ইসলামের মানদণ্ডে আসল প্রাজ্ঞ কে? জেনে নিন নবীজির (সা.) খাঁটি বুদ্ধিমানের সংজ্ঞা

ইসলামের মানদণ্ডে আসল প্রাজ্ঞ কে? জেনে নিন নবীজির (সা.) খাঁটি বুদ্ধিমানের সংজ্ঞা
ছবি: সংগৃহীত

 ইসলামী ডেস্ক: শামীম হোসাইন / দিগন্ত বাংলা নিউজ

ঢাকা: নশ্বর ও ক্ষণস্থায়ী এই পৃথিবীর বুকে মানুষের সাধারণ জীবনযাত্রা পর্যালোচনা করলে দেখা যায় যে, অধিকাংশ মানুষই প্রতিনিয়ত জাগতিক জ্ঞান, অফুরন্ত ধন-সম্পদ, উচ্চ সামাজিক পদমর্যাদা, বিশাল অট্টালিকা এবং বাহ্যিক জাগতিক সাফল্যের পেছনে এক নিরন্তর ও ক্লান্তিহীন অন্ধ প্রতিযোগিতায় ছুটে চলেছে। বর্তমান আধুনিক সমাজব্যবস্থাও সাধারণত কোনো একজন বিপুল বিত্তবৈভবের মালিক, সমাজে রাজনৈতিকভাবে প্রভাবশালী ব্যক্তিত্ব কিংবা জাগতিক উচ্চ শিক্ষায় ভূষিত কোনো ডিগ্রিধারী ব্যক্তিকেই সবচেয়ে চতুর, সফল এবং শ্রেষ্ঠ বুদ্ধিমান মানুষ হিসেবে গণ্য করে থাকে। তবে চিরন্তন ও শাশ্বত জীবনব্যবস্থা পবিত্র ইসলাম মানুষের এই বুদ্ধিমত্তা ও সাফল্যের জাগতিক সংজ্ঞাকে সম্পূর্ণ নাকচ করে দিয়ে একটি অত্যন্ত গভীর, তাত্ত্বিক ও পারলৌকিক মানদণ্ড নির্ধারণ করে দিয়েছে। ইসলামের সুমহান আদর্শ অনুযায়ী, যে দূরদর্শী ব্যক্তি এই নশ্বর পৃথিবীর মোহে অন্ধ না হয়ে প্রতিটি মুহূর্তে মানবজীবনের একমাত্র অনিবার্য ও চরম বাস্তবতা তথা মৃত্যুকে নিজের অন্তরে স্মরণ রাখে, প্রাত্যহিক জীবনে নিজের সমস্ত ভালো-মন্দ আমল ও কর্মকাণ্ডের কঠোর আত্মবিশ্লেষণ বা হিসাব গ্রহণ করে এবং মৃত্যুর পরবর্তী অন্তহীন আখিরাতের অনন্ত জীবনের মহাসফলতার জন্য নিজেকে দিনরাত প্রস্তুত করতে থাকে— আখেরি নবী সাইয়্যিদুল মুরসালিন হজরত মুহাম্মদ (সা.) তাঁর পবিত্র জবানে একমাত্র সেই ব্যক্তির ভেতরেই প্রকৃত প্রজ্ঞা, চতুরতা এবং প্রকৃত বুদ্ধিমত্তার আসল স্বীকৃতি দিয়েছেন।

পবিত্র হাদিস শরিফের সুদীর্ঘ বর্ণনায় আমরা প্রকৃত বুদ্ধিমানের এক চমৎকার ও কালজয়ী পরিচয় খুঁজে পাই। ইসলামের দ্বিতীয় খলিফা হজরত ওমর ফারুক (রা.)-এর সুযোগ্য পুত্র বিশিষ্ট সাহাবি হজরত আবদুল্লাহ ইবনে ওমর (রা.) থেকে অত্যন্ত নির্ভরযোগ্য সূত্রে একটি হাদিস বর্ণিত হয়েছে। তিনি উল্লেখ করেন যে, একবার এক কৌতূহলী ব্যক্তি বিশ্বনবী ও মানবতার মুক্তিদূত রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর দরবারে সশরীরে উপস্থিত হয়ে অত্যন্ত বিনীতভাবে একটি প্রশ্ন জিজ্ঞাসা করলেন যে, ‘হে আল্লাহর রাসুল! দয়াময় আল্লাহর দরবারে ঈমানদার বা মুমিন বান্দাদের মধ্যে সর্বোত্তম ও সবচেয়ে মর্যাদাবান ব্যক্তি কে?’ তাঁর এই প্রশ্নের উত্তরে নবীজি (সা.) অত্যন্ত সংক্ষেপে এবং চমৎকারভাবে এর সমাধান দিয়ে বললেন, ‘সেই ব্যক্তিই মুমিনদের মধ্যে সবচেয়ে শ্রেষ্ঠ ও সর্বোত্তম, যার চারিত্রিক মাধুর্য ও নৈতিক চরিত্র দুনিয়াতে সবচেয়ে বেশি উত্তম ও পবিত্র।’

আরও পড়ুন: যাত্রাবাড়ীর র'ক্তভেজা সেই গলি: নিজ হাতে ১২টি লাশ ভ্যানে তোলা জয়নালের স্মৃতিতে আজও দগদগে চব্বিশের জুলাই

সেই একই ব্যক্তি নবীজি (সা.)-এর পবিত্র দরবারে পুনরায় দ্বিতীয় প্রশ্ন জিজ্ঞাসা করে বললেন যে, ‘হে আল্লাহর রাসুল! তাহলে দয়া করে বলুন যে মানবজাতির মধ্যে সবচেয়ে বড় জ্ঞানী ও বুদ্ধিমান ব্যক্তি কে?’ এই প্রশ্নের উত্তরে বিশ্বনবী (সা.) কোনো বাহ্যিক ধন-সম্পদ বা জাগতিক ডিগ্রির কথা উল্লেখ না করে একটি অত্যন্ত চমৎকার আরবি বাক্য উচ্চারণ করে বললেন, ‘যারা নিজেদের প্রাত্যহিক জীবনে মৃত্যুকে সবচেয়ে বেশি পরিমাণে স্মরণ করে এবং মৃত্যুর পরবর্তী সেই মহাসংকটময় ও চিরস্থায়ী জীবনের জন্য দুনিয়ার বুকে বসে সর্বোত্তম ও সবচেয়ে কল্যাণকর নেক আমলের প্রস্তুতি গ্রহণ করে, মূলত তারাই সমগ্র মানবজাতির মধ্যে সবচেয়ে প্রকৃত প্রাজ্ঞ, চতুর ও শ্রেষ্ঠ বুদ্ধিমান।’ বিশ্ববিখ্যাত হাদিস গ্রন্থ সুনানে ইবনে মাজাহ-এর ৪২৫৯ নম্বর হাদিসে এই অনন্য বর্ণনাটি অত্যন্ত বিশুদ্ধভাবে সংকলিত করা হয়েছে।

পবিত্র আল-কুরআনের বিভিন্ন সুরায় মহান আল্লাহ রাব্বুল আলামিনও মানবজাতিকে এই একই পরম সত্য ও বুদ্ধিমত্তার মহান শিক্ষা বারবার প্রদান করেছেন। মহান আল্লাহ তাআলা সুরা আল-আনকাবূতের ৫৭ নম্বর আয়াতে অত্যন্ত সুস্পষ্ট ও দ্ব্যর্থহীন কণ্ঠে ঘোষণা করেছেন যে, ‘বিশ্বজগতের প্রতিটি প্রাণসম্পন্ন সত্ত্বাকেই অবশ্যই একদিন না একদিন মৃত্যুর অবধারিত ও তিক্ত স্বাদ গ্রহণ করতে হবে। অতঃপর তোমাদের সবাইকে চূড়ান্ত হিসাব-নিকাশের জন্য একমাত্র আমার কাছেই পুনরায় ফিরিয়ে আনা হবে।’ আল্লাহর এই পবিত্র বাণী আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয় যে, এই পৃথিবীর কোনো বাহ্যিক ক্ষমতা বা সম্পদই মানুষকে মৃত্যুর হাত থেকে রক্ষা করতে পারবে না।

এর পাশাপাশি মহান আল্লাহ তাআলা সুরা আল-হাশরের ১৮ নম্বর আয়াতে ঈমানদার বান্দাদের উদ্দেশ্য করে এক গভীর সতর্কবার্তা প্রদানপূর্বক নির্দেশ দিয়েছেন যে, ‘হে পরম ঈমানদার সমাজ! তোমরা সর্বদা একমাত্র মহান আল্লাহকে অন্তরে ভয় করো এবং তোমাদের প্রত্যেকের নিজের আত্মার স্বার্থেই এটি খুব গভীরভাবে লক্ষ্য করে দেখা উচিত যে, সে তার আগামী দিনের চিরস্থায়ী জীবনের জন্য (আখিরাতের পাথেয় হিসেবে) দুনিয়া থেকে অগ্রিম কী ধরনের নেক আমল বা পুণ্য পাঠিয়েছে। তোমরা আবারও আল্লাহকে ভয় করো। নিশ্চয়ই তোমরা দিনরাতের চব্বিশ ঘণ্টায় যা কিছু ভালো বা মন্দ কর্ম সম্পাদন করো, অন্তর্যামী আল্লাহ সে সম্পর্কে সম্পূর্ণ ও নিখুঁতভাবে সর্বজ্ঞ।’

ইসলামী সমাজব্যবস্থা ও আধ্যাত্মিক দর্শনে মানুষের মনস্ত জগতে মৃত্যুর নিয়মিত স্মরণ কেন এত বেশি জরুরি, তার পেছনে রয়েছে এক গভীর অন্তর্নিহিত তাৎপর্য। মৃত্যুর নিয়মিত ও আন্তরিক স্মরণ মানুষের পাষাণ ও কঠোর অন্তরকে অত্যন্ত নরম ও কোমল করে তোলে, মানুষের মনের ভেতরের লুকায়িত সমস্ত অহংকার, অহমিকা ও আমিত্বকে ধূলিসাৎ করে দেয়, সব ধরনের বড় ও ছোট গুনাহের কাজ থেকে মানুষকে ফিরিয়ে রাখে এবং পরম প্রভুর সন্তুষ্টি অর্জনের জন্য যেকোনো প্রকার নেক আমলের প্রতি মানুষকে প্রবলভাবে আগ্রহী করে তোলে। যে বুদ্ধিমান মুমিন বান্দা মনেপ্রাণে এটি খুব ভালো করে বিশ্বাস ও অনুধাবন করে যে, তার জীবনের প্রতিটি ভালো ও মন্দ কাজের একটি সুনির্দিষ্ট হিসাব একদিন হাশরের ময়দানে মহান আল্লাহর সামনে দাঁড়িয়ে তাকে একাকী দিতে হবে, সেই ব্যক্তি স্বয়ংক্রিয়ভাবেই যেকোনো ধরনের অন্যায়, অবিচার, জুলুম, মিথ্যা ও পাপাচার থেকে নিজেকে কঠোরভাবে বিরত রাখে। এর পরিবর্তে সে নিজের জীবনকে নিয়মতান্ত্রিক ইবাদত, মানুষের সাথে পরম সততা, নিখাদ ন্যায়পরায়ণতা ও নিঃস্বার্থ মানবসেবার মতো মহৎ ও কল্যাণকর কাজে সম্পূর্ণভাবে যত্নবান ও নিবেদিত করে তোলে।

এই মানবজীবনের ক্ষণস্থায়ী রূপ এবং আখেরাতের পরম সত্যতা ব্যাখ্যা করতে গিয়ে মহানবী হজরত মুহাম্মদ (সা.) অন্য আরেকটি প্রসিদ্ধ হাদিসে উম্মতের প্রতি নসিহত করে বলেছেন যে, ‘তোমরা তোমাদের পার্থিব জীবনের সমস্ত বাহ্যিক সুখ-স্বাচ্ছন্দ্য ও আনন্দ-উল্লাসকে এক নিমেষে তছনছ ও বিনষ্ট করে দেওয়া অবধারিত বিষয় অর্থাৎ মৃত্যুর স্মরণ নিজের জীবনে অনেক বেশি ও অধিক পরিমাণে করো।’ এই গুরুত্বপূর্ণ হাদিসটি বিখ্যাত হাদিস গ্রন্থ জামে আত-তিরমিজির ২৩০৭ নম্বর এবং সুনানে আন-নাসাঈর ১৮২৪ নম্বর পাতায় অত্যন্ত গুরুত্বের সাথে লিপিবদ্ধ করা হয়েছে।

আরও পড়ুন: হোলি আর্টিজান ট্র্যাজেডির ১০ বছর: এক দশকের ক্ষত ও রক্তাক্ত স্মৃতির উপাখ্যান

প্রকৃতপক্ষে আমাদের এই চিরচেনা পৃথিবীর দৃশ্যমান জীবনটি অত্যন্ত ক্ষণস্থায়ী ও একটি সামান্য পরীক্ষাগার মাত্র, কিন্তু মৃত্যুর পরবর্তী আখিরাতের সেই জীবনটি হলো চিরস্থায়ী ও অনন্তকালের আবাসস্থল। তাই ইসলামের নিখুঁত দৃষ্টিতে প্রকৃত বুদ্ধিমান ও চতুর চাণক্য কেবল সেই ব্যক্তিই, যিনি সাময়িক ও ধোঁকাভরা দুনিয়ার মোহে পুরোপুরি বিভোর বা অন্ধ না হয়ে চিরস্থায়ী জীবনের শান্তিময় জান্নাত লাভের জন্য নিজেকে প্রতিনিয়ত প্রস্তুত করেন। ইসলামের সুমহান ও শাশ্বত দৃষ্টিতে প্রকৃত বুদ্ধিমত্তা কেবল জাগতিক কোনো বিজ্ঞান, ব্যবসা বা বৈষয়িক সাফল্যে সীমাবদ্ধ নয়; বরং সৃষ্টির মহান প্রভু আল্লাহর পরম সন্তুষ্টি ও ভালোবাসা অর্জনের জন্য নিজের ক্ষণস্থায়ী জীবনকে সুচারুভাবে পরিচালিত করাই হলো মানুষের আসল প্রজ্ঞা ও দূরদর্শিতা।

মৃত্যুর কথা সর্বদা অন্তরে স্মরণ করা মোটেও কোনো হতাশা, দুঃখ বা নিরাশার বিষয় নয়; বরং এটি মানুষকে প্রতিনিয়ত সৎপথে অবিচল ও সোজা রাখতে, সমাজ থেকে সব ধরনের অন্যায় ও গুনাহের কাজ দূর করতে এবং একটি আদর্শ আখিরাতমুখী ও সুন্দর মানবসমাজ গঠনে মানুষকে মানসিকভাবে ভীষণ উদ্বুদ্ধ করে। তাই আসুন, আমরা প্রত্যেকে দৈনিক ঘুমাতে যাওয়ার পূর্বে নিজের ভালো-মন্দ আমলের সুনির্দিষ্ট হিসাব নিজে গ্রহণ করি, পরম করুণাময় আল্লাহর কাছে অতীতের সমস্ত গুনাহের জন্য খাঁটি অন্তরে তওবা করি এবং সেই কঠিন হাশরের দিনের জন্য নিজেদের উপযুক্ত করে গড়ে তুলি, যেদিন দুনিয়ার কোনো বিপুল ধন-সম্পদ, সামাজিক প্রভাব কিংবা নিজের আদরের সন্তান-সন্ততি মানুষের কোনো প্রকার উপকারে আসবে না— কেবল নিজের খাঁটি ঈমান ও দুনিয়া থেকে কামাই করে নিয়ে যাওয়া সুন্দর নেক আমলই সেদিন মানুষের একমাত্র স্থায়ী মুক্তি ও উপকারে আসবে। মহান দয়াময় আল্লাহ তাআলা আমাদের সবাইকে নবীজির (সা.) পবিত্র হাদিসের আলোতে দুনিয়া ও আখেরাতের আসল খাঁটি ও প্রকৃত বুদ্ধিমান বান্দাদের অন্তর্ভুক্ত হওয়ার তাওফিক দান করুন। আমিন।

নিউজের সূত্র: সুনানে ইবনে মাজাহ (হাদিস নং ৪২৫৯), জামে আত-তিরমিজি (হাদিস নং ২৩০৭) এবং পবিত্র আল-কুরআনের সুরা আল-আনকাবূত ও সুরা আল-হাশরের তাফসির বিভাগ।

Post a Comment

আপনার মূল্যবান মতামত আমাদের জানান। কোনো উসকানিমূলক বা অশালীন মন্তব্য করা থেকে বিরত থাকুন।

নবীনতর পূর্বতন