বর্জ্য থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদনে বড় মেগা প্রকল্প হাতে নিয়েছে সরকার

বর্জ্য থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদনে বড় মেগা প্রকল্প হাতে নিয়েছে সরকার

জাতীয় ডেস্ক: শামীম হোসাইন / দিগন্ত বাংলা নিউজ

জাতীয় প্রেসক্লাবে আয়োজিত বিশেষ আলোচনা সভায় দেশের পরিবেশ রক্ষা ও কঠিন বর্জ্য ব্যবস্থাপনায় সরকারের নতুন মেগা প্রকল্পের ঘোষণা দিচ্ছেন পরিবেশমন্ত্রী।

প্লাস্টিক বর্জ্য পুড়িয়ে মিলবে গ্রিন এনার্জি: কঠিন বর্জ্য থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদনের মেগা উদ্যোগ, আমিনবাজারে বসছে আধুনিক প্লান্ট, প্লাস্টিক রোধে পরিবেশমন্ত্রীর ৩ বছর মেয়াদি বিশেষ রোডম্যাপ

উন্নত বিশ্বের আদলে এবার বাংলাদেশেও পরিবেশ সুরক্ষায় এক যুগান্তকারী ও পরিবেশবান্ধব প্রযুক্তিগত বিপ্লব ঘটতে যাচ্ছে। দেশের পরিবেশকে দূষণমুক্ত রাখার পাশাপাশি ক্রমবর্ধমান জ্বালানি চাহিদা মেটাতে পরিত্যক্ত কঠিন বর্জ্য ও আবর্জনা থেকে সরাসরি বিদ্যুৎ উৎপাদনের এক বিশাল ও দূরদর্শী মহাপরিকল্পনা হাতে নিয়েছে সরকার। দীর্ঘদিনের এই স্বপ্নকে বাস্তবে রূপ দিতে ইতিমধ্যেই রাজধানীর আমিনবাজারে একটি আন্তর্জাতিক মানের বিদ্যুৎ উৎপাদন কেন্দ্র বা বিশেষ পাওয়ার প্লান্ট স্থাপনের কাজ দ্রুত গতিতে এগিয়ে চলছে।

আজ বৃহস্পতিবার (২৫ জুন ২০২৬) দুপুরে রাজধানী ঢাকার তোপখানা রোডে অবস্থিত জাতীয় প্রেসক্লাবের ভিআইপি লাউঞ্জে আয়োজিত এক বিশেষ ও উচ্চপর্যায়ের নাগরিক আলোচনা সভায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয়ের মাননীয় মন্ত্রী আব্দুল আউয়াল মিন্টু সরকারের এই মেগা পরিকল্পনা ও পরিবেশ সুরক্ষার সামগ্রিক রোডম্যাপ গণমাধ্যমের সামনে আনুষ্ঠানিকভাবে তুলে ধরেন। মন্ত্রী স্পষ্ট জানান, জলবায়ু পরিবর্তনের মারাত্মক ঝুঁকি মোকাবিলা এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য একটি বাসযোগ্য ও নিরাপদ সবুজ বাংলাদেশ গড়ে তুলতে বর্তমান সরকার সম্পূর্ণ নিজস্ব অর্থায়নে এবং আন্তর্জাতিক সহযোগিতায় নানামুখী পরিবেশবান্ধব সংস্কার কর্মসূচি বাস্তবায়ন করছে।

## ঢাকাকেন্দিক কার্যক্রমে পরিবেশ রক্ষা বড় চ্যালেঞ্জ: আমিনবাজারে বসছে বর্জ্য বিদ্যুৎ প্লান্ট

জাতীয় প্রেসক্লাব আয়োজিত সেমিনারে পরিবেশমন্ত্রী আব্দুল আউয়াল মিন্টু দেশের ভৌগোলিক ও প্রশাসনিক বাস্তবতার এক বড় সংকট তুলে ধরেন। তিনি বলেন, বর্তমানে দেশের প্রায় সব ধরণের গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্যিক, রাজনৈতিক ও সরকারি কার্যক্রম অতিরিক্ত মাত্রায় ঢাকাকেন্দ্রিক হয়ে পড়েছে। প্রতিদিন দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে লাখ লাখ মানুষ জীবিকার তাগিদে এই মেগাসিটিতে আসছেন। ফলে বিপুল জনসংখ্যার এই শহরের বর্জ্য ব্যবস্থাপনা ও সার্বিক পরিবেশ রক্ষা করা সরকারের জন্য এখন একটি বিশাল ও প্রধানতম চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। প্রতিদিন ঢাকা ও তার পার্শ্ববর্তী এলাকায় যে হাজার হাজার টন কঠিন বর্জ্য উৎপাদিত হয়, তা ল্যান্ডফিলে বছরের পর বছর ফেলে রাখা পরিবেশের জন্য মারাত্মক আত্মঘাতী।

আরও পড়ুন: যুদ্ধের খরচ মেটাতে ট্রাম্পের বড় চাল, কংগ্রেসের কাছে ৮৭৬০ কোটি ডলার দাবি

এই সংকটের স্থায়ী ও বৈজ্ঞানিক সমাধান হিসেবেই সরকার বর্জ্য থেকে বিদ্যুৎ (Waste-to-Energy) তৈরির পথে হাঁটছে। মন্ত্রী ঘোষণা করেন:

"আমরা ঢাকাবাসীকে একটি পরিচ্ছন্ন ও আধুনিক শহর উপহার দিতে বদ্ধপরিকর। এর অংশ হিসেবেই রাজধানীর আমিনবাজার এলাকায় অত্যন্ত অত্যাধুনিক ও পরিবেশবান্ধব প্রযুক্তিসম্পন্ন একটি কঠিন বর্জ্য থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদন প্লান্ট বাস্তবায়ন করা হচ্ছে। এই প্লান্টটি পুরোপুরি চালু হলে ঢাকার যত্রতত্র পড়ে থাকা গৃহস্থালি ও কঠিন বর্জ্যগুলোকে বৈজ্ঞানিক উপায়ে পুড়িয়ে শত শত মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন করা সম্ভব হবে, যা আমাদের জাতীয় গ্রিডে যোগ হয়ে বিদ্যুতের ঘাটতি মেটাতেও ভূমিকা রাখবে।"

## ১২ জেলার ৪০ উপজেলায় ‘সিঙ্গেল ইউজ প্লাস্টিক’ নিষিদ্ধের ৩ বছর মেয়াদি কর্মপরিকল্পনা

আলোচনা সভায় প্লাস্টিক দূষণের ভয়াবহতা নিয়ে চরম উদ্বেগ প্রকাশ করে পরিবেশমন্ত্রী আরও জানান, বর্তমান যুগের সবচেয়ে বড় অভিশাপ হলো একবার ব্যবহারযোগ্য প্লাস্টিক বা ‘সিঙ্গেল ইউজ প্লাস্টিক’ (Single-use Plastic)। এই প্লাস্টিক সামগ্রীগুলো মাটি ও পানির সাথে মিশে নদী-নালাকে অবরুদ্ধ করে ফেলছে এবং জীববৈচিত্র্য ধ্বংস করছে। এই মারাত্মক দূষণ চিরতরে রুখে দিতে বিশেষ করে দেশের অত্যন্ত সংবেদনশীল উপকূলীয় অঞ্চলের জন্য একটি বিশেষ ক্র্যাশ প্রোগ্রাম হাতে নিয়েছে মন্ত্রণালয়।

নকশা অনুযায়ী, দেশের উপকূলবর্তী ১২টি প্রধান জেলার মোট ৪০টি উপজেলায় সব ধরণের সিঙ্গেল ইউজ প্লাস্টিকের ব্যবহার ও বিপণন সম্পূর্ণ বন্ধ করার লক্ষ্যে একটি অত্যন্ত কঠোর ৩ বছর মেয়াদি কর্মপরিকল্পনা মাঠ পর্যায়ে ইতিমধ্যেই বাস্তবায়ন শুরু হয়েছে। এই নির্দিষ্ট সময়সীমার মধ্যে আইন প্রয়োগের পাশাপাশি সাধারণ জনগণের মাঝে বিকল্প পরিবেশবান্ধব পাটের ব্যাগ বা কাগজের সামগ্রী ব্যবহারে ব্যাপক সচেতনতা তৈরি করা হবে।

## বিশ্বব্যাংকের সহায়তায় ২০৩০ সালের মধ্যে প্লাস্টিক ব্যবহার ৫০ শতাংশ কমানোর মেগা লক্ষ্য

বৈশ্বিক অংশীদারিত্বের কথা উল্লেখ করে পরিবেশমন্ত্রী আব্দুল আউয়াল মিন্টু জানান, প্লাস্টিক বর্জ্যের এই আন্তর্জাতিক সংকট মোকাবিলায় বিশ্বের অন্যতম শীর্ষ উন্নয়ন সহযোগী সংস্থা বিশ্বব্যাংকের (World Bank) আর্থিক ও কারিগরি সহায়তায় একটি দীর্ঘমেয়াদি মহাপরিকল্পনা চূড়ান্ত করা হয়েছে। এই চুক্তির অধীনে আগামী ২০৩০ সালের মধ্যে দেশের অভ্যন্তরে সার্বিক ক্ষতিকারক প্লাস্টিকের ব্যবহার ও অপচয় এক ধাক্কায় ৫০ শতাংশ অর্থাৎ অর্ধেক কমিয়ে আনার এক কঠিন লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেছে বাংলাদেশ সরকার।

আরও পড়ুন: ২৩ জুনের প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী: রাজধানীতে ডিএমপির বিশেষ নিরাপত্তা ও সতর্ক অবস্থান

একই সাথে দেশের প্লাস্টিক উৎপাদনকারী শিল্পকারখানাগুলোর ওপর কড়া নজরদারি ও পরিবেশগত কর বা গ্রিন ট্যাক্স আরোপ করে প্লাস্টিকের নতুন উৎপাদন সামগ্রিকভাবে ৩০ শতাংশ হ্রাস করার আইনি বাধ্যবাধকতা তৈরি করা হচ্ছে। মন্ত্রী আশাবাদ ব্যক্ত করেন যে, ২০৩০ সালের এই মাইলফলক অর্জিত হলে বাংলাদেশের নদী, নালা ও কৃষিজমি প্লাস্টিকের মারাত্মক বিষক্রিয়া থেকে চিরতরে মুক্তি পাবে।

## একনজরে পরিবেশ রক্ষা ও বর্জ্য থেকে বিদ্যুৎ প্রকল্পের সুনির্দিষ্ট সরকারি রোডম্যাপ

পাঠকদের সুবিধার্থে এবং পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয় কর্তৃক গৃহীত প্লাস্টিক ও বর্জ্য ব্যবস্থাপনার প্রধান প্রধান সিদ্ধান্তসমূহ একনজরে সহজে অনুধাবন করার জন্য নিচে একটি বিশেষ আধুনিক তথ্য সারণী প্রদান করা হলো:

পরিবেশ সুরক্ষার প্রধান খাত ও প্রকল্পসমূহসুনির্দিষ্ট লক্ষ্যমাত্রা ও কৌশলগত কর্মপরিকল্পনা
১. বর্জ্য থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদন প্লান্টরাজধানীর امین بازار (আমিনবাজার) এলাকায় প্লান্টটি সফলভাবে বাস্তবায়নাধীন।
২. সিঙ্গেল ইউজ প্লাস্টিক বন্ধের অঞ্চলদেশের উপকূলীয় ১২টি জেলার মোট ৪০টি উপজেলায় সম্পূর্ণ নিষিদ্ধের উদ্যোগ।
৩. প্লাস্টিক বিরোধী বিশেষ মিশনআইন প্রয়োগ ও সচেতনতা বৃদ্ধির জন্য ৩ বছর মেয়াদি কঠোর কর্মপরিকল্পনা
৪. আন্তর্জাতিক অংশীদার ও সহযোগীএই মেগা প্রজেক্ট বাস্তবায়নে কারিগরি ও আর্থিক সহায়তা দিচ্ছে বিশ্বব্যাংক
৫. ২০৩০ সালের মূল লক্ষ্য (ব্যবহার)আগামী ২০৩০ সালের মধ্যে দেশে প্লাস্টিকের ব্যবহার ৫০% কমিয়ে আনা
৬. ২০৩০ সালের মূল লক্ষ্য (উৎপাদন)নতুন করে প্লাস্টিক সামগ্রীর কারখানা উৎপাদন ৩০% হ্রাস করা

দেশের জলবায়ু পরিবর্তন, প্লাস্টিক দূষণ রোধে প্রশাসনের কড়া নজরদারি, আমিনবাজার বিদ্যুৎ প্রকল্পের মাঠ পর্যায়ের সর্বশেষ অগ্রগতি এবং সরকারের নীতিনির্ধারণী মহলের প্রতিটি নির্ভরযোগ্য খবরাখবর সবার আগে প্রফেশনাল ও শতভাগ ইউনিক উপায়ে আপনাদের সামনে নিয়মিত তুলে ধরতে ‘দিগন্ত বাংলা নিউজ’ পোর্টাল সর্বদা প্রতিশ্রুতিবদ্ধ।

নিউজ সূত্র: পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয়

 

Post a Comment

আপনার মূল্যবান মতামত আমাদের জানান। কোনো উসকানিমূলক বা অশালীন মন্তব্য করা থেকে বিরত থাকুন।

নবীনতর পূর্বতন