কলাপাড়ায় পুলিশের বিশেষ অভিযান: ইয়াবাসহ ৪ মাদক কারবারি গ্রেফতার

কলাপাড়ায় পুলিশের বিশেষ অভিযান: ইয়াবাসহ ৪ মাদক কারবারি গ্রেফতার
ছবি: সংগৃহীত

সারাদেশ ডেস্ক: শামীম হোসাইন / দিগন্ত বাংলা নিউজ

পটুয়াখালীর কলাপাড়ায় থানা পুলিশের ঝটিকা অভিযানে ইয়াবাসহ চার যুবক গ্রেফতার

পটুয়াখালী জেলার উপকূলীয় উপজেলা কলাপাড়ায় মাদকের মরণনেশা প্রতিরোধে এবং জননিরাপত্তা নিশ্চিতকরণে এক বিশেষ অভিযান পরিচালনা করেছে স্থানীয় থানা পুলিশ। এই সফল ও ঝটিকা অভিযানের মাধ্যমে বিপুল পরিমাণ নিষিদ্ধ ইয়াবা বড়িসহ চারজন সক্রিয় মাদক কারবারি ও যুবককে হাতেনাতে গ্রেফতার করতে সক্ষম হয়েছে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। গত বৃহস্পতিবার (১৮ জুন ২০২৬) রাত আনুমানিক সাড়ে ১০টার দিকে উপজেলার ধানখালী ইউনিয়নের পশ্চিম ধানখালী গ্রামের একটি কৌশলগত পয়েন্টে অত্যন্ত গোপনীয়তার সাথে এই বিশেষ অভিযানটি চালানো হয়। উপকূলীয় এই অঞ্চলের তরুণ সমাজকে মাদকের করাল গ্রাস থেকে রক্ষা করতে পুলিশের চলমান মাদকবিরোধী জিরো টলারেন্স নীতির অংশ হিসেবে এই পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে বলে জানা গেছে।

## গ্রেফতারকৃত চার যুবকের সুনির্দিষ্ট পরিচয় ও আঞ্চলিক পটভূমি

কলাপাড়া থানা পুলিশের বিশেষ আভিযানিক দলের হাতে আটক হওয়া চার যুবকের বিরুদ্ধে দীর্ঘদিন ধরে এলাকায় গোপনে মাদক কেনাবেচা এবং যুবসমাজকে ধ্বংসের মুখে ঠেলে দেওয়ার সুনির্দিষ্ট অভিযোগ আসছিল। গ্রেফতারকৃত আসামিরা কলাপাড়া উপজেলার বিভিন্ন ইউনিয়নের বাসিন্দা এবং তারা একটি সুসংগঠিত মাদক চক্রের সক্রিয় সদস্য বলে প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে স্বীকার করেছে।

গ্রেফতারকৃতদের নাম, বয়স এবং সামাজিক পরিচয় নিচে বিস্তারিতভাবে তুলে ধরা হলো:

১. মো. মুসফিকুর রহমান শান্ত (১৯): সে মূলত এই চক্রের সর্বকনিষ্ঠ সদস্য হলেও মাঠপর্যায়ে মাদক সরবরাহে অত্যন্ত চতুর।

২. মো. শাকিল খান (৩৯): বয়সের দিক থেকে এই দলের সবচেয়ে অভিজ্ঞ এবং মাদক চক্রের অন্যতম প্রধান সমন্বয়ক।

৩. মো. বাইজিদ গাজী (২৮): সে এলাকায় মাদক পরিবহনের অন্যতম প্রধান দায়িত্ব পালন করত বলে পুলিশের কাছে তথ্য রয়েছে।

৪. মো. জাকারিয়া (৩০): সে কলাপাড়ার বিভিন্ন প্রত্যন্ত অঞ্চলে মাদক সিন্ডিকেটের খুচরা বিক্রেতা হিসেবে কাজ করত।

পুলিশের তদন্ত দল জানিয়েছে, গ্রেফতার হওয়া এই চার যুবকের স্থায়ী নিবাস কলাপাড়া উপজেলার পার্শ্ববর্তী চম্পাপুর ইউনিয়ন এবং বালিয়াতলী ইউনিয়ন এলাকায়। তারা নিজেদের এলাকা ছেড়ে ধানখালী ইউনিয়নে এসে এই মাদকের চালানটি খালাস বা হস্তান্তরের চেষ্টা করছিল।

আরও পড়ুন: কক্সবাজারে র‍্যাবের বড় সাফল্য: যাবজ্জীবন সাজাপ্রাপ্ত পলাতক মাদক ব্যবসায়ী গ্রেফতার

## ধানখালীতে পুলিশের বিশেষ ফাঁদ: যেভাবে ধরা পড়ল মাদক চক্রটি

স্থানীয় বাসিন্দা এবং কলাপাড়া থানা পুলিশের বিশেষ গোয়েন্দা সূত্র থেকে প্রাপ্ত তথ্যানুযায়ী, বৃহস্পতিবার রাতে কলাপাড়া থানার একটি চৌকস আভিযানিক দল নিয়মিত টহল ডিউটি করার সময় একটি বিশেষ গোপন সংবাদ লাভ করে। গোপন সূত্রে জানা যায়, ধানখালী ইউনিয়নের পশ্চিম ধানখালী গ্রামে একদল যুবক বিপুল পরিমাণ ইয়াবাসহ কোনো বড় মাদক চালানের লেনদেন করার উদ্দেশ্যে জড়ো হয়েছে।

এই গোপন ও সংবেদনশীল তথ্য পাওয়ার সাথে সাথেই কলাপাড়া থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তার নির্দেশনায় পুলিশের একটি বিশেষ টিম দ্রুত ঘটনাস্থলের উদ্দেশ্যে রওনা হয়। মাদক কারবারিরা যাতে পুলিশের উপস্থিতি টের পেয়ে পালিয়ে যেতে না পারে, সেজন্য পুলিশ সদস্যরা সাধারণ পোশাকে ছদ্মবেশ ধারণ করে পুরো পশ্চিম ধানখালী গ্রামের সন্দেহভাজন এলাকাটি চারদিক থেকে অবরুদ্ধ করে ফেলে।

অভিযানের চূড়ান্ত মুহূর্ত ও পুনরুদ্ধার: রাত সাড়ে ১০টার দিকে পুলিশ সদস্যরা সুনির্দিষ্ট স্থানে হানা দিয়ে ওই চার যুবককে ঘেরাও করে। পুলিশের আকস্মিক উপস্থিতি দেখে আসামিরা পালানোর চেষ্টা করলেও আভিযানিক দলের ক্ষিপ্রতার কারণে তারা চারজনই ঘটনাস্থলে অবরুদ্ধ হয়ে পড়ে। পরবর্তীতে স্থানীয় সাক্ষীদের উপস্থিতিতে যুবকদের শরীর এবং সাথে থাকা ব্যাগ তল্লাশি করে বিপুল পরিমাণ অবৈধ ইয়াবা বড়ি উদ্ধার করা হয়। তাৎক্ষণিকভাবে মাদক পরিবহনে ব্যবহৃত অন্যান্য সরঞ্জামাদিও জব্দ করে পুলিশ।

## ধৃত আসামিদের সংক্ষিপ্ত প্রোফাইল ও তথ্য সারণী

পাঠকদের সুবিধার্থে এবং পুরো অভিযানের মূল তথ্যগুলো একনজরে সহজে বোঝার জন্য নিচে একটি বিশেষ তথ্য সারণী উপস্থাপন করা হলো:

বিষয় বা পর্যায়অভিযানের সুনির্দিষ্ট তথ্যাবলী
অভিযান পরিচালনাকারী সংস্থাকলাপাড়া থানা পুলিশ, পটুয়াখালী জেলা।
অভিযানের সুনির্দিষ্ট সময়বৃহস্পতিবার রাত আনুমানিক ১০:৩০ মিনিট।
অভিযানের সুনির্দিষ্ট স্থানপশ্চিম ধানখালী গ্রাম, ধানখালী ইউনিয়ন, কলাপাড়া।
উদ্ধারকৃত আলামতঅবৈধ ও নিষিদ্ধ মাদকদ্রব্য ইয়াবা বড়ি।
আসামিদের আদি নিবাসচম্পাপুর ইউনিয়ন এবং বালিয়াতলী ইউনিয়ন, কলাপাড়া।
আইনি পদক্ষেপের বর্তমান অবস্থাদেশের প্রচলিত মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ আইনে মামলা দায়েরের প্রক্রিয়া চলমান।

## কলাপাড়া থানার ওসির আনুষ্ঠানিক বক্তব্য ও আইনি প্রক্রিয়া

পশ্চিম ধানখালী গ্রামে পরিচালিত এই সফল মাদকবিরোধী অভিযানের বিষয়ে কলাপাড়া থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. নজরুল ইসলাম গণমাধ্যমকে একটি আনুষ্ঠানিক বিবৃতি দিয়েছেন। তিনি অভিযানের সত্যতা নিশ্চিত করে জানান যে, কলাপাড়া উপজেলাকে সম্পূর্ণ মাদকমুক্ত করার লক্ষ্যে তাদের এই বিশেষ অভিযান নিয়মিত কার্যক্রমের একটি অংশ।

আরও পড়ুন: রাষ্ট্রদ্রোহ মামলা: শেখ হাসিনাসহ ২৮৬ জনের শুনানি ১৪ জুলাই

ওসি মো. নজরুল ইসলামের মূল বক্তব্য:

"আমরা বেশ কিছুদিন ধরেই কলাপাড়ার বিভিন্ন সীমান্ত ও উপকূলীয় পয়েন্টগুলোতে মাদকের আনাগোনার বিষয়ে গোয়েন্দা নজরদারি বৃদ্ধি করেছিলাম। তারই ধারাবাহিকতায় গোপন সংবাদের ভিত্তিতে ধানখালী ইউনিয়নে অভিযান চালিয়ে হাতেনাতে ইয়াবাসহ এই চার যুবককে গ্রেফতার করা হয়েছে। ধৃত আসামিরা চম্পাপুর ও বালিয়াতলী এলাকার বাসিন্দা হলেও তারা ধানখালীকে মাদক ট্রানজিট হিসেবে ব্যবহার করার অপচেষ্টা চালাচ্ছিল। আটককৃত আসামিদের বিরুদ্ধে দেশের প্রচলিত কঠোর মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ আইনের সংশ্লিষ্ট ধারায় মামলা দায়ের করার আইনি প্রক্রিয়া বর্তমানে জোরালোভাবে চলমান রয়েছে। সমস্ত আইনি নথিপত্র প্রস্তুত করে অত্যন্ত দ্রুততার সাথে তাদের বিজ্ঞ আদালতে সোপর্দ করা হবে।"

ওসি আরও হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করে বলেন, কলাপাড়া থানার সীমানার মধ্যে কোনো ধরনের মাদক ব্যবসায়ী, গডফাদার বা চোর-কারবারিদের বিন্দুমাত্র ছাড় দেওয়া হবে না। মাদকের এই মরণছোবল থেকে নতুন প্রজন্মকে বাঁচাতে পুলিশের এই চিরুনি অভিযান আগামী দিনগুলোতেও আরও কঠোরভাবে অব্যাহত থাকবে।

## উপকূলীয় অঞ্চলে মাদকের মরণছোবল ও সামাজিক প্রতিরোধ

ভৌগোলিক অবস্থানের কারণে পটুয়াখালীর কলাপাড়া এবং এর আশেপাশের উপকূলীয় অঞ্চলগুলো নদী ও সমুদ্রবেষ্টিত হওয়ায় মাদক চোরাকারবারিরা অনেক সময় নৌপথকে নিরাপদ রুট হিসেবে ব্যবহার করার অপচেষ্টা চালায়। বিশেষ করে তরুণ ও কিশোরদের টার্গেট করে ইয়াবার মতো মারাত্মক মাদক ছড়িয়ে দেওয়া হচ্ছে, যা অত্যন্ত উদ্বেগজনক। ১৯ বছর বয়সী শান্ত কিংবা ৩০-৩৯ বছর বয়সী যুবকদের এই অপরাধে জড়িয়ে পড়া প্রমাণ করে যে সমাজের একটি বড় অংশ এই অন্ধকারের দিকে ধাবিত হচ্ছে।

স্থানীয় সুশীল সমাজ এবং সমাজকর্মীদের মতে, কেবল পুলিশি অভিযান বা আইনি শাস্তির মাধ্যমে মাদক পুরোপুরি নির্মূল করা সম্ভব নয়। এর জন্য প্রয়োজন পারিবারিক সচেতনতা এবং সামাজিক প্রতিরোধ। পাড়া-মহল্লায় যুবকদের সুস্থ বিনোদন ও খেলাধুলার সুযোগ বৃদ্ধি করার পাশাপাশি অভিভাবকদেরও তাদের সন্তানদের বন্ধু ও চলাফেরার ওপর কড়া নজর রাখতে হবে। কলাপাড়া থানা পুলিশের এই সময়োপযোগী অভিযানকে স্থানীয় সর্বস্তরের জনগণ সাধুবাদ জানিয়েছেন। ‘দিগন্ত বাংলা নিউজ’ পোর্টালের পক্ষ থেকে আমরা মাদকমুক্ত সমাজ গঠনে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর প্রতিটি ইতিবাচক পদক্ষেপ এবং দেশের প্রতিটি প্রান্তের এমন বস্তুনিষ্ঠ খবর আপনাদের সামনে প্রফেশনাল উপায়ে তুলে ধরতে সর্বদা প্রতিশ্রুতিবদ্ধ।

 

Post a Comment

আপনার মূল্যবান মতামত আমাদের জানান। কোনো উসকানিমূলক বা অশালীন মন্তব্য করা থেকে বিরত থাকুন।

নবীনতর পূর্বতন