আন্তর্জাতিক ডেস্ক: শামীম হোসাইন / দিগন্ত বাংলা নিউজ
চুক্তির আগেই ইরানের ওপর থেকে নৌ অবরোধ প্রত্যাহার যুক্তরাষ্ট্রের
নিজস্ব প্রতিবেদক, ঢাকা | দিগন্ত বাংলা নিউজ
মধ্যপ্রাচ্যে চলমান চরম সামরিক উত্তেজনার পারদ কিছুটা নিম্নমুখী হতে শুরু করেছে। আনুষ্ঠানিকভাবে কোনো সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরিত হওয়ার আগেই ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যকার দীর্ঘদিনের অচলাবস্থা নিরসনে বড় ধরনের ছাড় দিয়েছে ওয়াশিংটন। ইরানের বন্দর এবং বাণিজ্যিক জাহাজের ওপর বিগত দুই মাস ধরে চলমান কঠোর মার্কিন নৌ অবরোধ আনুষ্ঠানিকভাবে প্রত্যাহার করে নিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। এই পদক্ষেপটি উভয় দেশের মধ্যকার চলমান কূটনৈতিক আলোচনার ক্ষেত্রে একটি বিশাল মাইলফলক হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
কূটনৈতিক বিজয়: তেহরানের কঠোর অবস্থানের ফল
ইরানের উপ-পররাষ্ট্রমন্ত্রী মাজিদ তাখত-রাভানচি মঙ্গলবার (১৬ জুন) ইরান সরকারের সরকারি ওয়েবসাইটে প্রকাশিত এক বিবৃতিতে এই অগ্রগতির বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন। তিনি জানান, আলোচনার শুরু থেকেই তেহরান শর্ত দিয়েছিল যে, নৌ অবরোধ প্রত্যাহার না করলে কোনো ধরনের সমঝোতা সম্ভব নয়। মাজিদ তাখত-রাভানচি বলেন, “অবরোধ প্রত্যাহারের দাবিটি ছিল আমাদের আলোচনার প্রধান ভিত্তি। এখন সেই অবরোধের আনুষ্ঠানিক সমাপ্তি ঘটেছে এবং আনুষ্ঠানিকভাবে কোনো চুক্তি স্বাক্ষরিত হওয়ার আগেই যুক্তরাষ্ট্র তা কার্যকর করেছে।” এটি ইরানের কূটনীতির জন্য একটি বড় সাফল্য হিসেবে দেখা হচ্ছে।
ট্রাম্পের অনুমোদন ও ট্রুথ সোশ্যালে ঘোষণা
গত রবিবার মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প তার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম প্ল্যাটফর্ম ‘ট্রুথ সোশ্যালে’ এক বার্তা প্রচার করেন। সেখানে তিনি স্পষ্টভাবে উল্লেখ করেন, মধ্যপ্রাচ্যে শান্তি ও স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনতে তিনি ইরানের ওপর আরোপিত নৌ অবরোধ অবিলম্বে তুলে নেওয়ার অনুমোদন দিয়েছেন। ট্রাম্পের এই ঘোষণার পরপরই বিশ্বব্যাপী বাণিজ্যিক মহলে স্বস্তির নিঃশ্বাস ফিরে আসে। বিশেষ করে শিপিং ও জ্বালানি খাতের সাথে জড়িত ব্যবসায়ীরা এই অবরোধ প্রত্যাহারের ফলে বৈশ্বিক সরবরাহ চেইন আবার স্বাভাবিক হবে বলে আশা প্রকাশ করেছেন।
আরও পড়ুন: রাউতারা জমিদার বাড়ি: ধ্বংসের পথে ১৪০ বছরের ইতিহাস
জেএমআইসি-র সতর্কতা ও বর্তমান পরিস্থিতি
যদিও যুক্তরাষ্ট্র অবরোধ তুলে নিয়েছে, তবে বহুজাতিক নৌ নিরাপত্তা সংস্থা জয়েন্ট মেরিটাইম ইনফরমেশন সেন্টার (জেএমআইসি) সোমবার জানিয়েছিল যে, যুদ্ধবিরতি পুরোপুরি কার্যকর ও নিশ্চিত না হওয়া পর্যন্ত অবরোধটি শুক্রবার পর্যন্ত বহাল থাকতে পারে। তবে ওয়াশিংটন এবং তেহরানের মধ্যকার বিদ্যমান গতিপ্রকৃতি বিশ্লেষণ করলে বোঝা যায়, দুই পক্ষই এখন দ্রুততার সাথে উত্তেজনা নিরসনের পথ বেছে নিয়েছে।
জেনেভা বৈঠকের অপেক্ষায় বিশ্ব
প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প জানিয়েছেন, ইরানের সাথে সংঘাত চিরতরে বন্ধ করার লক্ষ্যে একটি বিস্তৃত সমঝোতা স্মারক বা শান্তি চুক্তি প্রায় চূড়ান্ত। এই চুক্তির আনুষ্ঠানিক প্রক্রিয়া আগামী শুক্রবার সুইজারল্যান্ডের জেনেভা শহরে সম্পন্ন হবে। জেনেভা সম্মেলনকে ঘিরে গোটা বিশ্বের নীতিনির্ধারকদের আগ্রহ তুঙ্গে। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, যদি এই চুক্তিটি স্বাক্ষরিত হয়, তবে এটি বিগত কয়েক বছরের ভূ-রাজনৈতিক সংকটের ইতি টানবে।
ঘটনার প্রেক্ষাপট: ২৮ ফেব্রুয়ারির সেই উত্তাল দিন
গত ২৮ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যৌথ সামরিক অভিযান শুরুর পর থেকে মধ্যপ্রাচ্য কার্যত একটি আগ্নেয়গিরির ওপর দাঁড়িয়ে ছিল। জবাবে ইরান মার্কিন স্বার্থ ও ইসরায়েলি ভূখণ্ডে পাল্টা হামলা চালায়। পরিস্থিতি এমন পর্যায়ে পৌঁছায় যে, কৌশলগতভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালি বন্ধ ঘোষণা করে তেহরান। বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেলের দাম কয়েকগুণ বেড়ে যায়, যা বিশ্ব অর্থনীতিকে বিপর্যয়ের দ্বারপ্রান্তে নিয়ে গিয়েছিল। ওই সময়েই যুক্তরাষ্ট্র ইরানের বন্দর ও জাহাজের ওপর এই কঠোর নৌ অবরোধ আরোপ করেছিল। বর্তমান প্রেক্ষাপটে সেই পরিস্থিতির আমূল পরিবর্তন ঘটছে।
শান্তির পথে কি বাধা কাটিয়ে ওঠা সম্ভব?
এখন প্রশ্ন দেখা দিয়েছে, এই নৌ অবরোধ প্রত্যাহার কি মধ্যপ্রাচ্যে স্থায়ী শান্তির গ্যারান্টি? যদিও ট্রাম্প প্রশাসন এবং ইরানি কর্তারা আশাবাদী, তবে বিশ্লেষকদের মতে, দীর্ঘদিনের আস্থার সংকট কাটিয়ে ওঠা একটি বড় চ্যালেঞ্জ। জেনেভা চুক্তির প্রতিটি শর্ত এবং তা কার্যকর করার প্রক্রিয়াটিই নির্ধারণ করবে এই শান্তি কতদিন স্থায়ী হবে। তবে আপাতত, লোহিত সাগর ও হরমুজ প্রণালীতে বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচলের যে পথ উন্মুক্ত হয়েছে, তা বিশ্ব অর্থনীতির জন্য অত্যন্ত ইতিবাচক সংবাদ।
আমরা দিগন্ত বাংলা নিউজের পাঠকদের এই ঘটনার সর্বশেষ তথ্যের বিষয়ে নিয়মিত আপডেট দেব। জেনেভার চূড়ান্ত বৈঠক থেকে কী ফলাফল বেরিয়ে আসে, তা দেখার অপেক্ষায় পুরো বিশ্ব।


একটি মন্তব্য পোস্ট করুন
আপনার মূল্যবান মতামত আমাদের জানান। কোনো উসকানিমূলক বা অশালীন মন্তব্য করা থেকে বিরত থাকুন।