ইতিহাসে প্রথমবার প্রকাশ্যে খোলা হলো শাহজালালের মাজারের দানবাক্স ও ডেগ

ইতিহাসে প্রথমবার প্রকাশ্যে খোলা হলো শাহজালালের মাজারের দানবাক্স ও ডেগ

জাতীয় ডেস্ক: শামীম হোসাইন / দিগন্ত বাংলা নিউজ

সিলেটের আধ্যাত্মিক রাজধানী খ্যাত হযরত শাহজালাল (রহ.)-এর মাজারে ইতিহাসের প্রথমবার সরকারি প্রশাসনের কড়া নজরদারিতে প্রকাশ্যে খোলা হয়েছে সবকটি দানবাক্স ও লোহার বিশালাকার ডেগ।

## মাজারের ইতিহাসে প্রথম নজিরবিহীন ঘটনা: সিলেটে প্রকাশ্যে খোলা হলো হযরত শাহজালাল (রহ.)-এর মাজারের দানবাক্স ও ডেগ, চলছে বস্তাভর্তি টাকার মহাগণনা

সিলেটের আধ্যাত্মিক ইতিহাসের এক নজিরবিহীন ও যুগান্তকারী অধ্যায়ের সূচনা হয়েছে। ভক্তদের শত বছরের আবেগ, বিশ্বাস ও ঐতিহ্যের কেন্দ্রবিন্দু হিসেবে পরিচিত সিলেটের হযরত শাহজালাল (রহ.)-এর পুণ্যময় মাজারে এই প্রথমবার সম্পূর্ণ সরকারি প্রশাসনের প্রত্যক্ষ তত্ত্বাবধানে এবং জনসাধারণের সামনে প্রকাশ্যে খোলা হয়েছে সবকটি সুরক্ষিত দানবাক্স ও সিলগালা করা বিশালাকার লোহার ডেগ। বিগত দিনে মাজারের অভ্যন্তরীণ আয়-ব্যয়ের হিসাব নিয়ে নানা অস্পষ্টতা থাকলেও, এবার মাজারের সামগ্রিক অর্থ ব্যবস্থাপনায় শতভাগ স্বচ্ছতা, জবাবদিহিতা এবং শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনার লক্ষ্যে এই ঐতিহাসিক ও ব্যতিক্রমী পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে সিলেট জেলা প্রশাসন।

আজ সোমবার (২২ জুন ২০২৬) দুপুর আড়াইটা থেকে মাজার প্রাঙ্গণে রাখা শক্ত করে সিল করা বড় বড় ডেকচি বা ডেগের ঢাকনা এবং লোহার সিন্দুকের তালা খুলে আনুষ্ঠানিকভাবে এই অর্থ বের করার মহাযজ্ঞ শুরু করা হয়। দীর্ঘদিন পর মাজারের সিন্দুক ও ডেগ খোলার এই ঐতিহাসিক মুহূর্তটি স্বচক্ষে অবলোকন করতে এবং এই ব্যতিক্রমী প্রশাসনিক উদ্যোগের সাক্ষী হতে মাজার প্রাঙ্গণে হাজার হাজার উৎসুক ভক্ত, দেশী-বিদেশী দর্শনার্থী এবং স্থানীয় জনসাধারণের উপচে পড়া ভিড় লক্ষ্য করা গেছে। পুরো মাজার এলাকা জুড়ে এখন বিরাজ করছে এক উৎসবমুখর ও ব্যাপক কৌতূহলী পরিবেশ।

## জেলা প্রশাসকের উপস্থিতিতে যোহরের নামাজ শেষে খোলা হলো সিন্দুক: বের হলো বস্তাভর্তি টাকা

মাজার প্রশাসন ও সিলেট জেলা প্রশাসনের নির্ভরযোগ্য দাপ্তরিক সূত্রে জানা গেছে, আজ সোমবার পবিত্র যোহরের নামাজের পরপরই এই বিশেষ কার্যক্রমের মূল আনুষ্ঠানিকতা শুরু হয়। দুপুরের তীব্র তাপদাহ উপেক্ষা করে সিলেটের সদ্য সাবেক জেলা প্রশাসক ও বিজ্ঞ জেলা ম্যাজিস্ট্রেট সারওয়ার আলম মাজারের কেন্দ্রীয় মসজিদে সাধারণ মুসল্লিদের সাথে অত্যন্ত ভক্তিপূর্ণ পরিবেশে যোহরের নামাজ আদায় করেন। নামাজ শেষে দুপুর ঠিক ২টার দিকে জেলা প্রশাসনের উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা, মাজারের মোতাওয়াল্লী কমিটি এবং আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের সাথে নিয়ে তিনি মাজারের মূল সিন্দুক ও সিলগালা করা ডেগগুলোর তালা খোলার চূড়ান্ত নির্দেশ দেন।

আরও পড়ুন: হাইকোর্টের দেওয়া জামিন স্থগিত: কারাগারেই থাকতে হচ্ছে সাবেক এমপি মমতাজকে

সিলেট জেলা প্রশাসনের নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট আবদুল বাছিত মোল্লা গণমাধ্যম ও সাংবাদিকদের এই চাঞ্চল্যকর বিষয়টির সত্যতা নিশ্চিত করে জানান:

"আজ সোমবার দুপুরে সিলেটের জেলা প্রশাসক ও জেলা ম্যাজিস্ট্রেট সারওয়ার আলম স্যারের সরাসরি উপস্থিতিতে এবং প্রশাসনের কড়া নজরদারিতে হযরত শাহজালাল (রহ.) মাজারের ভেতরের ৩টি বিশালাকার লোহার ডেগ এবং ছোট-বড় প্রধান দানবাক্সগুলোর তালা ভাঙা ও সিলগালা উন্মোচন করা হয়। তালা খোলার পর ভেতরের দৃশ্য দেখে উপস্থিত সবাই রীতিমতো অবাক হয়ে যান। দানবাক্স ও ডেকচিগুলোর ভেতর থেকে দেশী ও বিদেশী মুদ্রার স্তূপের পাশাপাশি বিপুল পরিমাণ স্বর্ণালঙ্কার ও ভক্তদের দেওয়া চিঠিপত্র বের করা হয়। পরবর্তীতে মাজারের কর্মচারীদের সহায়তায় সেই দানকৃত বিপুল পরিমাণ অর্থ বড় বড় পাটের বস্তায় ভর্তি করা হয়। একের পর এক বস্তাভর্তি টাকা যখন সিন্দুক থেকে বের করা হচ্ছিল, তখন মাজার প্রাঙ্গণে উপস্থিত উৎসুক জনতার মধ্যে এক অন্যরকম গুঞ্জন ও কৌতূহলের সৃষ্টি হয়।"

## নিরাপত্তার চাদরে ঢাকা মাজার: সিসিটিভি ক্যামেরা ও আনসার মোতায়েন

বস্তাভর্তি সেই বিপুল পরিমাণ অর্থ সিন্দুক থেকে বের করার পরপরই তা অত্যন্ত সুরক্ষার সাথে মাজারের নির্ধারিত একটি বড় কক্ষে নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানে নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটের সরাসরি উপস্থিতিতে এবং ব্যাংকের অভিজ্ঞ ক্যাশিয়ার ও মাজারের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের সমন্বয়ে টাকা গণনার মূল কার্যক্রম শুরু হয়। দুপুর আড়াইটা থেকে শুরু হওয়া এই টাকার মহাগণনা কার্যক্রম আজ বিকেল ৪টা পার হয়েও একটানা চলমান ছিল বলে জানা গেছে।

নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট আবদুল বাছিত মোল্লা আরও স্পষ্ট করে জানান, মাজারের এই বিপুল পরিমাণ দানের অর্থ যাতে কোনোভাবেই অপচয় বা তছরুপ না হতে পারে এবং গণনার কাজ যেন নিখুঁত হয়, সেজন্য পুরো গণনা কক্ষটিকে সিসিটিভি (CCTV) ক্যামেরার কঠোর নজরদারিতে আনা হয়েছে। একই সাথে মাজারের ভেতরের নিরাপত্তা ব্যবস্থা জোরদার করতে বিপুল সংখ্যক সশস্ত্র আনসার সদস্য ও পুলিশ সদস্য মোতায়েন করা হয়েছে। টাকা গণনার এই পুরো প্রক্রিয়াটি সম্পূর্ণ শেষ হওয়ার পর, প্রাপ্ত অর্থের মোট নিখুঁত অংক এবং বিদেশী মুদ্রা ও স্বর্ণালঙ্কারের সঠিক হিসাব আনুষ্ঠানিকভাবে সংবাদ সম্মেলনের মাধ্যমে সিলেটের তথা দেশবাসীর সামনে প্রকাশ করা হবে।

## আয়-ব্যয়ের স্বচ্ছতা নিশ্চিতে গত ১২ জুন থেকে শুরু হয়েছিল জেলা প্রশাসনের মহাপরিকল্পনা

সিলেটের ঐতিহ্যবাহী হযরত শাহজালাল (রহ.) মাজারের এই ঐতিহাসিক সংস্কার কিন্তু একদিনে হয়নি। এর পেছনে রয়েছে সিলেট জেলা প্রশাসনের এক নিখুঁত ও সুদূরপ্রসারী মহাপরিকল্পনা। মাজারের আয়ের টাকা নির্দিষ্ট খাতে সঠিক ব্যবহারের মাধ্যমে সাধারণ মানুষ ও দুস্থদের কল্যাণে ব্যয় করার লক্ষে এই উদ্যোগ নেওয়া হয়।

আরও পড়ুন: জাপানে বিমানে যাত্রীর স্মার্টফোনে আগুন, অল্পের জন্য রক্ষা পেলেন ২১১ জন

এই ঐতিহাসিক উদ্যোগের ধারাবাহিকতা নিচে তুলে ধরা হলো:

  • ১২ জুন ২০২৬ (শুক্রবার): সিলেটের জেলা প্রশাসক ও জেলা ম্যাজিস্ট্রেট মো. সারওয়ার আলম আকস্মিকভাবে হযরত শাহজালাল (রহ.) মাজার পরিদর্শনে যান। তিনি মাজারের সামগ্রিক আয়-ব্যয় ব্যবস্থাপনায় বড় ধরণের গলদ ও অস্বচ্ছতা লক্ষ্য করেন। তাৎক্ষণিকভাবে মাজারের পবিত্রতা রক্ষা এবং আয়ের স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করার লক্ষ্যে তিনি মাজারের প্রধান দানবাক্সগুলোতে সরকারি তালা ও সিলগালা লাগানোর নির্দেশ দেন।

  • ১৮ জুন ২০২৬ (বৃহস্পতিবার): জেলা প্রশাসনের এই নির্দেশনার পর, গত বৃহস্পতিবার বিকেল ৪টার দিকে সিলেট জেলা প্রশাসনের নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট আবদুল বাছিত মোল্লার নেতৃত্বে একটি বিশেষ টিম মাজারে অভিযান চালায়। তারা মাজারের ঐতিহ্যবাহী ও সর্ববৃহৎ ৩টি বড় লোহার ডেগ লোহার রড ও গালা দিয়ে শক্তভাবে সিলগালা করে দেন। একই সাথে জেলা প্রশাসনের নিজস্ব অর্থায়নে তৈরি একটি সুদৃশ্য বড় প্রধান দানবাক্সসহ ছোট-ছোট আরও কয়েকটি ডিজিটাল দানবাক্স মাজারের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ ও স্ট্র্যাটেজিক পয়েন্টে স্থাপন করা হয়।

## একনজরে শাহজালাল মাজারের দানবাক্স উন্মোচন ও টাকা গণনার সার্বিক খতিয়ান

পাঠকদের সুবিধার্থে এবং মাজারের ইতিহাসে প্রথমবার ঘটে যাওয়া এই অভাবনীয় ঘটনার বিবরণ একনজরে সহজে অনুধাবন করার জন্য নিচে একটি বিশেষ আধুনিক তথ্য সারণী প্রদান করা হলো:

মাজারের দানবাক্স ও প্রশাসনিক খাতের বিবরণসুনির্দিষ্ট তথ্য ও ঐতিহাসিক খতিয়ান
মাজারের নাম ও অবস্থানহযরত শাহজালাল (রহ.) মাজার, দরগাহ মহল্লা, সিলেট।
ইতিহাসের প্রথম প্রকাশ্য উন্মোচনসোমবার (২২ জুন ২০২৬), দুপুর ২টা থেকে আড়াইটার মধ্যে।
মূল নেতৃত্বদানকারী কর্মকর্তাসিলেটের জেলা প্রশাসক ও জেলা ম্যাজিস্ট্রেট মো. সারওয়ার আলম।
তদারকিতে থাকা নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটসিলেট জেলা প্রশাসনের নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট আবদুল বাছিত মোল্লা।
সিলগালা করা ডেগের মোট সংখ্যা৩টি বিশালাকার লোহার তৈরি ঐতিহাসিক ডেগ বা ডেকচি।
নিরাপত্তা ও প্রযুক্তির ব্যবহার২৪ ঘণ্টা সিসিটিভি ক্যামেরা পর্যবেক্ষণ ও সশস্ত্র আনসার গার্ড মোতায়েন।
মূল লক্ষ্য ও উদ্দেশ্যমাজারের কোটি কোটি টাকার আয়ে শতভাগ স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করা।

## সাধারণ মানুষ ও ভক্তদের সাধুবাদ: কিশোরগঞ্জের পাগলা মসজিদের আদলে সংস্কার

সিলেটের সচেতন নাগরিক সমাজ এবং দূর-দূরান্ত থেকে আসা সাধারণ ভক্তরা জেলা প্রশাসনের এই ঐতিহাসিক ও সাহসী পদক্ষেপকে সাধুবাদ জানিয়েছেন। তাদের মতে, কিশোরগঞ্জের ঐতিহাসিক পাগলা মসজিদের দানবাক্স যেভাবে নিয়মিত প্রশাসনের উপস্থিতিতে প্রকাশ্যে খোলা হয় এবং কোটি কোটি টাকার হিসাব দেশবাসীকে জানানো হয়, ঠিক একই পদ্ধতিতে সিলেটের শাহজালাল মাজারের দানবাক্সও খোলা উচিত। এতে করে মাজারের আয়ের কোটি কোটি টাকা কোনো নির্দিষ্ট সিন্ডিকেটের পকেটে না গিয়ে এতিমখানা, মাদ্রাসা, দরিদ্র মানুষের চিকিৎসা এবং সিলেটের অবহেলিত জনপদের উন্নয়নে সঠিকভাবে ব্যবহার করা সম্ভব হবে।

সিলেট জেলা প্রশাসন জানিয়েছে, এখন থেকে প্রতি তিন মাস বা নির্দিষ্ট সময় পরপর মাজারের এই দানবাক্সগুলো নিয়মিত প্রশাসনের উপস্থিতিতে প্রকাশ্যে খোলা হবে এবং প্রতিটি টাকার হিসাব সরকারি অডিটের মাধ্যমে রাখা হবে। সিলেটের ধর্মীয় ঐতিহ্য রক্ষা, মাজারের পবিত্রতা এবং দেশের প্রতিটি প্রান্তের এমন এক্সক্লুসিভ ও অনুসন্ধানী খবরাখবর সবার আগে প্রফেশনাল ও শতভাগ ইউনিক উপায়ে আপনাদের সামনে নিয়মিত তুলে ধরতে ‘দিগন্ত বাংলা নিউজ’ পোর্টাল সর্বদা প্রতিশ্রুতিবদ্ধ।

Post a Comment

আপনার মূল্যবান মতামত আমাদের জানান। কোনো উসকানিমূলক বা অশালীন মন্তব্য করা থেকে বিরত থাকুন।

নবীনতর পূর্বতন