রাষ্ট্রদ্রোহ মামলা: শেখ হাসিনাসহ ২৮৬ জনের শুনানি ১৪ জুলাই

রাষ্ট্রদ্রোহ মামলা: শেখ হাসিনাসহ ২৮৬ জনের শুনানি ১৪ জুলাই
ছবি: সংগৃহীত

জাতীয় ডেস্ক: শামীম হোসাইন / দিগন্ত বাংলা নিউজ

রাষ্ট্রদ্রোহ মামলা: শেখ হাসিনাসহ ২৮৬ জনের বিরুদ্ধে চার্জগঠনের শুনানি ১৪ জুলাই

নিজস্ব প্রতিবেদক, ঢাকা | দিগন্ত বাংলা নিউজ

অনলাইন প্ল্যাটফর্মে গোপন বৈঠক করে রাষ্ট্রবিরোধী ষড়যন্ত্র, সহিংসতা উসকে দেওয়া এবং তত্কালীন অন্তর্বর্তী সরকারকে অবৈধভাবে উত্খাতের উদ্দেশ্যে গৃহযুদ্ধের ঘোষণার অভিযোগে দায়ের করা রাষ্ট্রদ্রোহ মামলায় এক চাঞ্চল্যকর অগ্রগতি সাধিত হয়েছে। ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী ফ্যাসিস্ট শেখ হাসিনাসহ দেশের মোট ২৮৬ জন উচ্চপর্যায়ের নেতা-কর্মীর বিরুদ্ধে দায়েরকৃত এই মামলার অভিযোগ গঠনের (চার্জশিট মূল্যায়ন) পরবর্তী শুনানির জন্য আগামী ১৪ জুলাই দিন ধার্য করেছেন ঢাকার একটি বিশেষ আদালত। আজ বুধবার দীর্ঘ শুনানি শেষে আদালত এই নতুন তারিখ নির্ধারণ করেন। এই মামলাটিকে বর্তমান বাংলাদেশের রাজনৈতিক ও বিচারিক ইতিহাসের অন্যতম বৃহত্তম রাষ্ট্রদ্রোহী মামলা হিসেবে বিবেচনা করছেন আইন বিশেষজ্ঞরা।

আদালতের আজকের কার্যবিবরণী ও শুনানির বিবরণ

বুধবার (১৭ জুন ২০২৬) ঢাকার তৃতীয় অতিরিক্ত মহানগর দায়রা জজ আদালতের বিচারক মঈন উদ্দিন চৌধুরীর আদালতে মামলাটির আসামিদের বিরুদ্ধে আনুষ্ঠানিক অভিযোগ গঠনের শুনানির জন্য দিন নির্ধারিত ছিল। নির্ধারিত সূচি অনুযায়ী সকাল থেকেই আদালত পাড়ায় নিরাপত্তা ব্যবস্থা জোরদার করা হয়। শুনানির শুরুতে রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবীরা আসামিদের বিরুদ্ধে আনীত রাষ্ট্রদ্রোহিতার অভিযোগগুলো অত্যন্ত জোরালোভাবে উপস্থাপন করেন এবং তাদের বিরুদ্ধে বিচার শুরু করার জন্য চার্জ গঠনের পক্ষে যুক্তি প্রদর্শন করেন।

অন্যদিকে, কারাগারে থাকা আসামিদের পক্ষে তাদের নিয়োজিত আইনজীবীরা শুনানিতে অংশ নেন। তারা আদালতকে জানান যে, এই মামলাটি সম্পূর্ণ রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত এবং আসামিদের হয়রানি করার জন্য এই কাল্পনিক অভিযোগ আনা হয়েছে। আসামিপক্ষের আইনজীবীরা তাদের মক্কেলদের মামলা থেকে সম্পূর্ণ অব্যাহতি (Discharge) দেওয়ার আবেদন জানিয়ে দীর্ঘক্ষণ আইনি সওয়াল-জওয়াব করেন। তবে, নির্ধারিত সময়ের মধ্যে আসামিপক্ষের সব আইনজীবীদের আইনি যুক্তি উপস্থাপন শেষ না হওয়ায় এবং মামলার নথিপত্র অত্যন্ত পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে পর্যালোচনার স্বার্থে বিচারক মঈন উদ্দিন চৌধুরী পরবর্তী শুনানির জন্য আগামী ১৪ জুলাই দিন ধার্য করেন। আদালতের এই আদেশের বিষয়টি গণমাধ্যমকে নিশ্চিত করেছেন সংশ্লিষ্ট আদালতের বেঞ্চ সহকারী গোলাম নবী

মামলার নেপথ্য কাহিনী: ‘জয় বাংলা ব্রিগেড’ ও জুম মিটিংয়ের ষড়যন্ত্র

আদালতে পেশকৃত মামলার আনুষ্ঠানিক নথি এবং সিআইডির তদন্ত প্রতিবেদন থেকে জানা যায়, এই রাষ্ট্রদ্রোহ মামলার মূল সূত্রপাত ঘটেছিল ২০২৪ সালের শেষভাগে। ২০২৪ সালের ১৯ ডিসেম্বর অনলাইন প্ল্যাটফর্ম জুমে (Zoom) ‘জয় বাংলা ব্রিগেড’ নামে একটি বিশেষ সংগঠনের ব্যানারে একটি অত্যন্ত গোপন ও দীর্ঘ বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র আওয়ামী লীগের সহ-সভাপতি ড. রাব্বি আলমের সঞ্চালনায় (Hosting) অনুষ্ঠিত ওই ভার্চুয়াল সভায় প্রধান অতিথি হিসেবে সরাসরি যুক্ত হন তৎকালীন সময়ে সদ্য ক্ষমতাচ্যুত ও ভারতে পলাতক সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা।

আরও পড়ুন: খুলনায় গৃহকর্মী নির্যাতন: অভিযুক্ত পুলিশ দম্পতি আটক

খুলনায় গৃহকর্মী নির্যাতন: অভিযুক্ত পুলিশ দম্পতি আটক

সিআইডির সাইবার ইউনিটের তদন্তে উঠে এসেছে যে, ওই জুম মিটিংয়ে বাংলাদেশ এবং বিশ্বের বিভিন্ন দেশ থেকে মোট ৫৭৭ জন আওয়ামী লীগ ও তার অঙ্গসংগঠনের নেতা-কর্মী ও সমর্থক অংশ নিয়েছিলেন। দীর্ঘ সময় ধরে চলা ওই বৈঠকে বাংলাদেশের রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তা বিঘ্নিত করার জন্য সুনির্দিষ্ট কিছু নীল নকশা তৈরি করা হয়। বৈঠকে উপস্থিত নেতা-কর্মীদের উদ্দেশ্যে শেখ হাসিনা বিভিন্ন উসকানিমূলক নির্দেশনা প্রদান করেন। অডিও ও ভিডিও রেকর্ড পর্যালোচনায় দেখা গেছে, পলাতক শেখ হাসিনাকে একটি ভয়াবহ গৃহযুদ্ধের (Civil War) মাধ্যমে পুনরায় বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী হিসেবে ক্ষমার আসনে বসানোর জন্য শেষ রক্তবিন্দু দিয়ে লড়াই চালিয়ে যাওয়ার শপথ করা হয় সেখানে। বৈধ সরকারকে শান্তিপূর্ণভাবে দেশ পরিচালনা করতে না দেওয়া এবং দেশের ভেতরে বড় ধরণের বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করে রাষ্ট্রীয় কাঠামো ভেঙে দেওয়ার জন্য ষড়যন্ত্রমূলক আলোচনা করা হয়, যা বাংলাদেশের প্রচলিত আইন অনুযায়ী রাষ্ট্রদ্রোহিতার সুস্পষ্ট উপাদান হিসেবে প্রমাণিত হয়েছে।

আসামিদের বর্তমান অবস্থান: পলাতক ও কারাবন্দিদের খতিয়ান

এই মেগা রাষ্ট্রদ্রোহ মামলার নথিপত্র পর্যালোচনা করে জানা গেছে যে, চার্জশিটভুক্ত মোট ২৮৬ জন আসামির মধ্যে সিংহভাগই বর্তমানে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর চোখ ফাঁকি দিয়ে পলাতক জীবনযাপন করছেন। মামলার প্রধান আসামি শেখ হাসিনাসহ মোট ২৫৯ জন আসামি বর্তমানে দেশের বাইরে ও ভেতরের বিভিন্ন অজ্ঞাত স্থানে পলাতক রয়েছেন। আদালত অলরেডি তাদের বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করেছে।

অন্যদিকে, দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে গ্রেপ্তার হয়ে বর্তমানে এই মামলায় মোট ২৭ জন আসামি ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারসহ বিভিন্ন কারাগারে বন্দি রয়েছেন। কারাবন্দি এই আসামিদের মধ্যে অন্যতম শীর্ষ নেতা হলেন ঢাকা মহানগর উত্তর যুব মহিলা লীগের সাবেক প্রভাবশালী সভাপতি এবং সংরক্ষিত নারী আসনের সাবেক সংসদ সদস্য সাবিনা আক্তার তুহিন। আজ শুনানির সময় কারাগারে থাকা এই ২৭ আসামিকে কঠোর নিরাপত্তার মধ্য দিয়ে আদালতে হাজির করা হয়েছিল।

স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের অনুমোদন ও সিআইডির দীর্ঘ তদন্ত

বাংলাদেশের আইন অনুযায়ী যেকোনো নাগরিক বা সংস্থার বিরুদ্ধে রাষ্ট্রদ্রোহিতার (Sedition) মামলা দায়ের করতে হলে সরকারের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের পূর্বানুমতি বা ক্লিয়ারেন্স নেওয়া বাধ্যতামূলক। ‘জয় বাংলা ব্রিগেড’ নামক প্ল্যাটফর্মে দেশ-বিদেশ থেকে অংশগ্রহণকারীদের সেই ভয়েস রেকর্ড ও ডিজিটাল তথ্যপ্রমাণ প্রযুক্তির মাধ্যমে ল্যাব টেস্ট করার পর সিআইডি স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে অনুমোদনের আবেদন জানায়। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সবুজ সংকেত পাওয়ার পর, ফৌজদারি কার্যবিধির (CrPC) ১৯৬ ধারায় ক্ষমতাপ্ত হয়ে ২০২৫ সালের ২৭ মার্চ শেখ হাসিনাসহ ৭৩ জনের নাম উল্লেখ করে সিআইডির সহকারী পুলিশ সুপার মো. এনামুল হক বাদী হয়ে আদালতে প্রথম মামলাটি দায়ের করেন।

পরবর্তীতে আদালত মামলাটি অধিকতর তদন্তের জন্য সিআইডির সাইবার ইনভেস্টিগেশন অ্যান্ড অপারেশন্স ইউনিটকে নির্দেশ দেয়। দীর্ঘ সময় ধরে ডিজিটাল ফরেনসিক পরীক্ষা, আইপি অ্যাড্রেস ট্র্যাকিং এবং ভিডিও ফুটেজ বিশ্লেষণ করে তদন্ত কর্মকর্তা সহকারী পুলিশ সুপার মো. এনামুল হক ঘটনার গভীরতা উন্মোচন করেন। তদন্ত শেষে চলতি বছরের ১৪ আগস্ট ঢাকার মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট আরিফুল ইসলামের আদালতে শেখ হাসিনাসহ ২৮৬ জনকে অভিযুক্ত করে একটি বিশাল এবং তথ্যবহুল চূড়ান্ত চার্জশিট (অভিযোগপত্র) দাখিল করা হয়। প্রাথমিক ৭৩ জন থেকে তদন্তে আরও ২১৩ জনের প্রত্যক্ষ সম্পৃক্ততা পাওয়ায় তাদেরও এই মামলায় অন্তর্ভুক্ত করা হয়।

মামলার উল্লেখযোগ্য ও হাইপ্রোফাইল আসামিবৃন্দ

এই মামলায় সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ছাড়াও দেশের রাজনীতি ও সামাজিক অঙ্গনের বেশ কিছু হাইপ্রোফাইল ব্যক্তির নাম রয়েছে, যারা এই জুম মিটিংয়ে সক্রিয়ভাবে অংশ নিয়েছিলেন অথবা ষড়যন্ত্রের তদারকি করেছিলেন। মামলার উল্লেখযোগ্য আসামিদের মধ্যে রয়েছেন:

  • ড. রাব্বি আলম (যুক্তরাষ্ট্র আওয়ামী লীগের সহ-সভাপতি ও সভার মূল হোস্ট)

  • সাবিনা আক্তার তুহিন (সাবেক এমপি ও যুব মহিলা লীগ নেত্রী)

  • সাদ্দাম হোসেন (বাংলাদেশ ছাত্রলীগ কেন্দ্রীয় কমিটির সভাপতি)

  • অ্যাডভোকেট কামরুল ইসলাম (সাবেক মন্ত্রী ও আওয়ামী লীগ নেতা)

  • সৈয়দ রুবিনা আক্তার ও পংকজ নাথ (সাবেক সংসদ সদস্যদ্বয়)

  • কবিরুল ইসলাম, এলাহী নেওয়াজ মাছুম, জাকির হোসেন জিকু, প্রফেসর তাহেরুজ্জামান, এ. কে. এম. আক্তারুজ্জামান, আজিদা পারভীন পাখি, শাহীন, এডভোকেট এ. এফ. এম. দিদারুল ইসলাম, মাকসুদুর রহমান, লায়লা বানু, রিতু আক্তার, নুরুন্নবী নিবির, সাবিনা বেগম এবং শরিফুল ইসলাম রমজান।

আইনজীবীদের মতে, রাষ্ট্রদ্রোহিতার এই মামলায় যদি আসামিদের বিরুদ্ধে আনীত অপরাধসমূহ বিজ্ঞ আদালতে তথ্যপ্রমাণের ভিত্তিতে সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণিত হয়, তবে দেশের প্রচলিত দণ্ডবিধি (Penal Code) অনুযায়ী অপরাধীদের সর্বোচ্চ শাস্তি যাবজ্জীবন কারাদণ্ড বা দীর্ঘমেয়াদী সশ্রম কারাদণ্ডে দণ্ডিত করা হতে পারে। আগামী ১৪ জুলাই আসামিপক্ষের অবশিষ্টাংশের শুনানি শেষে আদালত চার্জ গঠনের বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত দেবেন। পুরো দেশের রাজনৈতিক মহল এবং সাধারণ মানুষ এখন এই চাঞ্চল্যকর মামলার পরবর্তী শুনানির দিকে তাকিয়ে আছেন। দিগন্ত বাংলা নিউজ এই মামলার প্রতিটি আইনি প্রক্রিয়ার আপডেট সবার আগে পাঠকদের সামনে তুলে ধরবে।

 

Post a Comment

আপনার মূল্যবান মতামত আমাদের জানান। কোনো উসকানিমূলক বা অশালীন মন্তব্য করা থেকে বিরত থাকুন।

নবীনতর পূর্বতন