কক্সবাজারে র‍্যাবের বড় সাফল্য: যাবজ্জীবন সাজাপ্রাপ্ত পলাতক মাদক ব্যবসায়ী গ্রেফতার

কক্সবাজারে র‍্যাবের বড় সাফল্য: যাবজ্জীবন সাজাপ্রাপ্ত পলাতক মাদক ব্যবসায়ী গ্রেফতার
ছবি: সংগৃহীত

কক্সবাজার বাস টার্মিনাল এলাকা থেকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ডপ্রাপ্ত পলাতক মাদক ব্যবসায়ী আলী আহম্মদকে গ্রেফতার করেছে র‍্যাব-১৫

সারাদেশ ডেস্ক: শামীম হোসাইন / দিগন্ত বাংলা নিউজ

দেশের অন্যতম শীর্ষ আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী র‍্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়ন (র‍্যাব) মাদক চোরাচালান ও অপরাধ দমনে আরও একটি বড় সাফল্য অর্জন করেছে। কক্সবাজারের পর্যটন নগরীর মূল প্রবেশদ্বার সেন্ট্রাল বাস টার্মিনাল এলাকায় এক ঝটিকা অভিযান পরিচালনা করে মাদক মামলার এক শীর্ষ এবং দীর্ঘদিন ধরে পলাতক থাকা যাবজ্জীবন কারাদণ্ডপ্রাপ্ত আসামিকে গ্রেফতার করতে সক্ষম হয়েছে র‍্যাব-১৫। মাদক সংক্রান্ত অপরাধের বিরুদ্ধে সরকারের ‘জিরো টলারেন্স’ নীতির অংশ হিসেবে এই সফল অভিযান পরিচালনা করা হয়। আটককৃত ব্যক্তি দীর্ঘদিন ধরে দেশের বিভিন্ন প্রান্তে নিজের পরিচয় গোপন করে অত্যন্ত চতুরতার সাথে আত্মগোপনে ছিলেন বলে জানা গেছে।

আজ শুক্রবার (১৯ জুন ২০২৬) আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর পক্ষ থেকে এই চাঞ্চল্যকর গ্রেফতারের বিষয়টি নিশ্চিত করা হয়। র‍্যাবের এই ঝটিকা অভিযানের ফলে এলাকার সাধারণ মানুষ ও সচেতন মহলে স্বস্তি ফিরে এসেছে।

## গ্রেফতারকৃত শীর্ষ মাদক ব্যবসায়ীর পরিচয় ও পটভূমি

র‍্যাব-১৫-এর আভিযানিক দল কর্তৃক গ্রেফতার হওয়া ওই সাজাপ্রাপ্ত অপরাধীর নাম মো. আলী আহম্মদ (৩৬)। তিনি কক্সবাজার জেলার সদর উপজেলার অন্তর্গত ঝিলংজা ইউনিয়নের দক্ষিণ মহুরীপাড়া এলাকার স্থায়ী বাসিন্দা এবং স্থানীয় সুপরিচিত ব্যক্তি রফিকের পুত্র।

"আরও পড়ুন: খুলনায় গৃহকর্মী নির্যাতন: অভিযুক্ত পুলিশ দম্পতি আটক"

স্থানীয় ও গোয়েন্দা সূত্রে জানা যায়, আলী আহম্মদ বিগত বেশ কয়েক বছর ধরে আন্তর্জাতিক ও অভ্যন্তরীণ মাদক চোরাচালান সিন্ডিকেটের সাথে ওতপ্রোতভাবে জড়িত ছিলেন। তাঁর বিরুদ্ধে দেশের প্রচলিত মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ আইনে একাধিক মামলা রয়েছে। একটি বড় ধরণের মাদকের চালানের মামলায় বিজ্ঞ আদালত সমস্ত তথ্য-প্রমাণ ও সাক্ষ্যগ্রহণ শেষে তাকে দোষী সাব্যস্ত করে যাবজ্জীবন সশ্রম কারাদণ্ডের চূড়ান্ত রায় প্রদান করেন। তবে আদালতের রায় ঘোষণার পূর্ব মুহূর্ত থেকেই আলী আহম্মদ আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর চোখ ফাঁকি দিয়ে অত্যন্ত সুকৌশলে দেশের বিভিন্ন স্থানে পলাতক জীবন যাপন করছিলেন।

## বাস টার্মিনালে র‍্যাবের পাতা ফাঁদ ও নাটকীয় গ্রেফতার অভিযান

র‍্যাব-১৫ এর সদর দফতর থেকে প্রাপ্ত অত্যন্ত নির্ভরযোগ্য ও গোপন তথ্যের ভিত্তিতে জানা যায়, যাবজ্জীবন সাজাপ্রাপ্ত ওয়ারেন্টভুক্ত আসামি আলী আহম্মদ কক্সবাজার ছেড়ে অন্য কোনো নিরাপদ জেলা বা প্রত্যন্ত অঞ্চলে পালিয়ে যাওয়ার উদ্দেশ্যে অথবা কোনো বিশেষ অপরাধমূলক চক্রের সাথে সাক্ষাৎ করতে সেন্ট্রাল বাস টার্মিনাল এলাকায় অবস্থান করছেন।

এই তথ্যের ওপর ভিত্তি করে র‍্যাব-১৫, সিপিএসসি (CPSC) ক্যাম্পের একটি চৌকস ও দূরদর্শী আভিযানিক দল বৃহস্পতিবার রাতে কক্সবাজার সেন্ট্রাল বাস টার্মিনাল এলাকায় বিশেষ নজরদারি শুরু করে। ছদ্মবেশে র‍্যাব সদস্যরা পুরো বাস টার্মিনাল জুড়ে ওত পেতে থাকেন। এক পর্যায়ে রাত গভীর হলে বাস টার্মিনাল এলাকার ‘বলাকা বাস কাউন্টার’-এর সামনে একজন সন্দেহভাজন ব্যক্তিকে ঘোরাঘুরি করতে দেখা যায়।

"আরও পড়ুন: কক্সবাজারে ৭ বছরের শিশুকে পাশবিক হত্যার পর লাশ গুম: গ্রেপ্তার ৩"

অভিযানের চূড়ান্ত মুহূর্ত: র‍্যাবের আভিযানিক দলটি ওই ব্যক্তির শারীরিক গঠন এবং গোয়েন্দা ফাইলের ছবির সাথে মিল পাওয়ার পর নিশ্চিত হন যে তিনিই পলাতক আলী আহম্মদ। এরপর কোনো প্রকার সময় নষ্ট না করে র‍্যাব সদস্যরা অত্যন্ত ক্ষিপ্রতার সাথে চারদিক থেকে তাকে ঘিরে ফেলেন। আলী আহম্মদ পরিস্থিতি বুঝতে পেরে দৌঁড়ে পালানোর চেষ্টা করলেও আভিযানিক দলের সদস্যদের পেশাদারিত্ব ও চতুরতার কাছে তিনি পরাস্ত হন এবং হাতেনাতে গ্রেফতার হন। আকস্মিক এই বিশেষ অভিযানের কারণে টার্মিনাল এলাকায় থাকা সাধারণ যাত্রী ও কাউন্টারের কর্মচারীদের মধ্যে সাময়িক চাঞ্চল্য সৃষ্টি হয়।

## ঘটনার সামগ্রিক তথ্যচিত্র ও সংক্ষিপ্ত প্রোফাইল

পাঠকদের সুবিধার্থে এবং ঘটনার মূল তথ্যগুলো সহজে অনুধাবনের জন্য নিচে একটি বিশেষ তথ্য সারণী উপস্থাপন করা হলো:

বিষয়ের বিবরণসুনির্দিষ্ট তথ্যাবলী
গ্রেফতারকৃত আসামির নামমো. আলী আহম্মদ (৩৬)
পিতার নাম ও স্থায়ী ঠিকানারফিকের পুত্র, দক্ষিণ মহুরীপাড়া, ঝিলংজা ইউনিয়ন, কক্সবাজার সদর।
মামলার ধরণ ও সাজামাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ আইনের মামলায় বিজ্ঞ আদালত কর্তৃক যাবজ্জীবন কারাদণ্ড।
অভিযান পরিচালনাকারী ইউনিটর‍্যাব-১৫, সিপিএসসি (CPSC) এর একটি চৌকস আভিযানিক দল।
অভিযানের সুনির্দিষ্ট স্থানবলাকা বাস কাউন্টার, সেন্ট্রাল বাস টার্মিনাল এলাকা, কক্সবাজার।
অভিযানের সময়কালবৃহস্পতিবার গভীর রাতে গোপন সংবাদের ভিত্তিতে।
পরবর্তী আইনি ব্যবস্থাকক্সবাজার সদর মডেল থানায় হস্তান্তর ও আদালতে সোপর্দকরণ।

## আইনগত পদক্ষেপ ও র‍্যাবের আনুষ্ঠানিক বক্তব্য

এই চাঞ্চল্যকর ও গুরুত্বপূর্ণ গ্রেফতারের বিষয়টি আনুষ্ঠানিকভাবে নিশ্চিত করেছেন র‍্যাব-১৫ এর সহকারী পরিচালক (মিডিয়া) আ ম ফারুক। তিনি এক বিশেষ প্রেস বিজ্ঞপ্তির মাধ্যমে স্থানীয় ও জাতীয় গণমাধ্যমকে অভিযানের খুঁটিনাটি অবহিত করেন।

আ ম ফারুক জানান, গ্রেফতারকৃত আসামি আলী আহম্মদ একজন চিহ্নিত মাদক কারবারি। বিজ্ঞ আদালত কর্তৃক তাঁর বিরুদ্ধে যাবজ্জীবন কারাদণ্ডের রায় প্রদানের পর থেকেই তিনি দেশের প্রচলিত আইনের হাত থেকে বাঁচতে দীর্ঘ সময় ধরে পলাতক ছিলেন। তাঁর বিরুদ্ধে সংশ্লিষ্ট আদালতে সুনির্দিষ্ট ওয়ারেন্ট বা গ্রেফতারি পরোয়ানা জারি ছিল।

"আরও পড়ুন: সংসদে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী: বিএসএফের ৩৬টি পুশইন চেষ্টা রুখে দিয়েছে বিজিবি"

তিনি আরও উল্লেখ করেন যে, গ্রেফতারের পর আলী আহম্মদকে প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়েছে, যেখানে সে নিজের অপরাধ ও দীর্ঘদিন ধরে পলাতক থাকার বিষয়টি স্বীকার করেছে। পরবর্তীতে তাঁর বিরুদ্ধে চূড়ান্ত আইনি ও আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য তাকে কক্সবাজার সদর মডেল থানায় আনুষ্ঠানিকভাবে হস্তান্তর করা হয়েছে। থানা পুলিশ এখন আসামিকে বিজ্ঞ আদালতের মাধ্যমে কেন্দ্রীয় কারাগারে প্রেরণের সমস্ত আইনি প্রক্রিয়া সম্পন্ন করবে।

## কক্সবাজারে মাদক দমনে আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর জিরো টলারেন্স

ভৌগোলিক ও কৌশলগত কারণে কক্সবাজার জেলাটি সীমান্ত সংলগ্ন হওয়ায় এটি মাদক চোরাচালানের জন্য অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ একটি রুট হিসেবে পরিচিত। বিশেষ করে পাশ্ববর্তী দেশ থেকে আসা ইয়াবা, ক্রিস্টাল মেথ বা আইসের মতো মারাত্মক ও জীবনবিধ্বংসী মাদক দেশের অভ্যন্তরে ছড়িয়ে দেওয়ার ক্ষেত্রে বিভিন্ন অপরাধী চক্র এই অঞ্চলকে ট্রানজিট পয়েন্ট হিসেবে ব্যবহার করার অপচেষ্টা চালায়।

র‍্যাব-১৫ প্রতিষ্ঠার পর থেকেই এই অঞ্চলের মাদক সিন্ডিকেটগুলোর মেরুদণ্ড ভেঙে দিতে এবং বড় বড় গডফাদারদের আইনের আওতায় আনতে নিয়মিত চিরুনি অভিযান পরিচালনা করে আসছে। আলী আহম্মদের মতো একজন যাবজ্জীবন সাজাপ্রাপ্ত এবং দীর্ঘদিন ধরে আত্মগোপনে থাকা পেশাদার অপরাধীকে গ্রেফতার করা স্থানীয় আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখতে এবং মাদক নির্মূলের লড়াইয়ে একটি বড় মাইলফলক হিসেবে দেখা হচ্ছে।

স্থানীয় সমাজকর্মী ও সুশীল সমাজের প্রতিনিধিরা র‍্যাবের এই সফল অভিযানের ভূয়সী প্রশংসা করেছেন। তাদের মতে, এই ধরণের শীর্ষ অপরাধীরা বাইরে মুক্ত অবস্থায় ঘুরে বেড়ালে সমাজের তরুণ সমাজ আরও বেশি মাদকের মরণনেশায় ধাবিত হওয়ার ঝুঁকিতে থাকে। ‘দিগন্ত বাংলা নিউজ’ পোর্টালের পক্ষ থেকে আমরা মাদকমুক্ত সমাজ গঠনে আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর প্রতিটি ইতিবাচক পদক্ষেপ এবং দেশের প্রতিটি প্রান্তের এমন বস্তুনিষ্ঠ খবর আপনাদের সামনে প্রফেশনাল উপায়ে তুলে ধরতে সর্বদা প্রতিশ্রুতিবদ্ধ।

 

Post a Comment

আপনার মূল্যবান মতামত আমাদের জানান। কোনো উসকানিমূলক বা অশালীন মন্তব্য করা থেকে বিরত থাকুন।

নবীনতর পূর্বতন