জাতীয় ডেস্ক: শামীম হোসাইন / দিগন্ত বাংলা নিউজ
রাজধানীর ধানমণ্ডিতে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি) কার্যালয়ে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে সেবা খাতের দুর্নীতির ভয়াবহ চিত্র প্রকাশ।
টিআইবি’র জাতীয় খানা জরিপের বিস্ফোরক প্রতিবেদন: দেশের সবচেয়ে দুর্নীতিগ্রস্ত খাত ই-পাসপোর্ট অফিস, দ্বিতীয় স্থানে বিআরটিএ ও তৃতীয় অবস্থানে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী
বাংলাদেশের সাধারণ নাগরিকদের দৈনন্দিন প্রয়োজনীয় নাগরিক দাপ্তরিক সেবা খাতগুলোর রন্ধ্রে রন্ধ্রে জেঁকে বসা প্রাতিষ্ঠানিক দুর্নীতি ও অনিয়মের এক চরম ও উদ্বেগজনক চিত্র আবারও উন্মোচিত হয়েছে। সরকারের বিভিন্ন সেবা খাতের মধ্যে বর্তমানে সবচেয়ে বেশি দুর্নীতিগ্রস্ত ও জনভোগান্তির শীর্ষ খাত হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে ই-পাসপোর্ট ও ইমিগ্রেশন অফিস। দেশের সাধারণ মানুষের আন্তর্জাতিক যোগাযোগের একমাত্র মাধ্যম পাসপোর্ট সংগ্রহ করতে গিয়ে জাতীয় পর্যায়ে সর্বোচ্চ সংখ্যক নাগরিক তথা ৭৬ দশমিক ৬ শতাংশ পরিবার বা খানা সরাসরি ঘুস এবং নানামুখী দুর্নীতির শিকার হচ্ছেন।
আজ বৃহস্পতিবার (২৫ জুন ২০২৬) রাজধানীর ধানমণ্ডির সুপরিচিত মাইডাস সেন্টারে অবস্থিত ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি) এর প্রধান কার্যালয়ে আয়োজিত এক বিশেষ ও হাইপ্রোফাইল সংবাদ সম্মেলনে এই বিস্ফোরক ও চাঞ্চল্যকর তথ্যসমূহ আনুষ্ঠানিকভাবে গণমাধ্যমের সামনে তুলে ধরা হয়। ‘সেবা খাতে দুর্নীতি: জাতীয় খানা জরিপ ২০২৫’ শীর্ষক এই গবেষণামূলক প্রতিবেদনের বিস্তারিত প্রকাশ উপলক্ষে এই সংবাদ সম্মেলনের আয়োজন করা হয়। প্রতিবেদন প্রকাশকালে উপস্থিত ছিলেন টিআইবি’র নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান এবং গবেষণা দলের প্রধান প্রধান ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা। এই প্রতিবেদনটি প্রকাশ পাওয়ার পর সারা দেশের সচেতন নাগরিক সমাজ ও প্রশাসনিক মহলে ব্যাপক তোলপাড় শুরু হয়েছে।
## গ্রামীণ মানুষের ভোগান্তি চরম সীমায়: শহরের চেয়ে গ্রামে ঘুসের রাজত্ব অনেক বেশি
টিআইবি’র এই বিশেষ খানা জরিপের প্রাপ্ত ডেটা বা পরিসংখ্যানগুলো বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, ভৌগোলিক অবস্থানভেদে দুর্নীতির এই করাল গ্রাস শহরাঞ্চলের চেয়ে প্রত্যন্ত গ্রামাঞ্চলের সাধারণ মানুষের ওপর অনেক বেশি চেপে বসেছে। তথ্যানুযায়ী, পাসপোর্ট সেবা নিতে গিয়ে গ্রামীণ অঞ্চলের ভুক্তভোগী পরিবারগুলোর ক্ষেত্রে ঘুসের শিকার হওয়ার এই ন্যাক্কারজনক হার সর্বোচ্চ ৭৯ দশমিক ১ শতাংশ। অন্যদিকে, তুলনামূলকভাবে সচেতন হওয়া সত্ত্বেও শহরাঞ্চলের নাগরিকদের ক্ষেত্রে এই ঘুসের হার দাঁড়িয়েছে ৭১ দশমিক ৮ শতাংশ। অর্থাৎ দালালের দৌরাত্ম্য এবং অফিশিয়াল সিন্ডিকেটের কারণে প্রত্যন্ত অঞ্চলের গ্রামের সহজ-সরল মানুষগুলো পাসপোর্ট অফিসে গিয়ে সবচেয়ে বেশি আর্থিক প্রতারণা ও শোষণের শিকার হচ্ছেন।
আরও পড়ুন: লক্ষ্মীপুরে একই পরিবারের ৩ জনকে নির্মমভাবে কুপিয়ে হত্যা
সংবাদ সম্মেলনে টিআইবি’র পক্ষ থেকে আরও জানানো হয় যে, দেশের সামগ্রিক নাগরিক সেবার প্রধান প্রধান খাতগুলোর অবস্থা প্রায় একই রকম নাজুক। পাসপোর্ট অফিসের ঠিক পরেই দ্বিতীয় শীর্ষ দুর্নীতিগ্রস্ত এবং ঘুস নির্ভর খাত হিসেবে নিজের অবস্থান পাকা করেছে বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষ বা বিআরটিএ (BRTA)। এই খাতে ড্রাইভিং লাইসেন্স এবং গাড়ির ফিটনেস সার্টিফিকেটসহ বিভিন্ন জরুরি সেবা নিতে গিয়ে দেশের প্রায় ৬৩ দশমিক ৫ শতাংশ নাগরিক বা খানা সরাসরি ঘুসের রাজত্বের মুখোমুখি হয়েছেন।
## আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী সংস্থা ও ভূমি সেবায় হরিলুট: অন্তত একটি খাতে ঘুসের শিকার ৬৩.৬% পরিবার
প্রতিবেদনের অত্যন্ত সংবেদনশীল অংশে আইন প্রয়োগকারী সংস্থাগুলোর দুর্নীতির চিত্রও ফুটিয়ে তোলা হয়েছে। বিআরটিএ-এর ঠিক পরেই সাধারণ মানুষের জানমালের নিরাপত্তা দেওয়ার দায়িত্বে নিয়োজিত আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী সংস্থাগুলো দুর্নীতির তালিকায় তৃতীয় যৌথ অবস্থানে রয়েছে। এই খাতে সাধারণ নাগরিকদের বিভিন্ন আইনি সেবা বা সাধারণ ডায়েরি (GD) ও মামলা করতে গিয়ে প্রায় ৪৯ দশমিক ৩ শতাংশ মানুষ কোনো না কোনোভাবে ঘুস দিতে বাধ্য হয়েছেন।
সবচেয়ে আশ্চর্যের বিষয় হলো, দেশের প্রাণভোমরা হিসেবে পরিচিত কৃষি খাতও এবার এই সমান হারের দুর্নীতির কবলে পড়েছে। সার, বীজ ও সরকারি প্রণোদনা পেতে গিয়ে দেশের প্রান্তিক চাষীদের ৪৯ দশমিক ৩ শতাংশ অংশই দুর্নীতির করাল গ্রাসে পিষ্ট হয়েছেন। এর ঠিক পরেই রয়েছে জনগণের আজন্ম ভোগান্তির আরেক নাম ভূমি সেবা বা এসি ল্যান্ড ও সাব-রেজিস্ট্রি অফিস। জমি কেনাবেচা, নামজারি বা পর্চা তুলতে গিয়ে দেশের ৪৭ দশমিক ৬ শতাংশ পরিবার বা খানা সরাসরি ঘুস ও দালালি সিন্ডিকেটের মাধ্যমে নিজেদের পকেটের টাকা খোয়াতে বাধ্য হয়েছেন।
সামগ্রিক জাতীয় এই খানা জরিপের চূড়ান্ত ফলাফল বিশ্লেষণ করে ড. ইফতেখারুজ্জামান অত্যন্ত আক্ষেপের সাথে জানান:
আরও পড়ুন: চীনের এআই অগ্রগতি যুক্তরাষ্ট্রের জন্য বড় কৌশলগত ঝুঁকি: স্কট বেসেন্ট
"আমাদের এই বিজ্ঞানসম্মত জরিপ বলছে, বর্তমানে বাংলাদেশের সার্বিক জনসংখ্যা ও পরিবারের মধ্যে প্রায় ৬৩ দশমিক ৬ শতাংশ পরিবার তাদের দৈনন্দিন প্রয়োজনে সরকারের অন্তত যেকোনো একটি সেবা খাতে গিয়ে সরাসরি ঘুস ও প্রাতিষ্ঠানিক দুর্নীতির শিকার হয়েছেন। এর মধ্যে সবচেয়ে ভয়াবহ, ন্যাক্কারজনক ও চরম উদ্বেগজনক চিত্রটি উদঘাটিত হয়েছে পাসপোর্ট অধিদপ্তরের ক্ষেত্রে। ডিজিটাল ও ই-পাসপোর্ট চালুর পরও এই খাতে ঘুসের হার সর্বোচ্চ হওয়া প্রমাণ করে যে, প্রযুক্তির আধুনিকায়ন হলেও ভেতরের মানবিক ও প্রশাসনিক মানসিকতার কোনো পরিবর্তন ঘটেনি।"
## একনজরে টিআইবি’র জরিপে সেবা খাতের দুর্নীতির সুনির্দিষ্ট ও জাতীয় খতিয়ান
পাঠকদের সুবিধার্থে এবং ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি) কর্তৃক প্রকাশিত এই খানা জরিপের প্রধান প্রধান দুর্নীতিগ্রস্ত খাত ও ঘুসের সুনির্দিষ্ট পার্সেন্টেজ বা হার একনজরে সহজে অনুধাবন করার জন্য নিচে একটি বিশেষ আধুনিক তথ্য সারণী প্রদান করা হলো:
| সেবা খাতের নাম ও ভৌগোলিক ক্ষেত্রসমূহ | জাতীয় পর্যায়ে ঘুসের শিকার হওয়া খানার সুনির্দিষ্ট হার (%) |
| ১. পাসপোর্ট অফিস (শীর্ষ দুর্নীতিগ্রস্ত খাত) | জাতীয় পর্যায়ে সর্বোচ্চ ৭৬.৬% নাগরিক এই খাতের দুর্নীতির শিকার। |
| *** গ্রামাঞ্চলে পাসপোর্ট সেবায় ঘুস** | গ্রামের সহজ-সরল মানুষের ক্ষেত্রে এই হার সর্বোচ্চ ৭৯.১%। |
| *** শহরাঞ্চলে পাসপোর্ট সেবায় ঘুস** | তুলনামূলক সচেতন শহরে নাগরিকদের ক্ষেত্রে এই হার ৭১.৮%। |
| ২. বিআরটিএ (BRTA - দ্বিতীয় স্থান) | ড্রাইভিং লাইসেন্স ও ফিটনেস সেবায় ঘুসের হার ৬৩.৫%। |
| ৩. আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী সংস্থা | থানা ও আইনি সেবা নিতে গিয়ে ঘুসের শিকার হয়েছেন ৪৯.৩% খানা। |
| ৪. কৃষি সেবা খাত (যৌথ অবস্থান) | প্রান্তিক চাষী ও কৃষি উপকরণ সংগ্রহে ঘুসের হার ৪৯.৩%। |
| ৫. ভূমি সেবা দপ্তর (ভূমি অফিস) | জমির নামজারি, পর্চা ও দলিল সংক্রান্ত সেবায় ঘুসের হার ৪৭.৬%। |
| সার্বিকভাবে দেশের মোট ভুক্তভোগী | দেশের অন্তত একটি সেবা খাতে ঘুসের শিকার হয়েছেন ৬৩.৬% পরিবার। |
## দালালি সিন্ডিকেট ও প্রাতিষ্ঠানিক জবাবদিহিতা নিশ্চিতের জোরালো তাগিদ
সংবাদ সম্মেলনে টিআইবি’র নির্বাহী পরিচালক আরও উল্লেখ করেন, এই প্রাতিষ্ঠানিক দুর্নীতি দেশের সামগ্রিক টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা (SDG) অর্জনের পথে অন্যতম প্রধান অন্তরায় হিসেবে কাজ করছে। সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন-ভাতা বৃদ্ধির পরও সেবা খাতে ঘুসের এই জ্যামিতিক বৃদ্ধি প্রমাণ করে যে, অপরাধীদের কোনো প্রকার দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি বা ডিপার্টমেন্টাল একশন না হওয়ায় তারা প্রতিনিয়ত বেপরোয়া হয়ে উঠছে। টিআইবি সরকারের উচ্চ মহলের কাছে জোর দাবি জানিয়েছে, যেন অবিলম্বে পাসপোর্ট অফিস ও বিআরটিএ-এর সিসিটিভি ক্যামেরা ও অনলাইন ট্র্যাকিং সিস্টেম সচল করে প্রতিটি দালালি সিন্ডিকেটকে আইনের আওতায় আনা হয় এবং দুর্নীতিবাজ কর্মকর্তাদের চাকরি থেকে বরখাস্ত করা হয়।
দেশের শাসন ব্যবস্থার অসংগতি, সুশাসনের অভাব, টিআইবি’র দুর্নীতি বিরোধী মাঠ পর্যায়ের সর্বশেষ বৈজ্ঞানিক সমীক্ষা এবং জাতীয় ও আন্তর্জাতিক মহলের প্রতিটি নির্ভরযোগ্য ও প্রফেশনাল খবরাখবর সবার আগে শতভাগ ইউনিক উপায়ে আপনাদের সামনে নিয়মিত তুলে ধরতে ‘দিগন্ত বাংলা নিউজ’ পোর্টাল সর্বদা প্রতিশ্রুতিবদ্ধ।

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন
আপনার মূল্যবান মতামত আমাদের জানান। কোনো উসকানিমূলক বা অশালীন মন্তব্য করা থেকে বিরত থাকুন।