আন্তর্জাতিক ডেস্ক: শামীম হোসাইন / দিগন্ত বাংলা নিউজ
জাপানের টোকিও হানেদা বিমানবন্দরে উড্ডয়নের ঠিক আগমুহূর্তে ব্রিটিশ এয়ারওয়েজের একটি যাত্রীবাহী বিমানে স্মার্টফোন থেকে ভয়াবহ আগুনের সূত্রপাত হয়।
জাপানে উড্ডয়নের আগমুহূর্তে যাত্রীর স্মার্টফোনে ভয়াবহ আগুন: কেবিন জুড়ে আতঙ্ক, অল্পের জন্য অলৌকিকভাবে বাঁচলেন ২১১ জন আরোহী
বিশ্বজুড়ে বিমান চলাচলের ক্ষেত্রে যাত্রীদের ব্যক্তিগত ইলেকট্রনিক ডিভাইসে ব্যবহৃত ব্যাটারি প্রযুক্তি এখন এক নতুন ও চরম উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। দূরপাল্লার আন্তর্জাতিক আকাশযাত্রায় নিরাপত্তার শতভাগ কড়াকড়ি থাকা সত্ত্বেও এবার রানওয়েতে উড্ডয়নের ঠিক আগমুহূর্তে একটি যাত্রীবাহী বিমানের ভেতরে এক যাত্রীর ব্যবহৃত স্মার্টফোনে আকস্মিক ও ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটেছে। অত্যন্ত সংবেদনশীল এই ঘটনার কারণে বড় ধরনের একটি আকাশ বিপর্যয় ও নিশ্চিত প্রাণের ক্ষয়ক্ষতি থেকে অলৌকিকভাবে রক্ষা পেয়েছেন বিমানে থাকা শত শত সাধারণ যাত্রী। দূরদর্শী ক্রু মেম্বারদের তাৎক্ষণিক বুদ্ধিমত্তা ও দ্রুত পদক্ষেপের কারণে এক ভয়াবহ ট্র্যাজেডির হাত থেকে রক্ষা পেয়েছে আন্তর্জাতিক রুটের এই বিশালাকার বিমানটি।
আজ সোমবার (২২ জুন ২০২৬) ভারতের প্রভাবশালী আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম এনডিটিভি (NDTV)-এর একটি বিশেষ ও অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে এই লোমহর্ষক ঘটনার তথ্য বিশদভাবে প্রকাশ করা হয়েছে। প্রতিবেদন থেকে জানা গেছে, দূরপাল্লার আন্তর্জাতিক রুটের একটি ফ্লাইটে এই ঘটনা ঘটে, যার ফলে বিমানটির উড্ডয়ন সাময়িকভাবে বিলম্বিত করা হয় এবং পুরো বিমানবন্দর জুড়ে বিশেষ সতর্কতা জারি করা হয়।
## টোকিও হানেদা বিমানবন্দরের রানওয়েতে সেই আতঙ্কিত দুপুর ১টা
আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমের তথ্য অনুযায়ী, ঘটনাটি ঘটেছে জাপানের রাজধানী টোকিওতে অবস্থিত বিশ্বের অন্যতম ব্যস্ত এবং সর্বাধুনিক হানেদা বিমানবন্দরে (Haneda Airport)। গত ১৮ জুন ২০২৬ তারিখে টোকিও থেকে সরাসরি যুক্তরাজ্যের লন্ডনের উদ্দেশে যাত্রা করার কথা ছিল ব্রিটিশ এয়ারওয়েজের (British Airways) একটি যাত্রীবাহী বিশেষ ফ্লাইটের। জাপানের পরিবহন মন্ত্রণালয় এবং টোকিও ফায়ার ডিপার্টমেন্টের (টোকিও দমকল বাহিনী) দাপ্তরিক বিবৃতির বরাত দিয়ে সংবাদমাধ্যম জানিয়েছে, স্থানীয় সময় দুপুর ১টার কিছু পরেই বিমানটি রানওয়েতে সম্পূর্ণ গতি নিয়ে উড্ডয়নের চূড়ান্ত প্রস্তুতি নিচ্ছিল।
আরও পড়ুন: আর্জেন্টিনায় উন্মোচন হলো বিশ্বের সবচেয়ে উঁচু ২৬ মিটারের ‘মেসি মূর্তি’
ঠিক ওই অন্তিম মুহূর্তে বিমানের ভেতরের মূল কেবিনের পেছনের অংশে হঠাৎ করেই কুণ্ডলী পাকানো ঘন কালো ধোঁয়া দেখা যায়। কেবিন জুড়ে তীব্র ধোঁয়া ছড়িয়ে পড়ার সাথে সাথেই বিমানে থাকা সাধারণ যাত্রীদের মধ্যে চরম আতঙ্ক ও হুড়োহুড়ি শুরু হয়ে যায়। পরিস্থিতি বেগতিক দেখে বিমানের ভেতরে ডিউটিতে থাকা ক্রু মেম্বাররা তাৎক্ষণিকভাবে ককপিটে থাকা পাইলট এবং বিমানবন্দরের এয়ার ট্রাফিক কন্ট্রোল (ATC) টাওয়ারকে বিপদ সংকেত পাঠিয়ে সতর্ক করেন। একই সাথে ক্রুরা অত্যন্ত সাহসিকতার সাথে বিমানের ভেতরে থাকা বিশেষ ইমার্জেন্সি অগ্নিকাণ্ড নির্বাপক যন্ত্র (Fire Extinguisher) ব্যবহার করে ধোঁয়ার উৎস লক্ষ্য করে রাসায়নিক স্প্রে করা শুরু করেন এবং আগুন ছড়িয়ে পড়ার আগেই পরিস্থিতি সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণে নিয়ে আসেন।
## হ্যান্ডব্যাগের ভেতর থেকে ধোঁয়া: ঘটনার নেপথ্যে লিথিয়াম-আয়ন ব্যাটারির বিস্ফোরণ
পরবর্তীতে বিমানবন্দরের নিরাপত্তা বাহিনী এবং বিশেষ তদন্তকারী দলের প্রাথমিক তদন্তে এই রহস্যজনক আগুনের প্রকৃত কারণ উদঘাটিত হয়। তদন্তে দেখা যায়, বিমানের ভেতরের কোনো যান্ত্রিক ত্রুটি বা শর্ট সার্কিট থেকে এই ধোঁয়ার সৃষ্টি হয়নি; বরং কেবিনের ভেতরে বসা এক সাধারণ যাত্রীর ব্যক্তিগত হাতব্যাগে (Handbag) রাখা একটি আধুনিক স্মার্টফোনে হঠাৎ করে অভ্যন্তরীণ রাসায়নিক বিস্ফোরণ ঘটে এবং সেখানে আগুন ধরে যায়। স্মার্টফোনের ভেতরে থাকা অত্যন্ত শক্তিশালী লিথিয়াম-আয়ন (Lithium-ion) ব্যাটারিটি অতিরিক্ত গরম বা টেকনিক্যাল ত্রুটির কারণে বিস্ফোরিত হয়ে এই অগ্নিকাণ্ডের সূত্রপাত করেছিল।
আগুনের সূত্রপাত নিশ্চিত হওয়ার পর বড় ধরণের নিরাপত্তার কথা চিন্তা করে এয়ার ট্রাফিক কন্ট্রোল (এটিসি) বিমানটির রানওয়ে যাত্রা বাতিল করে এবং সেটিকে অত্যন্ত সাবধানে পুনরায় বোর্ডিং বা পার্কিং বে-তে ফিরিয়ে আনে। বিমানটি নিরাপদ স্থানে পার্ক করার পরপরই আগে থেকে প্রস্তুত থাকা দমকলকর্মী, অ্যাম্বুলেন্স এবং জরুরি উদ্ধারকারী দলের সদস্যরা দ্রুত বিমানের ভেতরে প্রবেশ করেন। তারা পুরো বিমানে তল্লাশি চালিয়ে নিরাপত্তা ব্যবস্থা শতভাগ পর্যবেক্ষণ করেন এবং নিশ্চিত করেন যে আর কোনো বিস্ফোরক বা আগুনের উপাদান কেবিনে অবশিষ্ট নেই।
## অলৌকিক রক্ষা পেলেন ২১১ জন আরোহী ও ব্রিটিশ এয়ারওয়েজের অফিসিয়াল বিবৃতি
জাপানের বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষ এক বিবৃতিতে জানিয়েছে, দুর্ঘটনার সময় ওই আন্তর্জাতিক ফ্লাইটে মোট ২১১ জন যাত্রী ও ক্রু মেম্বার অবস্থান করছিলেন। বিমানের ক্রুদের দ্রুত অগ্নিনির্বাপক ব্যবস্থা গ্রহণের ফলে বিমানে থাকা ২১১ জন আরোহীর প্রত্যেকেই সম্পূর্ণ অক্ষত ও নিরাপদ রয়েছেন। কোনো যাত্রীর শরীরে আগুনের আঁচ লাগেনি। সমস্ত ধরণের বিশেষ নিরাপত্তা ও কারিগরি পরীক্ষা সম্পন্ন করার পর, বিমানটি নির্ধারিত সময়ের চেয়ে প্রায় এক ঘণ্টা বিলম্ব করে পুনরায় লন্ডনের উদ্দেশে সফলভাবে যাত্রা শুরু করে।
আরও পড়ুন: টাঙ্গাইলে পরিত্যক্ত কূপে ছাগলছানা বাঁচাতে গিয়ে বিষাক্ত গ্যাসে ৪ জনের মৃত্যু
এই অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা প্রসঙ্গে ব্রিটিশ এয়ারওয়েজ কর্তৃপক্ষ তাদের অফিসিয়াল বিবৃতিতে স্পষ্ট করে জানিয়েছে:
"আমাদের যেকোনো ফ্লাইটের সম্মানিত যাত্রী এবং ক্রু মেম্বারদের সর্বোচ্চ নিরাপত্তা নিশ্চিত করাই আমাদের ব্যবসায়ের মূল ও প্রধান অগ্রাধিকার। টোকিওর হানেদা বিমানবন্দরে উদ্ভূত পরিস্থিতিতে আমাদের ক্রু মেম্বাররা অত্যন্ত পেশাদারিত্বের পরিচয় দিয়েছেন। ফ্লাইটটি পরবর্তীতে সম্পূর্ণ নিরাপদে পরিচালিত হয়েছে এবং যাত্রীরা লন্ডনে পৌঁছানোর পর অত্যন্ত স্বাভাবিক ও নিয়মমাফিক উপায়ে বিমান থেকে নিরাপদে নেমে গেছেন।"
## এক সপ্তাহের ব্যবধানে দ্বিতীয় ঘটনা: মাঝআকাশে জরুরি অবতরণের সেই ইতিহাস
বিমান চলাচল বিশেষজ্ঞদের কপালে চিন্তার ভাঁজ বাড়িয়ে দিয়েছে আরও একটি তথ্য। কারণ, গত মাত্র এক সপ্তাহের ব্যবধানে ব্রিটিশ এয়ারওয়েজের আন্তর্জাতিক ফ্লাইটে এটি ছিল দ্বিতীয় একই ধরণের গুরুতর ঘটনা। এই ঘটনার মাত্র কয়েক দিন আগেই লন্ডন থেকে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের লাস ভেগাসগামী ব্রিটিশ এয়ারওয়েজের আরেকটি ফ্লাইটে মাঝআকাশে থাকা অবস্থায় এক যাত্রীর মোবাইল ফোনে একইভাবে হঠাৎ আগুন ধরে যায়।
মাঝআকাশের সেই ঘটনায় আগুনের তীব্রতা এতটাই বেশি ছিল যে, বিমানের ভেতরের কেবিনের ভেতরের দেয়াল ও প্যানেলের একাংশ পুড়ে কালো হয়ে গিয়েছিল। তখন মাঝআকাশে চরম জরুরি অবস্থা (Emergency) ঘোষণা করে নিকটবর্তী একটি বিমানবন্দরে বিমানটিকে জরুরি অবতরণ করতে বাধ্য হয়েছিলেন পাইলট। সেই ঘটনার রেশ কাটতে না কাটতেই এবার জাপানের মাটিতে উড্ডয়নের আগমুহূর্তে পুনরায় স্মার্টফোনে আগুনের ঘটনা ঘটল।
আরও পড়ুন: কলাপাড়ায় পুলিশের বিশেষ অভিযান: ইয়াবাসহ ৪ মাদক কারবারি গ্রেফতার
## একনজরে জাপানে বিমানে স্মার্টফোনে আগুন ও সার্বিক নিরাপত্তা খতিয়ান
পাঠকদের সুবিধার্থে এবং আন্তর্জাতিক বিমান চলাচলে তৈরি হওয়া এই নতুন সংকটের বিবরণ একনজরে সহজে অনুধাবন করার জন্য নিচে একটি বিশেষ আধুনিক তথ্য সারণী প্রদান করা হলো:
| এয়ারলাইন্স ও দুর্ঘটনার প্রধান খাতসমূহ | সুনির্দিষ্ট বিবরণ ও দাপ্তরিক তথ্যাবলী |
| আক্রান্ত এয়ারলাইন্সের নাম | ব্রিটিশ এয়ারওয়েজ (British Airways)। |
| দুর্ঘটনার সুনির্দিষ্ট স্থান | হানেদা বিমানবন্দর, টোকিও, জাপান। |
| ফ্লাইটের মূল রুট বা গন্তব্য | টোকিও (জাপান) থেকে সরাসরি লন্ডন (যুক্তরাজ্য)। |
| মোট আরোহীর সংখ্যা (যাত্রী ও ক্রু) | ২১১ জন আরোহী (সবাই অলৌকিকভাবে অক্ষত ও নিরাপদ)। |
| আগুনের মূল উৎস ও কারণ | যাত্রীর হাতব্যাগে থাকা স্মার্টফোনের লিথিয়াম-আয়ন ব্যাটারির বিস্ফোরণ। |
| যাত্রার মোট বিলম্বের সময়কাল | নিরাপত্তা পরীক্ষা ও দমকলের তল্লাশির কারণে প্রায় ১ ঘণ্টা বিলম্ব। |
## বিশ্বজুড়ে উড়োজাহাজে লিথিয়াম-আয়ন ব্যাটারির ক্রমবর্ধমান আতঙ্ক ও উদ্বেগ
সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বিশ্বজুড়ে বাণিজ্যিক উড়োজাহাজগুলোতে যাত্রীদের বহন করা ল্যাপটপ, পাওয়ার ব্যাংক এবং স্মার্টফোনে ব্যবহৃত লিথিয়াম-আয়ন ব্যাটারিজনিত কারণে আকস্মিক আগুনের ঘটনা আশঙ্কাজনক হারে বৃদ্ধি পেয়েছে। এভিয়েশন বিশেষজ্ঞদের মতে, উচ্চ চাপে এবং বিমানের কেবিনের নির্দিষ্ট বায়ুচাপের কারণে অনেক সময় নিম্নমানের বা ত্রুটিযুক্ত ব্যাটারিগুলো অতিরিক্ত উত্তপ্ত হয়ে ‘থার্মাল রানঅ্যাওয়ে’ (Thermal Runaway) প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে যায়, যা থেকে মুহূর্তের মধ্যে স্বয়ংক্রিয়ভাবে আগুন ধরে বা বিস্ফোরণ ঘটে।
এই ধরণের বারবার ঘটে যাওয়া ঘটনা আন্তর্জাতিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষের (IATA) জন্য নতুন করে চরম উদ্বেগের সৃষ্টি করেছে। ভবিষ্যতে বিমানে এই ধরণের ব্যক্তিগত ডিভাইস বহনের ক্ষেত্রে আরও কঠোর আন্তর্জাতিক নিয়ম বা গ্যাজেট পরীক্ষার আইন পাস হতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে। বৈশ্বিক এভিয়েশন খাতের খবর, আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা ব্যবস্থা এবং বিশ্বের প্রতিটি প্রান্তের এমন নির্ভরযোগ্য ও অনুসন্ধানী খবরাখবর সবার আগে প্রফেশনাল ও শতভাগ ইউনিক উপায়ে আপনাদের সামনে নিয়মিত তুলে ধরতে ‘দিগন্ত বাংলা নিউজ’ পোর্টাল সর্বদা প্রতিশ্রুতিবদ্ধ।

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন
আপনার মূল্যবান মতামত আমাদের জানান। কোনো উসকানিমূলক বা অশালীন মন্তব্য করা থেকে বিরত থাকুন।