা এড়াতে পাঁচ বা তার বেশি ব্যক্তির যেকোনো ধরনের প্রকাশ্যে জমায়েত, মিছিল ও সমাবেশের ওপর কঠোরভাবে ১৪৪ ধারা জারি করা হয়।
সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম এক্স-এ (সাবেক টুইটার) প্রকাশিত এক জরুরি বিজ্ঞপ্তিতে দিল্লি পুলিশের সদর দপ্তর থেকে অত্যন্ত স্পষ্ট ভাষায় বার্তা দেওয়া হয়েছিল। প্রশাসনের পক্ষ থেকে সেখানে সাফ জানিয়ে দেওয়া হয় যে, নির্ধারিত ও অনুমোদিত যন্তর মন্তর এলাকা ব্যতীত রাজপথের অন্য কোথাও কোনো ধরনের শোভাযাত্রা, বড় জমায়েত বা বিক্ষোভ প্রদর্শন করা সম্পূর্ণ বেআইনি ও নিষিদ্ধ। পুলিশের আইন লঙ্ঘন করে কেউ নির্দেশ অমান্য করলে তার বিরুদ্ধে কঠোর আইনি ব্যবস্থা গ্রহণের হুঁশিয়ারি দেওয়া হয়েছিল। একই সাথে দেশের শান্তিপ্রিয় নাগরিকদের আইন মেনে চলতে ও আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখতে প্রশাসনকে সহযোগিতার আহ্বান জানানো হয়েছিল। বর্তমানে গোটা দিল্লিজুড়ে থমথমে ভাব বিরাজ করছে।
সংবাদ সূত্র: আন্তর্জাতিক সংবাদসংস্থা ও দিল্লি পুলিশের অফিশিয়াল স্টেটমেন্ট।

দারুণ লিখছেন
উত্তরমুছুনএকটি মন্তব্য পোস্ট করুন
আপনার মূল্যবান মতামত আমাদের জানান। কোনো উসকানিমূলক বা অশালীন মন্তব্য করা থেকে বিরত থাকুন।