আন্তর্জাতিক ডেস্ক: শামীম হোসাইন / দিগন্ত বাংলা নিউজ
লাহোর: দক্ষিণ এশিয়ার অন্যতম জনবহুল রাষ্ট্র পাকিস্তানের পাঞ্জাব প্রদেশে একটি অত্যন্ত অনাকাঙ্ক্ষিত ও জীর্ণ ভবনে পরিচালিত বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ছাদ ধসে পড়ার কারণে অন্তত ১৪টি নিষ্পাপ শিশুর মর্মান্তিক ও বেদনাদায়ক মৃত্যুর খবর পাওয়া গেছে। এই আকস্মিক ও ভয়ংকর ভবন ধসের ঘটনায় ধ্বংসস্তূপের নিচে চাপা পড়ে আরও বেশ কয়েকজন সাধারণ শিক্ষার্থী গুরুতর জখম ও আহত হয়েছেন বলে জানা গেছে। গত মঙ্গলবার বিকেলের দিকে পাঞ্জাব প্রদেশের ঐতিহ্যবাহী রাজধানী শহর লাহোরের জনাকীর্ণ কাহনা নামক একটি বিশেষ আবাসিক এলাকায় এই মর্মান্তিক ও শিউরে ওঠার মতো দুর্ঘটনাটি ঘটে। উদ্ধারকারী দল ও স্থানীয় প্রশাসন সূত্রে জানা গেছে যে, ধ্বংসস্তূপের নিচ থেকে উদ্ধার হওয়া নিহত ও আহত শিশুদের বয়স মূলত ৫ বছর থেকে শুরু করে ১৬ বছরের মধ্যে। তবে অত্যন্ত পরিতাপের বিষয় হলো, অকালে ঝরে যাওয়া এই শিশুদের মধ্যে অধিকাংশেরই বয়স ছিল মাত্র ৯ বছরের নিচে, যার ফলে পুরো দেশ জুড়ে এক স্তব্ধ ও বুকফাটা পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে।
আরও পড়ুন: দুপুরে ভাত খাওয়ার নামে ঘুষ নিলেন ডিএনসির সিপাহি আল-আমিন! দম্ভোক্তি নিয়ে তোলপাড়
পাঞ্জাব প্রদেশের সরকারি জরুরি সেবা ও উদ্ধার বিভাগ এই দুর্ঘটনার সার্বিক বিষয়ে এক আনুষ্ঠানিক বিবৃতিতে জানায় যে, যেদিন বিকেলে এই আকস্মিক দুর্ঘটনাটি ঘটে, সেই সময় উক্ত বেসরকারি কোচিং সেন্টারের ভেতরে প্রতিদিনের রুটিন অনুযায়ী প্রায় ২২ জন ছোট ছোট শিশু শিক্ষার্থী এবং একজন নারী শিক্ষক উপস্থিত থেকে পাঠদান কার্যক্রমে লিপ্ত ছিলেন। ভবনের ছাদটি হঠাৎ বিকট শব্দে ভেঙে পড়ার সাথে সাথে পুরো ঘরটি মুহূর্তের মধ্যে ধূলিসাৎ হয়ে যায় এবং উপস্থিত সবাই কংক্রিটের ভারী ধ্বংসস্তূপের নিচে আটকা পড়েন। পরবর্তীতে খবর পেয়ে স্থানীয় বাসিন্দাদের সহায়তায় সরকারি বিশেষ উদ্ধারকারী দল দ্রুত ঘটনাস্থলে পৌঁছে ভারী যন্ত্রপাতি ব্যবহার করে হতাহত শিশুদের পাশাপাশি প্রায় ৩০ বছর বয়সী ওই নারী শিক্ষককে আশঙ্কাজনক অবস্থায় উদ্ধার করতে সক্ষম হন। উদ্ধারকাজে নিয়োজিত কর্মীরা পরবর্তীতে ওই নারী শিক্ষক এবং মারাত্মকভাবে আহত হওয়া আরও আটটি শিশুকে দ্রুত চিকিৎসার জন্য লাহোর জেনারেল হাসপাতালের জরুরি বিভাগে নিয়ে যান। হাসপাতালে চিকিৎসাধীন গুরুতর আহত শিশুদের মধ্যে অন্তত পাঁচজনের শারীরিক অবস্থা বর্তমানে অত্যন্ত আশঙ্কাজনক ও সংকটাপন্ন বলে পাকিস্তানভিত্তিক জরুরি উদ্ধারকারী সংস্থা ‘রেসকিউ ১১২২’ নিশ্চিত করেছে।
হৃদয়বিদারক এই ঘটনার পর পাঞ্জাব প্রদেশের বর্তমান সরকারের তথ্যমন্ত্রী আজমা বুখারি তাৎক্ষণিকভাবে এক সংবাদ সম্মেলনে প্রশাসনের পক্ষ থেকে দুঃখ প্রকাশ করেন। তিনি তাঁর প্রাথমিক তদন্তের তথ্যের ভিত্তিতে গণমাধ্যমকে জানান যে, দুর্ঘটনাকবলিত ওই অবৈধ কোচিং সেন্টারটির কোনো প্রকার সরকারি প্রাতিষ্ঠানিক অনুমোদন বা বৈধ কোনো লাইসেন্স ও নিবন্ধন ছিল না। এটি মূলত সম্পূর্ণ আইন লঙ্ঘন করে এবং প্রশাসনের চোখ ফাঁকি দিয়ে একটি ব্যক্তিমালিকানাধীন অতি প্রাচীন ও জীর্ণ আবাসিক ভবনের নিচে বাণিজ্যিক উদ্দেশ্যে পরিচালিত হচ্ছিল। তথ্যমন্ত্রী আজমা বুখারি অত্যন্ত কঠোর ভাষায় হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করে বলেন যে, সরকারি উচ্চপর্যায়ের বিস্তারিত তদন্তে যদি উক্ত ভবনের মালিক বা শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের দায়িত্বে থাকা ব্যক্তিদের কোনো প্রকার প্রাতিষ্ঠানিক অবহেলা, দায়িত্বহীন অসতর্কতা কিংবা প্রচলিত ইমারত নির্মাণ আইন লঙ্ঘনের ন্যূনতম প্রমাণ খুঁজে পাওয়া যায়, তবে দায়ীদের বিরুদ্ধে দেশের প্রচলিত আইনে সর্বোচ্চ কঠোর ও দৃষ্টান্তমূলক আইনি পদক্ষেপ গ্রহণ করা হবে।
এই ভয়াবহ ও বেদনাদায়ক দুর্ঘটনার পর সমগ্র পাঞ্জাব প্রদেশ জুড়ে তীব্র ক্ষোভ ও প্রশাসনিক টনক নড়ে উঠেছে। ভবিষ্যতে যেন এমন নজিরবিহীন ও মর্মান্তিক ঘটনার পুনরাবৃত্তি আর কোথাও না ঘটে, সেজন্য আসন্ন বর্ষা মৌসুম শুরু হওয়ার পূর্বেই প্রদেশের সকল অঞ্চলের ঝুঁকিপূর্ণ ও জীর্ণ ভবনগুলো জরুরি ভিত্তিতে চিহ্নিত করার নির্দেশ দিয়েছে পাঞ্জাব সরকার। একই সাথে একটি বিশেষ জরিপ পরিচালনা করার পাশাপাশি পুরো প্রদেশে ছড়িয়ে থাকা সমস্ত অনিবন্ধিত ও জেনোতেনো কোচিং সেন্টার এবং বেসরকারি অননুমোদিত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোর বিরুদ্ধে কঠোর আইনি নীতিমালা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করার জন্য এক বিশেষ প্রশাসনিক নির্দেশ জারি করা হয়েছে।
আরও পড়ুন: তৃণমূল পর্যায়ে বিস্তৃত হচ্ছে দুদকের জাল: এবার ইউনিয়ন স্তরেও ‘দুর্নীতি প্রতিরোধ কমিটি’
লাহোরের এই নিষ্ঠুর ও মর্মান্তিক শিশু মৃত্যুর ঘটনায় পাকিস্তানের রাজনৈতিক অঙ্গনসহ সর্বস্তরের মানুষের মাঝে গভীর শোকের কালো ছায়া নেমে এসেছে। এই অকাল ও বেদনাদায়ক ট্র্যাজেডিতে গভীর শোক ও সমবেদনা প্রকাশ করেছেন পাকিস্তানের মহামান্য প্রেসিডেন্ট আসিফ আলী জারদারি এবং দেশটির বর্তমান প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফ। অন্যদিকে পাঞ্জাব প্রদেশের বর্তমান মুখ্যমন্ত্রী মরিয়ম নওয়াজ শরিফ এই পুরো ঘটনাটিকে দেশের জন্য একটি অত্যন্ত ‘হৃদয়বিদারক ও বেদনাদায়ক ট্র্যাজেডি’ হিসেবে বর্ণনা করেছেন। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্স-এ (সাবেক টুইটার) দেওয়া এক আবেগঘন বার্তায় মুখ্যমন্ত্রী ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন যে, একসাথে ১৪টি নিষ্পাপ ও সম্ভাবনাময় প্রাণের এমন অকাল মৃত্যু পুরো দেশের জন্য এক অপূরণীয় রাষ্ট্রীয় ক্ষতি। তিনি শোকসন্তপ্ত ও সন্তানহারা পরিবারগুলোর প্রতি গভীর সমবেদনা জানানোর পাশাপাশি এই মারাত্মক দুর্ঘটনার পেছনে পর্দার আড়ালে থাকা প্রকৃত অপরাধী ও ভবন মালিকদের কোনোভাবেই ছাড় দেওয়া হবে না বলে কড়া হুঁশিয়ারি প্রদান করেছেন।
নিউজের সূত্র: পাকিস্তানের রাষ্ট্রীয় উদ্ধারকারী সংস্থা রেসকিউ ১১২২ (Rescue 1122) এবং পাঞ্জাব প্রাদেশিক তথ্য মন্ত্রণালয়ের অফিশিয়াল ডায়েরি।

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন
আপনার মূল্যবান মতামত আমাদের জানান। কোনো উসকানিমূলক বা অশালীন মন্তব্য করা থেকে বিরত থাকুন।