হোলি আর্টিজান ট্র্যাজেডির ১০ বছর: এক দশকের ক্ষত ও রক্তাক্ত স্মৃতির উপাখ্যান

হোলি আর্টিজান ট্র্যাজেডির ১০ বছর: এক দশকের ক্ষত ও রক্তাক্ত স্মৃতির উপাখ্যান
ছবি: সংগৃহীত

রাজধানী ডেস্ক: শামীম হোসাইন / দিগন্ত বাংলা নিউজ

ঢাকা: বাংলাদেশের ইতিহাসে সবচেয়ে কালিমালিপ্ত, নৃশংস এবং ভয়াবহ পৈশাচিক অধ্যায় হিসেবে চিহ্নিত গুলশানের হোলি আর্টিজান বেকারি জঙ্গি হামলার আজ ১০ বছর বা এক দশক পূর্ণ হলো। ২০১৬ সালের পহেলা জুলাইয়ের সেই অভিশপ্ত ও রক্তভেজা দিনটি ছিল একটি শান্তিময় শুক্রবার। তবে পবিত্র রমজান মাসের শেষে রাতের অন্ধকার ঘনিয়ে আসতেই রাজধানীর গুলশান-২ এর কূটনৈতিক পাড়ার ৭৯ নম্বর সড়কের ৫ নম্বর বাড়িতে অবস্থিত শান্ত ও মনোরম লেকপাড়ের রেস্তোরাঁ ‘হোলি আর্টিজান বেকারি’ হঠাৎ করেই এক অবর্ণনীয় ও বিভীষিকাময় রক্তাক্ত উপাখ্যানে রূপ নেয়। আজ সুদীর্ঘ এক দশক বা ১০টি বছর অতিবাহিত হয়ে গেলেও সেই রক্তক্ষয়ী ও নারকীয় স্মৃতির ক্ষতচিহ্ন এবং স্বজনহারাদের বুকফাটা আর্তনাদ এদেশের মানুষের মনে এখনও সমানে দগদগে ও জীবন্ত হয়ে আছে। এই পৈশাচিক ট্র্যাজেডি মূলত বাংলাদেশের জাতীয় নিরাপত্তা কাঠামোকে কেবল আমূল কাঁপিয়ে দেয়নি, বরং গোটা বিশ্ববাসীকে এক চরম ও তীব্র ধাক্কা দিয়েছিল।

আরও পড়ুন: পাকিস্তানে জীর্ণ ভবনে কোচিং সেন্টারের ছাদ ধসে ১৪ শিশুর মর্মান্তিক মৃত্যু

তৎকালীন সময়ে ঘটনার দিন রাত ঠিক ৮টা ৪৫ মিনিটের দিকে ওই ক্যাফেতে রাতের খাবার খেতে যাওয়া দেশি-বিদেশি অতিথিদের ওপর অত্যাধুনিক মারণাস্ত্র ও গ্রেনেড নিয়ে আকস্মিক ও কাপুরুষোচিত সশস্ত্র হামলা চালায় একদল ধর্মান্ধ জঙ্গি। জঙ্গিদের এই হঠাৎ আকস্মিক আক্রমণ ও নারকীয় উল্লাস মুহূর্তের মধ্যে পুরো বাংলাদেশকে এক গভীর ও স্তব্ধ অন্ধকারের মধ্যে নিমজ্জিত করে দিয়েছিল। সেই ঐতিহাসিক ও বিভীষিকাময় কালরাতে ১৭ জন নিরপরাধ বিদেশি নাগরিকসহ মোট ২২ জন পরম সম্মানিত মানুষের অত্যন্ত নির্মম ও নৃশংস মৃত্যুর মধ্য দিয়ে দেশের ইতিহাসের সবচেয়ে কলঙ্কজনক ও বড় আকারের উগ্রপন্থী জঙ্গি হামলার অধ্যায়টি রচিত হয়েছিল। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর ভাষ্য এবং দীর্ঘ তদন্তের তথ্য অনুযায়ী, ইফতারের ঠিক পরপরই সাধারণ মানুষের ছদ্মবেশে সেখানে প্রবেশ করে নির্বিচারে এই বর্বর ও পৈশাচিক হত্যাযজ্ঞ চালিয়েছিল এদেশেরই বিভ্রান্ত পাঁচ তরুণ, যারা মূলত উগ্রপন্থী নিষিদ্ধ সংগঠন ‘নব্য জেএমবি’র সক্রিয় ও আত্মঘাতী যোদ্ধা ছিল।

পুরো এক রাত ধরে চলা আন্তর্জাতিক চরম উত্তেজনা, দরকষাকষি এবং বিশ্ব মিডিয়ার রুদ্ধশ্বাস অপেক্ষার অবসান ঘটেছিল পরদিন শনিবার ভোরে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর চৌকস সদস্যদের অত্যন্ত সাহসিকতাপূর্ণ ও নিখুঁত এক সামরিক কমান্ডো অভিযানের মধ্য দিয়ে। ‘অপারেশন থান্ডারবোল্ট’ নামের সেই সফল ও চূড়ান্ত কাউন্টার টেররিজম অভিযানে জিম্মিদশায় থাকা বেশ কয়েকজন দেশি-বিদেশিকে উদ্ধার করার পাশাপাশি ঘটনাস্থলেই আত্মঘাতী পাঁচ মূল হামলাকারী বন্দুকযুদ্ধে নিহত হয়। পরবর্তীতে সরকারের পক্ষ থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে জানানো হয়েছিল যে নিহত সেই পাঁচ জঙ্গির নাম ছিল যথাক্রমে নিবরাজ ইসলাম, শফিকুল ইসলাম ওরফে উজ্জ্বল, মীর সামেহ মোবাশ্বের, রোহান ইবনে ইমতিয়াজ এবং খায়রুল ইসলাম ওরফে পায়েল। এরা প্রত্যেকেই উচ্চবিত্ত ও মধ্যবিত্ত ঘরের সন্তান হওয়া সত্ত্বেও উগ্রবাদের বিষাক্ত মগজধোলাইয়ের শিকার হয়ে হামলার বেশ কিছুদিন পূর্বেই নিজেদের স্বাভাবিক ঘরবাড়ি ও পরিবার ছেড়ে নিরুদ্দেশ হয়ে গিয়েছিল।

ধর্মান্ধ ও বিপথগামী সেই খুনিদের হাতে সেদিন হোলি আর্টিজান বেকারির ভেতর অত্যন্ত নির্মমভাবে প্রাণ হারিয়েছিলেন নৈশভোজ করতে যাওয়া নয়জন জাপানি নাগরিক, সাতজন ইতালীয় নাগরিক, একজন উদীয়মান ভারতীয় শিক্ষার্থী, দুইজন বাংলাদেশি সম্ভ্রান্ত নাগরিক এবং একজন বাংলাদেশি-আমেরিকান দ্বৈত নাগরিক। এ ছাড়া হামলার একেবারে শুরুর দিকে রেস্তোরাঁর ভেতরে অবরুদ্ধ সাধারণ নাগরিকদের জীবন বাঁচাতে এবং জঙ্গিদের প্রতিরোধ করতে গিয়ে বীরত্বের সাথে নিজেদের বুকের তাজা রক্ত ঢেলে দিয়ে আত্মোৎসর্গ করেছিলেন দেশের দুই নির্ভীক ও উচ্চপদস্থ জ্যেষ্ঠ পুলিশ কর্মকর্তা। গুলশানের মতো একটি সুরক্ষিত কূটনৈতিক ও আন্তর্জাতিক পাড়ায় একসাথে এতজন বিদেশি ও কূটনৈতিক মিশন সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা নিহত হওয়ায় আন্তর্জাতিক শীর্ষ সংবাদমাধ্যমগুলোতে দীর্ঘ সময় ধরে অত্যন্ত বড় পরিসরে এবং গুরুত্বের সাথে সেই খবর ও লাইভ আপডেট প্রকাশিত হয়েছিল।

বিশ্বজুড়ে আলোড়ন তোলা এই লোমহর্ষক ও স্পর্শকাতর ঘটনায় গুলশান থানায় দায়ের করা মামলাটির বিচারিক প্রক্রিয়া দেশীয় আদালতে প্রায় সাড়ে তিন বছর ধরে অত্যন্ত নিবিড়ভাবে চলেছিল। সুদীর্ঘ আইনি লড়াই ও তদন্তের পর ঢাকার সন্ত্রাসবিরোধী বিশেষ ট্রাইব্যুনাল ২০১৯ সালের ২৭ নভেম্বর এক ঐতিহাসিক রায়ে এই বর্বরোচিত হামলার সাথে অস্ত্র, অর্থ ও বিস্ফোরক সরবরাহের অপরাধে সরাসরি জড়িত থাকা সাতজন শীর্ষ জঙ্গিকে সর্বোচ্চ শাস্তি মৃত্যুদণ্ড বা ফাঁসির আদেশ দিয়েছিলেন। তবে পরবর্তীতে ২০২৩ সালের ৩০ অক্টোবর বাংলাদেশের উচ্চ আদালত তথা হাইকোর্টের ডেথ রেফারেন্স ও আপিলের চূড়ান্ত রায়ে সেই আইনি সাজা কিছুটা পরিবর্তিত করা হয়। হাইকোর্টের সম্মানিত বেঞ্চ ওই সাতজন দণ্ডিত আসামির ফাঁসির সাজা পরিবর্তন করে আমৃত্যু কারাদণ্ডের চূড়ান্ত রায় প্রদান করেন।

আরও পড়ুন: আসিফ মাহমুদের সেই ফোনেই বদলে যায় সিদ্ধান্ত: অন্তর্বর্তী সরকার গঠনের নেপথ্য গল্প শোনালেন ড. ইউনূস

আদালতের সর্বশেষ আইনি আদেশে দণ্ডিত হওয়া সেই সাতজন দুর্ধর্ষ অপরাধী হলো জাহাঙ্গীর হোসেন ওরফে রাজীব গান্ধী, আসলাম হোসেন ওরফে র‌্যাশ, হাদিসুর রহমান, রাকিবুল হাসান রিগ্যান, আব্দুস সবুর খান, শরিফুল ইসলাম ওরফে খালেদ এবং মামুনুর রশিদ রিপন। তবে তদন্তে এটিও উঠে এসেছে যে, এই আন্তর্জাতিক ষড়যন্ত্র এবং রক্তক্ষয়ী হামলার পেছনে থাকা মূল পরিকল্পনাকারী বা মাস্টারমাইন্ডদের এক বৃহৎ অংশই হামলার পরবর্তী দিনগুলোতে দেশজুড়ে পরিচালিত আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর বিভিন্ন জঙ্গি আস্তানা বিরোধী বিশেষ কমান্ডো অভিযান ও কথিত বন্দুকযুদ্ধে ইতোমধ্যে নিহত হয়েছে। আজ ১০ বছর পূর্তির এই বেদনাদায়ক দিনে নিহত দেশি-বিদেশি সকল আত্মার প্রতি দেশবাসীর পক্ষ থেকে গভীর শ্রদ্ধা নিবেদন করা হচ্ছে।

নিউজের সূত্র: ঢাকা সন্ত্রাসবিরোধী বিশেষ ট্রাইব্যুনালের মামলার নথি এবং বাংলাদেশ পুলিশের কাউন্টার টেররিজম অ্যান্ড ট্রান্সন্যাশনাল ক্রাইম (সিটিটিসি) ইউনিটের আর্কাইভ।

 

Post a Comment

আপনার মূল্যবান মতামত আমাদের জানান। কোনো উসকানিমূলক বা অশালীন মন্তব্য করা থেকে বিরত থাকুন।

নবীনতর পূর্বতন