আন্তর্জাতিক ডেস্ক: শামীম হোসাইন / দিগন্ত বাংলা নিউজ
জেরুজালেম: মধ্যপ্রাচ্যের ভূ-রাজনীতিতে চরম উত্তেজনা ও যুদ্ধাবস্থার পারদ আরও একধাপ বাড়িয়ে দিয়ে পরাশক্তি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের নতুন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সরাসরি কড়া সতর্কবার্তাকে সম্পূর্ণ তোয়াক্কা না করে চিরশত্রু ইরানে আবারও এক নতুন ও বিধ্বংসী সামরিক হামলার প্রকাশ্য হুমকি দিয়েছেন ইসরায়েলের কট্টরপন্থী প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু। তেল আবিবের একক সিদ্ধান্তে ইরানি ভূখণ্ডে নতুন করে যেকোনো মুহূর্তে একযোগে বিমান ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালানোর জন্য ইসরায়েলি প্রতিরক্ষা বাহিনী বা আইডিএফ (IDF) ইতিমধ্যেই তাদের যাবতীয় সামরিক রণপ্রস্তুতি ও মহড়া সম্পন্ন করে রেখেছে বলেও আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমকে কঠোরভাবে হুঁশিয়ার করেছেন তিনি। বিশ্বজুড়ে যুদ্ধ প্রশমন ও কূটনৈতিক আলোচনার মাঝেই ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রীর এমন যুদ্ধংদেহী অবস্থান বৈশ্বিক কূটনৈতিক অঙ্গনে এক বড় ধরনের তোলপাড়ের সৃষ্টি করেছে। গতকাল মঙ্গলবার (৩০ জুন, ২০২৬) ইসরায়েলের প্রভাবশালী ও কট্টরপন্থী ঘরানার জনপ্রিয় টেলিভিশন সংবাদমাধ্যম ‘চ্যানেল ১৪’-কে দেওয়া এক বিশেষ ও একান্ত সাক্ষাৎকারে এই বিস্ফোরক মন্তব্য ও হুমকি দেন ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী। তুরস্কের সরকারি সংবাদ সংস্থা আনাদোলু এজেন্সির এক বিশেষ প্রতিবেদন থেকে এই চাঞ্চল্যকর সামরিক হুমকির তথ্যটি বিশ্ববাসীর সামনে উন্মোচিত হয়েছে।
আরও পড়ুন: দুর্নীতি রুখতে ৫০০ ও ১০০০ টাকার নোট বাতিলের প্রস্তাব সংসদে
টেলিভিশন সাক্ষাৎকারে নিজের আক্রমণাত্মক সামরিক কৌশলের পক্ষে কড়া যুক্তি উপস্থাপন করে বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু দাবি করেন যে, এ পর্যন্ত ইসরায়েলি বিমান বাহিনী ও বিশেষ কমান্ডো দল অত্যন্ত নিখুঁত পরিকল্পনার মাধ্যমে দুই দুইবার সরাসরি ইরানের অভ্যন্তরে অত্যন্ত স্পর্শকাতর সামরিক ঘাঁটিতে সফল হামলা পরিচালনা করেছে। তিনি আরও দাবি করেন যে, এই দুইবারের ভয়াবহ ও আকস্মিক হামলার ফলেই মূলত তেল আবিব তথা সমগ্র ইসরায়েল রাষ্ট্রকে ইরানের সম্ভাব্য পরমাণু বোমার এক মহা বিপর্যয়কর ও দীর্ঘমেয়াদী ধ্বংসাত্মক ঝুঁকি থেকে সম্পূর্ণ মুক্ত করা সম্ভব হয়েছে। তবে নিজেদের জাতীয় নিরাপত্তা নিশ্চিত করার স্বার্থে যদি ভবিষ্যতে আবারও প্রয়োজন দেখা দেয়, তবে কোনো প্রকার দ্বিধা ছাড়াই ইরানি মাটির ওপর তৃতীয়বারের মতো আরও বড় ধরনের ও বিধ্বংসী সামরিক আক্রমণ চালানো হবে। আর এই সম্ভাব্য তৃতীয় দফার হামলার ব্যাপারে ইসরায়েলি বিমান বাহিনী, গোয়েন্দা সংস্থা মোসাদ এবং স্থল বাহিনীর সব ধরনের আধুনিক যুদ্ধ সরঞ্জাম ও কৌশলগত রণপ্রস্তুতি সুনির্দিষ্টভাবে সম্পন্ন করা আছে।
সাক্ষাৎকারে নিজের অনড় অবস্থানের কথা পুনর্ব্যক্ত করে ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী অত্যন্ত আত্মবিশ্বাসের সাথে আরও বলেন যে, তেল আবিবের যুদ্ধকালীন বিশেষ ক্যাবিনেট বা সরকারের শীর্ষ পর্যায় থেকে যুদ্ধ শুরুর একটি সবুজ সংকেত বা চূড়ান্ত প্রশাসনিক নির্দেশ পাওয়া মাত্রই আইডিএফ অত্যন্ত আধুনিক ক্ষেপণাস্ত্র ও যুদ্ধবিমান নিয়ে ইরানের পারমাণবিক স্থাপনা ও গুরুত্বপূর্ণ অর্থনৈতিক লক্ষ্যবস্তুগুলোর ওপর একযোগে মারণাস্ত্রের হামলা শুরু করে দেবে। তবে নেতানিয়াহু এমন এক চরম ও সংকটময় সময়ে ইরানের ওপর নতুন করে এই একতরফা ও আগ্রাসী বিমান হামলার প্রকাশ্য হুমকি দিলেন, যখন সম্প্রতি স্বাক্ষরিত ঐতিহাসিক ‘ইসলামাবাদ চুক্তি’র সুনির্দিষ্ট আওতার মধ্যে এসে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে এক আনুষ্ঠানিক সামরিক যুদ্ধবিরতি চলছে। শুধু তাই নয়, ওয়াশিংটন ও তেহরানের দীর্ঘদিনের বৈরিতা চিরতরে অবসান ঘটিয়ে উভয়পক্ষের মধ্যে একটি স্থায়ী ও আন্তর্জাতিক শান্তিচুক্তি স্বাক্ষরের জন্য পর্দার আড়ালে এক সুসংগঠিত কূটনৈতিক প্রস্তুতি ও রোডম্যাপ তৈরির কাজ চলছে।
আরও পড়ুন: চতুর্থ শিল্পবিপ্লবের চ্যালেঞ্জ: সাইবার নিরাপত্তাই দেশের সবচেয়ে বড় প্রতিরক্ষা
ইসরায়েলের কট্টরপন্থী প্রধানমন্ত্রী অবশ্য ইতিমধ্যেই আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে এবং ওয়াশিংটনের নীতিনির্ধারকদের স্পষ্ট ভাষায় জানিয়ে দিয়েছেন যে, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে যে প্রস্তাবিত ও সম্ভাব্য শান্তিচুক্তি স্বাক্ষরিত হতে যাচ্ছে, তা মানতে বা সেই শর্তের বেড়াজালে নিজেদের আবদ্ধ রাখতে কোনোভাবেই বাধ্য নয় স্বাধীন রাষ্ট্র ইসরায়েল। নেতানিয়াহুর এই একতরফা ও যুদ্ধংদেহী একগুঁয়েমি আচরণের ইস্যুতে আমেরিকার নতুন ক্ষমতার কেন্দ্রবিন্দু তথা মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইতিমধ্যেই তেল আবিবকে অত্যন্ত কড়া ভাষায় ও কঠোরভাবে সতর্ক বার্তা পাঠিয়েছেন। ইসরায়েলের দীর্ঘদিনের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক ও সামরিক সিদ্ধান্তের সহযোগী হওয়া সত্ত্বেও ট্রাম্প সরাসরি নেতানিয়াহুর এই খামখেয়ালি যুদ্ধ বাধানোর মানসিকতায় তীব্র অসন্তোষ প্রকাশ করেছেন। অতি সম্প্রতি হোয়াইট হাউসের এক উচ্চপর্যায়ের গোপন বৈঠকে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রীকে তাঁর বহুল পরিচিত ডাকনামে সম্বোধন করে অত্যন্ত কঠোর হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করে বলেছেন, “বিবি, আপনি আগামী দিনগুলোতে ইরান ও মধ্যপ্রাচ্য ইস্যুতে অত্যন্ত সাবধানে কথাবার্তা বলবেন এবং নিজের পদক্ষেপ সাবধানে ফেলবেন; অন্যথায় খুব শীঘ্রই বৈশ্বিক ভূ-রাজনীতি ও আন্তর্জাতিক সম্পর্কের মঞ্চে আপনাকে সম্পূর্ণ একা ও বন্ধুহীন হয়ে যেতে হবে।” ট্রাম্পের এই নজিরবিহীন ও নমনীয়তাহীন হুমকির পরও নেতানিয়াহুর নতুন করে যুদ্ধ বাধানোর এই আকাঙ্ক্ষা মধ্যপ্রাচ্যকে আবারও এক অনিশ্চিত রক্তক্ষয়ী সংঘাতের দিকে ঠেলে দিচ্ছে বলে মনে করছেন আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশ্লেষকেরা।
নিউজের সূত্র: ইসরায়েলি সংবাদমাধ্যম চ্যানেল ১৪ (Channel 14) এর বিশেষ টকশো এবং তুরস্কের রাষ্ট্রীয় সংবাদ সংস্থা আনাদোলু এজেন্সি (Anadolu Agency)।

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন
আপনার মূল্যবান মতামত আমাদের জানান। কোনো উসকানিমূলক বা অশালীন মন্তব্য করা থেকে বিরত থাকুন।