জাতীয় ডেস্ক: শামীম হোসাইন / দিগন্ত বাংলা নিউজ
ঢাকা: দেশের প্রশাসনিক ও সামাজিক ব্যবস্থার প্রতিটি স্তরে সুশাসন প্রতিষ্ঠা এবং তৃণমূল পর্যায়ে দুর্নীতিবিরোধী সচেতনতা ছড়িয়ে দিতে এক বড় ধরনের সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হয়েছে। এরই অংশ হিসেবে দেশের মহানগর, জেলা ও উপজেলা ছাড়িয়ে এবার গ্রামীণ বা ইউনিয়ন পর্যায়েও বিস্তৃত হতে যাচ্ছে ‘দুর্নীতি প্রতিরোধ কমিটি’ (দুপ্রক)। ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেটে দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) জন্য বরাদ্দকৃত নীতিমালার আওতায় এই নতুন ও যুগান্তকারী কর্মসূচি যুক্ত করা হয়েছে।
দুদক সংশ্লিষ্ট দায়িত্বশীল সূত্রগুলো নিশ্চিত করেছে যে, দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলের সাধারণ মানুষকে দুর্নীতিবিরোধী আন্দোলনে সম্পৃক্ত করতেই এই বিশেষ উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। নতুন অর্থবছর থেকেই দেশের প্রতিটি ইউনিয়নে এই কমিটি গঠনের আনুষ্ঠানিক প্রক্রিয়া শুরু হতে যাচ্ছে, যা দেশের প্রান্তিক জনগোষ্ঠীকে সরাসরি সুশাসনের অংশীদার করবে।
তৃণমূলের সচেতনতা ও দুদকের লক্ষ্য
দুদক ও বিভিন্ন দুর্নীতিবিরোধী সামাজিক সংগঠনের শীর্ষ নেতারা মনে করছেন, ইউনিয়ন পর্যায়ে এই কমিটি গঠিত হলে স্থানীয় পর্যায়ে জবাবদিহিতা অনেক বৃদ্ধি পাবে। একই সাথে সমাজের রন্ধ্রে রন্ধ্রে বাসা বেঁধে থাকা অনিয়মের বিরুদ্ধে সাধারণ মানুষের প্রতিরোধ ক্ষমতা শক্তিশালী হবে।
আরও পড়ুন: পুনরুদ্ধার, উত্তরণ ও পুনর্গঠন: অর্থনীতিকে ৩ ধাপে সাজানোর ঘোষণা প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের
এই নতুন উদ্যোগের মূল লক্ষ্য এবং ভবিষ্যৎ কার্যকারিতা সম্পর্কে নিচে বিস্তারিত পয়েন্ট আকারে তুলে ধরা হলো:
স্থানীয়দের অংশগ্রহণ: ইউনিয়ন স্তরের সাধারণ মানুষ সরাসরি এই কমিটির কার্যক্রমে অংশ নেওয়ার সুযোগ পাবেন, যা দুর্নীতি দমনে সামাজিক আন্দোলন গড়ে তুলতে সাহায্য করবে।
নৈতিকতার বিকাশ: গ্রামীণ তরুণ সমাজ ও সাধারণ নাগরিকদের মধ্যে সততা, নৈতিকতা এবং সুশাসনের সংস্কৃতি স্থায়ীভাবে প্রতিষ্ঠা করা সম্ভব হবে।
সচেতনতামূলক কার্যক্রম: জেলা ও উপজেলার মতো ইউনিয়ন পর্যায়েও নিয়মিত আলোচনা সভা, বিতর্ক প্রতিযোগিতা, মানববন্ধন এবং সেমিনারের আয়োজন করা যাবে।
কমিটির গঠনতন্ত্র ও সদস্য পদের কঠোর শর্তাবলি
দুদকের মূল গঠনতন্ত্র অনুযায়ী, ইউনিয়ন পর্যায়ের এই দুর্নীতি প্রতিরোধ কমিটি সম্পূর্ণ ভিন্ন আঙ্গিকে এবং কঠোর যাচাই-বাছাইয়ের মাধ্যমে গঠন করা হবে। কমিটির কাঠামো ও সদস্য হওয়ার অযোগ্যতার শর্তগুলো নিচে আলাদা আলাদা লাইনে উল্লেখ করা হলো:
সদস্য সংখ্যা: ইউনিয়ন পর্যায়ের প্রতিটি দুর্নীতি প্রতিরোধ কমিটি মোট সাত (৭) সদস্যবিশিষ্ট হবে।
নেতৃত্ব কাঠামো: এই কমিটিতে একজন সুনির্দিষ্ট সভাপতি থাকবেন এবং তার সাথে প্রয়োজনীয় সংখ্যক দায়িত্বশীল সদস্য যুক্ত থাকবেন।
নারী নেতৃত্ব: লিঙ্গ সমতা ও নারীদের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে কমিটিতে বাধ্যতামূলকভাবে অন্তত এক-তৃতীয়াংশ নারী সদস্য রাখার বিধান রাখা হয়েছে।
সদস্যদের যোগ্যতা: স্থানীয় সমাজের অত্যন্ত সৎ, সচেতন, মার্জিত ও স্বেচ্ছাসেবী কাজে আগ্রহী ব্যক্তিদের মধ্য থেকেই এই কমিটির সদস্য মনোনয়ন দেওয়া হবে।
জনপ্রতিনিধিদের নিষেধাজ্ঞা: কোনো নির্বাচিত জনপ্রতিনিধি (যেমন: ইউপি চেয়ারম্যান বা মেম্বার) এই কমিটির সদস্য হতে পারবেন না।
সরকারি চাকুরীজীবী: প্রজাতন্ত্রের কোনো বেতনভুক্ত কর্মকর্তা বা কর্মচারী এই কমিটির অন্তর্ভুক্ত হওয়ার যোগ্য বলে বিবেচিত হবেন না।
রাজনৈতিক সম্পৃক্ততা: কোনো রাজনৈতিক দলের সক্রিয় কোনো নেতা বা কর্মী এই দুর্নীতি প্রতিরোধ কমিটিতে স্থান পাবেন না।
আইনি ও আর্থিক অযোগ্যতা: কোনো বিদেশি নাগরিক, আদালতের মাধ্যমে অপ্রকৃতস্থ ঘোষিত ব্যক্তি, দেউলিয়া বা ব্যাংক ঋণখেলাপি ব্যক্তিরা এই কমিটির বাইরে থাকবেন।
অপরাধমূলক রেকর্ড: ফৌজদারি অপরাধে অভিযুক্ত, বিচারাধীন বা আদালত কর্তৃক দণ্ডিত কোনো ব্যক্তি কোনোভাবেই এই কমিটির সদস্য হতে পারবেন না।
দুদক সচিব ও টিআইবি প্রধানের গুরুত্বপূর্ণ অভিমত
দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) সচিব মোহাম্মদ খালেদ রহীম এই সম্প্রসারণ কর্মসূচির বিষয়ে তাঁর প্রশাসনিক অবস্থান স্পষ্ট করেছেন। তিনি জানান, সমাজে দুর্নীতি কমাতে হলে শুধু মাত্র আইনের কঠোর প্রয়োগ বা শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করাই যথেষ্ট নয়। এর জন্য প্রয়োজন ব্যাপক সামাজিক জাগরণ। গ্রামীণ পর্যায়ে প্রতিরোধ কার্যক্রম শক্তিশালী করার মাধ্যমে সাধারণ জনগণের মাঝে সচেতনতা তৈরি করাই দুদকের মূল লক্ষ্য।
আরও পড়ুন: সংসদে জামায়াতের রাজনীতি নিষিদ্ধের দাবি তুললেন বিএনপি এমপি রফিকুল ইসলাম
অন্যদিকে, ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি)-এর নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান এই উদ্যোগকে স্বাগত জানিয়ে কিছু গুরুত্বপূর্ণ পরামর্শ দিয়েছেন:
ইতিবাচক পদক্ষেপ: ইউনিয়ন পর্যায়ে দুর্নীতি প্রতিরোধ কমিটি গঠনের এই সিদ্ধান্তটি নিঃসন্দেহে একটি ইতিবাচক এবং সময়োপযোগী পদক্ষেপ।
অতীতের মূল্যায়ন: অতীতে জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে এ ধরনের কমিটির কার্যক্রম পরিচালনার যে অভিজ্ঞতা রয়েছে, তা সম্পূর্ণ নিরপেক্ষভাবে মূল্যায়ন করতে হবে।
দুর্বলতা থেকে শিক্ষা: অতীতের সাংগঠনিক দুর্বলতা বা ত্রুটিগুলো থেকে শিক্ষা নিয়ে যদি সম্পূর্ণ স্বচ্ছ ও নতুন কাঠামো তৈরি করা যায়, তবেই এই উদ্যোগ সফল হবে।
সরকারি সেবায় স্বচ্ছতা: ইউনিয়ন পর্যায়ে এই কমিটি কার্যকর হলে সরকারের বয়স্ক ভাতা, বিধবা ভাতা, সামাজিক নিরাপত্তা বেষ্টনী এবং বিনামূল্যে কৃষি উপকরণ বিতরণের মতো খাতগুলোতে চলমান অনিয়ম ও হয়রানি অনেকটাই কমে আসবে।
দুদকের বর্তমান সাংগঠনিক চিত্র
দুদকের অফিসিয়াল ওয়েবসাইটের সর্বশেষ পরিসংখ্যান অনুযায়ী, বর্তমানে দেশের জেলা ও মহানগর পর্যায়ে সর্বোচ্চ ১৩ সদস্য এবং উপজেলা স্তরে সর্বোচ্চ ৯ সদস্যের দুর্নীতি প্রতিরোধ কমিটি সচল রয়েছে। ২০১৫-২৬ সালের সর্বশেষ বার্ষিক রিপোর্ট অনুসারে, দেশে বর্তমানে পাঁচ শতাধিক দুর্নীতি প্রতিরোধ কমিটি সক্রিয়ভাবে মাঠ পর্যায়ে কাজ করছে।
বিগত এক বছরে এই কমিটিগুলোর প্রত্যক্ষ উদ্যোগে সারা দেশে ১ হাজার ৫০০টিরও বেশি সচেতনতামূলক আলোচনা সভা, ১ হাজারের বেশি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে বিতর্ক ও রচনা প্রতিযোগিতা এবং শত শত বর্ণাঢ্য র্যালি ও মানববন্ধন অনুষ্ঠিত হয়েছে। এবার এই বিশাল কার্যক্রম দেশের প্রতিটি ইউনিয়নে ছড়িয়ে পড়লে তা দেশের সামগ্রিক উন্নয়ন ও সুশাসনে এক নতুন মাত্রা যোগ করবে বলে আশাবাদ ব্যক্ত করেছেন বিশিষ্টজনেরা।
নিউজের সূত্র: দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) এর মিডিয়া উইং এবং বাংলাদেশ সংবাদ সংস্থা (বাসস)।

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন
আপনার মূল্যবান মতামত আমাদের জানান। কোনো উসকানিমূলক বা অশালীন মন্তব্য করা থেকে বিরত থাকুন।