ব্রেকিং নিউজ

যাত্রাবাড়ীর র'ক্তভেজা সেই গলি: নিজ হাতে ১২টি লাশ ভ্যানে তোলা জয়নালের স্মৃতিতে আজও দগদগে চব্বিশের জুলাই

যাত্রাবাড়ীর রক্তভেজা সেই গলি: নিজ হাতে ১২টি লাশ ভ্যানে তোলা জয়নালের স্মৃতিতে আজও দগদগে চব্বিশের জুলাই
ছবি: সংগৃহীত

রাজধানী ডেস্ক: শামীম হোসাইন / দিগন্ত বাংলা নিউজ

ঢাকা: বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসের সবচেয়ে বড় গণঅভ্যুত্থান ও স্বৈরাচার পতনের রক্তাক্ত মহাকাব্য চব্বিশের জুলাই আন্দোলন। সেই অভূতপূর্ব ও রক্তক্ষয়ী গণঅভ্যুত্থানের দ্বিতীয় বছর বা দ্বিতীয় বর্ষপূর্তিতে এসেও রাজধানীর বুকে ঘটে যাওয়া নির্মম ও পৈশাচিক হত্যাযজ্ঞের স্মৃতি একটুও ম্লান হয়নি সাধারণ মানুষের মন থেকে। বিশেষ করে ঢাকার অন্যতম প্রধান প্রবেশদ্বার ও আন্দোলনের মূল রণক্ষেত্র হিসেবে পরিচিত যাত্রাবাড়ী এলাকার বাতাস এখনও যেন সেই শহীদদের রক্তের গন্ধ আর স্বজনহারাদের কান্নার আওয়াজ বহন করে চলেছে। জীবন সায়াহ্নে এসেও চোখের সামনে ঘটে যাওয়া সেই বিভীষিকাময় রক্তের হোলিখেলা কোনোভাবেই ভুলতে পারছেন না প্রত্যক্ষদর্শীরা। ঠিক তেমনই এক জীবন্ত ও শিউরে ওঠার মতো প্রত্যক্ষ খতিয়ান জানাচ্ছিলেন যাত্রাবাড়ী থানার একেবারে সম্মুখে দীর্ঘ দিন ধরে ব্যবসা করা ফুটপাতের সাধারণ মুড়ি বিক্রেতা জয়নাল আবেদিন। চব্বিশের জুলাইয়ের ছাত্র-জনতার সেই রক্তক্ষয়ী আন্দোলনের স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে অত্যন্ত ম্লান ও বিষণ্ণ মুখে নিজের ভেতরের জমে থাকা তীব্র ক্ষোভ ও কান্নার কথা প্রকাশ করেন তিনি।

অত্যন্ত আবেগতাড়িত ও রুদ্ধকণ্ঠে মুড়ি বিক্রেতা জয়নাল আবেদিন বলছিলেন যে, ২০২৪ সালের জুলাই মাসে এদেশের সাধারণ তরুণ ও ছাত্র সমাজ যে অভূতপূর্ব আন্দোলন গড়ে তুলেছিল, তার একেবারে শুরু থেকে শেষ দিন পর্যন্ত তিনি এই যাত্রাবাড়ী মোড়েই সশরীরে উপস্থিত ছিলেন। তিনি নিজের আঙুল দিয়ে ঐতিহাসিক যাত্রাবাড়ী থানা ভবনটি দেখিয়ে বলছিলেন যে, এই থানা ভবনের ভেতর থেকে তৎকালীন সরকারের পুলিশ ও বিশেষ বাহিনী নির্বিচারে সাধারণ মানুষের ওপর ঝাঁকে ঝাঁকে গুলি ছুড়তে ছুড়তে রাস্তায় বের হয়ে আসছিল। পুলিশ ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সেই অন্ধ বুলেটের আঘাতে রাস্তার ওপর লুটিয়ে পড়ছিল একের পর এক তাজা তরুণ প্রাণ। জয়নাল আবেদিন অত্যন্ত ভারাক্রান্ত হৃদয়ে দাবি করেন যে, তিনি নিজে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে সেই উত্তাল ও রণক্ষেত্রের রূপ নেওয়া গলির ভেতর থেকে একে একে ১২টি নিথর ও রক্তাক্ত লাশ উদ্ধার করে নিজের দুই হাত দিয়ে ভ্যানের ওপর তুলে রেখেছিলেন। কত শত নিষ্পাপ পোলাপান যে পুলিশের মারণাস্ত্রের গুলিতে ও অমানুষিক নির্যাতনে সেখানে রক্তাক্ত ও ক্ষতবিক্ষত হয়েছে, তার কোনো সঠিক হিসাব আজ পর্যন্ত কোনো খাতাকলমে মেলেনি।

আরও পড়ুন: ট্রাম্পের কড়া সতর্কবার্তার পরও ইরানে তৃতীয়বার হামলার প্রকাশ্য হুমকি নেতানিয়াহুর

নিজের জীবন চলে যাওয়ার শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত এই পৈশাচিক ও নির্মম দৃশ্য কোনোভাবেই মন থেকে মুছে ফেলা বা ভুলে যাওয়া সম্ভব নয় বলে দীর্ঘশ্বাস ছাড়েন এই প্রবীণ প্রত্যক্ষদর্শী। তিনি মনে করেন, চব্বিশের আন্দোলনে পুরো ঢাকা শহরের সমস্ত এলাকায় যে পরিমাণ তীব্র প্রতিরোধ ও আন্দোলন সংঘটিত হয়েছিল, তার চেয়ে বহুগুণ বেশি তীব্র, ভয়ংকর ও রক্তক্ষয়ী লড়াই হয়েছে এই যাত্রাবাড়ী এলাকায়। ছাত্র-জনতার এই অদম্য প্রতিরোধের পুঙ্খানুপুঙ্খ ঘটনা যদি মুখে বলে শেষ করতে হয়, তবে সুদীর্ঘ সময় লেগে যাবে। জীবনের এতগুলো বছর পার করলেও তিনি নিজের জীবদ্দশায় কখনো এমন পৈশাচিক ও ঐতিহাসিক দৃশ্য আর কোথাও দেখেননি। একদিকে রাষ্ট্রীয় মদদে পুলিশ ও ক্যাডার বাহিনী মুহুর্মুহু স্বয়ংক্রিয় মারণাস্ত্র দিয়ে তাজা গুলি বর্ষণ করছে, অন্যদিকে সাধারণ নিরস্ত্র পোলাপান ও ছাত্ররা বুলেটের আঘাতে চারদিকে ছিটকে ও দৌড়াদৌড়ি করলেও পরক্ষণেই বুক চিতিয়ে আবার সেই পুলিশের মুখোমুখি দাঁড়িয়ে লড়ান দিচ্ছে এবং তাদের পিছু হটতে বাধ্য করছে।

এই অকুতোভয় তরুণ সমাজ ও সাধারণ মানুষ চব্বিশের জুলাই আন্দোলনে দেশের মুক্তির জন্য যে নজিরবিহীন আত্মত্যাগ ও বীরত্ব প্রদর্শন করেছে, তা হয়তো দেশের বড় বড় ঐতিহাসিকেরা কোনো নামী সরকারি খাতাকলমে সুনির্দিষ্টভাবে লিখে রাখবেন না, কিন্তু এদেশের কোটি কোটি মুক্তিকামী মানুষের মন ও মনন থেকে সেই স্মৃতি কোনোদিনও মুছে যাবে না। তবে সেই তীব্র আন্দোলনের দিনগুলোতে তৎকালীন স্বৈরাচারী দল আওয়ামী লীগ ও তাদের সহযোগী সংগঠন ছাত্রলীগের ক্যাডাররা যেভাবে রাষ্ট্রীয় পুলিশের কাধে কাঁধ মিলিয়ে সাধারণ ছাত্র-জনতার ওপর প্রকাশ্য দিবালোকে সশস্ত্র হামলা ও পৈশাচিক হত্যাযজ্ঞ চালিয়েছিল, তাদের এই দেশের মাটিতে কোনোদিনও ক্ষমা করা হবে না বলে তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করেন জয়নাল। স্বৈরাচারের সেই দোসররা কোনোভাবেই সাধারণ মানুষের কাছে ক্ষমা পাওয়ার ন্যূনতম যোগ্যতা রাখে না বলেও মনে করেন তিনি।

ঐতিহাসিক তথ্যানুযায়ী, গত ২০২৪ সালের জুলাই মাসে শুরু হওয়া টানা ৩৬ দিনের সেই নজিরবিহীন ও ঐতিহাসিক জুলাই আন্দোলন প্রথম দিকে ছিল মূলত সাধারণ সরকারি চাকরির কোটা সংস্কারের দাবিতে একটি সুশৃঙ্খল ছাত্র আন্দোলন। কিন্তু পরবর্তীতে ফ্যাসিবাদী সরকারের তীব্র দমন-পীড়ন, অহংকার এবং নির্বিচারে সাধারণ শিক্ষার্থীদের হত্যার কারণে তা একপর্যায়ে একদফার ফ্যাসিবাদী সরকার পতনের এক সর্বাত্মক ও একমুখী গণঅভ্যুত্থানে রূপ নেয়। আর এই চূড়ান্ত আন্দোলনের সময় ঢাকার শনির আখড়া, কাজলা, দনিয়া, কোনাপাড়া, রায়েরবাগ ও সাইনবোর্ডসহ ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের প্রতিটি অলিগলি ও চত্বর সবচেয়ে বেশি ভয়ংকর, প্রতিবাদমুখর ও রণক্ষেত্রে পরিণত হয়েছিল। ছাত্র-জনতার এই তীব্র আন্দোলন দমাতে সম্পূর্ণ ব্যর্থ হয়ে তৎকালীন শেখ হাসিনা সরকার দেশজুড়ে কঠোর সামরিক কারফিউ ঘোষণা করতে বাধ্য হয়েছিল।

তবে স্বৈরাচারের সেই অন্যায্য কারফিউ আর আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর তাক করা বন্দুকের বুলেটকে সম্পূর্ণ উপেক্ষা করেই রাজপথ ও ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ নিজেদের হাতে তুলে নিয়েছিল অদম্য ছাত্র-জনতা। নিরস্ত্র সাধারণ জনতার ওপর তৎকালীন পুলিশ, র‍্যাব, বিজিবিসহ সমস্ত যৌথ বাহিনীর মুহুর্মুহু প্রাণঘাতী মারণাস্ত্রের যথেচ্ছ ব্যবহারের কারণে শত শত সাধারণ জনতার প্রাণ বিসর্জন দিতে হয়েছিল। আন্দোলনের তীব্রতা ও জনস্রোত এতটাই ভয়ংকর ছিল যে, তৎকালীন মাঠপর্যায়ের পুলিশ কর্মকর্তারা নিজেদের অসহায়ত্ব প্রকাশ করে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীকে উদ্দেশ্য করে বলতে বাধ্য হয়েছিলেন যে, ‘স্যার, একটা গুলি লাগলে একটা মানুষই মরে, কিন্তু বাকি জনতা ভয় পেয়ে সরে না, বরং আরও দ্বিগুণ উৎসাহে সামনের দিকে এগিয়ে আসে।’

আরও পড়ুন: কাজিপুরে যমুনা নদীতে ডুবে দুই মাদরাসা ছাত্রের মর্মান্তিক মৃত্যু

তবুও কোনো এক অদৃশ্য ইশারায় এবং অদম্য তারুণ্যের প্রতিবাদী কণ্ঠস্বরের কারণে বুলেটের ভয়কে জয় করে জীবন বাজি রেখে সামনের দিকে এগিয়ে গিয়েছিল এদেশের মুক্তিকামী মানুষ। এই ঐতিহাসিক ও যুগান্তকারী গণঅভ্যুত্থানে যেমন সাধারণ স্কুল-কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা সামনের সারিতে ছিলেন, ঠিক তেমনি তাদের কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে রাজপথে প্রতিরোধ গড়ে তুলেছিলেন বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি), যুবদল ও ছাত্রদল, জামায়াতে ইসলামী ও ইসলামী ছাত্রশিবির, ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ এবং হেফাজতে ইসলাম সমর্থিত বিভিন্ন ডানপন্থী ও ইসলামি রাজনৈতিক দলের সাধারণ কর্মী ও সমর্থকেরা। বিশেষ করে যাত্রাবাড়ী এলাকার শত শত কওমি ও আলিয়া মাদ্রাসার সাধারণ শিক্ষার্থীরা এই সম্মুখ প্রতিরোধে অত্যন্ত সক্রিয়ভাবে অংশ নিয়েছিলেন এবং স্বৈরাচারের বুলেটের সামনে নিজেদের বুক পেতে দিয়েছিলেন। যার ফলে সেখানে শত শত মানুষ নিজের মূল্যবান প্রাণ হারিয়েছেন, যাদের অনেকের ছিন্নভিন্ন দেহের সঠিক পরিচয় ও সন্ধান আজও তাদের পরিবারের কাছে মেলেনি। মুড়ি বিক্রেতা জয়নাল আবেদিনের মতো আজ যাত্রাবাড়ীর সর্বস্তরের মানুষের একটাই জোরালো দাবি, এই নির্মম ও ইতিহাসের সবচেয়ে বড় মানবতাবিরোধী হত্যাযজ্ঞের সঙ্গে জড়িত থাকা সকল খুনি ও হুকুমদাতাদের দ্রুততম সময়ে বিশেষ ট্রাইব্যুনালের মাধ্যমে দৃষ্টান্তমূলক বিচার নিশ্চিত করতে হবে, যাতে ভবিষ্যতে আর কোনো রাজনৈতিক দল বা সরকার এদেশের বুকে এমন ফ্যাসিবাদী আচরণ করার দুঃসাহস না দেখায়।

নিউজের সূত্র: চব্বিশের জুলাই গণঅভ্যুত্থান গবেষণা সেল, যাত্রাবাড়ী থানা এলাকার প্রত্যক্ষদর্শী নাগরিক ফোরাম এবং ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের মর্গ ও জরুরি বিভাগের তৎকালীন আর্কাইভ খতিয়ান।

 

Post a Comment

আপনার মূল্যবান মতামত আমাদের জানান। কোনো উসকানিমূলক বা অশালীন মন্তব্য করা থেকে বিরত থাকুন।

নবীনতর পূর্বতন