ট্রাম্পকে বড় পরীক্ষায় ফেলল ইরান: ২৪ বিলিয়ন ডলার ফেরত দিলেই চুক্তি
মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যকার ভূ-রাজনৈতিক টানাপোড়েন এখন এক নতুন মোড়ে এসে দাঁড়িয়েছে। দীর্ঘদিনের অচলবস্থা কাটাতে ইরান এবার সরাসরি ট্রাম্প প্রশাসনের প্রতি একটি কঠিন শর্ত জুড়ে দিয়েছে। তেহরান স্পষ্টভাবে জানিয়ে দিয়েছে যে, ওয়াশিংটনের সঙ্গে যেকোনো প্রকার কূটনৈতিক আলোচনার নতুন অধ্যায় শুরু করতে হলে আগে যুক্তরাষ্ট্রের হাতে অবরুদ্ধ থাকা ২৪ বিলিয়ন ডলারের ইরানি সম্পদ অবমুক্ত করতে হবে। এই দাবিকে ইরান কেবল অর্থনৈতিক লেনদেন হিসেবে নয়, বরং মার্কিন প্রশাসনের সততা ও বিশ্বাসের পরীক্ষা হিসেবে দেখছে।
ট্রাম্পের কোর্টে এখন বল: নতুন কৌশলে তেহরান
ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ মুজতবা খামেনির সামরিক উপদেষ্টা এবং অভিজ্ঞ নীতিনির্ধারক মহসেন রেজায়েই সিএনএন-কে দেওয়া এক একান্ত সাক্ষাৎকারে এই কঠোর অবস্থান ব্যক্ত করেছেন। তিনি বিশ্বনেতাদের সামনে একটি বার্তা স্পষ্ট করে দিয়েছেন—বর্তমানে ইরান-যুক্তরাষ্ট্র আলোচনার গতিপথ সম্পূর্ণভাবে ট্রাম্প প্রশাসনের সিদ্ধান্তের ওপর নির্ভরশীল।
আরও পড়ুন: মায়ের মৃত্যুতে শোকে স্তব্ধ সন্তান: একই দিনে বিদায় নিলেন দুজনেই
মহসেন রেজায়েই বলেন, “আলোচনার টেবিলে এখন অচলাবস্থা তৈরি হয়েছে। এই স্থবিরতা ভাঙার দায়িত্ব একান্তই ডোনাল্ড ট্রাম্পের। আমরা আমাদের পক্ষ থেকে যা করার করেছি, এখন বল সম্পূর্ণভাবে ট্রাম্পের কোর্টে। তিনি যদি সত্যিই একটি টেকসই চুক্তিতে পৌঁছাতে আগ্রহী হন, তবে তাকে অবশ্যই বিশ্বাসের নিদর্শন দেখাতে হবে।”
২৪ বিলিয়ন ডলারের শর্ত: কেন এই দাবি?
ইরানের পক্ষ থেকে এই বিপুল পরিমাণ অর্থ ছাড়ের দাবির পেছনে নির্দিষ্ট পরিকল্পনা রয়েছে। তারা চাইছে এই অর্থকে দুই দেশের মধ্যে পারস্পরিক আস্থা তৈরির একটি ধাপ হিসেবে ব্যবহার করতে। তাদের প্রস্তাব অনুযায়ী:
প্রথম ধাপ: চুক্তি স্বাক্ষরিত হওয়ার সাথে সাথেই ১২ বিলিয়ন ডলারের সম্পদ অবিলম্বে মুক্তি দিতে হবে।
পরবর্তী ধাপ: বাকি ১২ বিলিয়ন ডলার পর্যায়ক্রমে ছাড় করতে হবে।
রেজায়েই অত্যন্ত জোরালো কণ্ঠে স্মরণ করিয়ে দেন যে, এই অর্থ কোনো অনুদান নয়, বরং এটি ইরানের নিজস্ব পাওনা। তার ভাষায়, “এটি আমাদের দেশের জনগণের টাকা, এটি আমেরিকার কোনো সম্পদ নয়। এই টাকা আটকে রেখে ওয়াশিংটন যে নীতি প্রদর্শন করছে, তা আন্তর্জাতিক শিষ্টাচার বহির্ভূত। সামনের পথ সুগম করতে ট্রাম্পকে অবশ্যই এই পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হতে হবে।”
অন্ধকার করিডোরে কি যাচ্ছে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র?
সামরিক উপদেষ্টা মহসেন রেজায়েই মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রকে সতর্ক করে দিয়ে বলেছেন, যদি ওয়াশিংটন পুনরায় কোনো আগ্রাসী বা সংঘাতমূলক পথে হাঁটার সিদ্ধান্ত নেয়, তবে সেটি তাদের জন্য এক অনিশ্চিত ও "অন্ধকার করিডোর" তৈরি করবে। ইরান বর্তমানে কূটনৈতিক আলোচনার মাধ্যমে সংকট সমাধানের পক্ষপাতী হলেও, তাদের ওপর চাপ প্রয়োগের চেষ্টা করা হলে তারা যে পাল্টা ব্যবস্থা নিতে পিছপা হবে না, তাও ইঙ্গিতে স্পষ্ট করে দেওয়া হয়েছে।
মুজতবা খামেনি ও ট্রাম্পের বৈঠক কি সম্ভব?
গত সপ্তাহে বিশ্বজুড়ে একটি গুঞ্জন ছড়িয়ে পড়েছিল যে, ডোনাল্ড ট্রাম্প হয়তো ইরানের সর্বোচ্চ নেতার সাথে সরাসরি বৈঠকে বসতে পারেন। তবে এই সম্ভাবনাকে মহসেন রেজায়েই সম্পূর্ণ নাকচ করে দিয়েছেন। তিনি স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছেন, বর্তমানে দুই দেশের মধ্যে উচ্চপর্যায়ের কোনো আলোচনার সম্ভাবনা নেই এবং বর্তমান পরিস্থিতি আলোচনার জন্য অনুকূল নয়। এই ঘোষণার মধ্য দিয়ে দুই দেশের মধ্যে চলা দীর্ঘদিনের স্নায়ুযুদ্ধ যে সহসা থামছে না, সেটি আবারও প্রমাণিত হলো।
বিশ্ব রাজনীতির ওপর প্রভাব
ইরানের এই অনড় অবস্থান আন্তর্জাতিক রাজনীতি ও অর্থনীতিতে ব্যাপক প্রভাব ফেলছে। মধ্যপ্রাচ্যের নিরাপত্তা এবং বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহের শৃঙ্খল বর্তমানে এই চুক্তির ওপর অনেকাংশেই নির্ভর করছে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র একদিকে ইরানের ওপর কঠোর নিষেধাজ্ঞা বহাল রাখতে চায়, অন্যদিকে ইরান তার নিজস্ব সম্পদের নিয়ন্ত্রণ পুনরুদ্ধারের দাবিতে অটল। এই দুই মেরুর সংঘর্ষের ফলে বিশ্ববাজারে অস্থিরতা দেখা দিতে পারে বলে অনেক অর্থনীতিবিদ মনে করছেন।
উপসংহার
ট্রাম্প প্রশাসনের জন্য এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো—ইরানের সঙ্গে একটি সমঝোতায় আসা, নাকি কঠোর নিষেধাজ্ঞার পথে এগিয়ে যাওয়া। ২৪ বিলিয়ন ডলারের এই অর্থ মুক্তি দেওয়া ট্রাম্পের জন্য রাজনৈতিকভাবে একটি বড় ঝুঁকি হতে পারে, আবার এটি ছাড়া আলোচনার টেবিলে ইরানকে ফিরিয়ে আনা প্রায় অসম্ভব। বিশ্ববাসী এখন তাকিয়ে আছে ট্রাম্পের পরবর্তী পদক্ষেপের দিকে। তেহরান যে শর্ত দিয়েছে, তা কি ট্রাম্প মেনে নেবেন, নাকি পরিস্থিতি আরও উত্তপ্ত হবে—সেটিই এখন কোটি টাকার প্রশ্ন।


একটি মন্তব্য পোস্ট করুন
আপনার মূল্যবান মতামত আমাদের জানান। কোনো উসকানিমূলক বা অশালীন মন্তব্য করা থেকে বিরত থাকুন।