সিরাজগঞ্জ প্রতিনিধি: সিরাজগঞ্জ সদর উপজেলার খোকশাবাড়ী ইউনিয়নে গভীর রাতে একদল দুর্ধর্ষ ও নৃশংস চোরের বর্বরোচিত হামলায় একই পরিবারের দাদি ও নাতনি গুরুতর জখম হয়ে এখন হাসপাতালের বিছানায় জীবন-মৃত্যুর এক চরম সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে ছটফট করছেন। ঘুমন্ত অবস্থায় চোর চক্রের সদস্যদের চিনে ফেলার অপরাধে তাদের হাত-পা ও মুখ বেঁধে ধারালো অস্ত্র দিয়ে কুপিয়ে রক্তাক্ত করা হয়। এই পৈশাচিক ঘটনাটি এলাকায় জানাজানি হওয়ার পর চরম উত্তেজনা বিরাজ করছে।
এমনকি এই স্পর্শকাতর রক্তক্ষয়ী ঘটনাটি মোটা অঙ্কের টাকার বিনিময়ে ধামাচাপার চেষ্টা করার অভিযোগে স্থানীয় এক রাজনৈতিক নেতার ওপর চড়াও হয়েছে ক্ষুব্ধ এলাকাবাসী। ইতিমধ্যেই খবর পেয়ে সিরাজগঞ্জ জেলা পুলিশের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেছেন এবং এলাকায় থমথমে পরিস্থিতি বিরাজ করছে।
গভীর রাতে চুরির উদ্দেশ্য ও বর্বরোচিত হামলা
স্থানীয় এলাকাবাসী ও ভুক্তভোগী পরিবার সূত্রে জানা গেছে, গত ৩০ জুন ২০২৬ ইংরেজি তারিখ, রোজ মঙ্গলবার সিরাজগঞ্জ সদর উপজেলার খোকশাবাড়ী ইউনিয়নের গুণেরগাতী গ্রামের ভূঁইয়াপাড়া এলাকায় এই লোমহর্ষক ঘটনাটি ঘটে। ওই দিন গ্রামীণ পরিবেশে সারাদিনের হাড়ভাঙা খাটুনি ও কঠোর পরিশ্রম শেষে রাতের খাবার খেয়ে নিজের বসতভিটায় ঘুমিয়ে পড়েছিলেন মরহুম আল-মাহমুদের স্ত্রী নার্গিস খাতুন (৫২)। তাঁর সাথেই একই ঘরে ঘুমিয়েছিল তাঁর আপন ভাতিজা সুমনের মেয়ে তথা স্থানীয় স্কুলের ১৩ বছর বয়সী মেধাবী এসএসসি পরীক্ষার্থী শর্মিলা খাতুন।
এরপর আনুমানিক রাত ৩টা ঘটিকার দিকে রাতের আঁধারে ওই ঘরের জানালার শিক কেটে বা বেড়া ভেঙে ভেতরে প্রবেশ করে তিন জনের একটি সংঘবদ্ধ চোর চক্র। ঘরে ঢুকেই চোরেরা ঘুমন্ত নার্গিস খাতুনের কানের স্বর্ণের দুল অত্যন্ত হেঁচকা টানে খুলে নেওয়ার চেষ্টা করে। চুরির এই আকস্মিক ধস্তাধস্তির একপর্যায়ে দাদি ও নাতনি উভয়েরই ঘুম ভেঙে যায় এবং তারা অন্ধকারেই চোরদের চেহারা পরিষ্কারভাবে চিনে ফেলেন।
নিজেদের পরিচয় ফাঁস হয়ে যাওয়ার ভয়ে চোরেরা মুহূর্তের মধ্যে হিংস্র হয়ে ওঠে। তারা প্রথমে দাদি নার্গিস এবং অবুঝ শিশু শর্মিলার হাত, পা এবং মুখ কাপড়ে শক্ত করে বেঁধে ফেলে ঘরের মেঝেতে ফেলে দেয়। এরপর চুরির উদ্দেশ্যে সাথে করে নিয়ে আসা অত্যন্ত ধারালো চাকু ও ছোরার সাহায্যে তাদের শরীরের বিভিন্ন স্থানে এলোপাতাড়ি ও নৃশংসভাবে আঘাত করতে থাকে। বিশেষ করে তাদের কানের নিচে, মাথায় এবং হাতে গভীর ক্ষত তৈরি করা হয়। চোরদের উপর্যুপরি ছুরিকাঘাতে মাত্র কয়েক মিনিটের মধ্যে পুরো বিছানা ও ঘরের মেঝে রক্তে ভেসে যায়।
মৃত্যু নিশ্চিত ভেবে পলায়ন ও উদ্ধার অভিযান
দাদি ও নাতনির শরীর থেকে অতিরিক্ত রক্তক্ষরণ হতে দেখে এবং তাদের নিস্তেজ হয়ে পড়তে দেখে চোরেরা ভেবে নেয় যে তারা মারা গেছে। এরপর অত্যন্ত সুপরিকল্পিতভাবে পাশের বাড়ির বাসিন্দারা যাতে টের পেয়ে তাৎক্ষণিকভাবে বের হতে না পারে, সেজন্য পাশের ঘরের বাইরের দরজার শিকল ও রশি দিয়ে শক্ত করে বেঁধে দেয়। এরপর তারা ভুক্তভোগীদের সাথে থাকা মোবাইল ফোন এবং কানের দুল লুট করে অন্ধকারের মধ্যে নির্বিঘ্নে পালিয়ে যায়।
এই নৃশংস ঘটনার প্রায় এক ঘণ্টা পর অলৌকিকভাবে সুমনের মেয়ে শর্মিলার সাময়িক অচেতন অবস্থা থেকে সেন্স বা জ্ঞান ফিরে আসে। সে তার বাঁধা মুখের ভেতর থেকেই গোঙানি ও ক্ষীণ কণ্ঠে বাবা বলে চিৎকার করে ডাকতে শুরু করে। ঘরের পাশেই থাকা শর্মিলাদের অসহায় দিনমজুর পিতা সুমন মিয়া গভীর রাতে মেয়ের এই গোঙানির শব্দ শুনতে পেয়ে দ্রুত বিছানা থেকে উঠে আসেন। তিনি এসে দেখেন ঘরের দরজা বাইরে থেকে আটকানো। পরবর্তীতে তিনি প্রতিবেশীদের ডেকে এনে দরজা খুলে ঘরের ভেতরের দৃশ্য দেখে আঁতকে ওঠেন। রক্তে ভাসতে থাকা অবস্থায় দাদি ও নাতনিকে উদ্ধার করে স্থানীয়দের সহায়তায় দ্রুত সিরাজগঞ্জ ২৫০ শয্যা বিশিষ্ট বঙ্গমাতা শেখ ফজিলাতুন্নেছা মুজিব জেনারেল হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। বর্তমানে তাদের অবস্থা অত্যন্ত আশঙ্কাজনক বলে হাসপাতাল সূত্রে জানা গেছে।
অভিযুক্তদের পরিচয় ও রাজনৈতিক ধামাচাপার চেষ্টা
ঘটনার পর স্থানীয়ভাবে গোপনে তদন্ত ও খোঁজখবর নিয়ে জানা যায় যে—এই বর্বরোচিত ও মর্মান্তিক ঘটনার পেছনে অত্র এলাকার চিহ্নিত সন্ত্রাসী ও অপরাধী চক্রের সদস্য পাপ্পু রোকনীর সরাসরি হাত রয়েছে। তার নেতৃত্বেই সিফাত রোকনী এবং হিমেল রোকনী নামের যুবকেরা গভীর রাতে এই পৈশাচিক ও রক্তক্ষয়ী ঘটনাটি ঘটিয়েছে।
এদিকে, এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে খোকশাবাড়ী ইউনিয়নে এক নতুন রাজনৈতিক নাটকের জন্ম হয়েছে। এলাকার একাধিক বিশ্বস্ত ও গোপন সূত্রে জানা গেছে, দাদি ও নাতনির ওপর হওয়া এই বর্বরোচিত হামলার ঘটনাটি যাতে কোনোভাবেই থানা পুলিশ বা আইনি প্রক্রিয়ায় না যায়, সেজন্য খোকশাবাড়ী ইউনিয়ন যুবদলের বর্তমান সাধারণ সম্পাদক রাশেদ রোকনী গোপনে চোর চক্রের পক্ষ নিয়ে মাঠে নামেন। তিনি এই ঘটনা ধামাচাপা দেওয়ার ও আপস-মীমাংসার নামে নেপথ্যে থেকে একটি মোটা অঙ্কের টাকা হাতিয়ে নিয়েছেন বলে অভিযোগ ওঠে।
পরবর্তীতে রোববার বিকেলের দিকে এলাকাবাসী ও ভুক্তভোগী পরিবারের সদস্যরা রাশেদ রোকনীর এই অনৈতিক অর্থ লেনদেন ও ধামাচাপা দেওয়ার বিষয়টি জানতে পারলে পুরো গ্রামে তীব্র ক্ষোভের বিস্ফোরণ ঘটে। বিক্ষুব্ধ এলাকাবাসী একজোট হয়ে যুবদল নেতা রাশেদ রোকনীকে এলাকায় ঘেরাও করে তীব্র ধাওয়া দেয়। জনতার তাড়া খেয়ে ওই নেতা এলাকা ছেড়ে পালাতে বাধ্য হন।
পুলিশের তদন্ত ও বর্তমান পরিস্থিতি
অত্র এলাকায় এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে চরম উত্তেজনা ও আইনশৃঙ্খলার অবনতির আশঙ্কা দেখা দিলে সিরাজগঞ্জ জেলা পুলিশের একটি বিশেষ দল ও স্থানীয় ফাঁড়ির পুলিশ দ্রুত ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেছেন। পুলিশ কর্মকর্তারা ভুক্তভোগী পরিবারের সাথে কথা বলেছেন এবং আলামত সংগ্রহ করেছেন।
সিরাজগঞ্জ জেলা পুলিশের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে যে, অপরাধী যেই হোক না কেন, আইনের ঊর্ধ্বে কেউ নয়। কানের দুল চুরির ঘটনাকে কেন্দ্র করে এসএসসি পরীক্ষার্থী এবং এক বৃদ্ধার ওপর এই ধরণের নৃশংস হামলা কোনোভাবেই বরদাশত করা হবে না। মূল অভিযুক্ত পাপ্পু রোকনী, সিফাত রোকনী, হিমেল রোকনীসহ ঘটনার সাথে জড়িত সকলকে অনতিবিলম্বে গ্রেপ্তারের জন্য পুলিশি অভিযান জোরদার করা হয়েছে। একই সাথে ঘটনা ধামাচাপা দেওয়ার সাথে যদি কোনো রাজনৈতিক নেতার সংশ্লিষ্টতার প্রমাণ মেলে, তবে তাকেও আইনের আওতায় আনা হবে বলে আশ্বস্ত করেছে পুলিশ প্রশাসন।
সংবাদ সূত্র: খোকশাবাড়ী ইউনিয়নের ভুক্তভোগী পরিবার ও সিরাজগঞ্জ জেলা পুলিশ।

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন
আপনার মূল্যবান মতামত আমাদের জানান। কোনো উসকানিমূলক বা অশালীন মন্তব্য করা থেকে বিরত থাকুন।