জাতীয় ডেস্ক: শামীম হোসাইন / দিগন্ত বাংলা নিউজ
পল্লবীতে ফ্ল্যাটে মিলল নারীর অর্ধগলিত মরদেহ: রহস্যের জালে এলাকা
রাজধানীর পল্লবী এলাকা যেন মৃত্যুপুরীতে পরিণত হয়েছে। গত কয়েকদিনের ব্যবধানে একের পর এক ফ্ল্যাট থেকে বয়স্ক ও একা বসবাসকারী নারীদের অর্ধগলিত মরদেহ উদ্ধারের ঘটনায় জনমনে চরম আতঙ্ক বিরাজ করছে। বুধবার রাতে পল্লবীর ৬ নম্বর সেকশনের ১০ নম্বর রোডের সি ব্লকের ১৪ নম্বর বাসা থেকে সেলিনা আফরোজ (৫৫) নামের এক নারীর অর্ধগলিত মরদেহ উদ্ধার করেছে পুলিশ। এই ঘটনাটি এলাকা জুড়ে নতুন করে চাঞ্চল্য ও রহস্যের সৃষ্টি করেছে।
ঘটনার সূত্রপাত ও উদ্ধার অভিযান
পুলিশ ও পারিবারিক সূত্রে জানা গেছে, বুধবার রাতে গোপন সংবাদের ভিত্তিতে পল্লবী থানার একটি বিশেষ দল ওই ভবনে অভিযান চালায়। দীর্ঘ সময় ধরে ঘরের ভেতর থেকে কোনো সাড়া না পাওয়ায় এবং পচা গন্ধ পাওয়ায় প্রতিবেশীরা পুলিশকে খবর দেয়। দরজা ভেঙে ভেতরে প্রবেশের পর পুলিশ সেলিনা আফরোজের অর্ধগলিত মরদেহ উদ্ধার করে। প্রাথমিক সুরতহাল শেষে মরদেহটি ময়নাতদন্তের জন্য শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের মর্গে পাঠানো হয়েছে। পল্লবী থানার পরিদর্শক (তদন্ত) মো. হানিফ বিষয়টি নিশ্চিত করে জানিয়েছেন, মৃতদেহটি বেশ কয়েকদিন আগের হওয়ায় এটি পচন ধরেছে, যার ফলে মৃত্যুর সঠিক সময় ও কারণ এখনই নিশ্চিত করা সম্ভব নয়। ময়নাতদন্তের প্রতিবেদন আসার পর মৃত্যুর প্রকৃত রহস্য উন্মোচিত হবে।
একাকীত্বের করুণ পরিণতি ও পারিবারিক প্রেক্ষাপট
সেলিনা আফরোজের ব্যক্তিগত জীবন ও পারিবারিক তথ্যাবলি অনুসন্ধানে এক বিষাদময় চিত্র ফুটে উঠেছে। দীর্ঘ ১২ বছর আগে তিনি কানাডা থেকে দেশে ফিরে আসেন। তার স্বামী মমিনুল হক এবং দুই সন্তান কানাডায় বসবাস করছেন। পারিবারিক কলহ ও দূরত্ব থাকার কারণে তিনি তার বাবার পৈত্রিক ফ্ল্যাটে দীর্ঘদিন যাবত একাই বসবাস করে আসছিলেন। স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, গত ২৬ মে রাত ১১টার দিকে শেষবার তার ভাতিজা আশফাকুর রহমানের সঙ্গে তার মোবাইলে কথা হয়েছিল।
আরও পড়ুন: ইরানে হামলা বন্ধের ঘোষণা যুক্তরাষ্ট্রের: শেষ হলো অপারেশন এপিক ফিউরি
এরপর থেকে তার সঙ্গে পরিবারের অন্য সদস্যদের যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে। পরিবারের সদস্যরা ভেবেছিলেন তিনি হয়তো কোনো কাজে ব্যস্ত বা কোথাও গেছেন, কিন্তু বিধিবাম—বাসার চারতলায় তার বোন থাকা সত্ত্বেও এই দীর্ঘ সময়ে কেন কেউ খবর নিল না, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
পল্লবীর ধারাবাহিক মৃত্যুর আতঙ্ক
সেলিনা আফরোজের এই রহস্যজনক মৃত্যুর ঘটনাটি বিচ্ছিন্ন নয়। মাত্র কয়েকদিন আগে, ৩১ মে পল্লবীর ৬ নম্বর সেকশনের ১৩ নম্বর সড়কের আরেকটি বাসা থেকে নুরুজাহান বেগম নামে এক বৃদ্ধার অর্ধগলিত মরদেহ উদ্ধার করা হয়েছিল। নুরুজাহান বেগমের ক্ষেত্রেও দেখা গেছে একই চিত্র—তিনিও একাই বসবাস করতেন। অত্যন্ত সচ্ছল পরিবারের এই বৃদ্ধার তিন ছেলের একজন যুগ্ম-সচিব, একজন বুয়েট শিক্ষক এবং আরেকজন কানাডাপ্রবাসী। এরপরও বৃদ্ধা মায়ের কোনো খোঁজখবর না নেওয়া এবং তার করুণ মৃত্যু সামাজিক অবক্ষয়ের এক চূড়ান্ত উদাহরণ হিসেবে গণ্য হচ্ছে। একের পর এক এমন ঘটনা এলাকায় এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যাপক ক্ষোভের সৃষ্টি করেছে।
সামাজিক অবক্ষয় ও নিরাপত্তার প্রশ্ন
পল্লবীর এই জোড়া মৃত্যুর ঘটনা শুধু আইনি প্রশ্নই উত্থাপন করছে না, বরং আমাদের সামাজিক কাঠামোর ভঙ্গুরতাকে চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিচ্ছে। একক পরিবার প্রথার প্রসার এবং পারস্পরিক মানবিক দায়বদ্ধতার অভাব এমন ভয়াবহ পরিস্থিতির সৃষ্টি করছে। বয়স্ক ও একা বসবাসকারী নাগরিকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে স্থানীয় প্রশাসন ও কমিউনিটির কী ধরনের দায়বদ্ধতা থাকা উচিত, তা নিয়ে এখন আলোচনার সময় এসেছে। কেন একা বসবাসরত মানুষের মৃত্যুর খবর অনেকদিন পর পাওয়া যাচ্ছে? নিয়মিত নজরদারি বা প্রতিবেশীদের মধ্যে যোগাযোগের অভাব এই সমস্যাকে আরও প্রকট করছে।
পুলিশি তদন্ত ও পরবর্তী পদক্ষেপ
বর্তমানে দুটি মৃত্যুকে কেন্দ্র করেই পল্লবী থানা পুলিশ নিবিড় তদন্ত পরিচালনা করছে। সেলিনা আফরোজের মৃত্যু কি স্বাভাবিক, নাকি এর পেছনে অন্য কোনো নাশকতামূলক পরিকল্পনা রয়েছে, তা খতিয়ে দেখছে পুলিশ। বিশেষ করে গত ২৬ মে-র পর থেকে তার যোগাযোগের তথ্য বিশ্লেষণ করা হচ্ছে। স্থানীয় বাসিন্দারা দাবি জানিয়েছেন, এই এলাকায় বসবাসকারী একা থাকা ব্যক্তিদের সুরক্ষা নিশ্চিত করতে পুলিশ যেন নিয়মিত টহল ও তদারকি জোরদার করে।
উপসংহার
একটি উন্নত নাগরিক সমাজ গঠনে নাগরিকের নিরাপত্তা ও পারিবারিক বন্ধন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। পল্লবীর এই ঘটনা আমাদের বিবেককে নাড়া দিয়েছে। আমরা আশা করি, পুলিশ প্রশাসন এই রহস্যজনক মৃত্যুর পেছনে থাকা প্রকৃত কারণ উদ্ঘাটন করবে এবং দোষী সাব্যস্ত হলে আইনি প্রক্রিয়ায় দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির ব্যবস্থা করবে। একই সঙ্গে, পরিবারগুলো যেন তাদের বয়স্ক ও একা বসবাসকারী সদস্যদের প্রতি আরও যত্নশীল হয়—এটাই হোক আজকের শিক্ষা।


একটি মন্তব্য পোস্ট করুন
আপনার মূল্যবান মতামত আমাদের জানান। কোনো উসকানিমূলক বা অশালীন মন্তব্য করা থেকে বিরত থাকুন।