১৫% কর দিয়ে সাদা করা যাবে কালো টাকা: জমি ও ফ্ল্যাটে নতুন সুযোগ

১৫% কর দিয়ে সাদা করা যাবে কালো টাকা: জমি ও ফ্ল্যাটে নতুন সুযোগ
প্রতীকী ছবি

জাতীয় ডেস্ক: শামীম হোসাইন / দিগন্ত বাংলা নিউজ

কালো টাকা সাদা করার নতুন সুযোগ: ১৫ শতাংশ কর দিয়ে বিনিয়োগের ঐতিহাসিক সিদ্ধান্ত

বাংলাদেশের অর্থনৈতিক ইতিহাসে আবারো ফিরে এল সেই বহুল বিতর্কিত এবং আলোচিত সুযোগ—অপ্রদর্শিত আয় বা কালো টাকা সাদা করা। প্রায় দুই দশক পর রাষ্ট্রীয় ক্ষমতায় আসা বিএনপি নেতৃত্বাধীন সরকারের বর্তমান মেয়াদের প্রথম পূর্ণাঙ্গ বাজেটে জমি, ভবন এবং অ্যাপার্টমেন্ট খাতে অপ্রদর্শিত অর্থ বিনিয়োগের মাধ্যমে বৈধতা দেওয়ার এক বিশেষ বিধান রাখা হয়েছে। গতকাল বৃহস্পতিবার জাতীয় সংসদে ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেট পেশকালে অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী এই নতুন কর কাঠামোর রূপরেখা তুলে ধরেন।

বাজেট বক্তৃতায় মন্ত্রী স্পষ্টভাবে জানিয়েছেন, নির্দিষ্ট ১৫ শতাংশ কর পরিশোধের বিনিময়ে যে কোনো ব্যক্তি তাঁর অপ্রদর্শিত আয়কে অর্থনীতির মূলধারায় নিয়ে আসতে পারবেন। সরকারের এই নজিরবিহীন সিদ্ধান্তের ফলে সংশ্লিষ্ট অর্থের উৎস সম্পর্কে কোনো সরকারি কর্তৃপক্ষ বা আইন প্রয়োগকারী সংস্থা আর কোনো প্রশ্ন তুলতে পারবে না। তবে এই সুযোগ গ্রহণের ক্ষেত্রে রয়েছে কঠোর নিয়ম এবং সময়সীমা।

কেন এই সিদ্ধান্ত এবং এর প্রভাব কী?

অর্থনীতিবিদদের মতে, দেশের আবাসন খাতে গতিশীলতা আনা এবং স্থবির হয়ে থাকা কালো টাকাকে সরকারি কোষাগারে নিয়ে আসার লক্ষ্যেই মূলত এই সাহসী ও বিতর্কিত পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। এর মাধ্যমে একদিকে যেমন সরকারের রাজস্ব আয় বাড়বে, অন্যদিকে রিয়েল এস্টেট ব্যবসায়ীদের মধ্যে চাঞ্চল্য তৈরি হবে। তবে এই সিদ্ধান্ত নিয়ে জনমনে ও অর্থনীতিবিদদের মাঝে মিশ্র প্রতিক্রিয়া লক্ষ্য করা যাচ্ছে। একদিকে যখন ব্যবসায়ীরা এটিকে বাজারের জন্য ইতিবাচক দেখছেন, অন্যদিকে সৎ করদাতাদের মধ্যে দীর্ঘদিনের ক্ষোভের সঞ্চার হয়েছে যে, অবৈধভাবে উপার্জিত অর্থ কেন বারবার আইনি সুরক্ষা পাবে?

আবেদনের সময়সীমা ও শর্তাবলী: জেনে নিন খুঁটিনাটি

অর্থবিল ২০২৬-এর তথ্যানুযায়ী, আগামী ১ জুলাই ২০২৬ থেকে শুরু করে ৩০ জুন ২০২৭ সাল পর্যন্ত মোট এক বছর এই বিশেষ সুযোগ বলবৎ থাকবে। এই সময়ের মধ্যে যারা জমি, ফ্ল্যাট বা অ্যাপার্টমেন্ট কেনাবেচার ক্ষেত্রে অপ্রদর্শিত অর্থ প্রদর্শন করবেন, তারা এই ১৫ শতাংশ হারের সুবিধা পাবেন।

শর্তগুলো নিচে সংক্ষেপে তুলে ধরা হলো:

  • কর হার: অপ্রদর্শিত আয়ের ওপর নির্ধারিত ১৫ শতাংশ হারে কর পরিশোধ করতে হবে।

  • সুরক্ষা: একবার কর পরিশোধ করলে অর্থের উৎস বা পরিশোধিত কর নিয়ে কোনো ধরনের তদন্ত বা আইনি প্রশ্ন তোলা যাবে না।

  • অতিরিক্ত কর: যদি কোনো ব্যক্তির বিরুদ্ধে আয়কর আইনের আওতায় অডিট বা তদন্ত কার্যক্রম ইতিমধ্যে শুরু হয়ে যায়, তবে তিনি আর ১৫ শতাংশের সুবিধা পাবেন না। সেক্ষেত্রে তাঁকে নির্ধারিত করের পাশাপাশি অতিরিক্ত ২০ শতাংশ অর্থাৎ সর্বমোট ৩৫ শতাংশ হারে কর পরিশোধ করতে হবে।

  • বিক্রেতাদের সুযোগ: শুধুমাত্র ক্রেতা নয়, যারা জমি বা ভবন বিক্রির ক্ষেত্রে দলিলে প্রকৃত মূল্যের চেয়ে কম দাম দেখিয়েছেন এবং পরবর্তীতে বাড়তি অর্থ হাতে পেয়েছেন, তারাও মূলধনী মুনাফার ওপর প্রযোজ্য হারে কর দিয়ে অর্থ বৈধ করতে পারবেন।

রাজনৈতিক ইতিহাস ও কালো টাকা সাদা করার বিতর্ক

বাংলাদেশে কালো টাকা সাদা করার ইতিহাস বেশ দীর্ঘ। অতীতে বিভিন্ন সময় বিভিন্ন সরকার এই সুযোগ দিয়ে আসছে। কিন্তু প্রতিবারই এটি ব্যাপক সমালোচনার মুখে পড়েছে।

আরও পড়ুন: ইরানে হামলা স্থগিত: বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেলের দামে বড় পতন

ইরানে হামলা স্থগিত: বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেলের দামে বড় পতন

১. তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সময় (২০০৭): সেই সময় কঠোর দুর্নীতিবিরোধী অভিযান চললেও কালো টাকা বৈধ করার সুযোগ দেওয়া হয়েছিল। সে সময় যারা সুযোগ নেয়নি, তাদের ওপর উচ্চ হারে জরিমানার বিধান রাখা হয়েছিল। ২. আওয়ামী সরকারের আমল (২০০৯-২০২৪): ২০০৯ সালে তৎকালীন অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত ঘোষণা দিয়েছিলেন কালো টাকা সাদা করার সুযোগ আর দেওয়া হবে না। কিন্তু বাজেট পাস হওয়ার সময় ঠিকই ১০ শতাংশ কর দিয়ে ফ্ল্যাট, বাড়ি ও পুঁজিবাজারে বিনিয়োগের সুযোগ দেওয়া হয়। এমনকি ২০২২-২৩ অর্থবছরে টাকা পাচারকারীদেরও এই সুযোগ দেওয়া হয়েছিল, যা নিয়ে সারা দেশে তীব্র বিতর্কের সৃষ্টি হয়েছিল। ৩. বিএনপি সরকারের অবস্থান (২০০১): ২০০১ সালে ক্ষমতায় আসার পর বিএনপি সরকার আনুষ্ঠানিকভাবে সুযোগ না দিলেও পরবর্তীতে তারা বিভিন্ন সময়ে বিনিয়োগের নামে কালো টাকা বৈধ করার সুযোগ দিয়েছিল।

এবার বিএনপির প্রথম বাজেটেই এই বিধান যুক্ত হওয়ার ফলে এটি স্পষ্ট যে, বর্তমান সরকার অর্থনৈতিক মন্দা কাটিয়ে তুলতে এবং রাজস্ব ঘাটতি পূরণ করতে আবারও সেই পুরোনো পথেই হাঁটছে।

অর্থনীতিবিদদের পর্যবেক্ষণ: নৈতিক নাকি অনৈতিক?

দীর্ঘ বছর ধরে বিভিন্ন ব্যবসায়ী সংগঠন ও অর্থনীতিবিদরা কালো টাকা সাদা করার সুযোগের বিরোধিতা করে আসছেন। তাদের মতে, এটি কর ব্যবস্থার নৈতিক ভিত্তি নষ্ট করে। যারা সারা জীবন নিয়ম মেনে কর দিচ্ছেন, তারা সরকারের এই সিদ্ধান্তে নিরুৎসাহিত বোধ করেন।

অর্থনীতিবিদ ড. [নাম] বলেন, "কালো টাকা সাদা করার এই সুযোগ বার বার দেওয়ার অর্থ হলো দুর্নীতিবাজদের পুরস্কৃত করা। এটি দীর্ঘ মেয়াদে দেশের অর্থনীতিতে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনতে কোনো সাহায্য করবে না, বরং দুর্নীতিকে উৎসাহিত করবে।" অন্যদিকে, রিয়েল এস্টেট খাতের উদ্যোক্তারা মনে করেন, এটি আবাসন খাতকে বাঁচানোর জন্য জরুরি একটি পদক্ষেপ। কারণ, বর্তমানে জমি ও ফ্ল্যাটের বাজার অনেকটা স্থবির হয়ে আছে এবং অর্থের অভাবে অনেক বড় প্রকল্প বন্ধ হয়ে যাচ্ছে।

সরকারি কোষাগারে রাজস্ব বৃদ্ধি ও ভবিষ্যতের চ্যালেঞ্জ

সরকার মনে করছে, এই বিধান কার্যকর হলে হাজার হাজার কোটি টাকা অর্থনীতির মূলধারায় যুক্ত হবে। বিশেষ করে যারা দীর্ঘদিন ধরে তাদের উপার্জিত অতিরিক্ত আয় লুকিয়ে রেখেছেন, তারা এখন কর দিয়ে সম্পদ ঘোষণা করবেন। রাজস্ব সংগ্রহের এই লক্ষ্যমাত্রা পূরণ হলে আগামী বছরগুলোতে দেশের অবকাঠামোগত উন্নয়নে সরকারের হাত আরও শক্তিশালী হবে। তবে প্রশ্ন থেকে যায়—এই সুযোগ শেষ হওয়ার পর কি আবার নতুন করে অপ্রদর্শিত আয়ের সৃষ্টি হবে?

সরকারের কঠোর নজরদারি না থাকলে এটি একটি দুষ্টচক্রে পরিণত হতে পারে। আইনপ্রণেতারা জানিয়েছেন, এবারের বিধানে এই অর্থের উৎস নিয়ে কোনো প্রশ্ন না তোলার নিশ্চয়তা দেওয়া হয়েছে, যা ব্যবসায়ীদের মধ্যে এক ধরনের আস্থার পরিবেশ তৈরি করবে।

কীভাবে আবেদন করবেন?

যারা এই সুযোগ নিতে আগ্রহী, তাদের নিকটস্থ কর কমিশনারের কার্যালয়ে যোগাযোগ করতে হবে। নির্দিষ্ট ফর্মে অপ্রদর্শিত আয়ের ঘোষণা দিয়ে চালানের মাধ্যমে ১৫ শতাংশ কর পরিশোধের পর কর কর্তৃপক্ষ থেকে একটি সনদপত্র গ্রহণ করতে হবে। এই সনদপত্রটিই ওই অর্থের বৈধতার প্রমাণ হিসেবে কাজ করবে।

মনে রাখতে হবে, এই সুযোগ শুধুমাত্র নির্দিষ্ট খাতে (জমি, ভবন বা অ্যাপার্টমেন্ট) বিনিয়োগের জন্য। পুঁজিবাজার বা নগদ টাকার ক্ষেত্রে এই সুবিধা প্রযোজ্য নয়, যদি না বাজেটে পরবর্তীতে এমন কোনো সংশোধনী আনা হয়।

উপসংহার: করদাতাদের সতর্কতা

পরিশেষে, করদাতাদের জন্য পরামর্শ হলো—যদি আপনার কোনো অপ্রদর্শিত অর্থ থেকে থাকে, তবে আইন মেনে নির্ধারিত সময়ের মধ্যে তা ঘোষণা দেওয়াই বুদ্ধিমানের কাজ হবে। অন্যথায়, পরবর্তীতে যদি অডিট শুরু হয়ে যায়, তবে ২০ শতাংশ অতিরিক্ত কর প্রদানের বোঝা আপনার আর্থিক হিসাবকে ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারে। এছাড়া, করের উৎস নিয়ে কোনো জটিলতা এড়াতে প্রয়োজনে একজন দক্ষ ট্যাক্স কনসালট্যান্ট বা আইনজীবীর সহায়তা নিন।

দেশের অর্থনীতির চাকা সচল রাখতে এবং রাজস্ব বৃদ্ধিতে এই সুযোগ কীভাবে প্রভাব ফেলবে, তা সময় বলে দেবে। তবে এটি নিশ্চিত যে, ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটটি দেশের আবাসন ব্যবসায়ীদের জন্য এক নতুন দুয়ার উন্মোচন করতে যাচ্ছে।

এই ধরনের গুরুত্বপূর্ণ জাতীয় বাজেট সংবাদ এবং অর্থনীতির প্রতিটি সূক্ষ্ম বিশ্লেষণ সবার আগে নির্ভুলভাবে জানতে চোখ রাখুন দিগন্ত বাংলা নিউজ-এ। আপনার প্রয়োজনীয় তথ্য ও আপডেটের জন্য আমাদের নিউজ পোর্টালটি নিয়মিত ভিজিট করুন।

 

Post a Comment

আপনার মূল্যবান মতামত আমাদের জানান। কোনো উসকানিমূলক বা অশালীন মন্তব্য করা থেকে বিরত থাকুন।

নবীনতর পূর্বতন