কক্সবাজারে ৭ বছরের শিশুকে পাশবিক হত্যার পর লাশ গুম: গ্রেপ্তার ৩

কক্সবাজারে ৭ বছরের শিশুকে পাশবিক হত্যার পর লাশ গুম: গ্রেপ্তার ৩
ছবি: সংগৃহীত

সারাদেশ ডেস্ক: শামীম হোসাইন / দিগন্ত বাংলা নিউজ

কক্সবাজারে ৭ বছরের শিশুকে অপহরণ ও পাশবিক হত্যার পর লাশ গুম: গ্রেপ্তার ৩

নিজস্ব প্রতিবেদক, কক্সবাজার | দিগন্ত বাংলা নিউজ

কক্সবাজারের নবগঠিত মাতামুহুরী উপজেলায় এক নিষ্পাপ শিশুকে পরিকল্পিতভাবে অপহরণ, পাশবিক নির্যাতন ও নৃশংসভাবে হত্যার পর লাশ গুমের এক পৈশাচিক ঘটনা উন্মোচিত হয়েছে। উপজেলার পূর্ব বড়ভেওলা ইউনিয়নে নিখোঁজ হওয়ার মাত্র একদিন পর সাত বছর বয়সী শিশু ওয়াহিদুল ইসলামের ক্ষতবিক্ষত মরদেহ উদ্ধার করেছে পুলিশ। এই বর্বরোচিত ও লোমহর্ষক হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় নিহতের পিতা বাদী হয়ে চকরিয়া থানায় একটি হত্যা ও গুমের মামলা দায়ের করেছেন। ঘটনার সাথে সরাসরি জড়িত থাকার অভিযোগে পুলিশ তাৎক্ষণিকভাবে তিন পাষণ্ডকে গ্রেপ্তার করতে সক্ষম হয়েছে। এই পৈশাচিক হত্যাকাণ্ডের খবর ছড়িয়ে পড়লে পুরো কক্সবাজার জেলা জুড়ে তীব্র ক্ষোভ, শোক এবং আসামিদের ফাঁসির দাবিতে উত্তাল হয়ে উঠেছে সর্বস্তরের জনতা।

খেলার মাঠ থেকে নিখোঁজ: ঘটনার নির্মম সূত্রপাত

পারিবারিক ও এজাহার সূত্রে জানা যায়, গত ১৪ জুন বিকেল আনুমানিক ৫টার দিকে সাত বছর বয়সী কোমলমতি শিশু ওয়াহিদুল ইসলাম বাড়ির পাশে অন্যান্য শিশুদের সাথে খেলাধুলা করার জন্য বের হয়। প্রতিদিনের মতো সন্ধ্যা ঘনিয়ে এলেও সে বাড়িতে ফিরে না আসায় পরিবারের সদস্যদের মনে উদ্বেগের সৃষ্টি হয়। রাত গভীর হওয়ার সাথে সাথে পরিবারের সদস্যরা পাড়া-প্রতিবেশী, আত্মীয়-স্বজনদের বাড়িসহ সম্ভাব্য সমস্ত স্থানে খোঁজাখুঁজি করেন। কিন্তু পুরো রাত ও পরের দিন দুপুর পর্যন্ত শিশু ওয়াহিদুল ইসলামের কোনো সন্ধান মেলেনি। সন্তানের কোনো হদিস না পেয়ে পরিবারটি মানসিকভাবে সম্পূর্ণ ভেঙে পড়ে এবং এলাকায় এক রহস্যময় পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়।

খালের পাশের গর্ত থেকে হাত-পা বাঁধা লাশ উদ্ধার

ওয়াহিদুল ইসলামের নিখোঁজ হওয়ার পেছনে স্থানীয় কিছু যুবকের আচরণে সন্দেহ দানা বাঁধে এলাকাবাসীর মনে। স্থানীয় সচেতন জনতা ও ভুক্তভোগী পরিবারের সদস্যরা সন্দেহের ভিত্তিতে কয়েকজনকে জিজ্ঞাসাবাদ শুরু করলে ঘটনার মূল রহস্য উন্মোচিত হতে থাকে। এক পর্যায়ে স্থানীয়দের মাধ্যমে খবর পেয়ে চকরিয়া থানা পুলিশ দ্রুত ঘটনাস্থলে পৌঁছায়। আটককৃত এক সন্দেহভাজন ব্যক্তির দেওয়া চরম তথ্য ও স্বীকারোক্তির ভিত্তিতে মঙ্গলবার (১৬ জুন) সকাল ৯টার দিকে পূর্ব বড়ভেওলা ইউনিয়নের ৮ নম্বর ওয়ার্ডের অন্তর্গত দক্ষিণ চরপাড়া এলাকার মাতামুহুরী খালের তলদেশ সংলগ্ন একটি গভীর পানিভর্তি গর্ত থেকে শিশুটির নিথর দেহ উদ্ধার করা হয়।

আরও পড়ুন: সংসদে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী: বিএসএফের ৩৬টি পুশইন চেষ্টা রুখে দিয়েছে বিজিবি

সংসদে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী: বিএসএফের ৩৬টি পুশইন চেষ্টা রুখে দিয়েছে বিজিবি

সুরতহাল প্রতিবেদন ও পাশবিক নির্যাতনের প্রমাণ

পুলিশ যখন খালের পাশের গর্ত থেকে ওয়াহিদুল ইসলামের লাশ ওপরে তোলে, তখন সেখানে এক হৃদয়বিদারক দৃশ্যের অবতারণা হয়। উপস্থিত শত শত মানুষের চোখে জল ধরে রাখা সম্ভব ছিল না। পুলিশের প্রস্তুতকৃত প্রাথমিক সুরতহাল প্রতিবেদনে দেখা গেছে, শিশুটির শরীরের একাধিক স্থানে গুরুতর আঘাতের স্পষ্ট চিহ্ন রয়েছে। মামলার এজাহারে উল্লেখ করা হয়েছে, ঘাতক চক্রটি শিশুটিকে প্রথমে পরিকল্পিতভাবে ফুসলিয়ে অপহরণ করে একটি নির্জন স্থানে নিয়ে যায়। সেখানে তার ওপর তীব্র পাশবিক ও যৌন নির্যাতন চালানো হয়। নির্যাতন শেষে অপরাধ ঢাকতে এবং শিশুটি যাতে কারো কাছে মুখ খুলতে না পারে, সেজন্য তাকে অত্যন্ত নির্মমভাবে শ্বাসরোধ করে হত্যা করা হয়। পরবর্তীতে আইনি চোখ ফাঁকি দিতে ও আলামত ধ্বংসের উদ্দেশ্যে মরদেহটি মাতামুহুরী খালের পাশের দুর্গম পানিভর্তি গর্তে লুকিয়ে রাখা হয়।

চকরিয়া থানায় মামলা ও গ্রেপ্তারকৃত ৩ ঘাতকের পরিচয়

এই নৃশংস হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় মঙ্গলবার চকরিয়া থানায় নিহত শিশুর পিতা বাদী হয়ে একটি এজাহার দাখিল করেন, যা পরবর্তীতে নিয়মিত মামলা হিসেবে রুজু করা হয়। ঘটনার সত্যতা নিশ্চিত করে পুলিশ দ্রুত চিরুনি অভিযান চালিয়ে এজাহারনামীয় তিন আসামিকে গ্রেপ্তার করে। গ্রেপ্তারকৃতরা হলো: ১. ছৈয়দ হোসেন ওরফে মানিক ওরফে কাবিলা ২. তারেকুল ইসলাম ৩. মো. আরমান

গ্রেপ্তারকৃত এই তিন জনই পূর্ব বড়ভেওলা এলাকার স্থায়ী বাসিন্দা এবং স্থানীয়ভাবে বখাটে ও বিভিন্ন অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডের সাথে জড়িত বলে জানা গেছে। চকরিয়া থানা পুলিশের একটি নির্ভরযোগ্য উচ্চপদস্থ সূত্র নিশ্চিত করেছে যে, প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে গ্রেপ্তারকৃত এই তিন নরপশু শিশু ওয়াহিদুল ইসলামকে অপহরণ, দলবদ্ধ ধর্ষণ এবং সুপরিকল্পিতভাবে শ্বাসরোধ করে হত্যার পর লাশ গুমের কথা সম্পূর্ণভাবে স্বীকার করেছে।

আদালতে ১৬৪ ধারায় জবানবন্দি ও পরবর্তী আইনি প্রক্রিয়া

চকরিয়া থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মনির হোসেন সংবাদমাধ্যমকে জানিয়েছেন, অপরাধের খবর পাওয়ার সাথে সাথেই পুলিশ সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে অভিযান পরিচালনা করেছে। তিনি বলেন, “আমরা ইতোমধ্যে এজাহারনামীয় প্রধান তিন আসামিকে গ্রেপ্তার করেছি। প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে তারা নিজেদের অপরাধের কথা স্বীকার করেছে। অধিকতর তদন্ত ও আইনি প্রক্রিয়া সুসংহত করার লক্ষ্যে আসামিদের আদালতে হাজির করে ফৌজদারি কার্যবিধির ১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি রেকর্ডের আবেদন জানানো হবে।” ওসি আরও জানান, এই বর্বরোচিত ঘটনার পেছনে অন্য কোনো মদদদাতা, শত্রুতা বা অন্য কারো সম্পৃক্ততা রয়েছে কিনা, তা পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে খতিয়ে দেখতে পুলিশের বিশেষ টিম মাঠপর্যায়ে তদন্ত অব্যাহত রেখেছে।

এদিকে, নিহত শিশুর মরদেহ ময়নাতদন্তের জন্য কক্সবাজার সদর হাসপাতালের মর্গে পাঠানো হয়েছিল। সেখানে ময়নাতদন্তের প্রক্রিয়া সম্পন্ন হওয়ার পর মরদেহটি পরিবারের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে। চিকিৎসকদের দেওয়া চূড়ান্ত ময়নাতদন্ত প্রতিবেদন হাতে পেলে মৃত্যুর প্রকৃত বৈজ্ঞানিক কারণ এবং পাশবিক নির্যাতনের ধরণ সম্পর্কে আরও নিখুঁত ও অকাট্য প্রমাণ আদালতের সামনে উপস্থাপন করা সম্ভব হবে বলে জানিয়েছে পুলিশ।

আইনজীবীদের মতামত: সর্বোচ্চ শাস্তির বিধান

এই লোমহর্ষক মামলার আইনি দিক ও আসামিদের শাস্তির মেয়াদ সম্পর্কে সুপ্রিম কোর্টের বিশিষ্ট আইনজীবী অ্যাডভোকেট মঈনুল আমিন দিগন্ত বাংলা নিউজকে বলেন, “একটি ৭ বছরের অবুঝ শিশুকে অপহরণের পর যেভাবে পাশবিক নির্যাতন চালিয়ে হত্যা করা হয়েছে, তা সভ্য সমাজকে স্তব্ধ করে দেয়। চকরিয়া থানায় দায়েরকৃত মামলাটিতে নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইন, ২০০০ (সংশোধিত) এবং দণ্ডবিধির ৩০২ (হত্যা), ২০১ (আলামত গায়েব ও লাশ গুম) এবং ৩৪ (যৌথ অপরাধমূলক উদ্দেশ্য) ধারায় অত্যন্ত কঠোর অভিযোগ আনা হয়েছে।” তিনি আরও যোগ করেন, পুলিশের চার্জশিট যদি শক্ত হয় এবং আদালতে এই অপরাধ সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণিত হয়, তবে দেশের প্রচলিত আইন অনুযায়ী আসামিদের একমাত্র এবং সর্বোচ্চ শাস্তি ‘মৃত্যুদণ্ড’ বা ফাঁসি নিশ্চিত হবে।

সামাজিক অবক্ষয় ও শিশু নিরাপত্তা নিয়ে গভীর উদ্বেগ

মাতামুহুরীর এই ঘটনাটি দেশের উপকূলীয় অঞ্চলে শিশু সুরক্ষার ভঙ্গুর চিত্রটিকে আবারও সামনে এনে দাঁড় করিয়েছে। সমাজবিজ্ঞানীদের মতে, বিচারহীনতার সংস্কৃতি, মাদকের অবাধ বিস্তার এবং নৈতিক অবক্ষয়ের কারণেই সমাজে এই ধরণের বিকৃত অপরাধ মানসিকতার জন্ম হচ্ছে। স্থানীয় বাসিন্দারা ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেছেন, যদি এই খুনিদের দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনালের মাধ্যমে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দেওয়া না হয়, তবে সাধারণ মানুষের আইনের প্রতি আস্থা উঠে যাবে। পূর্ব বড়ভেওলা এলাকার সর্বস্তরের জনগণ এখন খুনিদের দ্রুততম সময়ে ফাঁসির কাষ্ঠে ঝুলানোর দাবিতে প্রশাসনের ওপর চাপ সৃষ্টি করে যাচ্ছে।

দিগন্ত বাংলা নিউজ পরিবার এই নিষ্পাপ শিশু ওয়াহিদুল ইসলামের অকাল ও নির্মম মৃত্যুতে গভীর শোক প্রকাশ করছে এবং শোকসন্তপ্ত পরিবারের প্রতি সমবেদনা জানাচ্ছে। এই পৈশাচিক হত্যাকাণ্ডের বিচার প্রক্রিয়া কোন দিকে মোড় নেয়, তার প্রতিটি মুহূর্তের ব্রেকিং আপডেট জানতে আমাদের পোর্টালে নজর রাখুন।

 

Post a Comment

আপনার মূল্যবান মতামত আমাদের জানান। কোনো উসকানিমূলক বা অশালীন মন্তব্য করা থেকে বিরত থাকুন।

নবীনতর পূর্বতন