ট্রাম্প-পেজেশকিয়ান ঐতিহাসিক চুক্তি: মধ্যপ্রাচ্যে নতুন ভূরাজনীতির সমীকরণ

ট্রাম্প-পেজেশকিয়ান ঐতিহাসিক চুক্তি: মধ্যপ্রাচ্যে নতুন ভূরাজনীতির সমীকরণ
ছবি: সংগৃহীত

ট্রাম্প-পেজেশকিয়ান ঐতিহাসিক যুদ্ধবিরতি চুক্তিতে সই: বুধবার থেকেই কার্যকর, মধ্যপ্রাচ্যে শান্তি ও নতুন ভূ-রাজনৈতিক সমীকরণ

আন্তর্জাতিক ডেস্ক: শামীম হোসাইন / দিগন্ত বাংলা নিউজ

বিশ্ব রাজনীতির ইতিহাসে এক অভূতপূর্ব ও নাটকীয় অধ্যায়ের সূচনা করে অবশেষে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এবং ইসলামি প্রজাতন্ত্র ইরানের মধ্যে চলমান রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের আনুষ্ঠানিক অবসান ঘটতে যাচ্ছে। দুই দেশের শীর্ষ নেতৃত্ব তথা মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্প এবং ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান একটি ঐতিহাসিক অন্তর্বর্তীকালীন যুদ্ধবিরতি চুক্তিতে স্বাক্ষর করেছেন। বুধবার (১৮ জুন ২০২৬) দুই দেশের পক্ষ থেকে যৌথভাবে এই সমঝোতা চুক্তিটি জনসমক্ষে প্রকাশ করা হয়। আন্তর্জাতিক কূটনৈতিক মহল এই চুক্তিটিকে মধ্যপ্রাচ্যে দীর্ঘস্থায়ী শান্তি প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে একটি যুগান্তকারী পদক্ষেপ হিসেবে দেখছে। তবে এই পরম প্রতীক্ষিত শান্তির বার্তার মধ্যেও মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্পের চিরচেনা আক্রমণাত্মক ও হুঁশিয়ারিLanguage বজায় রয়েছে। তিনি স্পষ্ট করে দিয়েছেন যে, ইরান যদি এই চুক্তির শর্তাবলি অক্ষরে অক্ষরে পালন করতে ব্যর্থ হয়, তবে মার্কিন সামরিক বাহিনী পুনরায় তেহরানের ওপর ভয়াবহ সামরিক আগ্রাসন চালাবে এবং প্রয়োজনে ইরানি শীর্ষ কর্মকর্তাদের হত্যার নির্দেশ দিতেও তিনি দ্বিধাবোধ করবেন না।

এই চুক্তির মাধ্যমে গত কয়েক মাস ধরে চলা মধ্যপ্রাচ্যের ভয়াবহতম যুদ্ধ পরিস্থিতির সাময়িক অবসান ঘটল, যা বিশ্ব অর্থনীতি, বিশেষ করে আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজারে এক বিশাল স্বস্তি এনে দিয়েছে। ঐতিহাসিক এই চুক্তিটি স্বাক্ষরিত হওয়ার পর থেকেই এর বিভিন্ন দিক, ভূ-রাজনৈতিক প্রভাব এবং ভবিষ্যৎ সম্ভাবনা নিয়ে বিশ্বজুড়ে ব্যাপক বিশ্লেষণ শুরু হয়েছে।

চুক্তির পটভূমি: রক্তক্ষয়ী সংঘাতের সূচনা ও আঞ্চলিক বিপর্যয়

এই ঐতিহাসিক চুক্তির গুরুত্ব অনুধাবন করতে হলে আমাদের একটু পিছনের দিকে তাকাতে হবে। চলতি বছরের ২৮ ফেব্রুয়ারি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এবং ইসরাইল যৌথভাবে ইরানের বিরুদ্ধে এক অতর্কিত ও ব্যাপক মাত্রার সামরিক অভিযান তথা যুদ্ধ শুরু করে। যুদ্ধের প্রথম দিনটি ছিল আধুনিক সামরিক ইতিহাসের অন্যতম সবচেয়ে ধ্বংসাত্মক এবং চাঞ্চল্যকর দিন। প্রথম দিনের কয়েক ঘণ্টার নিখুঁত এবং তীব্র বিমান ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলায় ইরানের ৮৬ বছর বয়সী সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি এবং দেশটির ইসলামি বিপ্লবী গার্ড কর্পস (আইআরজিসি)-এর বেশ কয়েকজন শীর্ষস্থানীয় সামরিক কমান্ডার ও নীতিনির্ধারক নিহত হন। এই আকস্মিক ও নজিরবিহীন ধাক্কায় ইরানের সমগ্র শাসনব্যবস্থা ও সামরিক কমান্ড কাঠামো সাময়িকভাবে বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছিল।

আরও পড়ুন: রাষ্ট্রদ্রোহ মামলা: শেখ হাসিনাসহ ২৮৬ জনের শুনানি ১৪ জুলাই

তবে ইরান এই বিশাল ক্ষতি কাটিয়ে দ্রুত নিজেদের পুনর্গঠিত করে এবং পাল্টা প্রতিরোধ গড়ে তোলে। ফলে এই সংঘাত আর কেবল মার্কিন-ইরান বা ইসরাইল-ইরান দ্বিপাক্ষিক লড়াইয়ের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকেনি। অত্যন্ত দ্রুততার সাথে এই সংঘাত একটি পূর্ণাঙ্গ আঞ্চলিক রূপ ধারণ করে। লেবাননের ইরান-সমর্থিত সশস্ত্র গোষ্ঠী হিজবুল্লাহ, ইয়েমেনের হুথি এবং ইরাক ও সিরিয়ার বিভিন্ন প্রতিরোধ গোষ্ঠী এই যুদ্ধে সরাসরি জড়িয়ে পড়ে। এর ফলে সমগ্র মধ্যপ্রাচ্য এক বিশাল অগ্নিকুণ্ডে পরিণত হয়।

বিগত কয়েক মাসের এই প্রলয়ঙ্কারী যুদ্ধে ইরান এবং লেবাননে ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। প্রাপ্ত তথ্য ও আন্তর্জাতিক প্রতিবেদন অনুযায়ী, এই সংঘাতে এখন পর্যন্ত সাত হাজারেরও বেশি মানুষের প্রাণহানি ঘটেছে, যার মধ্যে একটি বিশাল অংশ সাধারণ নিরীহ নাগরিক। যুদ্ধের তীব্রতায় লেবাননের দক্ষিণাঞ্চল এবং ইরানের বেশ কিছু কৌশলগত অবকাঠামো পুরোপুরি ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়েছে। লক্ষ লক্ষ মানুষ বাস্তুচ্যুত হয়ে চরম মানবিক সংকটের মুখোমুখি হয়েছেন।

বৈশ্বিক অর্থনীতি ও জ্বালানি সংকটের চরম চাপ

এই যুদ্ধের প্রভাব কেবল মধ্যপ্রাচ্যের ভৌগোলিক সীমানার মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল না, বরং তা সমগ্র বিশ্ব অর্থনীতিকে এক গভীর মন্দা ও অনিশ্চয়তার দিকে ঠেলে দিয়েছিল। বিশেষ করে আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজারে এর প্রভাব ছিল সবচেয়ে মারাত্মক। হরমুজ প্রণালি—যা বিশ্বের অন্যতম প্রধান এবং গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি পরিবহন রুট—তা যুদ্ধের কারণে কার্যত অবরুদ্ধ হয়ে পড়েছিল। এর ফলে বিশ্ববাজারে অপরিশোধিত তেলের সরবরাহ মারাত্মকভাবে বিঘ্নিত হয় এবং জ্বালানি তেলের দাম হু হু করে বাড়তে থাকে।

তেলের আকাশচুম্বী মূল্যের কারণে বিশ্বের উন্নত থেকে শুরু করে উন্নয়নশীল—সব দেশেই মূল্যস্ফীতির চাপ অস্বাভাবিকভাবে বৃদ্ধি পায়। পরিবহন খরচ বৃদ্ধি পাওয়ায় নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসপত্রের দাম সাধারণ মানুষের নাগালের বাইরে চলে যায়। সবচেয়ে বড় সংকটের আশঙ্কা তৈরি হয়েছিল উন্নয়নশীল ও অনুন্নত দেশগুলোর খাদ্য নিরাপত্তা নিয়ে। কৃষি উৎপাদন ও খাদ্যশস্য সরবরাহের চেইন ভেঙে পড়ার কারণে বিশ্বজুড়ে খাদ্য সংকটের এক ভয়াবহ পরিস্থিতি তৈরি হচ্ছিল। এই বহুমুখী বৈশ্বিক চাপের কারণেই আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়, বিশেষ করে ইউরোপীয় ইউনিয়ন এবং বিশ্বের প্রধান অর্থনৈতিক পরাশক্তিগুলো মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের ওপর যুদ্ধ বন্ধের জন্য তীব্র কূটনৈতিক চাপ সৃষ্টি করতে শুরু করে।

ভার্সাই প্রাসাদের ঐতিহাসিক মুহূর্ত এবং ডিজিটাল স্বাক্ষর

এই তীব্র বৈশ্বিক সংকট এবং কূটনৈতিক টানাপোড়েনের পর অবশেষে একটি সমঝোতার পথ তৈরি হয়। মার্কিন এবং ইরানি কর্মকর্তাদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্প এবং ইরানের নতুন প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান এই অন্তর্বর্তীকালীন চুক্তির স্মারকে নিজ নিজ দেশের পক্ষে স্বাক্ষর করেছেন। চুক্তিটির সংবেদনশীলতা এবং তাৎক্ষণিক কার্যকারিতার কথা বিবেচনা করে এটি ইংরেজি এবং ফারসি—উভয় ভাষায় অত্যন্ত সতর্কতার সাথে প্রস্তুত করা হয়েছে। আধুনিক প্রযুক্তির সর্বোচ্চ ব্যবহার নিশ্চিত করে দুই দেশের রাষ্ট্রপ্রধান এতে ডিজিটাল মাধ্যমে স্বাক্ষর সম্পন্ন করেন।

ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় আনুষ্ঠানিকভাবে নিশ্চিত করেছে যে, চুক্তিটি বুধবার থেকেই অর্থাৎ স্বাক্ষর হওয়ার সাথে সাথেই মাঠপর্যায়ে কার্যকর করা হয়েছে। এই চুক্তি স্বাক্ষরের স্থান এবং সময়টিও ছিল অত্যন্ত প্রতীকী ও তাৎপর্যপূর্ণ। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্প তখন ফ্রান্সে অনুষ্ঠিত জি-৭ (G7) শীর্ষ সম্মেলনে অংশ নিচ্ছিলেন। তিনি ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল মাক্রনের আমন্ত্রণে ঐতিহাসিক ভার্সাই প্রাসাদে একটি রাষ্ট্রীয় নৈশভোজে যোগ দেওয়ার ঠিক আগ মুহূর্তে এই গুরুত্বপূর্ণ নথিতে নিজের ডিজিটাল স্বাক্ষরটি প্রদান করেন।

আরও পড়ুন: যুক্তরাষ্ট্র-ইরান গোপন চুক্তির নথি ফাঁস: ১৪ দফায় যা থাকছে

যুক্তরাষ্ট্র-ইরান গোপন চুক্তির নথি ফাঁস: ১৪ দফায় যা থাকছে

উল্লেখ্য, এই ভার্সাই প্রাসাদটি বিশ্ব ইতিহাসের অন্যতম সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ স্থান, যেখানে প্রথম বিশ্বযুদ্ধের আনুষ্ঠানিক অবসান ঘটানো ঐতিহাসিক 'ভার্সাই চুক্তি' স্বাক্ষরিত হয়েছিল। এক শতাব্দী পর আবারো সেই একই স্থানে দাঁড়িয়ে বিশ্বনেতারা মধ্যপ্রাচ্যের একটি ভয়াবহ যুদ্ধের অবসান ঘটানোর সাক্ষী হলেন, যা আন্তর্জাতিক কূটনীতিতে এক অনন্য সাধারণ ঘটনা হিসেবে স্মরণীয় হয়ে থাকবে।

১৪ দফার অন্তর্বর্তীকালীন চুক্তি: কী আছে এই সমঝোতায়?

যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে স্বাক্ষরিত এই চুক্তিটি মূলত একটি ১৪ দফার অন্তর্বর্তীকালীন সমঝোতা স্মারক। এই চুক্তির প্রধান লক্ষ্য হলো গত এপ্রিল মাসে উভয় পক্ষের মধ্যে ঘোষিত সাময়িক যুদ্ধবিরতির মেয়াদকে আরও ৬০ দিনের জন্য বাড়িয়ে দেওয়া। এই বর্ধিত সময়ের মূল উদ্দেশ্য হলো, দুই পক্ষকে কোনো প্রকার সামরিক উত্তেজনা ছাড়াই একটি চূড়ান্ত এবং স্থায়ী শান্তিচুক্তির রূপরেখা তৈরি করার জন্য আলোচনার টেবিলে বসার সুযোগ করে দেওয়া।

চুক্তির প্রধান এবং অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ শর্তগুলো নিচে বিস্তারিতভাবে আলোচনা করা হলো:

১. সব ফ্রন্টে তাৎক্ষণিক যুদ্ধবিরতি ও লেবানন অন্তর্ভুক্তি

চুক্তির প্রথম এবং প্রধান শর্ত হলো—যুদ্ধের সবকটি ফ্রন্টে অবিলম্বে এবং সম্পূর্ণভাবে যুদ্ধবিরতি কার্যকর করতে হবে। এর আওতাভুক্ত রয়েছে লেবাননও। অর্থাৎ, লেবাননের মাটিতে হিজবুল্লাহ এবং ইসরাইলি বাহিনীর মধ্যকার চলমান সংঘাতও এই চুক্তির মাধ্যমে স্থগিত রাখার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে, যাতে করে আঞ্চলিকভাবে শান্তি ফিরিয়ে আনা সম্ভব হয়।

২. হরমুজ প্রণালি উন্মুক্তকরণ ও নৌ-চলাচল স্বাভাবিক করা

বিশ্ব অর্থনীতির স্বার্থে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এই দফায় বলা হয়েছে, হরমুজ প্রণালি দিয়ে আন্তর্জাতিক সমুদ্রপথে সব ধরনের বাণিজ্যিক ও জ্বালানি পরিবহনকারী জাহাজের চলাচল পুনরায় সম্পূর্ণ চালু করা হবে। এই রুটে চলাচলকারী কোনো জাহাজের ওপর অতিরিক্ত কোনো শুল্ক বা কর আরোপ করা যাবে না এবং কোনো পক্ষই নৌ-চলাচলে কোনো প্রকার প্রতিবন্ধকতা বা সামরিক হুমকি সৃষ্টি করতে পারবে না।

৩. ইরানি বন্দরের ওপর মার্কিন অবরোধ প্রত্যাহার

যুদ্ধের শুরু থেকেই মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ইরানের সবকটি প্রধান ও কৌশলগত সমুদ্রবন্দরের ওপর যে কঠোর সামরিক ও অর্থনৈতিক অবরোধ আরোপ করে রেখেছিল, এই চুক্তির আওতায় তা অবিলম্বে প্রত্যাহার করে নেওয়ার প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছে। এর ফলে ইরান পুনরায় বিশ্বের অন্যান্য দেশের সাথে সরাসরি সামুদ্রিক বাণিজ্য শুরু করতে পারবে।

৪. মার্কিন নিষেধাজ্ঞা শিথিল এবং অবরুদ্ধ সম্পদ মুক্তকরণ

ইরানের অর্থনীতিকে পঙ্গু করে দেওয়ার জন্য বিগত বছরগুলোতে এবং বিশেষ করে এই যুদ্ধ চলাকালীন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র যেসব কঠোর অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছিল, তা পর্যায়ক্রমে শিথিল করার কথা বলা হয়েছে এই চুক্তিতে। সবচেয়ে বড় বিষয় হলো, বিশ্বের বিভিন্ন আন্তর্জাতিক ব্যাংকে ইরানের অবরুদ্ধ বা ফ্রিজ করে রাখা শত শত বিলিয়ন ডলারের রাষ্ট্রীয় সম্পদ অবমুক্ত বা রিলিজ করার বিষয়টি এই চুক্তির অন্তর্ভুক্ত রয়েছে, যা ইরানের বর্তমান ভঙ্গুর অর্থনৈতিক পরিস্থিতিতে এক বিশাল সঞ্জীবনী শক্তি হিসেবে কাজ করবে।

৫. ৩০,০০০ কোটি (৩০০ বিলিয়ন) ডলারের যুদ্ধপরবর্তী পুনর্গঠন তহবিল

যুদ্ধের কারণে ইরান এবং লেবাননের যেসব অঞ্চল ও অবকাঠামো ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, সেগুলো পুনর্গঠন এবং যুদ্ধপরবর্তী অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধারের জন্য একটি বিশাল বিনিয়োগ তহবিল গঠনের প্রস্তাব করা হয়েছে। চুক্তির শর্ত অনুযায়ী, এই তহবিলের আকার হবে ৩০,০০০ কোটি বা ৩০০ বিলিয়ন মার্কিন ডলার। এই আন্তর্জাতিক তহবিলটি ক্ষতিগ্রস্ত এলাকার পুনর্বাসন, হাসপাতাল, রাস্তাঘাট এবং আবাসন খাতের উন্নয়নে ব্যয় করা হবে।

আরও পড়ুন: খুলনায় গৃহকর্মী নির্যাতন: অভিযুক্ত পুলিশ দম্পতি আটক

৬. পারমাণবিক কর্মসূচি ও ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ নিয়ন্ত্রণ

আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের সবচেয়ে বড় উদ্বেগের জায়গা ছিল ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি। এই চুক্তির আওতায় ইরান পুনরায় এই মর্মে দৃঢ় প্রতিশ্রুতি পুনর্ব্যক্ত করেছে যে, তারা কোনো অবস্থাতেই পারমাণবিক অস্ত্র তৈরি বা ব্যবহারের চেষ্টা করবে না, যা তারা দীর্ঘ বছর ধরে দাবি করে আসছে। একই সাথে, ইরান তার বর্তমান উচ্চমাত্রায় সমৃদ্ধ ইউরেনিয়ামের মজুতকে আন্তর্জাতিক আণবিক শক্তি সংস্থার (IAEA) কঠোর তত্ত্বাবধান ও পরিদর্শনের অধীনে কম ঘনত্বে রূপান্তর করতে সম্মত হয়েছে।

তবে এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ কূটনৈতিক দ্বন্দ্বের বিষয়ও উঠে এসেছে। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্পের প্রবল ইচ্ছা এবং দাবি ছিল যে, ইরান যেন তাদের এই সমৃদ্ধ ইউরেনিয়ামের মজুতটি সম্পূর্ণভাবে বিদেশের মাটিতে পাঠিয়ে দেয়। কিন্তু ইরান অত্যন্ত কঠোরভাবে মার্কিন এই দাবি প্রত্যাখ্যান করেছে। ইরান স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছে যে, ইউরেনিয়ামের ঘনত্ব কমানো হলেও তা ইরানের নিজস্ব ভূখণ্ডের ভেতরেই থাকবে এবং কোনো অবস্থাতেই তা দেশের বাইরে পাঠানো হবে না। শেষ পর্যন্ত ট্রাম্পকে ইরানের এই অবস্থানের কাছে নতি স্বীকার করতে হয়েছে।

ট্রাম্পের সুরবদল এবং ক্ষেপণাস্ত্র নিষেধাজ্ঞা থেকে পিছুটান

এই চুক্তির অন্যতম সবচেয়ে চমকপ্রদ এবং আলোচিত দিক হলো মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্পের দীর্ঘদিনের কট্টর অবস্থান থেকে নাটকীয় সুরবদল। ফ্রান্সে অনুষ্ঠিত জি-৭ সম্মেলনে অংশ নেওয়ার সময় ট্রাম্প ইরানের বিরুদ্ধে সামরিক পদক্ষেপ ও যুদ্ধ বজায় রাখার পক্ষে অতীতে দেওয়া তার প্রধান যুক্তিগুলোর অন্তত একটি থেকে পুরোপুরি সরে এসেছেন।

অতীতে ডনাল্ড ট্রাম্প বারবার অত্যন্ত জোর দিয়ে বলেছিলেন যে, মধ্যপ্রাচ্যে শান্তি প্রতিষ্ঠা করতে হলে ইরানের ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র সক্ষমতা এবং এর দূরপাল্লার ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচিকে পুরোপুরি ধ্বংস করে দিতে হবে। ইরানকে কোনো ধরনের ক্ষেপণাস্ত্র রাখার অনুমতি দেওয়া হবে না বলেও তিনি অঙ্গীকার করেছিলেন। কিন্তু এই চুক্তিতে এসে ট্রাম্পের সেই কঠোর অবস্থান আর দেখা যায়নি। সংবাদ সম্মেলনে ট্রাম্প নিজের সুর নরম করে বলেন:

"আমি মনে করি, যদি বিশ্বের অন্যান্য দেশের কাছে নিজস্ব প্রতিরক্ষার জন্য ক্ষেপণাস্ত্র প্রযুক্তি এবং সক্ষমতা থাকতে পারে, তবে ইরানকে কোনো প্রকার ক্ষেপণাস্ত্র রাখার অনুমতি না দেওয়াটা কিছুটা অন্যায্য এবং বৈষম্যমূলক হবে।"

কূটনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, ট্রাম্পের এই সুরবদল আসলে এক ধরণের বাস্তবতার স্বীকৃতি। বিগত কয়েক মাসের যুদ্ধে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এবং ইসরাইল এটি খুব ভালো করেই অনুধাবন করতে পেরেছে যে, ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচি এবং এর ভূগর্ভস্থ সামরিক ঘাঁটিগুলো একটি পূর্ণাঙ্গ ও দীর্ঘস্থায়ী স্থলযুদ্ধ ছাড়া কেবল বিমান হামলা বা নিষেধাজ্ঞার মাধ্যমে পুরোপুরি ধ্বংস করা অসম্ভব। আর মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষে এই মুহূর্তে আরেকটি দীর্ঘমেয়াদী এবং ব্যয়বহুল স্থলযুদ্ধে জড়িয়ে পড়া কোনোভাবেই সম্ভব নয়। তাই ট্রাম্প বাস্তবতার নিরিখে ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচিকে মেনে নিতে বাধ্য হয়েছেন।

ট্রাম্পের নতুন হুমকি এবং তেহরানের বিজয়োল্লাস

ডনাল্ড ট্রাম্প ক্ষেপণাস্ত্র ইস্যুতে সুর নরম করলেও তার স্বভাবসুলভ কড়া হুমকি ও সামরিক আগ্রাসনের বার্তা থেকে পুরোপুরি সরে আসেননি। চুক্তি স্বাক্ষরের পর আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে তিনি অত্যন্ত আক্রমণাত্মক ভাষায় ইরানকে সতর্ক করে দিয়েছেন। ট্রাম্প বলেন:

"তারা যদি কোনোভাবে এই চুক্তির একটি শর্তও লঙ্ঘন করে, তবে আমরা তাদের ওপর এমন ভয়াবহ বোমাবর্ষণ করবো যা তারা কখনো কল্পনাও করেনি। আমি ব্যক্তিগতভাবে তা করতে চাই না। আমি আন্তরিকভাবে চাই তারা এই চুক্তিটি মেনে চলুক এবং শান্তি বজায় রাখুক।"

তিনি আরও যোগ করেন, "ইরানিরা অত্যন্ত বুদ্ধিমান জাতি। আমি আশা করি তারা নিজেদের ভালোটা বুঝবে।" ট্রাম্প আরও জানান যে, আগামী ৬০ দিনের মধ্যে মার্কিন এবং ইরানি আলোচকরা একটি স্থায়ী ও চূড়ান্ত যুদ্ধবিরতি এবং শান্তি চুক্তি প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে গভীর আলোচনা চালিয়ে যাবেন। ট্রাম্প আশা প্রকাশ করেন যে, এই সামগ্রিক শান্তি প্রক্রিয়া মধ্যপ্রাচ্যে দীর্ঘস্থায়ী স্থিতিশীলতা আনবে এবং বৈশ্বিক তেলের দাম উল্লেখযোগ্যভাবে হ্রাস করে বিশ্ব অর্থনীতিকে স্বস্তি দেবে।

আরও পড়ুন: কক্সবাজারে ৭ বছরের শিশুকে পাশবিক হত্যার পর লাশ গুম: গ্রেপ্তার ৩

তবে ট্রাম্পের এই চরম হুমকির পাশাপাশি তার আরেকটি অনানুষ্ঠানিক বক্তব্য আন্তর্জাতিক মহলে বেশ সমালোচিত হয়েছে। সংবাদ সম্মেলনের এক পর্যায়ে তিনি কিছুটা রসিকতা বা ঔদ্ধত্যের সুরে বলেন, "যদি এই চুক্তি আমার ভালো না লাগে, কিংবা তারা যদি আমাদের সাথে ভালো আচরণ না করে, তাহলে আমরা আবার তাদের মাথার মাঝখানে বোমা ফেলতে ফিরে যাব, ঠিক আছে?"

মার্কিন প্রেসিডেন্টের এই নতুন এবং বিতর্কিত হুমকির বিষয়ে ইরানের শীর্ষ রাজনৈতিক বা সামরিক নেতারা প্রকাশ্যে কোনো জোরালো মন্তব্য বা পাল্টা হুমকি দেননি। বরং তেহরানের বর্তমান প্রশাসন এই মুহূর্তটিকে তাদের একটি বিশাল কূটনৈতিক ও কৌশলগত বিজয় হিসেবে উদযাপন করছে। ইরান সরকারের পক্ষ থেকে এই চুক্তির একটি ঐতিহাসিক গুরুত্ব তুলে ধরা হচ্ছে। কারণ, ১৯৭৯ সালে ইরানে ঐতিহাসিক ইসলামি বিপ্লব সম্পন্ন হওয়ার পর এবং ইসলামি প্রজাতন্ত্র প্রতিষ্ঠার পর থেকে বিগত ৪৭ বছরে এই প্রথম মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এবং ইরানের কোনো প্রেসিডেন্টের সরাসরি স্বাক্ষরিত কোনো দ্বিপাক্ষিক চুক্তি বা নথির ছবি আনুষ্ঠানিকভাবে প্রকাশ করা হলো। এটি ইরানের জন্য একটি বিশাল মনস্তাত্ত্বিক এবং রাজনৈতিক বিজয়।

ইরানের প্রধান আলোচক এবং দেশটির প্রভাবশালী রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব মোহাম্মদ বাঘের গালিবাফ রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে অত্যন্ত গর্বের সাথে বলেন:

"বিগত কয়েক মাসের তীব্র সামরিক পদক্ষেপ ও লড়াইয়ের মাধ্যমে আমরা মাঠে যা অর্জন করতে চেয়েছিলাম বা যা আমাদের লক্ষ্য ছিল, তার চেয়ে বহু গুণ বেশি এবং অভাবনীয় সাফল্য আমরা এই আলোচনার টেবিল থেকে আদায় করতে পেরেছি। সামরিক যুদ্ধ এবং এই কূটনৈতিক আলোচনার সাফল্যের মধ্যে কোনো তুলনাই চলে না। আমরা আমাদের সার্বভৌমত্ব এবং মূল সামরিক সক্ষমতা বজায় রেখেই দেশের জন্য শত শত বিলিয়ন ডলারের অর্থনৈতিক সুবিধা নিশ্চিত করেছি।"

কার জয়, কার পরাজয়? লক্ষ্য অর্জনে ট্রাম্পের ব্যর্থতা

এই অন্তর্বর্তীকালীন যুদ্ধবিরতি চুক্তির পুঙ্খানুপুঙ্খ বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, যুদ্ধ শুরু করার সময় মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্প যে বিশাল এবং উচ্চাভিলাষী লক্ষ্যগুলোর কথা ঘোষণা করেছিলেন, বাস্তবে তিনি তার খুব সামান্যই অর্জন করতে পেরেছেন। ট্রাম্পের মূল লক্ষ্য ছিল ইরানের ইসলামি শাসনব্যবস্থা বা ধর্মীয় সরকারকে ক্ষমতাচ্যুত করা অথবা তাদের এমনভাবে দুর্বল করে দেওয়া যাতে তারা মার্কিন শর্ত মেনে নিতে বাধ্য হয়। কিন্তু বাস্তবে দেখা যাচ্ছে, ইরানের ধর্মীয় সরকার এখনও অত্যন্ত শক্তিশালীভাবে ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত রয়েছে।

ট্রাম্পের অন্য আরেকটি বড় লক্ষ্য ছিল ইরানের উচ্চমাত্রায় সমৃদ্ধ ইউরেনিয়ামের মজুত সম্পূর্ণ ধ্বংস করা বা তা দেশের বাইরে পাঠিয়ে দেওয়া এবং তাদের ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচি মাটির সাথে মিশিয়ে দেওয়া। কিন্তু এই চুক্তির পর দেখা যাচ্ছে, ইরান তার সমৃদ্ধ ইউরেনিয়ামের মজুত সমর্পণ করেনি এবং তা নিজের দেশেই রাখছে। তাদের ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচিও পুরোপুরি অক্ষত রয়েছে। সবচেয়ে বড় বিষয় হলো, মধ্যপ্রাচ্যে ইসরাইলবিরোধী প্রতিরোধ অক্ষ—যেমন লেবাননের হিজবুল্লাহ, ফিলিস্তিনের হামাস বা ইয়েমেনের হুথিদের প্রতি ইরানের যে রাজনৈতিক ও সামরিক সমর্থন, তা বন্ধ করার বিষয়েও এই চুক্তিতে ইরানকে বাধ্য করা যায়নি।

অন্যদিকে, ইরানের দৃষ্টিকোণ থেকে দেখলে, তারা আগের তুলনায় অনেক সুবিধাজনক অবস্থানে পৌঁছেছে। কঠোর মার্কিন নিষেধাজ্ঞার কারণে দেশটির অর্থনীতি যে তীব্র সংকটের মধ্য দিয়ে যাচ্ছিল, এই চুক্তি এবং নিষেধাজ্ঞা শিথিলের মাধ্যমে তারা শত শত বিলিয়ন ডলারের অবরুদ্ধ অর্থনৈতিক সুবিধা পাওয়ার অনেক কাছাকাছি পৌঁছে গেছে। একই সাথে ৩০০ বিলিয়ন ডলারের পুনর্গঠন তহবিল তাদের অভ্যন্তরীণ অবকাঠামো সংস্কারে বিশাল ভূমিকা রাখবে। তাই আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকদের বড় একটি অংশ মনে করছেন, এই চুক্তিতে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের চেয়ে ইরানের কূটনৈতিক ও কৌশলগত বিজয় অনেক বেশি স্পষ্ট।

আন্তর্জাতিক প্রতিক্রিয়া: জি-৭ জোটের স্বাগত বার্তা

ঐতিহাসিক এই ট্রাম্প-পেজেশকিয়ান চুক্তি প্রকাশের পর বিশ্বজুড়ে মিশ্র কিন্তু মূলত ইতিবাচক প্রতিক্রিয়া দেখা গেছে। ফ্রান্সে অনুষ্ঠিত জি-৭ শীর্ষ সম্মেলনে অংশ নেওয়া বিশ্বের প্রধান গণতান্ত্রিক ও অর্থনৈতিক পরাশক্তিগুলোর নেতারা এই চুক্তিকে এক যৌথ বিবৃতির মাধ্যমে জোরালোভাবে স্বাগত জানিয়েছেন। ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল মাক্রন, জার্মানির চ্যান্সেলর, যুক্তরাজ্যের প্রধানমন্ত্রী, জাপানের প্রধানমন্ত্রী, ইতালির প্রধানমন্ত্রী এবং কানাডার প্রধানমন্ত্রী মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সাথে একাত্মতা প্রকাশ করে এই চুক্তিকে মধ্যপ্রাচ্যের শান্তি পুনরুদ্ধারের প্রথম বাস্তবসম্মত পদক্ষেপ হিসেবে অভিহিত করেছেন।

আরও পড়ুন: সংসদে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী: বিএসএফের ৩৬টি পুশইন চেষ্টা রুখে দিয়েছে বিজিবি

জি-৭ নেতারা তাদের যৌথ বিবৃতিতে বলেন যে, এই চুক্তি কেবল মার্কিন-ইরান সংঘাতেরই অবসান ঘটাবে না, বরং তা সমগ্র মধ্যপ্রাচ্যের উত্তেজনা প্রশমনে সাহায্য করবে। একই সাথে তারা লেবাননে অবিলম্বে পূর্ণাঙ্গ যুদ্ধবিরতি কার্যকর করার এবং সেখানে মানবিক সহায়তা পৌঁছানোর জন্য সব পথ উন্মুক্ত করার আহ্বান জানিয়েছেন। তারা আশা প্রকাশ করেন যে, আগামী ৬০ দিনের মধ্যে দুই পক্ষের আলোচকরা একটি স্থায়ী শান্তিচুক্তিতে পৌঁছাতে সক্ষম হবেন, যা বিশ্ব অর্থনীতি ও নিরাপত্তার জন্য অত্যন্ত জরুরি।

ইসরাইলের ভিন্ন সুর এবং নেতানিয়াহুকে ট্রাম্পের পরোক্ষ ভর্ৎসনা

এই চুক্তির ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় ব্যতিক্রমী এবং অসন্তোষজনক অবস্থান লক্ষ্য করা গেছে ইসরাইলের পক্ষ থেকে। উল্লেখ্য, এই যুদ্ধবিরতি এবং দীর্ঘ কূটনৈতিক আলোচনার কোনো অংশেই ইসরাইলকে অন্তর্ভুক্ত করা হয়নি। ইসরাইল এই আলোচনার বাইরে ছিল। বর্তমানে ইসরাইলি প্রতিরক্ষা বাহিনী (IDF) দক্ষিণ লেবাননের বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ এলাকা সামরিকভাবে দখল করে রেখেছে এবং সেখানে তাদের অভিযান পরিচালনা করছে।

এই চুক্তির প্রতিক্রিয়ায় ইসরাইল সরকারের পক্ষ থেকে অত্যন্ত কঠোর এবং ভিন্ন সুর শোনানো হয়েছে। তেল আবিব স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছে যে, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এবং ইরানের মধ্যে কী চুক্তি হলো, তাতে ইসরাইলের কিছু যায় আসে না। তারা নিজেদের জাতীয় নিরাপত্তা সুরক্ষার স্বার্থে এবং উত্তর ইসরাইলের নাগরিকদের ঘরে ফিরিয়ে নেওয়ার জন্য যখন প্রয়োজন হবে, তখন যেকোনো স্থানে শক্তি প্রয়োগের এবং সামরিক অভিযান চালানোর সার্বভৌম অধিকার সংরক্ষণ করে। অর্থাৎ, ইসরাইল এই যুদ্ধবিরতি চুক্তি মানতে আইনগত বা নৈতিকভাবে বাধ্য নয় বলে ইঙ্গিত দিয়েছে।

এদিকে, বুধবার সংবাদ সম্মেলনে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্প ইসরাইলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুকে অত্যন্ত নজিরবিহীন এবং পরোক্ষভাবে ভর্ৎসনা করেছেন। নেতানিয়াহু শুরু থেকেই এই মার্কিন-ইরান চুক্তির তীব্র বিরোধিতা করে আসছিলেন এবং এর থেকে একটি নিরাপদ দূরত্ব বজায় রাখছিলেন। তিনি লেবাননে হিজবুল্লাহর বিরুদ্ধে ইসরাইলের সামরিক অভিযানে কোনো ধরনের আন্তর্জাতিক সীমাবদ্ধতা বা যুদ্ধবিরতি মেনে নিতে একেবারেই রাজি নন। নেতানিয়াহুর এই যুদ্ধংদেহী মনোভাবের সমালোচনা করে ট্রাম্প বলেন:

"নেতানিয়াহু অত্যন্ত ভালো একজন মানুষ, এতে কোনো সন্দেহ নেই। তবে কখনো কখনো তিনি একটু বেশি উত্তেজিত এবং আবেগপ্রবণ হয়ে পড়েন। বিশেষ করে লেবানন এবং হিজবুল্লাহর বিরুদ্ধে সামরিক অভিযানের বিষয়ে আমাদের মধ্যে সামান্য কিছু মতপার্থক্য বা দৃষ্টিভঙ্গির অমিল আছে। আমি বিবিকে (নেতানিয়াহুর ডাকনাম) সবসময় বলি, কিছুটা নরমভাবে এবং কৌশলগত উপায়ে এগোনো যায়, বিবি। হিজবুল্লাহর কোনো একজন সদস্য বা লড়াকু যদি কোনো সাধারণ ভবনে গিয়ে আশ্রয় নেয়, তার জন্য পুরো ভবনটি বোমা মেরে উড়িয়ে দেওয়ার বা ধ্বংস করে দেওয়ার কোনো প্রয়োজন নেই। আমাদের বেসামরিক মানুষের জীবনের প্রতি আরও সংবেদনশীল হতে হবে।"

ট্রাম্পের এই মন্তব্য থেকে এটি স্পষ্ট যে, মার্কিন প্রশাসন এখন ইসরাইলের দীর্ঘমেয়াদী যুদ্ধ নীতির ওপর কিছুটা বিরক্ত এবং তারা মধ্যপ্রাচ্যে নিজেদের স্বার্থেই একটি দ্রুত স্থিতিশীলতা চায়।

মাঠপর্যায়ের বাস্তব চিত্র: লেবাননে অব্যাহত সংঘাত ও উত্তেজনা

কাগজে-কলমে এবং কূটনৈতিক টেবিলে বুধবার থেকেই যুদ্ধবিরতি চুক্তি কার্যকর হওয়ার কথা ঘোষণা করা হলেও, মাঠপর্যায়ের বা গ্রাউন্ড রিয়েলিটির চিত্র এখনও বেশ জটিল এবং উদ্বেগজনক। বিশেষ করে দক্ষিণ লেবানন এবং ইসরাইল সীমান্তে উত্তেজনা এখনো পুরোপুরি প্রশমিত হয়নি। লেবাননের রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যমের প্রতিবেদন অনুযায়ী, বুধবার সকালেও দক্ষিণ লেবাননের বেশ কয়েকটি সীমান্ত শহর ও গ্রামে নতুন করে ইসরাইলি বিমান বাহিনী তীব্র বিমান হামলা এবং আর্টিলারি বা গোলাবর্ষণ পরিচালনা করেছে। এর ফলে বেশ কিছু ঘরবাড়ি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।

আরও পড়ুন: ইরানের ওপর থেকে নৌ অবরোধ প্রত্যাহার যুক্তরাষ্ট্রের

পাল্টা পদক্ষেপ হিসেবে লেবাননের নিরাপত্তা সূত্রগুলো নিশ্চিত করেছে যে, ইরান-সমর্থিত সশস্ত্র গোষ্ঠী হিজবুল্লাহও দক্ষিণ লেবাননের ভেতরে অবস্থানরত ইসরাইলি অগ্রগামী বাহিনীর ওপর একটি অত্যন্ত নিখুঁত ও আকস্মিক ড্রোন হামলা চালিয়েছে। দুটি আত্মঘাতী ড্রোন দিয়ে এই হামলা চালানো হয়। যদিও হিজবুল্লাহর পক্ষ থেকে এই হামলার বিষয়ে এখনও আনুষ্ঠানিকভাবে কোনো দায় স্বীকার বা বিবৃতি দেওয়া হয়নি।

পরবর্তীতে ইসরাইলি সামরিক বাহিনীর (IDF) পক্ষ থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে স্বীকার করা হয়েছে যে, দক্ষিণ লেবাননে হিজবুল্লাহর চালানো দুটি ড্রোন হামলায় তাদের অন্তত পাঁচজন সেনা গুরুতরভাবে আহত হয়েছেন। আহত সেনাদের হেলিকপ্টার যোগে উত্তর ইসরাইলের হাসপাতালে স্থানান্তর করা হয়েছে। এই মাঠপর্যায়ের সংঘাত এটিই প্রমাণ করে যে, চুক্তি সই হলেও তা পুরোপুরি বাস্তবায়ন করা এবং সব পক্ষকে, বিশেষ করে ইসরাইল ও হিজবুল্লাহকে এই চুক্তির শর্তের মধ্যে ধরে রাখা আগামী দিনগুলোতে মার্কিন ও আন্তর্জাতিক কূটনীতির জন্য এক বিশাল বড় চ্যালেঞ্জ হতে যাচ্ছে।

উপসংহার: আগামী ৬০ দিনের অনিশ্চিত ভবিষ্যৎ

পরিশেষে বলা যায়, ট্রাম্প-পেজেশকিয়ান এই অন্তর্বর্তীকালীন যুদ্ধবিরতি চুক্তিটি নিঃসন্দেহে একবিংশ শতাব্দীর ভূরাজনীতিতে একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও ঐতিহাসিক ঘটনা। এটি গত কয়েক মাসের রক্তক্ষয়ী সংঘাতের অবসান ঘটিয়ে বিশ্ববাসীকে, বিশেষ করে বিশ্ব অর্থনীতি ও সাধারণ মানুষকে একটি বড় ধরণের বিপর্যয় থেকে রক্ষা করেছে। হরমুজ প্রণালি পুনরায় উন্মুক্ত হওয়ার সম্ভাবনায় ইতিমধ্যেই আন্তর্জাতিক বাজারে অপরিশোধিত ব্রেন্ট ক্রুড তেলের দাম ব্যারেল প্রতি ৮০ ডলারের নিচে নেমে এসেছে, যা বিশ্বজুড়ে মূল্যস্ফীতি কমাতে বড় ভূমিকা রাখবে।

তবে এই শান্তি কতটা স্থায়ী হবে, তা নিয়ে এখনও গভীর সংশয় রয়ে গেছে। ট্রাম্পের "মাথার মাঝখানে বোমা ফেলার" হুমকি এবং ইসরাইলের এককভাবে শক্তি প্রয়োগের ঘোষণা এই চুক্তির স্থায়িত্বকে যেকোনো সময় ঝুঁকির মুখে ফেলতে পারে। আগামী ৬০ দিন অত্যন্ত আশঙ্কাজনক এবং গুরুত্বপূর্ণ। এই সময়ের মধ্যে মার্কিন ও ইরানি কূটনীতিকরা কি একটি পূর্ণাঙ্গ এবং স্থায়ী শান্তি চুক্তি প্রণয়ন করতে পারবেন, নাকি এটি কেবলই আরেকটি বড় ঝড়ের আগের সাময়িক নীরবতা—তা সময়ই বলে দেবে। তবে আপাতত, বিশ্ববাসী মধ্যপ্রাচ্যের এই সাময়িক শান্তিতে কিছুটা হলেও স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলছে।

Post a Comment

আপনার মূল্যবান মতামত আমাদের জানান। কোনো উসকানিমূলক বা অশালীন মন্তব্য করা থেকে বিরত থাকুন।

নবীনতর পূর্বতন