জাতীয় ডেস্ক: শামীম হোসাইন / দিগন্ত বাংলা নিউজ
বিএমএতে ৯০তম দীর্ঘমেয়াদি কোর্সের ঐতিহাসিক রাষ্ট্রপতি কুচকাওয়াজ সম্পন্ন: আধুনিক সমরাস্ত্রে সজ্জিত পেশাদার সামরিক বাহিনী গড়ে তোলার দৃঢ় প্রত্যয় ব্যক্ত করলেন সেনাবাহিনী প্রধান জেনারেল ওয়াকার-উজ-জামান
বাংলাদেশ সামরিক বাহিনীর গৌরব, ঐতিহ্য এবং পেশাদারিত্বের এক অনন্য ও বর্ণাঢ্য অধ্যায় রচিত হলো চট্টগ্রামের ভাটিয়ারিস্থ বাংলাদেশ মিলিটারি একাডেমি (বিএমএ) প্যারেড গ্রাউন্ডে। আজ এক জাঁকজমকপূর্ণ ও মর্যাদাপূর্ণ পরিবেশের মধ্য দিয়ে সম্পন্ন হয়েছে বাংলাদেশ মিলিটারি একাডেমির ৯০তম দীর্ঘমেয়াদি কোর্সের অফিসার ক্যাডেটদের কমিশন প্রাপ্তি উপলক্ষ্যের ঐতিহাসিক ‘রাষ্ট্রপতি কুচকাওয়াজ’। দীর্ঘ তিন বছরের অত্যন্ত কঠোর, নিয়মতান্ত্রিক এবং সুশৃঙ্খল সামরিক প্রশিক্ষণ সমাপ্তি শেষে একঝাঁক তরুণ ও উদ্যমী অফিসার আজ দেশের সার্বভৌমত্ব রক্ষার পবিত্র মন্ত্রে দীক্ষিত হয়ে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীতে আনুষ্ঠানিকভাবে যোগদান করেছেন।
ঐতিহাসিক এই গৌরবময় অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের সেনাবাহিনী প্রধান জেনারেল ওয়াকার-উজ-জামান, এসবিপি, ওএসপি, এসজিপি, পিএসসি। তিনি বিএমএ প্যারেড গ্রাউন্ডে উপস্থিত হয়ে মনোজ্ঞ কুচকাওয়াজ অত্যন্ত গুরুত্ব সহকারে পরিদর্শন করেন এবং সুসজ্জিত প্যারেডের অভিবাদন গ্রহণ করেন। কুচকাওয়াজ পরিদর্শন শেষে তিনি নবীন অফিসারদের পেশাগত জীবনের সাফল্য কামনা করে কৃতি ক্যাডেটদের মাঝে মহামূল্যবান পুরস্কার বিতরণ করেন। নবীন সামরিক কর্মকর্তাদের এই গৌরবোজ্জ্বল মুহূর্তে তাদের পিতা-মাতা, অভিভাবক এবং দেশি-বিদেশি উচ্চপদস্থ অতিথিদের উপস্থিতিতে সমগ্র বিএমএ প্রাঙ্গণ এক আবেগঘন ও উৎসবমুখর পরিবেশে রূপ নেয়।
দেশ মাতৃকার সার্বভৌমত্ব রক্ষায় সেনাপ্রধানের দিকনির্দেশনা ও প্রত্যয়
কুচকাওয়াজ অনুষ্ঠান শেষে প্রশিক্ষণ সমাপনকারী নবীন অফিসার ক্যাডেটদের উদ্দেশ্যে এক দিকনির্দেশনামূলক ও অনুপ্রেরণাদায়ী ভাষণ প্রদান করেন সেনাবাহিনী প্রধান জেনারেল ওয়াকার-উজ-জামান। তিনি তাঁর বক্তব্যের শুরুতেই কঠোর পরিশ্রমের মাধ্যমে সফলভাবে প্রশিক্ষণ সম্পন্নকারী সকল নবীন অফিসারদের আন্তরিক অভিনন্দন জানান। সেনাপ্রধান অত্যন্ত গুরুত্বের সাথে উল্লেখ করেন যে, আজকের এই আনুষ্ঠানিক শপথ গ্রহণের মধ্য দিয়ে সদ্য কমিশনপ্রাপ্ত তরুণ অফিসারদের কাঁধে ন্যস্ত হলো পবিত্র দেশ মাতৃকার স্বাধীনতা, অখণ্ডতা এবং সার্বভৌমত্ব রক্ষার এক মহান ও গুরুদায়িত্ব।
"সেনাবাহিনী কেবল একটি চাকরি নয়, এটি দেশ সেবার এক সর্বোচ্চ ব্রত। আজকের পর থেকে দেশের যেকোনো সংকটে, সীমানা রক্ষায় এবং দেশের মানুষের জানমালের সুরক্ষায় আপনাদেরকে সর্বদা অগ্রভাগে থাকতে হবে।"
আরও পড়ুন: ট্রাম্প-পেজেশকিয়ান ঐতিহাসিক চুক্তি: মধ্যপ্রাচ্যে নতুন ভূরাজনীতির সমীকরণ
ভাষণ চলাকালীন সেনাবাহিনী প্রধান বাংলাদেশ সেনাবাহিনীকে সময়ের সাথে তাল মিলিয়ে বিশ্বের বুকে একটি অত্যন্ত প্রশিক্ষিত, সুশৃঙ্খল এবং আধুনিক সমরাস্ত্রে সজ্জিত পেশাদার বাহিনী হিসেবে গড়ে তোলার ব্যাপারে তাঁর দৃঢ় ও আপসহীন প্রত্যয় ব্যক্ত করেন। তিনি বলেন, বর্তমান পরিবর্তনশীল ভূরাজনৈতিক প্রেক্ষাপট এবং আধুনিক যুদ্ধক্ষেত্রের নানামুখী চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় বাংলাদেশ সেনাবাহিনীকে প্রতিনিয়ত আধুনিকায়ন করা হচ্ছে। উন্নত প্রযুক্তির সংযোজন এবং বিশ্বমানের সামরিক প্রশিক্ষণের মাধ্যমে এই বাহিনীকে একটি বহুমাত্রিক ও আধুনিক বাহিনীতে রূপান্তর করার প্রক্রিয়া চলমান রয়েছে। পরিশেষে, সেনাপ্রধান অত্যন্ত চমৎকার ও চোখ ধাঁধানো মনোমুগ্ধকর কুচকাওয়াজ প্রদর্শনের জন্য বাংলাদেশ মিলিটারি একাডেমির কমান্ড্যান্ট, সংশ্লিষ্ট সকল সামরিক কর্মকর্তা, জেসিও, এনসিও, সৈনিক এবং অসামরিক কর্মকর্তা-কর্মচারীদের অক্লান্ত পরিশ্রমের ভূয়সী প্রশংসা করেন এবং তাদের আন্তরিক ধন্যবাদ জ্ঞাপন করেন।
কমিশনপ্রাপ্তির পরিসংখ্যান: নারী নেতৃত্ব ও আন্তর্জাতিক ভ্রাতৃত্বের অনন্য নজির
বাংলাদেশ মিলিটারি একাডেমির ৯০তম দীর্ঘমেয়াদি কোর্সের এই কুচকাওয়াজটি নানাবিধ কারণে অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ ছিল। দীর্ঘ তিন বছরের হাড়ভাঙা খাটুনি, মানসিক দৃঢ়তার পরীক্ষা এবং কঠোর সামরিক কৌশল রপ্ত করার পর আজ এই বিশেষ কুচকাওয়াজের মাধ্যমে সর্বমোট ১৮৪ জন অফিসার ক্যাডেট বাংলাদেশ সেনাবাহিনীতে নিয়মিত অফিসার হিসেবে কমিশন লাভ করেছেন।
আধুনিক বাংলাদেশ সেনাবাহিনীতে নারীদের ক্রমবর্ধমান অংশগ্রহণ এবং সাফল্যের চিত্রটি এই কোর্সেও অত্যন্ত জাজ্বল্যমান। কমিশনপ্রাপ্ত মোট ১৮৪ জন অফিসারের মধ্যে ১৬৬ জন পুরুষ অফিসার এবং ১৮ জন নারী অফিসার রয়েছেন। নবীন এই নারী কর্মকর্তারা পুরুষ সহকর্মীদের কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে দেশের প্রতিরক্ষায় সমভাবে অবদান রাখার গৌরব অর্জন করলেন।
কেবল দেশীয় ক্যাডেটই নয়, আন্তর্জাতিক অঙ্গনেও বাংলাদেশ মিলিটারি একাডেমির প্রশিক্ষণের মান যে অত্যন্ত উচ্চমানের, তার প্রমাণ মিলেছে এই কুচকাওয়াজে বিদেশী ক্যাডেটদের অংশগ্রহণের মাধ্যমে। এই বিশেষ কোর্সে বন্ধুপ্রতিম বিভিন্ন দেশের মোট ০৭ জন বিদেশী অফিসার ক্যাডেট সফলভাবে তাদের সামরিক প্রশিক্ষণ সম্পন্ন করেছেন। প্রশিক্ষণ শেষে তারা নিজ নিজ দেশের সেনাবাহিনীতে যোগদান করে দেশের সেবায় আত্মনিয়োগ করবেন। বিদেশী ক্যাডেটদের দেশভিত্তিক পরিসংখ্যান নিচে দেওয়া হলো:
ফিলিস্তিন: ০৪ জন অফিসার ক্যাডেট
তানজানিয়া: ০১ জন অফিসার ক্যাডেট
জাম্বিয়া: ০১ জন অফিসার ক্যাডেট
মালদ্বীপ: ০১ জন অফিসার ক্যাডেট
আন্তর্জাতিক এই ক্যাডেটদের সফল অংশগ্রহণ প্রমাণ করে যে, বিএমএ আজ কেবল বাংলাদেশের নয়, বরং বৈশ্বিক সামরিক মানচিত্রে একটি অত্যন্ত নির্ভরযোগ্য ও আন্তর্জাতিক মানের সামরিক প্রশিক্ষণ প্রতিষ্ঠান হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করতে সক্ষম হয়েছে।
আরও পড়ুন: যুক্তরাষ্ট্র-ইরান গোপন চুক্তির নথি ফাঁস: ১৪ দফায় যা থাকছে
শ্রেষ্ঠত্বের স্বীকৃতি: সোর্ড অব অনার ও মেডেল প্রাপ্তির গৌরব
প্রতিটি বিএমএ দীর্ঘমেয়াদি কোর্সের সমাপনীতে ক্যাডেটদের দীর্ঘ তিন বছরের সামগ্রিক পারফরম্যান্স, শৃঙ্খলা, নেতৃত্ব এবং সামরিক বিষয়ের ওপর ভিত্তি করে শ্রেষ্ঠ ক্যাডেটদের পুরস্কৃত করা হয়। ৯০তম বিএমএ দীর্ঘমেয়াদি কোর্সে নিজের অসামান্য মেধা, শারীরিক সক্ষমতা এবং অনন্য সাধারণ নেতৃত্বের গুণাবলী প্রদর্শন করে সেরা চৌকশ ক্যাডেট হওয়ার গৌরব অর্জন করেছেন ব্যাটালিয়ন সিনিয়র আন্ডার অফিসার খায়রুল ইসলাম।
তিনি তাঁর এই অসাধারণ কৃতিত্বের স্বীকৃতিস্বরূপ বিএমএ-এর সর্বোচ্চ সম্মানজনক পুরস্কার 'সোর্ড অব অনার' (Sword of Honor) লাভ করেন। এখানেই শেষ নয়, সামরিক বিষয়ে তাত্ত্বিক ও ব্যবহারিক উভয় ক্ষেত্রেই সর্বশ্রেষ্ঠ পারফরম্যান্স ও শ্রেষ্ঠত্ব প্রদর্শনের জন্য তিনি একই সাথে অর্জন করেন অত্যন্ত মর্যাদাপূর্ণ 'সেনাবাহিনী প্রধান স্বর্ণপদক'। একই সাথে দুটি সর্বোচ্চ সম্মাননা অর্জন করে তিনি বিএমএ-এর ইতিহাসে এক অনন্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করলেন।
পাশাপাশি, এই একাডেমিতে প্রশিক্ষণ গ্রহণকারী বিদেশী ক্যাডেটদের মধ্যে যিনি নিজের কঠোর পরিশ্রমের মাধ্যমে সর্বশ্রেষ্ঠ বিদেশী ক্যাডেট হিসেবে নিজেকে প্রমাণ করেছেন, তিনি হলেন তানজানিয়ার সার্জেন্ট আবু বকর। সামরিক প্রশিক্ষণে অনন্য সাধারণ কৃতিত্ব প্রদর্শনের জন্য তাঁকে সম্মানজনক 'বিএমএ ট্রফি অব এক্সিলেন্স' (BMA Trophy of Excellence) প্রদান করা হয়। প্রধান অতিথি জেনারেল ওয়াকার-উজ-জামান অত্যন্ত আনন্দের সাথে এই কৃতি ক্যাডেটদের হাতে পুরস্কারসমূহ তুলে দেন এবং তাদের উজ্জ্বল ভবিষ্যৎ কামনা করেন।
শপথ গ্রহণ ও র্যাঙ্ক-ব্যাজ পরিধানের আবেগঘন মুহূর্ত
পুরস্কার বিতরণী পর্ব শেষ হওয়ার পর প্যারেড গ্রাউন্ডে উপস্থিত সকলের সামনে এক গম্ভীর ও আবেগঘন পরিবেশের সৃষ্টি হয়। প্রশিক্ষণ সমাপনকারী নবীন ক্যাডেটগণ পবিত্র সংবিধানের প্রতি আনুগত্য এবং দেশের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব বজায় রাখার জন্য আনুষ্ঠানিকভাবে সমস্বরে শপথ বাক্য পাঠ করেন। দেশের জন্য প্রয়োজনে নিজের সর্বোচ্চ ত্যাগ স্বীকার করার এই শপথ অনুষ্ঠানটি ছিল অত্যন্ত জাঁকজমকপূর্ণ।
শপথ গ্রহণ পর্ব সম্পন্ন হওয়ার পর শুরু হয় ক্যাডেটদের দীর্ঘ প্রতীক্ষিত র্যাঙ্ক-ব্যাজ পরিধানের অনুষ্ঠান। প্যারেড গ্রাউন্ডে উপস্থিত নবীন অফিসারদের গর্বিত পিতা-মাতা, অভিভাবক এবং অনুষ্ঠানে আগত উর্ধ্বতন অতিথিবৃন্দ অত্যন্ত আনন্দঘন পরিবেশে নবীন অফিসারদের কাঁধে অফিসার পদের মর্যাদাপূর্ণ 'র্যাঙ্ক-ব্যাজ' পরিয়ে দেন। দীর্ঘ তিন বছরের কঠোর সাধনার পর নিজেদের সন্তানদের কাঁধে এই ব্যাজ দেখে অনেক পিতা-মাতার চোখেই আনন্দের অশ্রু লক্ষ্য করা যায়। নবীন অফিসাররাও তাদের পিতা-মাতার চরণে সালাম জানিয়ে এবং আলিঙ্গন করে এই বিশেষ মুহূর্তটিকে স্মরণীয় করে রাখেন।
উচ্চপদস্থ অতিথিদের উপস্থিতি ও বর্ণাঢ্য অভ্যর্থনা
আজকের এই বর্ণাঢ্য অনুষ্ঠানের শুরুটা ছিল অত্যন্ত চমৎকার। প্রধান অতিথি সেনাবাহিনী প্রধান জেনারেল ওয়াকার-উজ-জামান যখন বিএমএ প্যারেড গ্রাউন্ডে এসে পৌঁছান, তখন বিএমএ-এর ঐতিহ্যবাহী রীতি অনুযায়ী তাঁকে গার্ড অব অনার প্রদান করা হয়। এ সময় প্রধান অতিথিকে উষ্ণ অভ্যর্থনা জানান: ১. ভারপ্রাপ্ত জেনারেল অফিসার কমান্ডিং (জিওসি), আর্মি ট্রেনিং অ্যান্ড ডকট্রিন কমান্ড (ARTDOC) ও কমান্ড্যান্ট, বাংলাদেশ মিলিটারি একাডেমি। ২. ২৪ পদাতিক ডিভিশনের জেনারেল অফিসার কমান্ডিং (জিওসি) এবং এরিয়া কমান্ডার, চট্টগ্রাম এরিয়া।
আরও পড়ুন: মহানায়িকা শাবানার জন্মদিন: রূপালি পর্দার চিরসবুজ এক অধ্যায়
এই ঐতিহাসিক কুচকাওয়াজ প্রত্যক্ষ করার জন্য বিএমএ প্যারেড গ্রাউন্ডে এক বিশাল হাই-প্রোফাইল সুধী সমাবেশ ঘটেছিল। অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের সম্মানিত সংসদ সদস্যগণ, দেশি-বিদেশি উচ্চপদস্থ সামরিক ও অসামরিক কর্মকর্তাবৃন্দ, বাংলাদেশে নিযুক্ত বিভিন্ন দেশের ডিফেন্স অ্যাটাশে ও কূটনৈতিক ব্যক্তিবর্গ, সদ্য কমিশনপ্রাপ্ত নবীন অফিসারদের গর্বিত পিতা-মাতা ও অভিভাবকগণ, আমন্ত্রিত বিশিষ্ট নাগরিকবৃন্দ এবং বিভিন্ন প্রিন্ট ও ইলেকট্রনিক গণমাধ্যমের ব্যক্তিবর্গ। উপস্থিত সকলেই অত্যন্ত সুশৃঙ্খল এবং নিখুঁত এই বর্ণাঢ্য কুচকাওয়াজ প্রত্যক্ষ করে ক্যাডেটদের ভূয়সী প্রশংসা করেন।
বিএমএ-তে নতুন দিগন্ত: '২য় বাংলাদেশ ব্যাটালিয়ন' ও মেগা প্রকল্পসমূহের শুভ উদ্বোধন
কুচকাওয়াজ অনুষ্ঠান সফলভাবে সম্পন্ন করার পর সেনাবাহিনী প্রধান জেনারেল ওয়াকার-উজ-জামান বাংলাদেশ মিলিটারি একাডেমির সার্বিক সক্ষমতা ও অবকাঠামোগত উন্নয়নের লক্ষ্যে বেশ কয়েকটি যুগান্তকারী মেগা প্রকল্পের শুভ উদ্বোধন করেন। এর মধ্যে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ এবং ঐতিহাসিক সংযোজন হলো বিএমএ-তে '২য় বাংলাদেশ ব্যাটালিয়ন' এর শুভ উদ্বোধন।
১. '২য় বাংলাদেশ ব্যাটালিয়ন' প্রতিষ্ঠার লক্ষ্য ও গুরুত্ব
বর্তমান একবিংশ শতাব্দীর আধুনিক ও হাইব্রিড যুদ্ধক্ষেত্রের নানামুখী জটিল চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করার জন্য অফিসার ক্যাডেটদের আরও উন্নত, বিশেষায়িত এবং বিশ্বমানের প্রশিক্ষণ প্রদান করা অত্যন্ত জরুরি হয়ে পড়েছে। বিএমএ-তে প্রশিক্ষণরত অফিসার ক্যাডেটগণের পেশাগত দক্ষতা, কৌশলগত নেতৃত্বের যোগ্যতা অর্জন এবং প্রশিক্ষণের সার্বিক মানকে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে উন্নীত করার দূরদর্শী লক্ষ্য নিয়েই এই নতুন ব্যাটালিয়নটি প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে। এতদিন বিএমএ-তে শুধুমাত্র '১ম বাংলাদেশ ব্যাটালিয়ন' এর মাধ্যমে প্রশিক্ষণ কার্যক্রম পরিচালিত হতো। এখন থেকে '১ম বাংলাদেশ ব্যাটালিয়ন' এর পাশাপাশি নবগঠিত '২য় বাংলাদেশ ব্যাটালিয়ন' পূর্ণাঙ্গভাবে কাজ শুরু করায় ক্যাডেটদের প্রশিক্ষণের পরিধি ও গুণগত মান বহুগুণে বৃদ্ধি পাবে।
২. অন্যান্য অবকাঠামোগত প্রকল্পের উদ্বোধন
'২য় বাংলাদেশ ব্যাটালিয়ন' উদ্বোধনের পাশাপাশি সেনাপ্রধান বিএমএ-এর আধুনিকায়ন এবং ক্যাডেট ও স্টাফদের উন্নত সুযোগ-সুবিধা নিশ্চিতকরণের লক্ষ্যে নবনির্মিত বেশ কয়েকটি বড় প্রকল্পের ফলক উন্মোচন করেন। প্রকল্পগুলো হলো:
সিএমএইচ (CMH), ভাটিয়ারি: নবীন ক্যাডেট এবং মিলিটারি একাডেমির সাথে সংশ্লিষ্ট সকলের উন্নত ও জরুরি চিকিৎসাসেবা নিশ্চিত করতে এই আধুনিক সম্মিলিত সামরিক হাসপাতাল (সিএমএইচ) নির্মাণ করা হয়েছে।
বিএমএ পার্ক: একাডেমির পরিবেশগত সৌন্দর্য বর্ধন এবং সংশ্লিষ্টদের মানসিক প্রফুল্লতার জন্য একটি দৃষ্টিনন্দন ও আধুনিক পার্ক প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে।
বিএমএ সুইমিং পুল: ক্যাডেটদের শারীরিক সক্ষমতা বৃদ্ধি, সাঁতার ও জলজ সামরিক কৌশল প্রশিক্ষণের জন্য আন্তর্জাতিক মানের একটি আধুনিক সুইমিং পুল কমপ্লেক্স নির্মাণ করা হয়েছে।
এমইএস (MES) অফিস কমপ্লেক্স: মিলিটারি ইঞ্জিনিয়ারিং সার্ভিসের প্রশাসনিক কাজ আরও গতিশীল ও সুচারুভাবে সম্পন্ন করার জন্য এই আধুনিক অফিস কমপ্লেক্সটি নির্মাণ করা হয়েছে।
এই যুগান্তকারী উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে অন্যান্যের মধ্যে উপস্থিত ছিলেন বাংলাদেশ সেনাবাহিনী, নৌবাহিনী ও বিমান বাহিনীর উর্ধ্বতন সামরিক কর্মকর্তাগণ, বিএমএ'র বিভিন্ন পদবির সামরিক ও বেসামরিক কর্মকর্তাবৃন্দ, প্রশিক্ষণরত অফিসার ক্যাডেটবৃন্দ এবং গণমাধ্যমের প্রতিনিধিগণ। এই নতুন প্রকল্পগুলোর বাস্তবায়ন বাংলাদেশ মিলিটারি একাডেমিকে একটি সম্পূর্ণ স্বয়ংসম্পূর্ণ এবং বিশ্বমানের আধুনিকতম প্রশিক্ষণ একাডেমি হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করতে সাহায্য করবে।
উপসংহার: নবীন অফিসারদের হাত ধরে এগিয়ে যাবে বাংলাদেশ
বাংলাদেশ মিলিটারি একাডেমির ৯০তম দীর্ঘমেয়াদি কোর্সের এই সফল সমাপনী কুচকাওয়াজ এবং নতুন ব্যাটালিয়নের সংযোজন প্রমাণ করে যে, বাংলাদেশ সেনাবাহিনী তার আধুনিকায়নের রোডম্যাপে অত্যন্ত সফলভাবে এগিয়ে চলেছে। আজ যারা নবীন অফিসার হিসেবে দেশের সার্বভৌমত্ব রক্ষার কঠিন শপথ নিলেন, তাদের হাত ধরেই আগামী দিনের বাংলাদেশ সেনাবাহিনী আরও শক্তিশালী, সুসংহত এবং আধুনিক হয়ে উঠবে। সেনাপ্রধানের দূরদর্শী নেতৃত্ব এবং নবীন কর্মকর্তাদের দেশপ্রেমের সংমিশ্রণে বাংলাদেশ সেনাবাহিনী দেশের অভ্যন্তরে যেকোনো দুর্যোগ মোকাবিলা এবং আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে, বিশেষ করে জাতিসংঘ শান্তি রক্ষা মিশনে বাংলাদেশের সুনাম আরও উজ্জ্বল করবে—এটাই দেশবাসীর প্রত্যাশা।

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন
আপনার মূল্যবান মতামত আমাদের জানান। কোনো উসকানিমূলক বা অশালীন মন্তব্য করা থেকে বিরত থাকুন।