জাতীয় ডেস্ক: শামীম হোসাইন / দিগন্ত বাংলা নিউজ
## অবৈধ অর্থ উদ্ধার ও মানিলন্ডারিং প্রতিরোধে জাতীয় সংসদে এক যুগান্তকারী ও সাহসী প্রস্তাব উত্থাপন করেছেন বিরোধী দলীয় সংসদ সদস্য ব্যারিস্টার এ এম মাহবুব উদ্দিন খোকন। দুর্নীতিবাজদের জমানো অপ্রদর্শিত অর্থ ব্যাংকিং ব্যবস্থায় ফিরিয়ে আনা, কালো টাকার উৎস বন্ধ করা এবং দেশের ভঙ্গুর অর্থনীতিকে গতিশীল করার লক্ষ্যে তিনি ১০০০ টাকা ও ৫০০ টাকার নোট বাতিলের জোর দাবি জানিয়েছেন।
রবিবার (২৮ জুন ২০২৬) ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের দ্বিতীয় ও বাজেট অধিবেশনের ১৭তম দিনে ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেটের ওপর সাধারণ আলোচনায় অংশ নিয়ে তিনি এই প্রস্তাব দেন। তাঁর এই বক্তব্য সংসদ এবং দেশের অর্থনৈতিক মহলে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দিয়েছে।
## কেন ১০০০ ও ৫০০ টাকার নোট বাতিলের প্রয়োজন?
ব্যারিস্টার মাহবুব উদ্দিন খোকন তাঁর বক্তব্যে স্পষ্টভাবে উল্লেখ করেছেন যে, দেশের একটি বড় অংশের নগদ অর্থ ব্যাংকের বাইরে সংরক্ষিত রয়েছে। বিশেষ করে, বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে গড়ে ওঠা দুর্নীতিবাজ সিন্ডিকেট এবং যারা দেশ ছেড়ে পালিয়েছেন, তারা বিপুল পরিমাণ নগদ অর্থ ঘরে বা গোপন স্থানে জমা করে রেখেছেন। এই অর্থ অর্থনীতিতে কোনো অবদান রাখছে না, বরং কালো টাকার পাহাড় হিসেবে অর্থনীতিকে স্থবির করে রেখেছে।
আরও পড়ুন: না ফেরার দেশে শাহজাদপুরের কৃতি সন্তান ও সাবেক সেনাসদস্য আজগর আলী: স্তব্ধ দরগাপাড়া
অর্থনীতিতে ফিরবে গতি: তিনি প্রস্তাব করেছেন, ১০০০ ও ৫০০ টাকার নোট বাতিল করে যদি সরকার এক থেকে দুই মাসের সময়সীমা বেঁধে দেয়, তবে যাদের কাছে অবৈধ নগদ অর্থ রয়েছে, তাদের তা ব্যাংকে জমা দিতে বাধ্য হতে হবে। এর ফলে বিপুল পরিমাণ অর্থ মূলধারার ব্যাংকিং চ্যানেলে ফিরে আসবে।
🔹 কালো টাকার উৎস বন্ধ: অবৈধ উপায়ে উপার্জিত অর্থ যারা নোট আকারে জমিয়ে রেখেছেন, তাদের জন্য এই পদক্ষেপ একটি বড় ধাক্কা হবে। ব্যাংকে অর্থ জমা দেওয়ার সময় অর্থের বৈধ উৎস দেখাতে হবে, যা মানি লন্ডারিং রোধে কার্যকর ভূমিকা রাখবে।
🔹 স্বচ্ছতা নিশ্চিতকরণ: এই সিদ্ধান্তের মাধ্যমে দেশের অভ্যন্তরীণ অর্থপ্রবাহের একটি স্বচ্ছ চিত্র পাওয়া সম্ভব হবে এবং সরকারের হাতে কালো টাকা নিয়ন্ত্রণের একটি বড় অস্ত্র চলে আসবে।
## ব্যাংকিং খাতের সংস্কার ও ‘এমপি-ব্যাংক’ সংস্কৃতির অবসান
সংসদে দাঁড়িয়ে মাহবুব উদ্দিন খোকন দেশের ব্যাংকিং খাতের বর্তমান নাজুক পরিস্থিতির কড়া সমালোচনা করেন। তিনি মন্তব্য করেন, বাংলাদেশে বর্তমানে প্রয়োজনের তুলনায় অনেক বেশি ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান রয়েছে। এই সংখ্যাধিক্য অর্থনীতির জন্য শুভকর নয়।
🔹 নতুন সংস্কৃতির অবসান: তিনি বলেন, “এমপি হলেই একটি ব্যাংক লাগবে, নেতা হলেই একটি লিজিং কোম্পানি লাগবে—এই সংস্কৃতি আমাদের বন্ধ করতে হবে।” এই অপ্রয়োজনীয় ব্যাংকের সংখ্যা কমিয়ে ব্যাংকিং খাতকে শক্তিশালী করার আহ্বান জানান তিনি।
🔹 জনগণের অর্থের অপচয়: অনেক দুর্বল ব্যাংক শুধুমাত্র জনগণের আমানতের ওপর ভর করে টিকে আছে। তিনি হুশিয়ারি দিয়ে বলেন, জনগণের টাকা দিয়ে এভাবে দুর্বল প্রতিষ্ঠানগুলোকে বাঁচিয়ে রাখা অযৌক্তিক এবং এতে আমানতকারীদের ঝুঁকি বাড়ছে।
অর্থ পাচার ও আস্থার সংকট
পাচার হওয়া অর্থ নিয়ে বলতে গিয়ে তিনি অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ একটি মন্তব্য করেন—‘অর্থ যেখানে নিরাপদ মনে হয়, সেখানেই চলে যায়’। তিনি উল্লেখ করেন যে, স্বাধীনতার পর থেকেই পাচার হওয়া অর্থ ফেরত আনার কথা বলা হচ্ছে, কিন্তু বাস্তবে তা কখনো সম্ভব হয়নি।
🔹 আইনি পরিবেশ তৈরি: তার মতে, শুধুমাত্র অর্থ উদ্ধারের পেছনে না ছুটে এমন একটি আইনি ও আর্থিক পরিবেশ তৈরি করতে হবে, যেখানে বিনিয়োগকারী এবং ব্যবসায়ীরা দেশে অর্থ রাখতে নিরাপদ বোধ করেন।
🔹 আস্থার অভাব: যতক্ষণ পর্যন্ত দেশে বিনিয়োগবান্ধব ও নিরাপদ পরিবেশ তৈরি না হবে, ততক্ষণ অর্থ পাচার রোধ করা কঠিন। তিনি জোর দিয়ে বলেন, অর্থ পাচারের মূল কারণ হলো দেশের প্রতি আস্থাহীনতা এবং দুর্নীতির ভয়।
## অর্থ বৈধকরণের প্রস্তাব
যাদের অর্থের উৎস বৈধ দেখানোর সুযোগ নেই, তাদের জন্য তিনি একটি বিকল্প প্রস্তাব দিয়েছেন। তিনি বলেন, যারা নিজেদের অর্থ সাদা করতে চান, তাদের নির্দিষ্ট হারে—২০ থেকে ২৫ শতাংশ—কর দেওয়ার সুযোগ দেওয়া উচিত। এতে বিপুল পরিমাণ অর্থ ব্যাংকে ফিরে আসবে, বিনিয়োগ বাড়বে এবং দেশের অর্থনীতিতে অর্থের সরবরাহ বৃদ্ধি পাবে।
## বাজেট ও কর্মসংস্থান: একটি সমন্বিত রূপরেখা
বর্তমান বাজেটকে কঠিন অর্থনৈতিক পরিস্থিতির মধ্যে প্রণীত উল্লেখ করে তিনি বলেন, বাজেটে সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচি, ফ্যামিলি কার্ড, কৃষক কার্ড এবং যুবকদের কর্মসংস্থানের মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলো অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। তবে এ সবের পাশাপাশি আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নতির জন্য কর্মসংস্থান সৃষ্টিকে সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দেওয়ার আহ্বান জানান এই সংসদ সদস্য।
🔹 নিরাপত্তার গুরুত্ব: তিনি বলেন, সামাজিক ও অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা বজায় রাখতে হলে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নতি ঘটানো অপরিহার্য।
🔹 কর্মসংস্থানের সুযোগ: বাজেটে কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি করতে পারলে দেশের যুবসমাজ বিপথগামী হবে না এবং অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড হ্রাস পাবে।
উপসংহার: ব্যারিস্টার এ এম মাহবুব উদ্দিন খোকনের এই প্রস্তাবটি বাংলাদেশের বর্তমান অর্থনৈতিক বাস্তবতায় অত্যন্ত সময়োপযোগী। যদিও নোট বাতিল একটি অত্যন্ত সংবেদনশীল ও বড় সিদ্ধান্তের বিষয়, তবুও কালো টাকা উদ্ধার ও ব্যাংকিং খাতের সংস্কারে এটি একটি পরীক্ষিত পদ্ধতি হিসেবে বিবেচিত। সংসদ সদস্যের এই প্রস্তাব কতটা কার্যকর হবে, তা এখন দেখার অপেক্ষায় দেশের সাধারণ মানুষ ও অর্থনীতিবিদরা।
সূত্র: জাতীয় সংসদের বাজেট অধিবেশন প্রতিবেদন।

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন
আপনার মূল্যবান মতামত আমাদের জানান। কোনো উসকানিমূলক বা অশালীন মন্তব্য করা থেকে বিরত থাকুন।