সারাদেশ ডেস্ক: শামীম হোসাইন / দিগন্ত বাংলা নিউজ
খুলনায় গৃহকর্মী নির্যাতন: অভিযুক্ত পুলিশ দম্পতি আটক
নিজস্ব প্রতিবেদক, খুলনা | দিগন্ত বাংলা নিউজ
আইনের রক্ষক যখন নিজেই ভক্ষকের ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়, তখন সমাজের সাধারণ মানুষের নিরাপত্তা ও ন্যায়বিচারের শেষ আশ্রয়স্থলটুকু প্রশ্নের মুখে পড়ে। দেশের আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর দায়িত্বশীল পদে থেকে এক অবুজ ও অসহায় গৃহকর্মীর ওপর অমানবিক ও পৈশাচিক নির্যাতন চালানোর এক অত্যন্ত চাঞ্চল্যকর ও হৃদয়বিদারক অভিযোগ উঠেছে এক পুলিশ দম্পতির বিরুদ্ধে। খুলনার সোনাডাঙ্গা আবাসিক এলাকায় সংঘটিত এই বর্বর ঘটনার পর ভুক্তভোগী গৃহকর্মীকে রক্তাক্ত ও গুরুতর জখম অবস্থায় উদ্ধার করা হয়েছে। এই ন্যক্কারজনক ঘটনার সাথে সরাসরি সম্পৃক্ততার অভিযোগে একই থানায় কর্মরত অভিযুক্ত পুলিশ দম্পতিকে তাৎক্ষণিকভাবে আটক করেছে পুলিশ প্রশাসন। ঘটনাটি জানাজানি হওয়ার পর পুরো খুলনা মহানগরী জুড়ে তীব্র ক্ষোভ, উত্তেজনা এবং অপরাধী পুলিশ কর্মকর্তাদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবিতে তুমুল আলোচনার সৃষ্টি হয়েছে।
তুচ্ছ কারণে পৈশাচিক নির্যাতন: ঘটনার নির্মম বিবরণ
স্থানীয় প্রত্যক্ষদর্শী ও থানা পুলিশ সূত্রে জানা গেছে, বুধবার (১৭ জুন ২০blank/চলতি বছর) দুপুরে খুলনার সোনাডাঙ্গা আবাসিক এলাকার সোলার পার্ক সংলগ্ন একটি বহুতল ভবনের ভাড়া বাসায় এই লোমহর্ষক নির্যাতনের ঘটনাটি ঘটে। দুপুরের রান্নার সময় তরকারি কিছুটা পুড়ে যাওয়াকে কেন্দ্র করে বাসার গৃহকর্ত্রী ও গৃহকর্তা চরম ক্ষিপ্ত হয়ে ওঠেন। সামান্য এই ভুলের জন্য কোনো সুস্থ মানসিকতার মানুষ যে এতটা হিংস্র হয়ে উঠতে পারে, তা ভাবাই যায় না। তরকারি পুড়ে যাওয়ার অপরাধে ওই অসহায় গৃহকর্মীর ওপর নেমে আসে অমানুষিক নির্যাতন। লাঠি দিয়ে বেধড়ক পেটানোর পাশাপাশি ডালঘুটনি ও অন্যান্য শক্ত বস্তু দিয়ে তার শরীরের বিভিন্ন সংবেদনশীল স্থানে আঘাত করা হয়। এখানেই শেষ নয়, ঘরের ভেতরে নির্যাতনের পর তাকে টেনে হিঁচড়ে বারান্দায় এনে চরমভাবে লাঞ্ছিত করা হয়।
অসহায় মিলনের জীবন আলেখ্য ও দীর্ঘদিনের বন্দিদশা
নির্যাতনের শিকার ওই ভাগ্যবিড়ম্বিত ও অসহায় গৃহকর্মীর নাম মিলন। তিনি নরসিংদী জেলার মূল বাসিন্দা। অত্যন্ত দরিদ্র পরিবারে জন্ম নেওয়া মিলনের শৈশবেই বাবা ও মা দুজনেই মারা যান। মা-বাবার মৃত্যুর পর সম্পূর্ণ অনাথ ও আশ্রয়হীন হয়ে পড়া মিলনকে ছোটবেলা থেকেই এই পুলিশ কর্মকর্তা নিজের পরিবারে নিয়ে আসেন। তখন থেকেই মিলন ওই বাসায় গৃহকর্মী হিসেবে দিনরাত হাড়ভাঙা খাটুনি খেটে আসছিলেন। অভিভাবকহীন এই এতিম শিশুটির ওপর দীর্ঘদিন ধরেই এক ধরণের মানসিক ও শারীরিক নির্যাতন চালানো হতো বলে স্থানীয় প্রতিবেশীরা জানিয়েছেন। নরসিংদী থেকে সুদূর খুলনায় এসে মিলনের জীবন যে এমন এক নরককুণ্ডে পরিণত হবে, তা হয়তো তার জানা ছিল না। কোনো আত্মীয়-স্বজন বা খোঁজ নেওয়ার মতো কেউ না থাকায় মুখ বুজে সমস্ত অত্যাচার সহ্য করতে বাধ্য হতেন মিলন।
অভিযুক্তদের পরিচয়: একই থানায় কর্মরত দুই কর্মকর্তা
এই বর্বরোচিত ও নৃশংস ঘটনার পেছনে যে দুই মূল অভিযুক্তের নাম বেরিয়ে এসেছে, তা শুনে পুরো খুলনা মেট্রোপলিটন পুলিশ (কেএমপি) প্রশাসন বিব্রতকর পরিস্থিতিতে পড়েছে। অভিযুক্ত ব্যক্তিরা হলেন সোনাডাঙ্গা থানার উপপরিদর্শক (এসআই) সঞ্জয় মিত্র এবং তার সহধর্মিণী পপি মিত্র। অত্যন্ত আশ্চর্যের বিষয় হলো, পপি মিত্রও বাংলাদেশ পুলিশ বাহিনীর একজন সদস্য এবং তিনিও একই থানায় কর্মরত রয়েছেন। (যদিও পরবর্তীকালে ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা তাদের দুজনকে এএসআই পদমর্যাদার কর্মকর্তা হিসেবে উল্লেখ করেছেন)। দেশের প্রচলিত আইন অনুযায়ী নাগরিকদের নিরাপত্তা দেওয়ার শপথ নিয়ে যারা চাকরিতে প্রবেশ করেছিলেন, তাদের নিজেদের ঘরের ভেতরের এই অন্ধকার রূপ দেখে স্তম্ভিত হয়ে গেছেন খোদ তাদেরই সহকর্মীরা। ক্ষমতার অপব্যবহার এবং এতিম গৃহকর্মীর ওপর এমন পাশবিক অত্যাচার কোনোভাবেই মেনে নেওয়া যায় না বলে মন্তব্য করেছেন স্থানীয় সচেতন নাগরিকরা।
বারান্দায় কান ধরে ওঠবস ও প্রত্যক্ষদর্শীদের সাহসিকতা
বুধবার দুপুরে নির্যাতনের এক পর্যায়ে মিলনকে বাসার চারতলার বারান্দায় এনে প্রকাশ্যে কান ধরে ওঠবস করানো হচ্ছিল এবং লাঠি দিয়ে নির্মমভাবে পিটিয়ে রক্তাক্ত করা হচ্ছিল। মিলনের গগনবিদারী চিৎকার ও কান্না শুনে সোলার পার্ক সংলগ্ন এলাকার আশপাশের বাসিন্দারা জড়ো হতে থাকেন। এই পৈশাচিক দৃশ্য দেখে স্থানীয় এক সাহসী সংবাদকর্মী এবং কয়েকজন মানবাধিকার ও সামাজিক সংগঠনের নারী নেত্রী তাৎক্ষণিকভাবে ওই ভবনে ছুটে যান। তারা নির্যাতনের হাত থেকে মিলনকে রক্ষা করার জন্য ওই পুলিশ দম্পতির ফ্ল্যাটে প্রবেশের চেষ্টা করেন। কিন্তু নিজেদের অপরাধ ধামাচাপা দিতে অভিযুক্ত পুলিশ কর্মকর্তা সঞ্জয় মিত্র ও তার স্ত্রী পপি মিত্র প্রথমে ওই সাংবাদিক এবং নারী নেত্রীদের ঘরে প্রবেশ করতে চরমভাবে বাধা দেন এবং তাদের সাথে অত্যন্ত অসৌজন্যমূলক আচরণ করেন।
আরও পড়ুন: কক্সবাজারে ৭ বছরের শিশুকে পাশবিক হত্যার পর লাশ গুম: গ্রেপ্তার ৩
এলাকাবাসীর প্রতিরোধ ও ৯৯৯-এর মাধ্যমে উদ্ধার অভিযান
সাংবাদিক ও মানবাধিকার কর্মীদের ভেতরে ঢুকতে বাধা দেওয়ার খবরটি মুহূর্তের মধ্যে সোনাডাঙ্গা আবাসিক এলাকায় ছড়িয়ে পড়ে। কিছুক্ষণের মধ্যেই সেখানে আরও বিপুল সংখ্যক গণমাধ্যমকর্মী, স্থানীয় গণ্যমান্য ব্যক্তিবর্গ এবং বিভিন্ন সামাজিক ও রাজনৈতিক সংগঠনের নেতৃবৃন্দ জড়ো হয়ে বাড়িটি ঘেরাও করেন। পরিস্থিতি বেগতিক দেখে এবং উপস্থিত জনতার তোপের মুখে পড়ে অভিযুক্ত পুলিশ দম্পতি ঘরের দরজা বন্ধ করে দেন। পরবর্তীতে উপস্থিত নাগরিকরা কোনো উপায় না দেখে তাৎক্ষণিকভাবে সরকারের জাতীয় জরুরি সেবা ৯৯৯ নম্বরে ফোন করে বিষয়টি অবহিত করেন এবং দ্রুত পুলিশি হস্তক্ষেপ কামনা করেন। ৯৯৯ থেকে বার্তা পাওয়ার পরপরই সোনাডাঙ্গা থানা পুলিশের একটি বিশেষ দল দ্রুত ঘটনাস্থলে ছুটে আসে এবং বিক্ষুব্ধ জনতার হাত থেকে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে নিয়ে ঘরের ভেতর থেকে অবরুদ্ধ ও মারাত্মকভাবে আহত গৃহকর্মী মিলনকে অক্ষত অবস্থায় উদ্ধার করে।
শরীরে গরম খুন্তি ও কড়াইয়ের ছ্যাঁকার বীভৎস দাগ
উদ্ধার করার পর মিলনকে যখন সোনাডাঙ্গা থানার ভিকটিম সাপোর্ট সেন্টারে নিয়ে যাওয়া হয়, তখন সেখানে উপস্থিত পুলিশ কর্মকর্তা ও সাংবাদিকদের সামনে মিলনের ওপর চালানো নির্যাতনের আসল ভয়াবহতা উন্মোচিত হয়। মিলনের পরনের কাপড় সরাতেই দেখা যায় তার পিঠ, হাত, পা এবং বুকের বিভিন্ন স্থানে তাজা রক্তের দাগ এবং কালশিটে পড়ে আছে। সবচেয়ে ভয়ংকর বিষয় হলো, মিলনের শরীরের বিভিন্ন স্থানে জ্বলন্ত গরম খুন্তি এবং গরম কড়াইয়ের ছ্যাঁকা দেওয়ার গভীর ক্ষত চিহ্ন স্পষ্ট দেখা যাচ্ছিল। চামড়া পুড়ে গিয়ে মাংস বের হয়ে আসা সেই ক্ষতগুলো থেকে তখনও রক্তরস ঝরছিল। চিকিৎসকরা এবং সংশ্লিষ্ট সূত্র নিশ্চিত করেছে যে, মিলনের শরীরে কেবল আজকের টাকাই নয়, বরং আগেরও একাধিক পুরনো নির্যাতনের গভীর দাগ ও চিহ্ন রয়েছে। এতে প্রমাণিত হয় যে, এটি কোনো সাময়িক বা আকস্মিক ঘটনা নয়; বরং মিলনকে দীর্ঘদিন ধরে এক ধরণের দাসত্বের শৃঙ্খলে আটকে রেখে ক্রমান্বয়ে এই ধরণের পাশবিক নির্যাতন চালানো হতো।
খুলনা মেট্রোপলিটন পুলিশ (কেএমপি) প্রশাসনের তাৎক্ষণিক পদক্ষেপ
এই চাঞ্চল্যকর ঘটনাটি জানাজানি হওয়ার পর খুলনা মেট্রোপলিটন পুলিশের (কেএমপি) ঊর্ধ্বতন মহলে তোলপাড় শুরু হয়। একজন সাধারণ নাগরিকের ওপর পুলিশ কর্মকর্তাদের এমন আচরণ কোনোভাবেই বরদাশত করা হবে না বলে প্রশাসনের পক্ষ থেকে পরিষ্কার জানিয়ে দেওয়া হয়েছে। ঘটনার তীব্রতা বিবেচনা করে কেএমপির ঊর্ধ্বতন পুলিশ কর্মকর্তারা তাৎক্ষণিকভাবে ঘটনাস্থল এবং সোনাডাঙ্গা থানার ভিকটিম সাপোর্ট সেন্টার পরিদর্শন করেন। তারা ভুক্তভোগী মিলনের স্বাস্থ্যের খোঁজখবর নেন এবং তার প্রয়োজনীয় উন্নত চিকিৎসার ব্যবস্থা করার জন্য নির্দেশ প্রদান করেন।
সোনাডাঙ্গা থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. রফিকুল ইসলাম ঘটনার সত্যতা নিশ্চিত করে অত্যন্ত পেশাদারিত্বের সাথে সংবাদমাধ্যমকে বলেন, “জাতীয় জরুরি সেবা ৯৯৯-এর মাধ্যমে একটি ফোন পেয়ে আমাদের ফোর্স দ্রুত ঘটনাস্থলে গিয়ে গৃহকর্মী মিলনকে উদ্ধার করে থানায় নিয়ে আসে। তাকে বর্তমানে সম্পূর্ণ নিরাপদে ভিকটিম সাপোর্ট সেন্টারে রাখা হয়েছে এবং তার চিকিৎসার ব্যবস্থা করা হচ্ছে।” অভিযুক্তদের বিষয়ে জানতে চাওয়া হলে ওসি আরও যুক্ত করেন, “অভিযুক্ত দুই পুলিশ সদস্যকে (এএসআই) ইতিমধ্যেই আটক করে থানা হেফাজতে আনা হয়েছে। আইন সবার জন্য সমান। আমাদের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা বিষয়টি সরাসরি তদারকি করছেন এবং তাদের বিরুদ্ধে বিভাগীয় ব্যবস্থা ও নিয়মিত ফৌজদারি মামলা দায়েরের আইনি প্রক্রিয়া অত্যন্ত গুরুত্বের সাথে প্রক্রিয়াধীন রয়েছে।”
আইন ও মানবাধিকারের চরম লঙ্ঘন: সুধী সমাজের প্রতিক্রিয়া
আইন প্রয়োগকারী সংস্থার সদস্যদের দ্বারা নিজ গৃহের ভেতরে এতিম ও অনাথ শিশুর ওপর এমন মধ্যযুগীয় কায়দায় নির্যাতন চালানো দেশের প্রচলিত আইন এবং আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সনদের সুস্পষ্ট লঙ্ঘন। মানবাধিকার কর্মীরা বলছেন, যারা আইন রক্ষা করবেন, তারা যদি নিজেই এমন জঘন্য অপরাধের সাথে যুক্ত হন, তবে সাধারণ মানুষের নিরাপত্তা কোথায়? বাংলাদেশে গৃহকর্মী নির্যাতন ও শিশু শ্রম নিরোধ আইনের স্পষ্ট ধারা থাকা সত্ত্বেও এই ধরণের ঘটনা বারবার আমাদের নৈতিক অবক্ষয়কে মনে করিয়ে দেয়। খুলনার বিভিন্ন সামাজিক ও নাগরিক সংগঠনের নেতৃবৃন্দ এক যৌথ বিবৃতিতে বলেছেন, এই পুলিশ দম্পতি যদি তাদের পদের প্রভাব খাটিয়ে পার পেয়ে যায়, তবে তা হবে বিচার ব্যবস্থার জন্য একটি কলঙ্কজনক অধ্যায়। তারা অবিলম্বে এই দুই পুলিশ কর্মকর্তাকে চাকরি থেকে সাময়িক বরখাস্ত করে দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনালের অধীনে এনে সর্বোচ্চ শাস্তি নিশ্চিত করার দাবি জানিয়েছেন।
দিগন্ত বাংলা নিউজ সবসময় শোষিত, বঞ্চিত এবং নির্যাতিত মানুষের পাশে থেকে সত্য প্রকাশে অঙ্গীকারাবদ্ধ। খুলনার এই অসহায় এতিম শিশু মিলনের ওপর চালানো এই নির্মম অত্যাচারের সুষ্ঠু বিচার এবং অপরাধীদের উপযুক্ত শাস্তি না হওয়া পর্যন্ত আমরা এই ঘটনার আইনি প্রক্রিয়ার প্রতিটি খবরের ওপর তীক্ষ্ণ নজর রাখব।


একটি মন্তব্য পোস্ট করুন
আপনার মূল্যবান মতামত আমাদের জানান। কোনো উসকানিমূলক বা অশালীন মন্তব্য করা থেকে বিরত থাকুন।