সংসদে জামায়াতের রাজনীতি নিষিদ্ধের দাবি তুললেন বিএনপি এমপি রফিকুল ইসলাম

সংসদে জামায়াতের রাজনীতি নিষিদ্ধের দাবি তুললেন বিএনপি এমপি রফিকুল ইসলাম

জাতীয় ডেস্ক: শামীম হোসাইন / দিগন্ত বাংলা নিউজ

জাতীয় সংসদে চলমান বাজেট অধিবেশনে অংশ নিয়ে জামায়াতে ইসলামীর রাজনীতি নিষিদ্ধ ও ধর্মীয় উপাসনালয়ে রাজনৈতিক সভা বন্ধে কঠোর আইন প্রণয়নের দাবি জানিয়েছেন সংসদ সদস্যরা।

## জাতীয় সংসদে তোলপাড়: ১৯৭১ সালের ভূমিকা ও বিতর্কিত মন্তব্যের জের ধরে জামায়াতের রাজনীতি নিষিদ্ধের জোরালো দাবি তুললেন বিএনপি দলীয় সংসদ সদস্য রফিকুল ইসলাম জামাল

বাংলাদেশের দ্বাদশ বা ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের চলমান বাজেট অধিবেশন এক নজিরবিহীন ও উত্তপ্ত রাজনৈতিক বিতর্কের সাক্ষী হয়েছে। দেশের অন্যতম বৃহৎ রাজনৈতিক দল বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি)-এর একজন প্রভাবশালী সংসদ সদস্য খোদ জাতীয় সংসদের ফ্লোরে দাঁড়িয়ে জামায়াতে ইসলামীর রাজনীতি সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ করার এক বিস্ফোরক ও ঐতিহাসিক দাবি উত্থাপন করেছেন। বিগত দিনের রাজনৈতিক সমীকরণ ও কৌশলগত মিত্রতার বৃত্ত থেকে সম্পূর্ণ বেরিয়ে এসে বিএনপির এই সংসদ সদস্যের এমন কঠোর ও আপসহীন অবস্থান দেশের রাজনৈতিক পরিমণ্ডলে এক নতুন মেরুকরণ ও তুমুল আলোড়নের সৃষ্টি করেছে।

আজ সোমবার (২২ জুন ২০২৬) জাতীয় সংসদে চলমান ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেটের ওপর সাধারণ আলোচনা চলাকালীন সময়ে নিজের নির্ধারিত বক্তব্য দিতে গিয়ে ঝালকাঠী-১ আসনের বিএনপি দলীয় সংসদ সদস্য রফিকুল ইসলাম জামাল জামায়াতে ইসলামীর ঐতিহাসিক নেতিবাচক ভূমিকা এবং বর্তমান রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের তীব্র সমালোচনা করে এই নিষিদ্ধকরণের দাবি জানান। তিনি স্পষ্ট ভাষায় বলেন, দেশের সার্বভৌমত্ব ও স্বাধীনতার প্রশ্নে কোনো ধরণের আপস করার সুযোগ নেই এবং ফ্যাসিবাদী শক্তির মতোই জামায়াতকেও নিষিদ্ধের আওতায় আনা উচিত।

## "স্বাধীনতার বিরোধিতাকারীদের রাজনীতি করার অধিকার নেই": সংসদে বিএনপি এমপির কঠোর হুশিয়ারি

সংসদে বাজেট আলোচনায় অংশ নিয়ে ঝালকাঠী-১ আসনের সংসদ সদস্য রফিকুল ইসলাম জামাল তাঁর বক্তব্যের শুরুতেই মহান মুক্তিযুদ্ধ এবং ১৯৭১ সালে জামায়াতে ইসলামীর বিতর্কিত ও সশস্ত্র ভূমিকার প্রসঙ্গটি অত্যন্ত গুরুত্বের সাথে টেনে আনেন। তিনি তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করে সংসদের স্পিকারের উদ্দেশ্যে বলেন,

আরও পড়ুন: ইতিহাসে প্রথমবার প্রকাশ্যে খোলা হলো শাহজালালের মাজারের দানবাক্স ও ডেগ

"১৯৭১ সালে যে রাজনৈতিক দলটি এই স্বাধীন-সার্বভৌম বাংলাদেশের অভ্যুদয়ের ও স্বাধীনতার প্রকাশ্য বিরোধিতা করেছিল, আলবদর-রাজাকার বাহিনী গঠন করে এদেশের বীর সন্তানদের হত্যা করেছিল, সেই দলের কোনো সদস্যের এই স্বাধীন বাংলাদেশের মাটিতে মুক্তভাবে রাজনীতি করার কোনো নৈতিক বা সাংবিধানিক অধিকার থাকতে পারে না।"

তিনি তাঁর বক্তব্যে অন্তর্বর্তীকালীন বা বর্তমান সরকারের প্রতি এক জোরালো ও আনুষ্ঠানিক আহ্বান জানিয়ে বলেন, যেভাবে গণ-অভ্যুত্থানের মুখে বিতাড়িত ফ্যাসিস্ট শক্তিকে বাংলার মাটিতে নিষিদ্ধ করার দাবি উঠছে, ঠিক তেমনিভাবে একাত্তরের ঘাতক ও ফ্যাসিবাদের দোসর জামায়াতের রাজনীতিও অবিলম্বে এই দেশে চিরতরে নিষিদ্ধ ঘোষণা করতে হবে।

## ত্রয়োদশ নির্বাচন ও ধর্মের নামে বেহেশতের নিশ্চয়তা: জামায়াতের নির্বাচনী প্রচারণার তীব্র সমালোচনা

রফিকুল ইসলাম জামাল কেবল একাত্তরের ইতিহাসেই সীমাবদ্ধ থাকেননি; বরং সম্প্রতি অনুষ্ঠিত হয়ে যাওয়া দেশের ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে জামায়াতে ইসলামীর মাঠপর্যায়ের বিতর্কিত ও বিভ্রান্তিকর নির্বাচনী প্রচারণার কৌশল নিয়েও তীব্র সমালোচনা ও ক্ষোভ উগরে দেন। তিনি অভিযোগ করে বলেন, ভোটের স্বার্থে জামায়াত নেতারা পবিত্র ইসলাম ধর্মকে নিজেদের ব্যক্তিগত ও দলীয় স্বার্থে চরমভাবে ব্যবহার ও হাতিয়ার হিসেবে অপব্যবহার করেছেন।

আরও পড়ুন: সিন্ধু নদ জলচুক্তি স্থগিত: ভারতের বিরুদ্ধে যুদ্ধের হুঁশিয়ারি পাকিস্তানের

বিএনপির এই সংসদ সদস্য অত্যন্ত ক্ষোভের সাথে সংসদকে জানান:

  • নাম বনাম প্রকৃত ইসলাম: কোনো রাজনৈতিক দলের নামের সাথে কেবল ‘ইসলাম’ শব্দটি যুক্ত থাকলেই তা কখনো প্রকৃত ইসলামের প্রতিনিধিত্বকারী হয়ে ওঠে না। ইসলাম শান্তির ধর্ম, যা কোনো নির্দিষ্ট দলের একচেটিয়া সম্পত্তি নয়।

  • ঝালকাঠী-১ আসনের বিতর্ক: ঝালকাঠী-১ আসনে জামায়াতে ইসলামীর মনোনীত প্রার্থী ফয়জুল হকের সুনির্দিষ্ট উদাহরণ টেনে রফিকুল ইসলাম জামাল বলেন, নির্বাচনী জনসভাগুলোতে ওই জামায়াত প্রার্থী অত্যন্ত বিতর্কিত ও অগ্রহণযোগ্য মন্তব্য করেছেন।

  • ভোটের বদলে বেহেশতের টিকিট: জামায়াত প্রার্থীরা ভোটের বিনিময়ে সাধারণ ও সরলমনা মানুষকে পরকালে সরাসরি ‘বেহেশত’ বা জান্নাতের নিশ্চয়তা দেওয়ার মতো অত্যন্ত স্পর্ধিত ও ধর্মীয় দৃষ্টিতে অগ্রহণযোগ্য প্রচার চালিয়েছেন। এই ধরণের কর্মকাণ্ড পবিত্র ধর্মের নামে সস্তা ও নোংরা রাজনীতিকে প্রশ্রয় দেয়, যা কোনোভাবেই বরদাশত করা যায় না।

## মসজিদ-মাদ্রাসায় রাজনীতি বন্ধে আইন চান কুষ্টিয়া-১ আসনের এমপি রেজা আহমেদ

একই দিনে বাজেট অধিবেশনে অংশ নিয়ে জামায়াতে ইসলামীর রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের বিরুদ্ধে আরও একটি অত্যন্ত স্পর্শকাতর ও গুরুত্বপূর্ণ দাবি তুলে ধরেন কুষ্টিয়া-১ আসনের সংসদ সদস্য রেজা আহমেদ। তিনি দেশের প্রতিটি ধর্মীয় উপাসনালয়, বিশেষ করে পবিত্র মসজিদ ও মাদ্রাসাগুলোতে সব ধরণের রাজনৈতিক সভা-সমাবেশ ও দলীয় এজেন্ডা বাস্তবায়ন সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ করার জোরালো আহ্বান জানান।

সাংসদ রেজা আহমেদ স্পিকারের মাধ্যমে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর দৃষ্টি আকর্ষণ করে অত্যন্ত জোরালো ভাষায় বলেন:

"মসজিদ হলো মহান আল্লাহ তাআলার পবিত্র ঘর। সেখানে শুধুমাত্র ইবাদত-বন্দেগী, আল্লাহর জিকির, নামাজ এবং পবিত্র কোরআন শিক্ষার এক শান্ত ও আধ্যাত্মিক পরিবেশ বজায় থাকতে হবে। কোনো রাজনৈতিক দল, তা যে দলেরই হোক না কেন, আল্লাহর এই পবিত্র ঘরকে কোনোভাবেই তাদের দলীয় সভা-সমাবেশ, কর্মীসভা বা রাজনীতির নোংরা চর্চার কেন্দ্র হিসেবে ব্যবহার করতে পারবে না।"

তিনি অন্য দলগুলোর রাজনৈতিক মাঠের প্রসঙ্গ টেনে আরও যুক্ত করেন, বাংলাদেশের অন্য সব রাজনৈতিক দল যদি আইন মেনে রাজপথে, খোলা ময়দানে কিংবা কমিউনিটি সেন্টারে তাদের রাজনৈতিক কর্মসূচি ও কর্মীসভা করতে পারে, তবে একটি নির্দিষ্ট দল বা জামায়াত কেন ধর্মের দোহাই দিয়ে পবিত্র মসজিদের ভেতরে রাজনৈতিক মিটিং করবে? তিনি অবিলম্বে দেশের সমস্ত মসজিদ ও মাদ্রাসায় রাজনৈতিক দলীয় মিটিং স্থায়ীভাবে নিষিদ্ধ করার লক্ষ্যে একটি কঠোর ও সুনির্দিষ্ট আইন প্রণয়ন করার জন্য বর্তমান স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর প্রতি তীব্র অনুরোধ জানান। রেজা আহমেদের এই সময়োপযোগী ও যৌক্তিক বক্তব্যের প্রেক্ষিতে সংসদে উপস্থিত অন্যান্য দলের সংসদ সদস্যরা টেবিল চাপড়ে তাদের পূর্ণ সমর্থন ও সংহতি প্রকাশ করেন।

## একনজরে জাতীয় সংসদে জামায়াত নিষিদ্ধের দাবি ও উপাসনালয় সংক্রান্ত তথ্যাবলী

পাঠকদের সুবিধার্থে এবং সংসদের বাজেট অধিবেশনে জামায়াতে ইসলামীর বিরুদ্ধে উত্থাপিত এই চাঞ্চল্যকর ও ঐতিহাসিক দাবিসমূহের বিবরণ একনজরে সহজে অনুধাবন করার জন্য নিচে একটি বিশেষ আধুনিক তথ্য সারণী প্রদান করা হলো:

আরও পড়ুন: একটাও সামনে আইবি না, একদম মাই"রা ফেলামু’: গাজীপুরে তোলপাড়

সংসদ সদস্যের নাম ও আসনরাজনৈতিক দলসংসদে উত্থাপিত মূল দাবি ও বক্তব্য

রফিকুল ইসলাম জামাল


(ঝালকাঠী-১ আসন)

বিএনপি

* ১৯৭১ সালে স্বাধীনতার বিরোধিতার কারণে জামায়াতের রাজনীতি নিষিদ্ধের দাবি।


* ভোটের বিনিময়ে ‘বেহেশত’ দেওয়ার মতো বিতর্কিত প্রচারণার তীব্র নিন্দা।

রেজা আহমেদ


(কুষ্টিয়া-১ আসন)

সংসদ সদস্য

* পবিত্র মসজিদ ও মাদ্রাসার ভেতরে সব ধরণের রাজনৈতিক মিটিং নিষিদ্ধের দাবি।


* ধর্মীয় উপাসনালয়ে দলীয় লেজুড়বৃত্তি বন্ধে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর প্রতি আইন পাসের অনুরোধ।

## রাজনৈতিক অঙ্গনে নতুন ঝড়ের আভাস ও জামায়াত-বিএনপির ঐতিহাসিক দূরত্বের সমীকরণ

জাতীয় সংসদের ভেতরে বিএনপির একজন সংসদ সদস্যের মুখ থেকে জামায়াতকে নিষিদ্ধ করার এই আকস্মিক ও তীব্র দাবি আসার পর দেশের রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও সচেতন মহলে ব্যাপক তোলপাড় শুরু হয়েছে। দীর্ঘদিন ধরে বাংলাদেশে বিএনপি এবং জামায়াতে ইসলামী রাজনৈতিক জোট বা কৌশলগত সমঝোতার মাধ্যমে যুগপৎ আন্দোলন করে আসছিল। তবে চব্বিশের গণ-অভ্যুত্থান পরবর্তী সময়ে এবং বর্তমান ত্রয়োদশ সংসদের আবহে দুই দলের ভেতরের বৈরিতা ও আদর্শিক দূরত্ব ক্রমেই প্রকাশ্য রূপ লাভ করছে।

বিশ্লেষকদের মতে, বিএনপির এই অবস্থান প্রমাণ করে যে, তারা নিজেদের একটি সম্পূর্ণ আধুনিক ও প্রগতিশীল গণতান্ত্রিক দল হিসেবে বিশ্বমঞ্চে ও দেশের মানুষের কাছে উপস্থাপন করতে চায় এবং একাত্তরের কলঙ্কিত ইতিহাসের দায় কোনোভাবেই নিজেদের কাঁধে নিতে রাজী নয়। সংসদের এই বক্তব্যের পর জামায়াতে ইসলামীর পক্ষ থেকে এখন পর্যন্ত কোনো আনুষ্ঠানিক প্রতিক্রিয়া বা পাল্টা বিবৃতি দেওয়া হয়নি। তবে ধারণা করা হচ্ছে, এই ঘটনার রেশ ধরে আগামী দিনগুলোতে বাংলাদেশের সামগ্রিক রাজনীতিতে এক নতুন মেরুকরণ, তীব্র কাদা ছোড়াছুড়ি এবং বড় ধরণের রাজনৈতিক ঝড় শুরু হতে পারে।

জাতীয় সংসদের ভেতরের খবর, রাজনৈতিক দলগুলোর নীতি নির্ধারণী সিদ্ধান্ত এবং দেশের আইন-আদালতসহ প্রতিটি নির্ভরযোগ্য খবরাখবর সবার আগে প্রফেশনাল ও শতভাগ ইউনিক উপায়ে আপনাদের সামনে নিয়মিত তুলে ধরতে ‘দিগন্ত বাংলা নিউজ’ পোর্টাল সর্বদা প্রতিশ্রুতিবদ্ধ।

Post a Comment

আপনার মূল্যবান মতামত আমাদের জানান। কোনো উসকানিমূলক বা অশালীন মন্তব্য করা থেকে বিরত থাকুন।

নবীনতর পূর্বতন