পুষ্টির পাওয়ার হাউস আখরোট: খাওয়ার সঠিক নিয়ম, অসাধারণ উপকারিতা ও সম্ভাব্য অপকারিতা

পুষ্টির পাওয়ার হাউস আখরোট: খাওয়ার সঠিক নিয়ম, অসাধারণ উপকারিতা ও সম্ভাব্য অপকারিতা
ছবি: সংগৃহীত
 আমাদের দৈনন্দিন খাদ্যতালিকায় বাদামের উপস্থিতি সুস্বাস্থ্যের অন্যতম প্রধান চাবিকাঠি। যারা নিয়মিত বিভিন্ন ধরনের বাদাম খেতে পছন্দ করেন, তাদের কাছে অত্যন্ত সুপরিচিত এবং সমাদৃত একটি নাম হলো ‘আখরোট’ (Walnut)। তবে আমাদের সমাজে একটি প্রচলিত ভুল ধারণা রয়েছে যে, আখরোটে প্রচুর পরিমাণে ফ্যাট বা চর্বি থাকে, তাই এটি খেলে ওজন বেড়ে যেতে পারে বা স্বাস্থ্যের ক্ষতি হতে পারে। এই অমূলক ভয়ের কারণে অনেকেই অত্যন্ত উপকারী এই বাদামটি এড়িয়ে চলেন।

​কিন্তু চিকিৎসা বিজ্ঞান ও পুষ্টিবিদদের গবেষণায় প্রমাণিত হয়েছে যে, আকৃতিতে ছোট্ট এই বাদামটি মূলত পুষ্টির এক বিশাল পাওয়ার হাউস। এতে যে ফ্যাট থাকে তা ক্ষতিকর নয়, বরং তা শরীরের জন্য অত্যাবশ্যকীয় ‘গুড ফ্যাট’ বা স্বাস্থ্যকর চর্বি। আখরোটে প্রচুর পরিমাণে ডায়াটারি ফাইবার, শক্তিশালী অ্যান্টি-অক্সিডেন্ট, উদ্ভিজ্জ প্রোটিন এবং অত্যাবশ্যকীয় ওমেগা-থ্রি ফ্যাটি অ্যাসিড রয়েছে, যা মানবদেহকে নানা ধরনের জটিল রোগ থেকে রক্ষা করে। কালো কিংবা বাদামি—বাজারে পাওয়া যাওয়া এই দুই ধরনের আখরোটই আমাদের সুস্বাস্থ্যের জন্য সমানভাবে উপকারী।

​চলুন, দিগন্ত বাংলা নিউজের আজকের এই স্বাস্থ্য আয়োজনে বিস্তারিতভাবে জেনে নেওয়া যাক আখরোট খাওয়ার জাদুকরী উপকারিতা, অতিরিক্ত খাওয়ার অপকারিতা এবং এটি খাওয়ার সঠিক নিয়ম সম্পর্কে।

​আখরোটের বিস্ময়কর স্বাস্থ্য উপকারিতা

​নিয়মিত পরিমিত পরিমাণে আখরোট খেলে তা মানবদেহের বিভিন্ন অঙ্গপ্রত্যঙ্গের ওপর ইতিবাচক প্রভাব ফেলে। নিচে এর প্রধান প্রধান উপকারিতাগুলো বিজ্ঞানভিত্তিক দৃষ্টিকোণ থেকে আলোচনা করা হলো:

​মস্তিষ্কের কার্যক্ষমতা ও স্মৃতিশক্তি বাড়ায়: একটি দারুণ মজার বিষয় হলো, আখরোটের বাহ্যিক গঠন দেখতে অবিকল মানুষের মস্তিষ্কের বা ব্রেনের মতো। শুধু দেখতেই নয়, এটি মস্তিষ্কের স্বাস্থ্যের জন্যও দারুণভাবে কাজ করে। আখরোটে রয়েছে প্রচুর পরিমাণে ওমেগা-৩ ফ্যাটি অ্যাসিড (ডিএইচএ) এবং পলিফেনলিক অ্যান্টি-অক্সিডেন্ট। এই উপাদানগুলো মস্তিষ্কের স্নায়ুকোষগুলোকে সচল রাখে, অক্সিডেটিভ স্ট্রেস কমায় এবং স্মৃতিশক্তি ও মনোযোগ বহুগুণে বৃদ্ধি করতে সাহায্য করে। বয়স্কদের ক্ষেত্রে অ্যালজেইমার্স বা ডিমেনশিয়ার মতো স্মৃতিভ্রংশ রোগ প্রতিরোধে আখরোট দারুণ কার্যকরী।

​হৃদযন্ত্র বা হার্ট ভালো রাখে: হার্ট অ্যাটাক বা স্ট্রোকের অন্যতম প্রধান কারণ হলো রক্তে খারাপ কোলেস্টেরল বেড়ে যাওয়া। আখরোটে থাকা স্বাস্থ্যকর মনো-আনস্যাচুরেটেড ফ্যাট এবং ওমেগা-৩ ফ্যাটি অ্যাসিড রক্তনালীতে চর্বি জমতে দেয় না। এটি রক্ত থেকে এলডিএল (LDL) বা খারাপ কোলেস্টেরলের মাত্রা দ্রুত কমিয়ে আনে এবং এইচডিএল (HDL) বা ভালো কোলেস্টেরলের মাত্রা বৃদ্ধি করে। ফলে নিয়মিত আখরোট খেলে হৃদরোগের ঝুঁকি অনেকাংশে কমে যায়।

আরও পড়ুন: সাবেক শ্রম প্রতিমন্ত্রী ও রাজনীতিবিদ    নজরুল ইসলাম চৌধুরী আর নেই

​ক্যান্সারের ঝুঁকি কমাতে প্রতিরোধক: বর্তমান সময়ের সবচেয়ে মরণঘাতী রোগ ক্যান্সার থেকে দূরে থাকতে আখরোট এক বিশাল বর্ম হিসেবে কাজ করতে পারে। আখরোটে প্রচুর মাত্রায় ওমেগা থ্রি ফ্যাটি অ্যাসিড, পলিফেনলস এবং ইউরোলিথিন নামক অ্যান্টি-ক্যান্সার উপাদান রয়েছে। এই উপাদানগুলো শরীরের অভ্যন্তরে টিউমার বা ক্যান্সার কোষের বৃদ্ধিকে বাধাগ্রস্ত করে। আমেরিকান অ্যাসোসিয়েশন ফর ক্যান্সার রিসার্চ-এর এক গবেষণায় জানানো হয়েছে যে, নিয়মিত আখরোট খেলে স্তন ক্যান্সার, কোলন ক্যান্সার এবং প্রোস্টেট ক্যান্সারের ঝুঁকি উল্লেখযোগ্য হারে কমে যায়।

​ডায়াবেটিস বা রক্তে শর্করার মাত্রা নিয়ন্ত্রণ: টাইপ-২ ডায়াবেটিস রোগীদের জন্য আখরোট একটি আদর্শ খাবার। এটি ইনসুলিনের কার্যকারিতা উন্নত করতে সাহায্য করে। পরিমিত মাত্রায় আখরোট খাওয়ার অভ্যাস রক্তে শর্করার মাত্রাকে হঠাৎ করে বাড়তে দেয় না, ফলে ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণে রাখা অনেক সহজ হয়।

​ওজন নিয়ন্ত্রণে জাদুকরী প্রভাব: যারা ওজন কমাতে চাইছেন, তাদের ডায়েট চার্টে আখরোট রাখা আবশ্যক। সকালে কয়েকটি আখরোট খেলে এতে থাকা ফাইবার ও প্রোটিনের কারণে দীর্ঘ সময় পেট ভরা অনুভূত হয়। এর ফলে বারবার ক্ষুধা লাগা বা অতিরিক্ত অস্বাস্থ্যকর খাবার খাওয়ার প্রবণতা কমে যায়, যা ওজন হ্রাসে সরাসরি সহায়তা করে।

​হাড়ের মজবুত গঠন নিশ্চিত করে: বয়স বাড়ার সাথে সাথে মানুষের হাড় দুর্বল হয়ে পড়ে এবং অস্টিওপোরোসিসের মতো রোগ দেখা দেয়। আখরোটে রয়েছে ‘আলফা-লিনোলেনিক অ্যাসিড’ নামক একটি অত্যন্ত প্রয়োজনীয় ফ্যাটি অ্যাসিড এবং পর্যাপ্ত ক্যালসিয়াম। এই উপাদানগুলো হাড়ের ঘনত্ব বৃদ্ধি করে এবং হাড়কে দীর্ঘস্থায়ীভাবে সুস্থ ও শক্ত রাখতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।

​পরিপাকতন্ত্রের সুস্থতা ও হজমশক্তি বৃদ্ধি: পেটের গোলমাল বা কোষ্ঠকাঠিন্যের সমস্যায় যারা ভুগছেন, তাদের জন্য আখরোট আশীর্বাদস্বরূপ। এতে থাকা উচ্চমাত্রার ফাইবার অন্ত্রের উপকারী ব্যাকটেরিয়াগুলোকে পুষ্টি জোগায় এবং হজম প্রক্রিয়াকে ত্বরান্বিত করে। ফলে নিয়মিত খেলে কোষ্ঠকাঠিন্য ও গ্যাস্ট্রিকের সমস্যা চিরতরে দূর হয়।

​গর্ভবতী মা ও অনাগত শিশুর যত্নে: গর্ভাবস্থায় চিকিৎসকেরা অনেক সময় নারীদের আখরোট খাওয়ার পরামর্শ দিয়ে থাকেন। কারণ, আখরোটে রয়েছে প্রচুর পরিমাণে ফলিক অ্যাসিড এবং ভিটামিন বি কমপ্লেক্স (যেমন—ফোলেট, রাইবোফ্লাভিন এবং থিয়ামিন)। এই উপাদানগুলো হবু মায়ের শারীরিক দুর্বলতা কাটায় এবং গর্ভস্থ অনাগত সন্তানের মস্তিষ্কের সুগঠন ও জন্মগত ত্রুটি রোধে চমৎকার কাজ করে।

​ত্বক উজ্জ্বল করে ও চুল পড়া কমায়: বাহ্যিক সৌন্দর্যের জন্যও আখরোটের জুড়ি মেলা ভার। এতে উপস্থিত ভিটামিন-ই, বায়োটিন এবং অ্যান্টি-অক্সিডেন্ট ত্বকের মরা কোষ দূর করে ত্বককে ভেতর থেকে উজ্জ্বল ও সতেজ রাখে। এটি ত্বকের অকাল বার্ধক্য বা বলিরেখা রোধ করে। পাশাপাশি চুলের গোড়া শক্ত করতে এবং মাত্রাতিরিক্ত চুল পড়া বন্ধ করতেও এটি অত্যন্ত উপকারী।

​রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বা ইমিউনিটি বৃদ্ধি: যেকোনো ক্ষতিকর ভাইরাস, ব্যাকটেরিয়া বা সংক্রমণের বিরুদ্ধে লড়াই করার জন্য শরীরের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা শক্তিশালী হওয়া প্রয়োজন। আখরোটে থাকা কপার (তামা), জিঙ্ক এবং ভিটামিন বি-৬ ইমিউন সিস্টেমকে সচল ও শক্তিশালী রাখে, যা করোনাকালীন সময়ের মতো যেকোনো স্বাস্থ্য সংকটে শরীরকে সুরক্ষিত রাখে।

​অনিদ্রা দূর করে প্রশান্তির ঘুম আনে: কাজের চাপ ও মানসিক দুশ্চিন্তার কারণে বর্তমানে অনেকেরই রাতে ঠিকমতো ঘুম হয় না। অনিদ্রার এই সমস্যা দূর করতে আখরোট দারুণ কার্যকরী। কারণ, আখরোটে প্রাকৃতিকভাবে ‘মেলাটোনিন’ নামক একটি হরমোন থাকে, যা মানুষের স্লিপ সাইকেল বা ঘুমের চক্রকে নিয়ন্ত্রণ করে। ঘুমানোর আগে কয়েকটি আখরোট খেলে তা স্ট্রেস বা মানসিক চাপ উপশম করে এবং গভীর ও প্রশান্তির ঘুম নিশ্চিত করে।

​অতিরিক্ত আখরোট খাওয়ার স্বাস্থ্যগত অপকারিতা ও সতর্কতা

​যেকোনো উপকারী খাবারই প্রয়োজনের অতিরিক্ত বা অনিয়ন্ত্রিত মাত্রায় খাওয়া শরীরের জন্য মারাত্মক ক্ষতিকর হতে পারে। আখরোটের ক্ষেত্রেও এর ব্যতিক্রম নয়। পুষ্টি উপাদানগুলোর সঠিক সামঞ্জস্য বজায় রাখতে আখরোট খাওয়ার ক্ষেত্রে কিছু সতর্কতা অবলম্বন করা জরুরি। মাত্রাতিরিক্ত আখরোট খেলে যেসব অপকারিতা বা সমস্যা দেখা দিতে পারে তা নিচে দেওয়া হলো:

​অ্যালার্জির সমস্যা: অনেকেরই বিভিন্ন ধরনের বাদামে মারাত্মক অ্যালার্জি (Nut Allergy) থাকে। যাদের এই সমস্যা আছে, তারা আখরোট খেলে শরীরে র‍্যাশ বের হওয়া, চুলকানি, শ্বাসকষ্ট বা অ্যানাফিল্যাক্সিসের মতো মারাত্মক অ্যালার্জিক রিঅ্যাকশন হতে পারে।

আরও পড়ুন: জয়পুরহাটে পঙ্গু বাবাকে জীবন্ত মাটিচাপা দেওয়ার চেষ্টা: ঘরের ভেতর বিশাল কবর খুঁড়ল মাদকাসক্ত ছেলে

​লিভার বা যকৃতের ওপর চাপ: অতিরিক্ত পরিমাণে আখরোট খেলে এতে থাকা অত্যধিক ফ্যাটের কারণে লিভারের কার্যকারিতায় নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে এবং লিভারের স্বাভাবিক কাজ বাধাগ্রস্ত হতে পারে।

​আয়রনের ঘাটতি ও রক্তশূন্যতা: কালো আখরোটে উচ্চমাত্রায় ‘ফাইটেটস’ (Phytates) নামক একটি উপাদান থাকে। এই ফাইটেটস মানুষের পরিপাকতন্ত্রে থাকা অন্যান্য খাবার থেকে আয়রন শুষে নেওয়ার প্রক্রিয়াকে চরমভাবে ব্যাহত করে। ফলে অতিরিক্ত কালো আখরোট খেলে শরীরে আয়রনের ঘাটতি বা রক্তশূন্যতা (অ্যানিমিয়া) দেখা দিতে পারে।

​হজমজনিত সমস্যা ও ডায়রিয়া: একবারে অনেক বেশি আখরোট খেয়ে ফেললে উচ্চমাত্রার ফাইবারের কারণে পেট ফাঁপা, গ্যাস, বদহজম এমনকি মারাত্মক ডায়রিয়াও হতে পারে।

​আখরোট খাওয়ার স্বাস্থ্যসম্মত ও সঠিক নিয়ম

​আখরোট থেকে এর শতভাগ পুষ্টিগুণ পেতে হলে এটি খাওয়ার সঠিক নিয়ম জানা অত্যন্ত জরুরি। পুষ্টিবিদদের মতে, আখরোট কখনোই সরাসরি কাঁচা অবস্থায় খাওয়া উচিত নয়, কারণ এর খোসায় ফাইট্যাটিক অ্যাসিড থাকে যা হজমে ব্যাঘাত ঘটায়।

​সবচেয়ে ভালো উপায় হলো—রাতে ঘুমাতে যাওয়ার আগে একটি পরিষ্কার কাঁচের বাটিতে সাধারণ পানিতে ২ থেকে ৪টি আস্ত আখরোট ভিজিয়ে রাখা। সারারাত ভেজানোর ফলে এর অ্যান্টি-নিউট্রিয়েন্ট উপাদানগুলো ধুয়ে যায় এবং পুষ্টিগুণ অনেক বেড়ে যায়। পরদিন সকালে ঘুম থেকে উঠে খালি পেটে এই ভেজানো আখরোট খাওয়া সবচেয়ে বেশি উপকারী।

​এছাড়া আপনি চাইলে আপনার প্রতিদিনের সকালের নাস্তায় ওটস, টকদই, ফ্রুট সালাদ বা স্মুদির সঙ্গে মিশিয়েও সুস্বাদু এই বাদামটি খেতে পারেন। তবে মনে রাখবেন, সুস্থ থাকতে হলে প্রতিদিন ২ থেকে ৪টির বেশি আখরোট খাওয়া কোনোভাবেই সমীচীন নয়। যাদের আগে থেকেই বাদামে তীব্র অ্যালার্জির হিস্ট্রি রয়েছে বা বিশেষ কোনো শারীরিক অসুস্থতা রয়েছে, তাদের ক্ষেত্রে আখরোট খাদ্যতালিকায় যুক্ত করার আগে অবশ্যই একজন বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক বা পুষ্টিবিদের পরামর্শ গ্রহণ করা বাঞ্ছনীয়।

​তথ্যসূত্র: আন্তর্জাতিক স্বাস্থ্য বিষয়ক গবেষণা ও পুষ্টিবিদ।

Post a Comment

আপনার মূল্যবান মতামত আমাদের জানান। কোনো উসকানিমূলক বা অশালীন মন্তব্য করা থেকে বিরত থাকুন।

নবীনতর পূর্বতন