কাজিপুরে যমুনা নদীতে ডুবে দুই মাদরাসা ছাত্রের মর্মান্তিক মৃত্যু

কাজিপুরে যমুনা নদীতে ডুবে দুই মাদরাসা ছাত্রের মর্মান্তিক মৃত্যু

সিরাজগঞ্জ ডেস্ক: শামীম হোসাইন / দিগন্ত বাংলা নিউজ

সিরাজগঞ্জের কাজিপুর উপজেলার নিশ্চিন্তপুর ইউনিয়নে যমুনা নদীর চরাঞ্চলে গোসলে নেমে তীব্র স্রোতের তোড়ে তলিয়ে যাওয়া দুই মাদরাসা ছাত্রের মরদেহ উদ্ধার।

চরাঞ্চলে শোকের মাতম: সিরাজগঞ্জের কাজিপুরে যমুনা নদীর তীব্র স্রোতে তলিয়ে গেল দুই শিশু শিক্ষার্থীর প্রাণ, জীবিত উদ্ধার ১

সিরাজগঞ্জের কাজিপুর উপজেলায় প্রমত্তা যমুনা নদীর বুকে ঝরে গেল দুটি তাজা ও নিষ্পাপ শিশুর প্রাণ। চরাঞ্চলের উত্তাল ও তীব্র স্রোতস্বিনী যমুনা নদীতে গোসল করতে নেমে পানিতে ডুবে সলিল সমাধি হয়েছে স্থানীয় একটি কওমি ও হাফেজিয়া মাদরাসার দুই আবাসিক শিক্ষার্থীর। এই হৃদয়বিদারক ও মর্মান্তিক দুর্ঘটনায় পুরো চরাঞ্চল জুড়ে নেমে এসেছে গভীর শোকের ছায়া, স্তব্ধ হয়ে গেছে সহপাঠী ও স্থানীয় বাসিন্দারা। নদীমাতৃক বাংলাদেশের চরাঞ্চলে অসচেতনতা এবং নদীর গভীরতা আন্দাজ করতে না পারার কারণে আবারও এক করুণ ট্র্যাজেডির সাক্ষী হলো যমুনার তীরবর্তী জনপদ।

আজ বৃহস্পতিবার (২৫ জুন ২০২৬) সকাল আনুমানিক সাড়ে দশটার দিকে কাজিপুর উপজেলার প্রত্যন্ত চরাঞ্চলখ্যাত নিশ্চিন্তপুর ইউনিয়নের ৬ নম্বর নৌকাঘাট এলাকায় এই ন্যাক্কারজনক ও যন্ত্রণাদায়ক দুর্ঘটনাটি ঘটে। ঘটনাটি জানাজানির পর স্থানীয় চরের মানুষ ও জেলেরা নদী বক্ষে উদ্ধার অভিযান শুরু করেন। পরবর্তীতে দুপুরের দিকে নদী থেকে ওই দুই শিক্ষার্থীর নিথর দেহ উদ্ধার করা সম্ভব হয়। নিহত দুই শিশুই স্থানীয় জজিরা মদিনাতুল উলূম কওমীয়া ও হাফিজিয়া মাদরাসার আবাসিক ছাত্র ছিল বলে প্রাতিষ্ঠানিক সূত্রে নিশ্চিত হওয়া গেছে।

## গোসলের আনন্দই ডেকে আনল চরম বিপর্যয়: ১ জন অলৌকিকভাবে বেঁচে ফিরলেও তলিয়ে গেল ২ জন

কাজিপুর থানা পুলিশ এবং স্থানীয় প্রত্যক্ষদর্শীদের মারফত জানা গেছে, প্রতিদিনের মতো মাদরাসার ক্লাস ও প্রাত্যহিক শিক্ষা কার্যক্রম শেষে জজিরা দারুল উলুম কওমি ও হাফেজিয়া মাদরাসার তিন কোমলমতি শিক্ষার্থী দুপুরের তীব্র গরম থেকে একটু স্বস্তি পেতে একসাথে যমুনা নদীর পাড়ে যায়। তারা সাঁতার কাটার উদ্দেশ্যে নিশ্চিন্তপুর ইউনিয়নের ৬ নম্বর নৌকাঘাট এলাকায় নদীর পানিতে নামে। কিন্তু বর্ষা ও গ্রীষ্মের এই সন্ধিক্ষণে যমুনা নদীর চরাঞ্চলে পানির নিচে তীব্র অলক্ষ্য ঘূর্ণিস্রোত (Undercurrent) তৈরি হয়েছিল, যা ওই অবুঝ শিশুরা টের পায়নি। পানির গভীরে যাওয়ার সাথে সাথেই নদীর তীব্র স্রোত তাদেরকে মাঝনদীর দিকে টেনে নিয়ে যেতে শুরু করে।

আরও পড়ুন: বর্জ্য থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদনে বড় মেগা প্রকল্প হাতে নিয়েছে সরকার

এই চরম বিপদের মুহূর্তে তিন শিক্ষার্থীর মধ্যে একজন কোনো রকমে নিজের জীবন বাঁচাতে সক্ষম হয় এবং আপ্রাণ চেষ্টা চালিয়ে নদীর তীরে উঠে আসে। তবে বাকি দুই শিক্ষার্থী তীব্র স্রোতের সাথে যুদ্ধ করে টিকতে না পেরে চোখের পলকে নদীর গভীর পানিতে তলিয়ে গিয়ে নিখোঁজ হয়। তীরে উঠে আসা শিক্ষার্থীটির চিৎকারে আশেপাশের চরের মানুষ ও ঘাটে থাকা নৌকার মাঝিরা দ্রুত ঘটনাস্থলে ছুটে আসেন।

এই চাঞ্চল্যকর ঘটনার সত্যতা পুরোপুরি নিশ্চিত করে কাজিপুর থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) এস এম মোস্তাফিজুর রহমান গণমাধ্যমকে জানান:

"জজিরা দারুল উলুম কওমি ও হাফেজিয়া মাদরাসার তিন আবাসিক শিক্ষার্থী দুপুরের দিকে নদীর ঘাটে গোসলের জন্য নেমেছিল। যমুনার চরের তীব্র স্রোতের কারণে দুজন নদীতে তলিয়ে যায় এবং ভাগ্যক্রমে একজন কোনো রকমে নদীর তীরে উঠে নিজের প্রাণ রক্ষা করতে সক্ষম হয়। ঘটনাটি অত্যন্ত বেদনাদায়ক এবং পুলিশ প্রশাসন খবর পাওয়ার সাথে সাথেই ঘটনাস্থলে ফোর্স পাঠিয়েছে।"

## জেলেদের জালে উঠল দুই নিথর দেহ: নাটুয়ারপাড়া ফাঁড়ি ও নৌপুলিশের জরুরি পরিদর্শন

নদীতে দুই মাদরাসা ছাত্র তলিয়ে যাওয়ার খবরটি চরাঞ্চলের গ্রামগুলোতে মুহূর্তের মধ্যে ছড়িয়ে পড়লে শত শত মানুষ নদীর পাড়ে এসে ভিড় জমান। স্থানীয় চরের অভিজ্ঞ জেলেরা তাৎক্ষণিকভাবে কোনো বিলম্ব না করে নিজেদের বড় বড় মাছ ধরার জাল নিয়ে যমুনা নদীর ওই নির্দিষ্ট এলাকায় তল্লাশি অভিযান শুরু করেন। নদী বক্ষে প্রায় দেড় ঘণ্টারও বেশি সময় ধরে নিবিড়ভাবে জাল ফেলার পর, দুপুর আনুমানিক ১২টার দিকে নিখোঁজ দুই শিক্ষার্থীর নিথর ও নিস্পন্দ দেহ জেলের জালে আটকে পড়ে। পরে তাদেরকে মৃত অবস্থায় নদীর বুক থেকে ওপরে তুলে আনা হয়।

নদী থেকে মরদেহ উদ্ধারের পর চরের আকাশে-বাতাসে নিহতদের সহপাঠী ও শিক্ষকদের কান্নার রোল পড়ে যায়। খবর পেয়ে কাজিপুর উপজেলার নাটুয়ারপাড়া পুলিশ ফাঁড়ির একটি চৌকস দল এবং সিরাজগঞ্জ অঞ্চলের নৌপুলিশের (Naval Police) কর্মকর্তারা দ্রুত ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেন। সুরতহাল প্রতিবেদন তৈরির পাশাপাশি পুলিশ সদস্যরা শোকসন্তপ্ত পরিবার ও মাদরাসা কর্তৃপক্ষের সাথে কথা বলে ঘটনার বিস্তারিত বিবরণ ও আইনি প্রক্রিয়া সম্পন্ন করেন।

## নিহত ও জীবিত উদ্ধার হওয়া শিক্ষার্থীদের সুনির্দিষ্ট পরিচয়

নিশ্চিন্তপুর ইউনিয়নের ৫ নম্বর ওয়ার্ডের স্থানীয় ইউপি সদস্য (মেম্বার) শাহিনুল ইসলাম শাহিন নিহত ও জীবিত উদ্ধার হওয়া শিক্ষার্থীদের পারিবারিক ও প্রাতিষ্ঠানিক পরিচয় বিস্তারিতভাবে নিশ্চিত করেছেন।

১. জুনায়েদ হোসেন (১৩): সে টাঙ্গাইল জেলার ভূয়াপুর উপজেলার হালিদাপাড়া (ভদ্রশিমুল) গ্রামের স্থায়ী বাসিন্দা জাহাঙ্গীর আলমের একমাত্র আদরের পুত্র সন্তান।

২. আরিফুল ইসলাম (১১): সে সিরাজগঞ্জ সদর উপজেলার প্রত্যন্ত চরাঞ্চল ক্ষুদ্র কাটেঙ্গা গ্রামের বাসিন্দা আব্দুল হালিমের ছেলে।

৩. হাসিবুল্লাহ (১৩) [জীবিত উদ্ধার]: নদী থেকে অলৌকিকভাবে বেঁচে ফেরা একমাত্র শিক্ষার্থী হাসিবুল্লাহ জামালপুর জেলার সরিষাবাড়ি উপজেলার জামিরা গ্রামের রাশেদুল ইসলামের ছেলে।

ইউপি সদস্য শাহিনুল ইসলাম শাহিন আরও জানান, এরা তিনজনই মূলত কাজিপুর উপজেলার নিশ্চিন্তপুর ইউনিয়নের ঐতিহ্যবাহী জজিরা মদিনাতুল উলূম কওমীয়া ও হাফিজিয়া মাদরাসার আবাসিক হোস্টেলে থেকে পবিত্র কুরআন ও ধর্মীয় শিক্ষা গ্রহণ করছিল। একই সাথে আবাসিক হোস্টেলে থাকার কারণে এদের মধ্যে অত্যন্ত গভীর বন্ধুত্ব গড়ে উঠেছিল, কিন্তু যমুনার এক গ্রাস সেই বন্ধুত্বকে চিরতরে ছিন্নভিন্ন করে দিল।

আরও পড়ুন: দুর্নীতি ও ঘুসে শীর্ষে পাসপোর্ট অফিস, দ্বিতীয় অবস্থানে বিআরটিএ

## একনজরে কাজিপুরে যমুনা নদীতে ডুবে দুই ছাত্রের মৃত্যুর মূল খতিয়ান

পাঠকদের সুবিধার্থে এবং সিরাজগঞ্জের কাজিপুরে ঘটে যাওয়া এই মর্মান্তিক নদী দুর্ঘটনার প্রধান প্রধান বিবরণসমূহ একনজরে সহজে অনুধাবন করার জন্য নিচে একটি বিশেষ আধুনিক তথ্য সারণী প্রদান করা হলো:

দুর্ঘটনার মূল খাত ও আইনি বিবরণ সমূহসুনির্দিষ্ট বিবরণ ও প্রাতিষ্ঠানিক খতিয়ান
দুর্ঘটনার সুনির্দিষ্ট স্থানসিরাজগঞ্জ জেলার কাজিপুর উপজেলার নিশ্চিন্তপুর ইউনিয়নের ৬ নম্বর নৌকাঘাট এলাকা।
দুর্ঘটনার তারিখ ও সময়কাল২৫ জুন ২০২৬ (বৃহস্পতিবার); সকাল আনুমানিক ১০:৩০ মিনিট।
নিহত শিক্ষার্থীদের সংখ্যা ও বয়স২ জন; জুনায়েদ হোসেন (১৩ বছর) এবং আরিফুল ইসলাম (১১ বছর)।
জীবিত উদ্ধার হওয়া শিক্ষার্থীহাসিবুল্লাহ (১৩ বছর), জামালপুরের সরিষাবাড়ির বাসিন্দা।
শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের নাম ও ধরনজজিরা মদিনাতুল উলূম কওমীয়া ও হাফিজিয়া মাদরাসা (আবাসিক হোস্টেল)।
মরদেহ উদ্ধারের পদ্ধতি ও সময়স্থানীয় জেলেদের জালে আটকা পড়া অবস্থায় দুপুর ১২টার দিকে উদ্ধার।
তদন্তকারী সরকারি আইন বিভাগকাজিপুরের নাটুয়ারপাড়া পুলিশ ফাঁড়ি এবং সিরাজগঞ্জ নৌপুলিশ।
সরকারি আর্থিক সহায়তার আশ্বাসকাজিপুর উপজেলা নির্বাহী অফিসার (UNO) মোস্তাফিজুর রহমান

## উপজেলা প্রশাসনের গভীর শোক ও সরকারি আর্থিক সহায়তার ঘোষণা

এই মর্মান্তিক দুর্ঘটনার খবরটি কাজিপুর উপজেলা প্রশাসনের শীর্ষ কর্তাদের কান পর্যন্ত পৌঁছালে প্রশাসনের পক্ষ থেকে গভীর শোক ও দুঃখ প্রকাশ করা হয়েছে। কাজিপুর উপজেলা নির্বাহী অফিসার (UNO) মোস্তাফিজুর রহমান সাংবাদিকদের সাথে আলাপকালে বলেন, "যমুনা নদীতে ডুবে দুই কোমলমতি মাদরাসা ছাত্রের মৃত্যুর খবরটি আমি অত্যন্ত দুঃখের সাথে শুনেছি। এটি একটি অপূরণীয় ক্ষতি। আমরা প্রশাসনের পক্ষ থেকে নিহতদের আত্মার মাগফিরাত কামনা করছি। মৃত শিশুদের ওই দুটি দরিদ্র ও শোকগ্রস্ত পরিবার যদি আমাদের নিকট বিধি মোতাবেক আবেদন পেশ করে, তবে সরকারের দুর্যোগ ও ত্রাণ তহবিল থেকে তাদেরকে জরুরি ভিত্তিতে সর্বোচ্চ সরকারি আর্থিক সহায়তা প্রদান করা হবে।"

এদিকে, দুই শিক্ষার্থীর আকস্মিক ও অকাল মৃত্যুর ঘটনায় জজিরা মদিনাতুল উলূম মাদরাসার হোস্টেলের অন্যান্য সাধারণ শিক্ষার্থীদের মাঝে এক নিদারুণ শোকের ছায়া নেমে এসেছে। সহপাঠীদের হারিয়ে অনেক শিক্ষার্থী নাওয়া-খাওয়া ভুলে ক্রন্দনরত অবস্থায় দিন পার করছে। স্থানীয় সচেতন মহল মনে করছেন, চরাঞ্চলের নদীগুলোতে বর্ষা মৌসুমে পানির গভীরতা ও স্রোত অনেক বৃদ্ধি পায়, তাই ছোট ছোট শিশুদের একা একা নদীতে গোসলে পাঠানোর ক্ষেত্রে মাদরাসা কর্তৃপক্ষ ও অভিভাবকদের আরও অনেক বেশি সতর্ক ও দায়িত্বশীল হওয়া উচিত ছিল।

সিরাজগঞ্জ জেলার চরাঞ্চলের প্রতিটি খবর, যমুনা নদীর ভাঙন ও দুর্ঘটনার সর্বশেষ আপডেট, দেশের আনাচে-কানাচে ঘটে যাওয়া প্রতিটি ঘটনার প্রফেশনাল ও শতভাগ ইউনিক বিশ্লেষণ সবার আগে পেতে ‘দিগন্ত বাংলা নিউজ’ পোর্টাল সর্বদা প্রতিশ্রুতিবদ্ধ।

নিউজ সূত্র: কাজিপুর থানা পুলিশ ও স্থানীয় ইউনিয়ন পরিষদ কার্যালয়

Post a Comment

আপনার মূল্যবান মতামত আমাদের জানান। কোনো উসকানিমূলক বা অশালীন মন্তব্য করা থেকে বিরত থাকুন।

নবীনতর পূর্বতন