জাতীয় ডেস্ক: শামীম হোসাইন / দিগন্ত বাংলা নিউজ
বাংলাদেশ ব্যাংকের রিজার্ভ চুরি কেলেঙ্কারি: সাবেক গভর্নর ড. আতিউরসহ ৬৪ ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে সিআইডির ১০ হাজার পৃষ্ঠার খসড়া চার্জশিট প্রস্তুত; চূড়ান্ত আইনি মতামতের জন্য পাঠানো হলো অ্যাটর্নি জেনারেলের কার্যালয়ে
বাংলাদেশের আর্থিক খাতের ইতিহাসে সবচেয়ে বড় ও চাঞ্চল্যকর সাইবার ডাকাতি তথা বাংলাদেশ ব্যাংকের রিজার্ভ চুরির ঘটনার তদন্তে এক যুগান্তকারী ও ঐতিহাসিক মোড় এসেছে। বহুল আলোচিত এই আন্তর্জাতিক সাইবার ক্রাইম ও অর্থ পাচার মামলার দীর্ঘ ও নিবিড় তদন্ত শেষে পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি) একটি অত্যন্ত সুবৃহৎ ও পুঙ্খানুপুঙ্খ খসড়া অভিযোগপত্র (চার্জশিট) প্রস্তুত করেছে। সিআইডির প্রস্তুতকৃত এই খসড়া চার্জশিটে বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গভর্নর ড. আতিউর রহমানসহ দেশীয় ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ের মোট ৬৪ জন হাই-প্রোফাইল ব্যক্তি ও বিতর্কিত প্রতিষ্ঠানকে সরাসরি অভিযুক্ত এবং তাদের অপরাধের সম্পৃক্ততা শনাক্ত করা হয়েছে। বর্তমান বিচারিক প্রক্রিয়াকে আরও বেগবান ও নিখুঁত করতে এই বিশাল খসড়া প্রতিবেদনটি চূড়ান্ত আইনি মতামতের জন্য দেশের সর্বোচ্চ আইন কর্মকর্তা অর্থাৎ অ্যাটর্নি জেনারেলের কার্যালয়ে পাঠানো হয়েছে।
আজ বৃহস্পতিবার (১৮ জুন ২০২৬) এক আনুষ্ঠানিক প্রেস ব্রিফিংয়ের মাধ্যমে গণমাধ্যমকে বিষয়টি সুনির্দিষ্টভাবে নিশ্চিত করেছেন সিআইডির সম্মানিত মুখপাত্র জসীমউদ্দিন খান। তিনি জানান, দীর্ঘ এক দশকেরও বেশি সময় ধরে চলা এই স্পর্শকাতর মামলার প্রযুক্তিগত, অর্থনৈতিক ও আন্তর্জাতিক আইনি দিকগুলো গভীরভাবে পর্যালোচনা করে এই খসড়া চার্জশিট চূড়ান্ত করা হয়েছে। প্রায় ১০ হাজার পৃষ্ঠার এই বিশাল ও নজিরবিহীন খসড়া চার্জশিটে ঘটনার পরতে পরতে লুকিয়ে থাকা আন্তর্জাতিক হ্যাকিং চক্রের নীল নকশা, দেশের অভ্যন্তরে থাকা সহায়তাকারীদের ভূমিকা, সাইবার আক্রমণের জটিল কারিগরি কৌশল এবং চুরি হওয়া বিপুল পরিমাণ বৈদেশিক মুদ্রার অবৈধ লেনদেনের প্রতিটি ধাপ নিখুঁতভাবে ও বিশদভাবে উপস্থাপন করা হয়েছে।
সিআইডির দীর্ঘ তদন্ত ও ১০ হাজার পৃষ্ঠার খসড়া চার্জশিটের আদ্যোপান্ত
২০১৬ সালের সেই কালরাত্রিতে ঘটে যাওয়া সাইবার হামলার পর থেকেই দেশ-বিদেশে নানামুখী আলোচনা-সমালোচনা তৈরি হয়েছিল। সিআইডির মুখপাত্র জসীমউদ্দিন খান জানান, এই মামলার তদন্ত কেবল সাধারণ কোনো চুরির তদন্ত ছিল না; এটি ছিল একটি অত্যন্ত জটিল ও বহুমাত্রিক আন্তর্জাতিক নেটওয়ার্কের রহস্য উন্মোচন। তদন্তকারী কর্মকর্তারা বিশ্বের বিভিন্ন দেশের ব্যাংকিং চ্যানেল, সুইফট (SWIFT) মেসেজিং সিস্টেম এবং সাইবার ফরেনসিক ল্যাবের তথ্য উপাত্ত অত্যন্ত গভীরভাবে বিশ্লেষণ করেছেন।
সিআইডি সূত্রে জানা গেছে, প্রস্তুতকৃত ১০ হাজার পৃষ্ঠার খসড়া চার্জশিটটি মূলত তিনটি প্রধান ভাগে বিভক্ত করা হয়েছে:
সাইবার আক্রমণের প্রযুক্তিগত ও ফরেনসিক বিশ্লেষণ: কীভাবে অজ্ঞাতনামা হ্যাকাররা বাংলাদেশ ব্যাংকের অত্যন্ত সুরক্ষিত সার্ভারে ম্যালওয়্যার বা ট্রোজান হর্স পুশ করেছিল এবং ব্যাংকের সিকিউরিটি সিস্টেমকে অকেজো করে দিয়েছিল, তার বিশদ বিবরণ।
অর্থনৈতিক লেনদেন ও আন্তর্জাতিক মানি লন্ডারিং রুট: নিউইয়র্কের ফেডারেল রিজার্ভ ব্যাংক থেকে অর্থ ছাড় হওয়ার পর তা কীভাবে বিশ্বের বিভিন্ন ব্যাংকিং চ্যানেল ঘুরে ফিলিপাইন ও শ্রীলঙ্কায় প্রবেশ করল, তার পুঙ্খানুপুঙ্খ মানি ট্রেইল বা অর্থের গতিপথ।
ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের ভূমিকা: সাবেক গভর্নর ড. আতিউর রহমানসহ বাংলাদেশ ব্যাংকের তৎকালীন কর্মকর্তা, আইটি বিশেষজ্ঞ এবং ফিলিপাইনের আরসিবিসি ব্যাংকের কর্মকর্তাদের অবহেলা, তথ্য গোপন ও পরোক্ষ বা প্রত্যক্ষ অপরাধমূলক সম্পৃক্ততার প্রমাণাদি।
সিআইডি জানিয়েছে, এই খসড়া চার্জশিটটি এখন অ্যাটর্নি জেনারেলের কার্যালয়ের অভিজ্ঞ প্যানেল দ্বারা স্ক্রুটিনি বা আইনগত পরীক্ষা-নিরীক্ষা করা হবে। সেখান থেকে চূড়ান্ত আইনি মতামত ও সবুজ সংকেত পাওয়ার পরপরই তা বিজ্ঞ আদালতে আনুষ্ঠানিকভাবে দাখিল করা হবে।
আরও পড়ুন: যুক্তরাষ্ট্র-ইরান গোপন চুক্তির নথি ফাঁস: ১৪ দফায় যা থাকছে
সাবেক গভর্নর ড. আতিউর রহমান ও দেশি-বিদেশি চক্রের সম্পৃক্ততা
এই মামলার খসড়া চার্জশিটে সবচেয়ে বড় চমক এবং আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছেন বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গভর্নর ড. আতিউর রহমান। তদন্ত সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের মতে, রিজার্ভ চুরির মতো এত বড় একটি জাতীয় ও আন্তর্জাতিক বিপর্যয়ের পর তৎকালীন গভর্নর হিসেবে তাঁর ভূমিকা, সিদ্ধান্তহীনতা এবং ঘটনাটি সরকারের উচ্চপর্যায়ের কাছে সময়মতো প্রকাশ না করে দীর্ঘ সময় গোপন রাখার বিষয়টি বড় ধরণের অপরাধমূলক অবহেলা এবং প্রাতিষ্ঠানিক ব্যর্থতার শামিল।
তদন্তে দেখা গেছে, রিজার্ভ চুরির ঘটনাটি ঘটেছিল ২০১৬ সালের ফেব্রুয়ারির শুরুতে, অথচ ড. আতিউর রহমান বিষয়টি তাৎক্ষণিকভাবে দেশের অর্থমন্ত্রণালয় বা জনগণকে জানতে দেননি। এই দীর্ঘ সময়ক্ষেপণের ফলে অপরাধী চক্র চুরি করা অর্থ ফিলিপাইনের ক্যাসিনো ও অন্যান্য মাধ্যমে সরিয়ে ফেলার পর্যাপ্ত সুযোগ পেয়েছিল। সিআইডির খসড়া চার্জশিটে তাঁর এই রহস্যজনক নীরবতা ও প্রশাসনিক ব্যর্থতাকে অপরাধের সহযোগী উপাদান হিসেবে গণ্য করা হয়েছে।
ড. আতিউর রহমান ছাড়াও এই জালিয়াতির সাথে দেশীয় ব্যাংকিং খাতের বেশ কয়েকজন শীর্ষ কর্মকর্তা, আইটি বিভাগের দায়িত্বপ্রাপ্ত ব্যক্তি এবং আন্তর্জাতিক পর্যায়ের প্রভাবশালী হ্যাকার গোষ্ঠী ও মানি লন্ডারিং চক্রের মোট ৬৪ জন সদস্য ও সংস্থাকে সরাসরি অভিযুক্ত করা হয়েছে। এর মধ্যে ফিলিপাইনের রিজাল কমার্শিয়াল ব্যাংকিং করপোরেশন (আরসিবিসি)-এর উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাদের নামও শীর্ষ তালিকায় রয়েছে।
ফিরে দেখা ২০১৬: কীভাবে ঘটেছিল ইতিহাসের বৃহত্তম সাইবার ডাকাতি?
মামলার মূল নথি এবং সিআইডির ঐতিহাসিক তদন্ত প্রতিবেদন অনুযায়ী, ঘটনার সূত্রপাত হয়েছিল ২০১৬ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে। সেই সময় বিশ্বের অন্যতম সুরক্ষিত ও আন্তর্জাতিক ব্যাংকিং ব্যবস্থার কেন্দ্রবিন্দু মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের নিউইয়র্কের ফেডারেল রিজার্ভ ব্যাংকে রক্ষিত বাংলাদেশ ব্যাংকের মূল হিসাব (অ্যাকাউন্ট) থেকে অজ্ঞাতনামা ও অত্যন্ত সুপ্রশিক্ষিত একদল হ্যাকার প্রায় ১০১ মিলিয়ন মার্কিন ডলার (যা তৎকালীন বাংলাদেশি মুদ্রায় প্রায় ৮১০ কোটি টাকার সমতুল্য) চুরি করতে সক্ষম হয়।
হ্যাকাররা অত্যন্ত নিখুঁতভাবে বাংলাদেশ ব্যাংকের সুইফট কোড ও পেমেন্ট ক্রেডেনশিয়াল হ্যাক করে নিউইয়র্ক ফেড-এ মোট ৩৫টি ভুয়া অর্থ স্থানান্তরের বার্তা (পেমেন্ট অ্যাডভাইস) পাঠায়। এর মধ্যে ৩০টি বার্তা ব্লক করা সম্ভব হলেও ৫টি বার্তা সফলভাবে কার্যকর হয়ে যায়।
অর্থের গতিপথ ও শ্রীলঙ্কায় ব্যর্থ লেনদেন
সাফল্যের সাথে অবমুক্ত হওয়া ১০১ মিলিয়ন মার্কিন ডলারের মধ্যে সিংহভাগ অর্থাৎ ৮১ মিলিয়ন মার্কিন ডলার অত্যন্ত দ্রুততার সাথে ফিলিপাইনের বিতর্কিত বাণিজ্যিক ব্যাংক ‘রিজাল কমার্শিয়াল ব্যাংকিং করপোরেশন’ (আরসিবিসি)-এর জুপিটার স্ট্রিট শাখায় খোলা চারটি সম্পূর্ণ ভোয়া ও জাল অ্যাকাউন্টে স্থানান্তর করা হয়।
আরও পড়ুন: ট্রাম্প-পেজেশকিয়ান ঐতিহাসিক চুক্তি: মধ্যপ্রাচ্যে নতুন ভূরাজনীতির সমীকরণ
বাকি ২০ মিলিয়ন মার্কিন ডলার হ্যাকাররা শ্রীলঙ্কার একটি বেসরকারি ব্যাংকে ‘শালিকা ফাউন্ডেশন’ নামক একটি অলাভজনক সংস্থার অ্যাকাউন্টে পাঠানোর নির্দেশ দিয়েছিল। তবে সৌভাগ্যবশত, শ্রীলঙ্কার সেই ব্যাংকিং চ্যানেলে অর্থ স্থানান্তরের সময় হ্যাকারদের টাইপিংয়ের একটি ছোট ভুল ও বানানজনিত ত্রুটি (Foundation শব্দের বানান ভুল করা হয়েছিল) এবং প্রেরিত তথ্যের অসঙ্গতি শ্রীলঙ্কান ব্যাংক কর্মকর্তাদের নজরে আসে। ফলে তাৎক্ষণিকভাবে সেই ২০ মিলিয়ন ডলারের লেনদেনটি ব্যর্থ করে দেওয়া হয় এবং এই বিশাল অঙ্কের অর্থ চুরির হাত থেকে বেঁচে যায় বাংলাদেশ।
অর্থ উদ্ধার ও আন্তর্জাতিক আইনি লড়াইয়ের বর্তমান চিত্র
রিজার্ভ চুরির পরপরই বাংলাদেশ সরকারের পক্ষ থেকে চুরি যাওয়া অর্থ উদ্ধার এবং অপরাধীদের আন্তর্জাতিক আইনের আওতায় আনতে ব্যাপক তৎপরতা শুরু করা হয়। দীর্ঘ কূটনৈতিক ও আইনি প্রক্রিয়ার মাধ্যমে বাংলাদেশ ব্যাংক এবং ফিলিপাইন সরকারের যৌথ সহযোগিতায় এখন পর্যন্ত আরসিবিসি ব্যাংক ও ফিলিপাইনের ক্যাসিনো মার্কেট থেকে প্রায় ১৫ মিলিয়ন মার্কিন ডলার সফলভাবে উদ্ধার করে বাংলাদেশের রাষ্ট্রীয় কোষাগারে ফেরত আনা সম্ভব হয়েছে।
তবে এখনো একটি বড় অঙ্কের অর্থ অর্থাৎ বাকি ৬৬ মিলিয়ন মার্কিন ডলার ফেরত আনার আইনি প্রক্রিয়া অত্যন্ত জটিল আন্তর্জাতিক আদালতের বারান্দায় চলমান রয়েছে। এই বিষয়ে সিআইডি প্রধান এবং অতিরিক্ত আইজিপি মো. ছিবগাত উল্লাহ এক অত্যন্ত আশাব্যঞ্জক তথ্য প্রদান করেছেন। তিনি জানিয়েছেন যে, ফিলিপাইনের আরসিবিসি (RCBC) ব্যাংকে থাকা বিতর্কিত ও অবরুদ্ধ ৮১ মিলিয়ন মার্কিন ডলার ইতিমধ্যে আন্তর্জাতিক আইনি ব্যবস্থার মাধ্যমে বাজেয়াপ্ত করা হয়েছে।
"আমরা আন্তর্জাতিক সমকক্ষদের সাথে সার্বক্ষণিক যোগাযোগ রাখছি। আরসিবিসির ৮১ মিলিয়ন ডলার বাজেয়াপ্ত হওয়া আমাদের জন্য একটি বিশাল আইনি বিজয়। এখন প্রয়োজনীয় সকল আন্তর্জাতিক আইনি প্রক্রিয়া ও প্রোটোকল সম্পন্ন করে এই বিপুল পরিমাণ অর্থ খুব দ্রুত সময়ের মধ্যে বাংলাদেশে ফেরত আনার জন্য সর্বোচ্চ ও সমন্বিত উদ্যোগ চলমান রয়েছে।"
মামলার ইতিহাস ও দীর্ঘ এক দশকের আইনি পথপরিক্রমা
ইতিহাসের অন্যতম এই নৃশংস আর্থিক অপরাধের পর দেশজুড়ে তীব্র ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছিল। ঘটনার ভয়াবহতা অনুধাবন করে ২০১৬ সালের ১৫ মার্চ রাজধানী ঢাকার মতিঝিল থানায় একটি নিয়মিত ফৌজদারি মামলা দায়ের করেন বাংলাদেশ ব্যাংকের তৎকালীন উপ-পরিচালক (হিসাব ও বাজেটিং) জোবায়ের বিন হুদা। মামলা দায়েরের পরপরই এর আন্তর্জাতিক গুরুত্ব এবং সাইবার প্রযুক্তির জটিলতার কথা বিবেচনা করে তদন্তের দায়িত্ব ন্যস্ত করা হয় পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ বা সিআইডির ওপর।
বিগত ১০ বছর ধরে সিআইডির একাধিক চৌকশ দল এই মামলার তদন্তভার পরিচালনা করেছেন। তদন্ত সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বলছেন, এটি কেবল বাংলাদেশের ইতিহাসে নয়, বরং সমগ্র বিশ্বের ব্যাংকিং ইতিহাসের অন্যতম বৃহৎ ও জটিল আন্তর্জাতিক সাইবার আর্থিক অপরাধ মামলা হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। দীর্ঘ এক দশক ধরে অত্যন্ত ধৈর্য ও সূক্ষ্মতার সাথে কাজ করার পর অবশেষে ২০১৬ সালের এই মামলাটি ২০২৬ সালে এসে একটি চূড়ান্ত বিচারিক প্রক্রিয়ার নতুন ও যুগান্তকারী ধাপে প্রবেশ করতে যাচ্ছে।
রিজার্ভ চুরির অর্থনৈতিক ও প্রাতিষ্ঠানিক প্রভাব: একটি তুলনামূলক চিত্র
বাংলাদেশ ব্যাংকের এই রিজার্ভ চুরি দেশের সামগ্রিক অর্থনৈতিক নিরাপত্তা এবং আন্তর্জাতিক ব্যাংকিং ব্যবস্থার দুর্বলতাকে অত্যন্ত নগ্নভাবে উন্মোচিত করেছিল। নিচে একটি তথ্যচিত্র বা টেবিলের মাধ্যমে ঘটনার মূল আর্থিক দিকগুলো তুলে ধরা হলো:
| চুরির বিবরণ ও খাত | অর্থের পরিমাণ (মার্কিন ডলারে) | বর্তমান অবস্থা ও অগ্রগতি |
| মোট চুরির চেষ্টা (আক্রমণ) | ১০১ মিলিয়ন ডলার | ৩৫টি ভুয়া সুইফট বার্তার মাধ্যমে চেষ্টা |
| ফিলিপাইনে পাচার (আরসিবিসি) | ৮১ মিলিয়ন ডলার | সম্পূর্ণ অর্থ ক্যাসিনো ও জুয়ায় ডাইভার্ট করা হয়েছিল |
| শ্রীলঙ্কায় প্রেরিত (ব্যর্থ লেনদেন) | ২০ মিলিয়ন ডলার | বানান ভুলের কারণে তাৎক্ষণিক আটকে দেওয়া হয় |
| ফিলিপাইন থেকে সফলভাবে উদ্ধার | ১৫ মিলিয়ন ডলার | আইনি প্রক্রিয়ায় ইতিমধ্যে বাংলাদেশে ফেরত আনীত |
| আরসিবিসিতে বর্তমানে বাজেয়াপ্ত | ৮১ মিলিয়ন ডলার | দ্রুত বাংলাদেশে ফেরত আনার আইনি প্রক্রিয়া চলমান |
এই ঘটনার পর বাংলাদেশ ব্যাংকের সামগ্রিক আইটি নিরাপত্তা এবং তিন স্তর বিশিষ্ট সিকিউরিটি আর্কিটেকচারকে আমূল পরিবর্তন করা হয়েছে। বিশ্বমানের ফায়ারওয়াল এবং রিয়েল-টাইম মনিটরিং সিস্টেম চালু করা হলেও, চুরির সাথে জড়িত অভ্যন্তরীণ চক্রের বিচার না হওয়ায় এতদিন এক ধরণের প্রাতিষ্ঠানিক জবাবদিহিতার অভাব পরিলক্ষিত হচ্ছিল। সিআইডির এই বর্তমান চার্জশিট সেই অভাব পূরণ করবে বলে মনে করছেন অর্থনীতিবিদরা।
পরবর্তী ধাপ: অ্যাটর্নি জেনারেলের মতামত ও বিচারিক প্রক্রিয়া
সিআইডি অত্যন্ত সুচারুভাবে তাদের দায়িত্ব পালন করে ১০ হাজার পৃষ্ঠার এই খসড়া চার্জশিট প্রস্তুত করেছে। এখন সবার চোখ দেশের সর্বোচ্চ আইন কর্মকর্তা অর্থাৎ অ্যাটর্নি জেনারেলের কার্যালয়ের দিকে। আইন বিশেষজ্ঞরা বলছেন, যেহেতু এই মামলার সাথে আন্তর্জাতিক পক্ষ, বিদেশি ব্যাংক এবং সাবেক গভর্নরের মতো হাই-প্রোফাইল ব্যক্তি জড়িত, তাই চার্জশিটের প্রতিটি ধারা এবং সাক্ষ্য-প্রমাণ অত্যন্ত নিরেট হতে হবে যাতে আন্তর্জাতিক আদালতে বা দেশের ভেতরের আদালতে অপরাধীরা কোনো প্রকার আইনি ফাঁকফোকর গলে পার পেয়ে যেতে না পারে।
অ্যাটর্নি জেনারেলের কার্যালয় থেকে খসড়া চার্জশিটটির সামগ্রিক আইনি দিক, আন্তর্জাতিক চুক্তি ও সাক্ষ্য আইনের ধারাগুলো পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে স্ক্রুটিনি করার পর যদি কোনো সংশোধনের প্রয়োজন হয়, তবে তা সিআইডিকে জানানো হবে। অন্যথায়, তাদের চূড়ান্ত ভেটিং বা আইনি মতামতের পর এই চার্জশিটটি আনুষ্ঠানিকভাবে চিফ মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট (সিএমএম) আদালতে দাখিল করা হবে। এর মাধ্যমেই শুরু হবে ইতিহাসের এই বৃহত্তম সাইবার ডাকাতির আনুষ্ঠানিক বিচার কার্য, যা দেশের বিচারিক ইতিহাসে এক নতুন মাইলফলক স্থাপন করবে।

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন
আপনার মূল্যবান মতামত আমাদের জানান। কোনো উসকানিমূলক বা অশালীন মন্তব্য করা থেকে বিরত থাকুন।