আন্তর্জাতিক ডেস্ক: শামীম হোসাইন / দিগন্ত বাংলা নিউজ
হতাশার জালে মার্কিন প্রেসিডেন্ট: ইরানকে দমাতে ট্রাম্পের নতুন বোমাবর্ষণের নেপথ্যের গল্প
মধ্যপ্রাচ্যের ভূ-রাজনীতি আজ এক চরম সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে। ডোনাল্ড ট্রাম্পের হোয়াইট হাউস এক নতুন সামরিক অধ্যায়ে প্রবেশ করেছে, যেখানে কূটনীতির টেবিলকে পাশ কাটিয়ে আবারও বোমার গর্জনে সমস্যার সমাধান খোঁজার চেষ্টা চলছে। ইরান যুদ্ধ আজ পর্যন্ত একটি প্রতিষ্ঠিত ধারণাকে সম্পূর্ণ ভুল প্রমাণিত করেছে—আর তা হলো, বিশ্বের সর্বাধুনিক প্রযুক্তির অধিকারী মার্কিন সামরিক বাহিনীর ‘শাস্তিমূলক হামলা’ তেহরানকে হাঁটুর ওপর ভর করে আত্মসমর্পণে বাধ্য করবে। কিন্তু ট্রাম্প প্রশাসন এখন সেই প্রমাণিত ভুল ধারণাকেই নতুন করে সত্য প্রমাণ করতে মরিয়া হয়ে মাঠে নেমেছে।
গত ৯ জুন, ২০২৬ তারিখে ডোনাল্ড ট্রাম্পের নতুন সামরিক অভিযানের ঘোষণা বিশ্বকে স্তম্ভিত করে দিয়েছে। ইরানের পরমাণু কর্মসূচি এবং হরমুজ প্রণালীর ওপর তাদের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে ওয়াশিংটনের হতাশা চরমে পৌঁছেছে। ট্রাম্পের ভাষায়, "ইরান আমাদের বোকা বানাচ্ছে।" এই ক্ষোভের বহিঃপ্রকাশ হিসেবেই বুধবার রাতে মার্কিন বাহিনী ইরানি সামরিক স্থাপনায় নতুন করে বিমান হামলা পরিচালনা করেছে।
আলোচনার টেবিলে বোমা: ওয়াশিংটনের ‘স্পষ্ট বার্তা’
মার্কিন প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথ এই হামলার যৌক্তিকতা ব্যাখ্যা করতে গিয়ে যে মন্তব্য করেছেন, তা বিশ্ব কূটনীতিতে এক অস্বস্তিকর সংকেত পাঠিয়েছে। তিনি সাফ জানিয়ে দিয়েছেন, "যদি আমাদের বোমার মাধ্যমে আলোচনা করতে হয়, তবে আমরা বোমার মাধ্যমেই আলোচনা করব।" এটি মূলত ট্রাম্প প্রশাসনের ‘পাওয়ার ডিপ্লোমেসি’ বা শক্তি দিয়ে কূটনীতি পরিচালনার আধুনিক রূপ।
সেন্ট্রাল কমান্ড (সেন্টকম)-এর বিবৃতি অনুযায়ী, এই হামলায় ইরানের আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা, গোয়েন্দা সার্ভিল্যান্স এবং যোগাযোগ অবকাঠামোকে লক্ষ্যবস্তু করা হয়েছে। কিন্তু প্রশ্ন থেকে যায়—এই ধ্বংসযজ্ঞ কি তেহরানকে আলোচনার টেবিলে ফিরিয়ে আনবে, নাকি তাদের জিদ আরও বাড়িয়ে দেবে? গত তিন মাসের ঘটনাপ্রবাহ ইঙ্গিত দিচ্ছে, ওয়াশিংটন যখনই সামরিক চাপ বাড়ায়, তেহরান উল্টো নিজেদের প্রতিরক্ষামূলক অবস্থান আরও শক্তিশালী করে তোলে এবং ট্রাম্পের প্রতি তাদের অনাস্থার দেয়াল আরও উঁচুতে ওঠে।
ট্রাম্পের পুরোনো ঝোঁক ও বর্তমান রাজনৈতিক বাস্তবতা
ডোনাল্ড ট্রাম্পের এই সামরিক আগ্রাসনের পেছনে কাজ করছে তাঁর নিজের তৈরি করা রাজনীতির মারপ্যাঁচ। প্রথমত, হরমুজ প্রণালী পুনরায় স্বাভাবিক চলাচলের জন্য উন্মুক্ত করা এবং পরমাণু কর্মসূচি পুরোপুরি বন্ধ করার যে চরমপত্র তিনি দিয়েছেন, ইরান তা মানছে না। দ্বিতীয়ত, এটি ট্রাম্পের সেই পুরোনো প্রবণতার পুনরাবৃত্তি, যেখানে তিনি মনে করেন সংঘাতই আলোচনার একমাত্র পথ।
আরও পড়ুন: রোনালদোকে পেছনে ফেলা কলম্বিয়ান বংশোদ্ভূত কিনিয়োসের মেক্সিকান ইতিহাস
মনে করা হচ্ছে, কাতারের মধ্যস্থতাকারী একটি দল যখন তেহরানে সমঝোতার চূড়ান্ত খসড়া নিয়ে আলোচনা করছিল, ঠিক তখনই মার্কিন সামরিক হামলার নির্দেশ দিয়ে ট্রাম্প সেই কূটনৈতিক পথকে আবারও অনিশ্চয়তার মুখে ঠেলে দিলেন। এটি কি নিছক দুর্ঘটনা, নাকি কূটনীতি ব্যর্থ হওয়ার আগেই যুদ্ধের দামামা বাজিয়ে নিজের প্রভাব বজায় রাখার চেষ্টা?
সংঘাতের বহুমাত্রিক ঝুঁকি ও জ্বালানি বাজারের অস্থিরতা
মার্কিন ডেমোক্রেট নেতা জিম হাইমস সিএনএন-এর মাধ্যমে মার্কিন জনগণকে সতর্ক করেছেন যে, ট্রাম্পের এই সামরিক চাল বুমেরাং হতে পারে। ইরানের হাতে এখনো লোহিত সাগরে হুতি বিদ্রোহীদের মাধ্যমে তেল সরবরাহ রুট বন্ধ করার ক্ষমতা রয়েছে। যদি ইরান retaliatory বা পাল্টা প্রতিশোধমূলক পদক্ষেপ নেয়, তবে বিশ্বজুড়ে জ্বালানি তেলের দাম যে আকাশচুম্বী হবে, তাতে কোনো সন্দেহ নেই। আর সেই অর্থনৈতিক ধাক্কা আমেরিকার সাধারণ জনগণের জীবনযাত্রার মানকে আরও নিচে নামিয়ে আনবে, যা ট্রাম্পের জনপ্রিয়তার রেটিংয়ের জন্য হবে মরণফাঁদ।
তেহরানের পাল্টা অবস্থান: শক্তির মুখে মাথা নত নয়
জাতিসংঘে নিযুক্ত ইরানের রাষ্ট্রদূত আমির সাইদ ইরাভানি অত্যন্ত স্পষ্টভাবে বিশ্ববাসীকে বার্তা দিয়েছেন, "ভয়ভীতি প্রদর্শন বা সামরিক শক্তি প্রয়োগ করে কোনো স্থায়ী চুক্তিতে পৌঁছানো অসম্ভব।" ইরান চাইছে বিশ্ব সম্প্রদায়কে দেখাতে যে, তারা কেবল মার্কিন হুমকির কাছে নতিস্বীকার করা কোনো দেশ নয়, বরং তারা সার্বভৌমত্ব রক্ষায় বদ্ধপরিকর।
পরস্পরবিরোধী সংকেত দিচ্ছে ট্রাম্প প্রশাসন। একদিকে ইসরায়েলি নেতা নেতানিয়াহুর সঙ্গে আলোচনা ভেস্তে যাওয়া নিয়ে ট্রাম্পের ক্ষোভ, অন্যদিকে ইরানের ওপর পূর্ণ শক্তি নিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়া—এটি কি ট্রাম্পের নিজের সিদ্ধান্তের জালের মধ্যেই আটকা পড়ার লক্ষণ নয়?
কেন এই হামলা ব্যর্থ হতে পারে?
১. কৌশলগত ভুল ধারণা: ট্রাম্প মনে করছেন ইরান ভেঙে পড়ছে। কিন্তু বাস্তবতা হলো, ইরান এখন আগের চেয়েও বেশি ঐক্যবদ্ধ। ২. অর্থনৈতিক অবরোধের সীমাবদ্ধতা: দীর্ঘমেয়াদী অবরোধেও ইরানি অর্থনীতির সম্পূর্ণ পতন ঘটেনি। ৩. জনমতের অভাব: আমেরিকার অধিকাংশ ভোটার নিজেরাই এখন মধ্যপ্রাচ্যে নতুন কোনো যুদ্ধের ঘোর বিরোধী।
প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথ বলছেন, তারা পূর্ণমাত্রার যুদ্ধ চান না। কিন্তু যুদ্ধের আগুন কি কখনো কারো ইচ্ছাধীন থাকে? ইতিহাসে দেখা গেছে, সামরিক উত্তেজনার পারদ একবার বেড়ে গেলে তা নিয়ন্ত্রণ করা অসম্ভব হয়ে পড়ে।
উপসংহার: ট্রাম্পের সামনে এখন কী পথ?
ডোনাল্ড ট্রাম্পকে এখন নিজের ব্যর্থ কৌশলের মুখোমুখি হতে হবে। যে নীতি তিনি বারবার প্রয়োগ করেও ব্যর্থ হয়েছেন, সেটিই আবার নতুন করে প্রয়োগ করার যৌক্তিকতা নিয়ে খোদ মার্কিন কংগ্রেসে প্রশ্ন উঠছে। হাতুড়ি পেটার মতো সামরিক শক্তি প্রয়োগের এই পুরোনো বাণিজিক কৌশল আন্তর্জাতিক রাজনীতির জটিল সমীকরণে খাটছে না।
বিশ্ব এখন অপেক্ষায় আছে, ট্রাম্প কি আবারও একই ভুল পুনরাবৃত্তি করবেন, নাকি কূটনীতির পথে ফিরে আসার কোনো নতুন দুয়ার খুলবেন? আমাদের এই প্রতিবেদনে মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধের প্রতিটি খুঁটিনাটি আপডেট পেতে চোখ রাখুন দিগন্ত বাংলা নিউজ-এ। আমরা আপনাদের দিচ্ছি ১০০% নিরপেক্ষ ও ইউনিক সংবাদ।


একটি মন্তব্য পোস্ট করুন
আপনার মূল্যবান মতামত আমাদের জানান। কোনো উসকানিমূলক বা অশালীন মন্তব্য করা থেকে বিরত থাকুন।