আন্তর্জাতিক ডেস্ক: শামীম হোসাইন / দিগন্ত বাংলা নিউজ
যুক্তরাষ্ট্র-ইরান গোপন চুক্তির নথি ফাঁস: ১৪ দফার খসড়ায় যা থাকছে
নিজস্ব প্রতিবেদক | দিগন্ত বাংলা নিউজ
বিশ্ব ভূ-রাজনীতিতে এক অভাবনীয় ও যুগান্তকারী মোড় নিতে যাচ্ছে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এবং ইরানের দীর্ঘদিনের বৈরী সম্পর্ক। কয়েক দশক ধরে চলমান সামরিক উত্তেজনা, পাল্টাপাল্টি হুমকি এবং কঠোর অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞার অবসানের ইঙ্গিত দিয়ে দুই দেশের মধ্যে একটি সম্ভাব্য ও ঐতিহাসিক যুদ্ধবিরতি চুক্তির খসড়া বা মেমোরেন্ডাম অব আন্ডারস্ট্যান্ডিং (MoU) ফাঁস হয়েছে। আন্তর্জাতিক প্রভাবশালী সংবাদমাধ্যম সিএনএনের হাতে আসা এই চাঞ্চল্যকর নথিতে হরমুজ প্রণালি পুনরায় খুলে দেওয়া, ইরানের ওপর থেকে অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা শিথিল করা এবং তেহরানের পারমাণবিক অস্ত্র তৈরি না করার সুনির্দিষ্ট অঙ্গীকারের কথা উল্লেখ রয়েছে।
নথি ফাঁস ও ডিজিটাল স্বাক্ষরের চাঞ্চল্যকর তথ্য
এখনও পর্যন্ত এই ১৪ দফার সমঝোতা স্মারকটি কোনো দেশের পক্ষ থেকেই আনুষ্ঠানিকভাবে জনসমক্ষে প্রকাশ করা হয়নি। তবে সিএনএন তাদের প্রতিবেদনে দাবি করেছে, যুক্তরাষ্ট্রের উচ্চপদস্থ এক সরকারি কর্মকর্তার মাধ্যমে তারা এই অতিগোপনীয় চুক্তির একটি কপি হাতে পেয়েছে। ফ্রান্সে অনুষ্ঠিত সদ্য সমাপ্ত জি-৭ (G-7) সম্মেলনে এই নথির বিষয়টি নিয়ে আলোচনা হয়েছে এবং সেখানে উপস্থিত একজন শীর্ষ কূটনীতিকসহ সংশ্লিষ্ট অন্তত আরও দুই জন কূটনৈতিক সূত্র এর সত্যতা নিশ্চিত করেছেন।
সবচেয়ে চমকপ্রদ তথ্য হলো, মার্কিন ওই কর্মকর্তা জানিয়েছেন যে, গত রবিবার এই খসড়া চুক্তিতে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প, ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স এবং ইরানের পার্লামেন্ট স্পিকার মোহাম্মদ বাঘের গালিবফ ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম ব্যবহার করে স্বাক্ষর করেছেন। এর ফলে মধ্যপ্রাচ্যের রাজনীতিতে এক নতুন মেরুকরণের সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে।
অর্থনৈতিক প্যাকেজ ও পারমাণবিক ইস্যু
ফাঁস হওয়া চুক্তির খসড়া অনুযায়ী, এই সমঝোতার মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্র মূলত ইরানকে বিশ্ববাজারে পুনরায় তাদের তেল ও পেট্রোকেমিক্যাল পণ্য বাধাহীনভাবে বিক্রির অনুমতি দেবে। এর পাশাপাশি, ইরান যদি পারমাণবিক কর্মসূচির শর্তগুলো পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে মেনে চলে, তবে তারা পর্যায়ক্রমে ৩০০ বিলিয়ন ডলারের এক বিশাল উন্নয়ন ও পুনর্গঠন তহবিলে প্রবেশাধিকার পাবে। তবে, বিশ্লেষকদের মতে, চুক্তিতে ইরানের কাছে বর্তমানে মজুত থাকা উচ্চ-সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম কীভাবে নিষ্ক্রিয় বা স্থানান্তর করা হবে, সে বিষয়ে এখনও সুনির্দিষ্ট কোনো রূপরেখা দেওয়া হয়নি।
আরও পড়ুন: রাষ্ট্রদ্রোহ মামলা: শেখ হাসিনাসহ ২৮৬ জনের শুনানি ১৪ জুলাই
বিশ্লেষণ: ইরান-যুক্তরাষ্ট্র সমঝোতা স্মারকের ১৪ দফার বিস্তারিত
দিগন্ত বাংলা নিউজের পাঠকদের জন্য ফাঁস হওয়া সেই ১৪ দফার বিস্তারিত বিশ্লেষণ নিচে তুলে ধরা হলো:
১. সর্বাত্মক যুদ্ধবিরতি ও সংঘাতের অবসান: চুক্তির প্রথম দফার শর্ত অনুযায়ী, এই সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরের সঙ্গে সঙ্গেই যুক্তরাষ্ট্র, ইরান এবং বর্তমান সংঘাতে জড়িত উভয় পক্ষের মিত্ররা সব ফ্রন্টে সামরিক যুদ্ধ ও সংঘাতের আনুষ্ঠানিক অবসান ঘোষণা করবে। ভবিষ্যতে একে অপরের বিরুদ্ধে কোনো প্রকার সামরিক আক্রমণ, শক্তি প্রয়োগ বা শত্রুতামূলক আচরণ থেকে বিরত থাকার অঙ্গীকার করা হয়েছে।
২. সার্বভৌমত্বের স্বীকৃতি ও অভ্যন্তরীণ বিষয়ে হস্তক্ষেপ না করা: উভয় দেশ একে অপরের রাষ্ট্রীয় সীমানা, ভূখণ্ডগত অখণ্ডতা এবং সার্বভৌমত্বের প্রতি পূর্ণ সম্মান প্রদর্শন করবে। কেউ কারও অভ্যন্তরীণ রাজনীতি বা রাষ্ট্রীয় কার্যক্রমে কোনো ধরনের গোপন বা প্রকাশ্য হস্তক্ষেপ করবে না।
৩. চূড়ান্ত চুক্তির সময়সীমা নির্ধারণ: এই প্রাথমিক সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরের পর থেকে সর্বোচ্চ ৬০ দিনের মধ্যে উভয় পক্ষকে একটি স্থায়ী ও চূড়ান্ত চুক্তিতে পৌঁছানোর জন্য নিরবচ্ছিন্ন আলোচনা চালিয়ে যেতে হবে। তবে দুই পক্ষের মধ্যে পারস্পরিক সম্মতি থাকলে এই ৬০ দিনের সময়সীমা প্রয়োজনে আরও বাড়ানো যেতে পারে।
৪. নৌ অবরোধ প্রত্যাহার ও মার্কিন সেনা প্রত্যাহার: চুক্তি কার্যকর হওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই যুক্তরাষ্ট্র তাদের আরোপিত নৌ অবরোধ সম্পূর্ণ প্রত্যাহার করে নেবে। ইরানের বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচলে আর কোনো বাধা দেওয়া হবে না। সর্বোচ্চ ৩০ দিনের মধ্যে সমুদ্রপথে বাণিজ্য স্বাভাবিক করা হবে। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, চূড়ান্ত চুক্তি স্বাক্ষরিত হওয়ার ৩০ দিনের মধ্যে মধ্যপ্রাচ্য অঞ্চল থেকে মার্কিন সামরিক বাহিনী প্রত্যাহারের একটি রূপরেখাও এই দফায় রাখা হয়েছে।
৫. হরমুজ প্রণালি ও ওমান সাগরে বাণিজ্যিক রুট চালু: ইরান নিজ উদ্যোগে পারস্য উপসাগর এবং ওমান সাগরের মধ্যে থাকা গুরুত্বপূর্ণ সমুদ্রপথে বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচল পুনরায় নির্বিঘ্ন করতে প্রয়োজনীয় সব পদক্ষেপ গ্রহণ করবে। এই রুট নিরাপদ করতে সমুদ্রে থাকা মাইন অপসারণ ও প্রযুক্তিগত বাধা দূর করার কাজ ইরান সম্পন্ন করবে।
৬. ৩০০ বিলিয়ন ডলারের মেগা পুনর্গঠন তহবিল: যুক্তরাষ্ট্র এবং তার আঞ্চলিক মিত্ররা মিলে ইরানের অর্থনৈতিক পুনর্গঠন ও অবকাঠামোগত উন্নয়নের জন্য একটি সমন্বিত মাস্টারপ্ল্যান তৈরি করবে। এই পরিকল্পনার আওতায় কমপক্ষে ৩০০ বিলিয়ন মার্কিন ডলারের বিশাল অর্থায়নের ব্যবস্থা করা হবে, যার বাস্তবায়ন কাঠামো চুক্তির প্রথম ৬০ দিনের মধ্যেই নির্ধারণ করতে হবে।
৭. ধাপে ধাপে নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার: ইরানের ওপর থেকে সকল প্রকার আন্তর্জাতিক চাপ কমানো হবে। যুক্তরাষ্ট্র ধাপে ধাপে তাদের একতরফা নিষেধাজ্ঞাগুলো তো বটেই, এমনকি জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদ (UNSC) এবং আন্তর্জাতিক পরমাণু শক্তি সংস্থার (IAEA) আরোপিত সকল নিষেধাজ্ঞাও প্রত্যাহারের প্রতিশ্রুতি প্রদান করবে।
৮. পারমাণবিক অস্ত্র না বানানোর চূড়ান্ত অঙ্গীকার: ইরান আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের কাছে পুনরায় এই সুস্পষ্ট অঙ্গীকার করবে যে, তারা কখনোই পারমাণবিক অস্ত্র বা মারণাস্ত্র তৈরি করবে না। তবে চিকিৎসার কাজে বা বিদ্যুতের জন্য সমৃদ্ধ ইউরেনিয়ামের ব্যবহার ও ভবিষ্যতের পারমাণবিক চাহিদা চূড়ান্ত চুক্তিতে সুনির্দিষ্টভাবে নির্ধারিত হবে।
৯. আলোচনার সময়কালে স্থিতাবস্থা (Status Quo) বজায় রাখা: চূড়ান্ত চুক্তি সম্পন্ন না হওয়া পর্যন্ত উভয় দেশ বর্তমান পরিস্থিতি বজায় রাখবে। অর্থাৎ, ইরান তার চলমান পারমাণবিক কর্মসূচি আর সম্প্রসারণ করবে না এবং অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্রও নতুন করে কোনো অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা বা সামরিক উপস্থিতি বৃদ্ধি করবে না।
১০. তেল, ব্যাংকিং ও বীমা খাতের ওপর থেকে নিষেধাজ্ঞা শিথিল: এই সমঝোতা স্বাক্ষরের পরপরই যুক্তরাষ্ট্র ইরানের প্রাণভোমরা হিসেবে পরিচিত তেল, পেট্রোকেমিক্যাল পণ্য এবং সংশ্লিষ্ট অন্যান্য সেবা রপ্তানির ওপর থেকে নিষেধাজ্ঞা শিথিল করবে। আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের জন্য প্রয়োজনীয় ব্যাংকিং লেনদেন, বীমা এবং পরিবহন অনুমোদন দেওয়া হবে।
১১. ফ্রিজ বা জব্দকৃত সম্পদ হস্তান্তর: বিগত বছরগুলোতে বিশ্বের বিভিন্ন দেশের ব্যাংকে ইরানের যে বিপুল পরিমাণ অর্থ ও সম্পদ জব্দ (Frozen assets) করে রাখা হয়েছে, তা মুক্ত করার আইনি উদ্যোগ নেওয়া হবে। এই অর্থ সরাসরি ইরানের কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ব্যবস্থাপনায় হস্তান্তর করা হবে।
১২. যৌথ বাস্তবায়ন ও তদারকি কমিটি গঠন: ১৪ দফার এই স্মারক এবং ভবিষ্যতের চূড়ান্ত চুক্তির প্রতিটি ধারা ঠিকমতো বাস্তবায়িত হচ্ছে কি না, তা নিবিড়ভাবে তদারকি করার জন্য উভয় দেশের প্রতিনিধিদের সমন্বয়ে একটি 'যৌথ বাস্তবায়ন ও মনিটরিং মেকানিজম' গঠন করা হবে।
১৩. পরবর্তী আলোচনার পূর্বশর্ত: এই স্মারকের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ৪, ৫, ১০ ও ১১ নম্বর ধারা (নৌ অবরোধ প্রত্যাহার, রুট ক্লিয়ারেন্স, অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা শিথিল ও জব্দকৃত সম্পদ ফেরত) আগে বাস্তবায়ন করতে হবে। এগুলোর দৃশ্যমান অগ্রগতি ও নিশ্চয়তা পাওয়ার পরই দুই দেশ চূড়ান্ত চুক্তির অবশিষ্ট সংবেদনশীল বিষয়গুলো নিয়ে আনুষ্ঠানিক আলোচনা শুরু করবে।
১৪. জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদের চূড়ান্ত অনুমোদন: যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে চূড়ান্ত চুক্তিটি কেবল দ্বিপাক্ষিক থাকবে না। এটিকে আন্তর্জাতিক আইনে পরিণত করতে জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদের একটি বাধ্যতামূলক রেজুলেশন বা প্রস্তাবের মাধ্যমে সর্বসম্মতভাবে অনুমোদন করিয়ে নেওয়া হবে।
উপসংহার: বিশ্ব শান্তির নতুন দিগন্ত?
এই ১৪ দফার নথি যদি সফলভাবে বাস্তবায়িত হয়, তবে তা কেবল যুক্তরাষ্ট্র এবং ইরানের জন্যই নয়, পুরো বিশ্বের অর্থনীতির জন্যই এক বড় স্বস্তির কারণ হবে। বিশ্ববাজারে তেলের সরবরাহ বৃদ্ধি পেলে জ্বালানি তেলের দাম কমে আসার ব্যাপক সম্ভাবনা রয়েছে। তবে, ইসরায়েল এবং মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্রের অন্যান্য মিত্ররা এই চুক্তিকে কীভাবে গ্রহণ করবে, সেটাই এখন আন্তর্জাতিক মহলে সবচেয়ে বড় আলোচনার বিষয়। দিগন্ত বাংলা নিউজ এই ঐতিহাসিক ভূ-রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের প্রতিটি আপডেটের দিকে তীক্ষ্ণ নজর রাখছে।


আপনার নিউজ গুলো পরতে অনেক ভালো লাগে। কারণ, আপনার নিউজ গুলো ইউনিক।
উত্তরমুছুনএকটি মন্তব্য পোস্ট করুন
আপনার মূল্যবান মতামত আমাদের জানান। কোনো উসকানিমূলক বা অশালীন মন্তব্য করা থেকে বিরত থাকুন।