জাতীয় ডেস্ক: শামীম হোসাইন / দিগন্ত বাংলা নিউজ
আওয়ামী লীগ সরকারের সাবেক সংসদ সদস্য ও দেশের শীর্ষস্থানীয় ফোক সম্রাজ্ঞী মমতাজ বেগমের জামিন স্থগিত করে আদেশ দিয়েছেন আপিল বিভাগের চেম্বার আদালত।
দুই মামলায় সাবেক সংসদ সদস্য ও কণ্ঠশিল্পী মমতাজের জামিন স্থগিত: চেম্বার আদালতের আদেশে আটকে গেল কারামুক্তির পথ
রাজধানীর একাধিক থানায় দায়েরকৃত রাজনৈতিক সহিংসতা, হত্যা ও হত্যাচেষ্টা মামলায় কারাবন্দি থাকা আওয়ামী লীগের সাবেক সংসদ সদস্য এবং দেশের জনপ্রিয় ফোক সঙ্গীতশিল্পী মমতাজ বেগমের আইনি লড়াইয়ে বড় ধরনের ধাক্কা লেগেছে। উচ্চ আদালত (হাইকোর্ট) থেকে সাময়িক স্বস্তি পেলেও সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগের চেম্বার আদালতের কড়া আদেশে তাঁর কারামুক্তির পথ আপাতত সম্পূর্ণ অবরুদ্ধ হয়ে পড়েছে। পৃথক দুটি ফৌজদারি মামলায় হাইকোর্টের দেওয়া অন্তর্বর্তীকালীন জামিনের আদেশ স্থগিত করে দিয়েছেন আপিল বিভাগের চেম্বার আদালত। এর ফলে কণ্ঠশিল্পী মমতাজ বেগমকে কারাগারেই বন্দি থাকতে হচ্ছে বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্ট আইনজীবীরা।
আজ সোমবার (২২ জুন ২০২৬) সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগের চেম্বার বিচারপতি মো. রেজাউল হক এই স্থগিতাদেশের তাৎপর্যপূর্ণ রায় প্রদান করেন। আদালতে রাষ্ট্রপক্ষ তথা জামিন স্থগিতের আবেদনের পক্ষে অত্যন্ত জোরালো আইনি যুক্তি উপস্থাপন করেন দেশের জ্যোষ্ঠ ও প্রথিতযশা আইনজীবী মোতাহার হোসেন সাজু। এই স্থগিতাদেশের ফলে আইনি প্রক্রিয়ার একটি দীর্ঘমেয়াদী বৃত্তে আটকা পড়লেন এই গায়িকা কাম রাজনীতিবিদ। দেশের আইন-আদালত ও রাজনৈতিক পরিমণ্ডলে এই আদেশ নিয়ে নতুন করে ব্যাপক আলোচনা শুরু হয়েছে।
## হাইকোর্টের অন্তর্বর্তীকালীন জামিন এবং আপিল বিভাগের চেম্বার জজের আইনি পদক্ষেপ
আইনি ও আদালত সূত্রে প্রাপ্ত তথ্যানুযায়ী, এর আগে গত ১৫ জুন ২০২৬ তারিখে দেশের উচ্চ আদালত (হাইকোর্ট) এক আদেশের মাধ্যমে ঢাকার আশুলিয়া থানায় দায়েরকৃত একটি সুনির্দিষ্ট হত্যা মামলা ও একটি নৃশংস হত্যাচেষ্টা মামলা এবং মিরপুর মডেল থানায় দায়ের করা অপর একটি চাঞ্চল্যকর হত্যা মামলায় সাবেক সংসদ সদস্য মমতাজ বেগমকে অন্তর্বর্তীকালীন জামিন মঞ্জুর করেছিলেন। উচ্চ আদালতের সেই জামিনের আদেশের পর মমতাজের আইনজীবীরা তাঁর দ্রুত কারামুক্তির জন্য আইনি প্রক্রিয়া শুরু করেছিলেন।
আরও পড়ুন: ভারতের আসামে বিমান বিধ্বস্ত: পাঁচ সেনার মর্মান্তিক মৃত্যু
তবে হাইকোর্টের সেই জামিনের আদেশকে চ্যালেঞ্জ করে এবং তা সম্পূর্ণ বাতিল ও স্থগিত চেয়ে রাষ্ট্রপক্ষ ও বাদীপক্ষের পক্ষ থেকে সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগের সংশ্লিষ্ট শাখায় পৃথক তিনটি আবেদন (লিভ টু আপিল) দায়ের করা হয়। সেই ধারাবাহিকতায় গত রবিবার (২১ জুন ২০২৬) আপিল বিভাগের চেম্বার আদালতে একটি মামলার ওপর দীর্ঘ শুনানি অনুষ্ঠিত হয়। ওই দিন শুনানি শেষে চেম্বার আদালত ‘নো অর্ডার’ (No Order) অর্থাৎ হাইকোর্টের আদেশে কোনো হস্তক্ষেপ না করার প্রাথমিক সিদ্ধান্ত দিয়েছিলেন। তবে আজ সোমবার (২২ জুন ২০২৬) বাকি দুটি অত্যন্ত স্পর্শকাতর ও গুরুতর মামলার ওপর পুনরায় গভীর আইনি শুনানি অনুষ্ঠিত হয়। জ্যেষ্ঠ আইনজীবী মোতাহার হোসেন সাজুর আইনগত যুক্তি ও অপরাধের গভীরতা বিবেচনা করে চেম্বার বিচারপতি মো. রেজাউল হক হাইকোর্টের দেওয়া জামিনের আদেশটি পরবর্তী নির্দেশ না দেওয়া পর্যন্ত সম্পূর্ণ স্থগিত ঘোষণা করেন।
## ২০২৪ সালের ছাত্র-জনতার গণ-অভ্যুত্থান এবং ২০২৫ সালের মে মাসের সেই নাটকীয় গ্রেফতার
উল্লেখ্য, ২০২৪ সালের জুলাই ও আগস্ট মাসে বাংলাদেশে সংঘটিত ঐতিহাসিক ছাত্র-জনতার অভূতপূর্ব গণ-অভ্যুত্থানের মুখে ৫ আগস্ট তৎকালীন স্বৈরাচারী শেখ হাসিনা সরকারের পতন ঘটে। শেখ হাসিনার দেশত্যাগের পর দেশের রাজনৈতিক দৃশ্যপট আমূল পরিবর্তিত হয় এবং বিদায়ী সরকারের মন্ত্রী, সংসদ সদস্য ও প্রভাবশালী নেতাদের বিরুদ্ধে ঢাকাসহ সারা দেশের বিভিন্ন থানায় অসংখ্য হত্যা ও মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলা দায়ের করা শুরু হয়। সেই ধারাবাহিকতায় মানিকগঞ্জ-২ আসনের সাবেক সংসদ সদস্য মমতাজ বেগমের বিরুদ্ধেও রাজধানীর একাধিক থানায় খুনের মামলা দায়ের করা হয়েছিল।
আরও পড়ুন: বাজেট নিয়ে বিরোধী দলের সমালোচনার জবাব দিলেন প্রধানমন্ত্রী
সরকার পতনের পর দীর্ঘ প্রায় ৯ মাস যাবত অত্যন্ত চতুরতার সাথে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর চোখ ফাঁকি দিয়ে বিভিন্ন গোপন আস্তানায় আত্মগোপনে ছিলেন মমতাজ বেগম। অবশেষে সুনির্দিষ্ট গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতে দীর্ঘ নজরদারির পর, গত ২০২৫ সালের ১২ মে গভীর রাতে রাজধানীর অভিজাত এলাকা ধানমন্ডির একটি নিরাপদ বাসা থেকে মমতাজ বেগমকে গ্রেপ্তার করতে সক্ষম হয় ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশ (ডিবি)। গ্রেপ্তারের পরদিন অর্থাৎ ১৩ মে ২০২৫ তারিখে তাঁকে কড়া পুলিশি পাহারায় ঢাকার চিফ মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট (সিএমএম) আদালতে হাজির করা হলে বিজ্ঞ বিচারক তাঁর জামিন আবেদন নামঞ্জুর করে সরাসরি কারাগারে পাঠানোর নির্দেশ দেন। এরপর থেকেই তিনি দেশের কেন্দ্রীয় কারাগারে বন্দি জীবন যাপন করছেন।
## আশুলিয়া ও মিরপুরের মামলার নেপথ্য কাহিনী: কেন ফেঁসে গেলেন ফোক সম্রাজ্ঞী
কণ্ঠশিল্পী মমতাজ বেগমের বিরুদ্ধে দায়েরকৃত মামলার বিবরণী পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, ২০২৪ সালের ৪ ও ৫ আগস্ট ঢাকার সাভারের আশুলিয়া এবং মিরপুর এলাকায় ছাত্র-জনতার আন্দোলনের ওপর তৎকালীন সরকারি দলের নেতাকর্মী ও পুলিশের যৌথ হামলায় বেশ কয়েকজন সাধারণ নাগরিক ও শিক্ষার্থী নিহত হন।
মামলার এজাহারে অভিযোগ করা হয়েছে যে, মমতাজ বেগম আওয়ামী লীগের একজন প্রথম সারির সংসদ সদস্য এবং প্রভাবশালী নেত্রী হিসেবে এই সমস্ত দমনপীড়ন ও হত্যাকাণ্ডের পেছনে অর্থায়ন, উসকানি এবং মাঠপর্যায়ের ক্যাডারদের অস্ত্র সরবরাহের মতো গুরুতর অপরাধে সরাসরি জড়িত ছিলেন। আশুলিয়া থানায় দায়ের হওয়া একটি হত্যা ও একটি হত্যাচেষ্টা মামলায় তাঁর বিরুদ্ধে অপরাধের প্রত্যক্ষ প্রমাণ পাওয়ার দাবি করেছে তদন্তকারী সংস্থা। অন্যদিকে, মিরপুর মডেল থানায় দায়ের হওয়া পৃথক একটি হত্যা মামলাতেও তাঁকে অন্যতম প্রধান হুকুমদাতা ও পরিকল্পনাকারী হিসেবে আসামি করা হয়েছে। এই মামলাগুলোর গুরুত্ব বিবেচনা করেই সুপ্রিম কোর্টের চেম্বার আদালত তাঁর জামিন স্থগিতের সিদ্ধান্ত নিয়েছেন।
আরও পড়ুন: ব্রাজিলপ্রেমে এক কাতারে অপু-বুবলী
## একনজরে সাবেক এমপি মমতাজ বেগমের মামলার বিবরণী ও বর্তমান আইনি স্থিতি
পাঠকদের সুবিধার্থে এবং সাবেক সংসদ সদস্য মমতাজ বেগমের বিরুদ্ধে চলমান আইনি প্রক্রিয়ার বর্তমান অবস্থা একনজরে সহজে অনুধাবন করার জন্য নিচে একটি বিশেষ তথ্য সারণী প্রদান করা হলো:
| আইনি ও অপরাধের খাতসমূহ | মামলার সুনির্দিষ্ট বিবরণী ও কালানুক্রমিক তথ্য |
| আসামির নাম ও পরিচিতি | মমতাজ বেগম (সাবেক সংসদ সদস্য, মানিকগঞ্জ-২ ও কণ্ঠশিল্পী)। |
| গ্রেপ্তারের সুনির্দিষ্ট তারিখ | ১২ মে ২০২৫ (রাজধানীর ধানমন্ডির একটি গোপন বাসা থেকে)। |
| গ্রেপ্তারকারী প্রধান সংস্থা | ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশ (ডিবি), ডিএমপি ঢাকা। |
| হাইকোর্টের জামিনের তারিখ | ১৫ জুন ২০২৬ (আশুলিয়ার ২টি ও মিরপুরের ১টি মামলায়)। |
| চেম্বার আদালতের আদেশের তারিখ | ২২ জুন ২০২৬ (সোমবার)। |
| আদালতের বর্তমান চূড়ান্ত আদেশ | দুই মামলায় হাইকোর্টের দেওয়া জামিন সম্পূর্ণ স্থগিত। |
| বর্তমান আইনি ফলাফল | জামিন স্থগিত হওয়ায় মমতাজ বেগমকে কারাগারেই বন্দি থাকতে হচ্ছে। |
## সঙ্গীত জগৎ থেকে রাজনীতির রাজপথ: মমতাজের উত্থান ও পতন
বাংলাদেশের লোকসঙ্গীত বা ফোক গানের জগতে মমতাজ বেগম এক অবিসংবাদিত নাম। কয়েক দশকে হাজার হাজার জনপ্রিয় গান গেয়ে তিনি কোটি মানুষের হৃদয়ে স্থান করে নিয়েছিলেন এবং লাভ করেছিলেন ‘ফোক সম্রাজ্ঞী’র উপাধি। তবে ২০০৮ সালের পর তিনি সরাসরি আওয়ামী লীগের রাজনীতির সাথে যুক্ত হন এবং প্রথমে সংরক্ষিত নারী আসনের সংসদ সদস্য মনোনীত হন। পরবর্তীতে তিনি মানিকগঞ্জ-২ (সিঙ্গাইর-হরিরামপুর) আসন থেকে সরাসরি নৌকা প্রতীকে নির্বাচন করে একাধিকবার সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, একজন জনপ্রিয় সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব হওয়া সত্ত্বেও ক্ষমতার দাপট, দলীয় লেজুড়বৃত্তি এবং স্বৈরাচারী সরকারের বিতর্কিত কর্মকাণ্ডের অন্ধ সমর্থন করার কারণেই আজ মমতাজ বেগমের এই পরিণতি হয়েছে। ক্ষমতার অপব্যবহার ও সাধারণ মানুষের ওপর দমনপীড়নের মামলায় আজ তিনি দেশের শীর্ষ আদালতের কাঠগড়ায় দাঁড়িয়েছেন।
আপিল বিভাগের চেম্বার আদালতের আজকের এই আদেশের ফলে মমতাজ বেগমের আইনজীবীদের এখন সুপ্রিম কোর্টের পূর্ণাঙ্গ আপিল বেঞ্চে শুনানির জন্য অপেক্ষা করতে হবে। সেখানে যদি তাঁর জামিনের আদেশ বহাল থাকে, তবেই কেবল তাঁর মুক্তির সম্ভাবনা তৈরি হতে পারে; অন্যথায় দীর্ঘ সময়ের জন্য তাঁকে কারাগারেই কাটাত হবে। দেশের রাজনৈতিক অঙ্গনের খবর, আইন-আদালতের সর্বশেষ আপডেট এবং সমাজের প্রতিটি চাঞ্চল্যকর ঘটনার বস্তুনিষ্ঠ ও অনুসন্ধানী প্রতিবেদন সবার আগে প্রফেশনাল ও শতভাগ ইউনিক উপায়ে আপনাদের সামনে নিয়মিত তুলে ধরতে ‘দিগন্ত বাংলা নিউজ’ পোর্টাল সর্বদা প্রতিশ্রুতিবদ্ধ।

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন
আপনার মূল্যবান মতামত আমাদের জানান। কোনো উসকানিমূলক বা অশালীন মন্তব্য করা থেকে বিরত থাকুন।