শিশু রামিসা ধর্ষণ-হত্যা: আসামিদের ফাঁসি চাইল রাষ্ট্রপক্ষ

শিশু রামিসা ধর্ষণ-হত্যা: আসামিদের ফাঁসি চাইল রাষ্ট্রপক্ষ

জাতীয় ডেস্ক: শামীম হোসাইন / দিগন্ত বাংলা নিউজ

শিশু রামিসা ধর্ষণ ও হত্যা মামলা: আসামিদের মৃত্যুদণ্ড চাইল রাষ্ট্রপক্ষ

বাংলাদেশ জুড়ে আলোড়ন সৃষ্টিকারী শিশু রামিসা ধর্ষণ ও হত্যা মামলার বিচারিক কার্যক্রম এখন চূড়ান্ত পর্যায়ে। ঢাকার শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনালে আজ এই চাঞ্চল্যকর মামলার যুক্তিতর্ক উপস্থাপনের দিনে রাষ্ট্রপক্ষ আসামিদের সর্বোচ্চ শাস্তি হিসেবে মৃত্যুদণ্ডের জোর দাবি জানিয়েছেন। অবুঝ শিশু রামিসাকে যেভাবে পৈশাচিক কায়দায় ধর্ষণ ও পরবর্তীতে শিরশ্ছেদ করে হত্যা করা হয়েছে, তা কেবল আইন নয়, বরং মানবতার চরম লঙ্ঘন হিসেবে দেখছে রাষ্ট্রপক্ষ। মামলার প্রধান আসামি সোহেল রানা ও তার স্ত্রী স্বপ্না আক্তারের বিরুদ্ধে আনীত অভিযোগ প্রমাণিত হওয়ায় রাষ্ট্রপক্ষ কোনো প্রকার সহানুভূতি ছাড়াই সর্বোচ্চ সাজার পক্ষে তাদের অবস্থান স্পষ্ট করেছে।

আসামিদের আত্মপক্ষ সমর্থন ও স্বীকারোক্তি

আদালতের শুনানিতে মামলার প্রধান আসামি সোহেল রানা নিজের কৃতকর্মের দায়ভার সম্পূর্ণভাবে স্বীকার করে নিয়েছেন। অপরাধের ভয়াবহতা বুঝতে পেরে তিনি আদালতের কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করেন। অন্যদিকে, মামলার অপর আসামি স্বপ্না আক্তার নিজেকে নির্দোষ দাবি করে আদালতে জবানবন্দি দিয়েছেন। 

আরও পড়ুন: রামিসা হত্যা মামলার রায় ৭ জুন: শেষ হলো সাক্ষ্যগ্রহণ

রামিসা হত্যা মামলার রায় ৭ জুন: শেষ হলো সাক্ষ্যগ্রহণ

তবে মামলার নথিপত্র এবং তদন্ত কর্মকর্তাদের দাখিল করা তথ্য অনুযায়ী, এই নৃশংস হত্যাকাণ্ডের পেছনে স্বপ্না আক্তারের ভূমিকাও ছিল অত্যন্ত সন্দেহজনক। রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবী, পাবলিক প্রসিকিউটর আজিজুর রহমান দুলু যুক্তি তুলে ধরেন যে, পরিকল্পিত এই হত্যাকাণ্ড ও পাশবিক নির্যাতনের পেছনে দুজনেই সমভাবে দায়ী। অন্যদিকে, আসামিপক্ষে স্টেট ডিফেন্স অ্যাডভোকেট মুসা কালিমুল্যাহ আইনগত দিকগুলো খতিয়ে দেখার জন্য আদালতে সময় প্রার্থনা করেছেন।

হত্যাকাণ্ডের নেপথ্যের ভয়াবহ কাহিনী

মামলার অভিযোগপত্র এবং তদন্ত প্রতিবেদন থেকে জানা যায়, ভুক্তভোগী শিশু রামিসা আক্তার (৮) পপুলার মডেল হাই স্কুলের দ্বিতীয় শ্রেণির একজন মেধাবী শিক্ষার্থী ছিল। গত ১৯ মে সকালে সে নিজের ঘর থেকে বের হওয়ার পর আর ফিরে আসেনি। সকাল ১০টার দিকে তাকে স্কুলে পাঠানোর সময় পরিবারের সদস্যরা তাকে খুঁজে না পেয়ে চরম উদ্বিগ্ন হয়ে পড়েন। একপর্যায়ে অ্যাপার্টমেন্ট ভবনের বাসিন্দারা আসামিদের কক্ষের সামনে রামিসার জুতা দেখতে পান।

দরজায় বারবার ডাকাডাকি করেও কোনো সাড়া না পাওয়ায়, রামিসার বাবা-মা এবং ভবনের অন্যান্য বাসিন্দারা দরজা ভেঙে ভেতরে প্রবেশ করেন। তারা যে দৃশ্য প্রত্যক্ষ করেন, তা ছিল হৃদয়বিদারক। আসামিদের শয়নকক্ষের মেঝেতে পড়েছিল রামিসার মস্তকবিহীন দেহ এবং একটি বালতির ভেতরে পাওয়া যায় তার ছিন্নভিন্ন মাথা। এই পৈশাচিক দৃশ্যটি উপস্থিত সবাইকে বাকরুদ্ধ করে দেয়।

পুলিশি তদন্ত ও গ্রেফতারের ইতিবৃত্ত

ঘটনাস্থলেই উপস্থিত স্বপ্না আক্তারকে জিজ্ঞাসাবাদের সময় বেরিয়ে আসে আসল সত্য। স্বপ্না স্বীকার করেন যে, তার স্বামী সোহেল রানা তার হীন ও বিকৃত কামনা চরিতার্থ করার জন্য শিশু রামিসাকে বাথরুমে আটকে রেখে ধর্ষণ করেন এবং পরবর্তীতে কোনো প্রমাণ না রাখার জন্য ধারালো অস্ত্র দিয়ে গলা কেটে তাকে হত্যা করেন। এই ঘটনায় রামিসার বাবা আব্দুল হান্নান মোল্লা ১৯ মে পল্লবী থানায় মামলা দায়ের করেন। পুলিশ দ্রুত ব্যবস্থা গ্রহণ করে স্বপ্নাকে গ্রেফতার করে এবং তথ্যপ্রযুক্তির সহায়তায় নারায়ণগঞ্জের ফতুল্লা থেকে সোহেল রানাকে আটক করে।

বিচারিক প্রক্রিয়ার মাইলফলক

তদন্ত কর্মকর্তা পল্লবী থানার এসআই অহিদুজ্জামান গত ২৪ মে সোহেল রানা ও স্বপ্না আক্তারকে অভিযুক্ত করে আদালতে চার্জশিট জমা দেন। ঢাকার মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট আশরাফুল হকের আদালত মামলাটির গুরুত্ব বিবেচনায় নিয়ে তা ঢাকার শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনালে পাঠানোর নির্দেশ দেন। ট্রাইব্যুনালের বিচারক মাসরুর সালেকীন অভিযোগপত্র আমলে নিয়ে ১ জুন অভিযোগ গঠনের দিন ধার্য করেছিলেন। এরপর থেকে অত্যন্ত দ্রুততার সাথে বিচারকার্য পরিচালিত হয়েছে। সাক্ষীদের জবানবন্দি এবং মেডিকেল রিপোর্টসহ অন্যান্য দালিলিক প্রমাণাদি বিচারক পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে পর্যালোচনা করেছেন।

সামাজিক প্রতিক্রিয়া ও ন্যায়বিচার

রামিসার মতো একটি নিষ্পাপ শিশুকে এভাবে পরিকল্পিতভাবে হত্যা করার ঘটনায় সারা দেশে প্রতিবাদের ঝড় উঠেছিল। নারী ও শিশু অধিকার নিয়ে কাজ করা বিভিন্ন সংগঠন এই মামলার রায়ের অপেক্ষায় রয়েছে। রামিসার পরিবার এখন আদালতের রায়ের মাধ্যমে তাদের মেয়ের হত্যাকাণ্ডের চূড়ান্ত বিচার এবং অপরাধীদের কঠোর থেকে কঠোরতর শাস্তি প্রত্যাশা করছে। রাষ্ট্রপক্ষের দাবি, এই রায় কার্যকর করা গেলে সমাজে এ ধরনের বিকৃত মানসিকতার অপরাধীদের মনে ভয়ের সৃষ্টি হবে এবং শিশু সুরক্ষায় একটি শক্তিশালী বার্তা পৌঁছাবে।

উপসংহার

আইন ও বিচার ব্যবস্থার প্রতি সাধারণ মানুষের আস্থা স্থাপনের জন্য এই মামলার রায় অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সমাজ আজ একটি দৃষ্টান্তমূলক রায়ের অপেক্ষায় রয়েছে। আদালত তার নিজস্ব বিচারিক প্রজ্ঞায় অপরাধের মাত্রা ও গুরুত্ব বিবেচনায় নিয়ে যে রায় প্রদান করবেন, তা যেন রামিসার আত্মার শান্তির জন্য একটি কার্যকর পদক্ষেপ হয়। দিগন্ত বাংলা নিউজ এই মামলার প্রতিটি আপডেট ফলো করছে এবং আমরা আশা করছি, অচিরেই ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠিত হবে।



 

Post a Comment

আপনার মূল্যবান মতামত আমাদের জানান। কোনো উসকানিমূলক বা অশালীন মন্তব্য করা থেকে বিরত থাকুন।

নবীনতর পূর্বতন