আন্তর্জাতিক ডেস্ক: শামীম হোসাইন / দিগন্ত বাংলা নিউজ
আসামের জোরহাটে বিমান বাহিনীর প্রশিক্ষণকালীন দুর্ঘটনা: পাঁচ সেনার মৃত্যুতে শোকের ছায়া
ভারতের আসাম রাজ্যের জোরহাট বিমানঘাঁটিতে আজ শনিবার সকালে এক ভয়াবহ বিমান দুর্ঘটনার কবলে পড়ে ভারতীয় বিমান বাহিনীর একটি এএন-৩২ পরিবহন বিমান। এই মর্মান্তিক দুর্ঘটনায় বিমান বাহিনীর পাঁচজন নির্ভীক সেনা সদস্য নিহত হয়েছেন। নিয়মিত উড্ডয়নকালীন এই দুর্ঘটনা পুরো ভারতের সামরিক এবং রাজনৈতিক অঙ্গনে শোকের এক গভীর ছায়া ফেলেছে। একই সাথে এ ধরনের গুরুত্বপূর্ণ সামরিক যানের রক্ষণাবেক্ষণ ও নিরাপত্তা ব্যবস্থা নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে।
দুর্ঘটনার করুণ বিবরণ শনিবার সকাল ১০টার দিকে জোরহাট বিমানঘাঁটিতে নিয়মিত প্রশিক্ষণ ও পরিবহন উড্ডয়নের উদ্দেশ্যে যাত্রা শুরু করেছিল বিমানটি। উড্ডয়নের পরপরই যান্ত্রিক গোলযোগ বা কোনো অপ্রত্যাশিত পরিস্থিতির কারণে বিমানটি অবতরণের সময় নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে বিমানঘাঁটির ভেতরেই বিধ্বস্ত হয়। চোখের পলকেই পুরো বিমানটিতে আগুন ধরে যায় এবং বিশাল অগ্নিকাণ্ডে চারিদিকে ধোঁয়ার কুণ্ডলী ছড়িয়ে পড়ে। ঘটনার ভয়াবহতা এতটাই ছিল যে, উদ্ধারকারী দল দ্রুত ঘটনাস্থলে পৌঁছালেও আগুন নিয়ন্ত্রণে আনতে হিমশিম খেতে হয়।
নিহত সেনাসদস্যদের পরিচিতি এই দুর্ঘটনায় প্রাণ হারানো পাঁচ সেনা সদস্যের তালিকা প্রকাশ করেছে ভারতীয় বিমান বাহিনী। তাঁরা হলেন: ১. স্কোয়াড্রন লিডার প্রশান্ত সিং। ২. ফ্লাইট লেফটেন্যান্ট শুভম কুমার। ৩. সার্জেন্ট জিতেন্দ্র শর্মা। ৪. অগ্নিবীরবায়ু খেমারাম কুমাবত। ৫. অগ্নিবীরবায়ু দানিশ আলম। দেশসেবায় নিয়োজিত এই বীর সন্তানদের অকাল প্রয়াণ ভারত ও সামরিক বাহিনীর জন্য এক অপূরণীয় ক্ষতি। ভারতীয় বিমান বাহিনীর পক্ষ থেকে নিহতদের পরিবারের প্রতি গভীর সমবেদনা জানানো হয়েছে এবং তাদের পাশে থাকার আশ্বাস দেওয়া হয়েছে।
আরও পড়ুন: বাজেট নিয়ে বিরোধী দলের সমালোচনার জবাব দিলেন প্রধানমন্ত্রী
এএন-৩২ বিমানের কারিগরি সক্ষমতা ও ইতিহাস আন্তোনভ এএন-৩২ বিমানটি দীর্ঘ সময় ধরে ভারতীয় বিমান বাহিনীর শক্তির একটি অন্যতম প্রতীক। এটি মূলত দুই ইঞ্জিনবিশিষ্ট টার্বোপ্রপ সামরিক পরিবহন বিমান হিসেবে সুপরিচিত। প্রতিকূল আবহাওয়া, বিশেষ করে হিমালয়ের মতো দুর্গম পার্বত্য অঞ্চলের উচ্চ-উচ্চতার ঘাঁটিতে মালামাল ও সৈন্য পরিবহনের ক্ষেত্রে এটি অতুলনীয় দক্ষতা প্রদর্শন করে আসছে। এই বিমানটি প্রায় ৫০ জন যাত্রী বা ৪২ জন প্যারাট্রুপার বহন করতে সক্ষম। তবে দীর্ঘদিনের ব্যবহারের ফলে এর রক্ষণাবেক্ষণ বা কারিগরি সক্ষমতা নিয়ে মাঝে মধ্যেই প্রশ্ন ওঠে।
তদন্ত ও পরবর্তী আইনগত পদক্ষেপ দুর্ঘটনার প্রকৃত কারণ উদ্ঘাটনের জন্য ইতিমধ্যেই একটি উচ্চপর্যায়ের তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। ভারতীয় বিমান বাহিনীর উচ্চপদস্থ কর্মকর্তারা ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেছেন এবং বিমানের 'ব্ল্যাক বক্স' উদ্ধারের কাজ চলছে। আসামের মুখ্যমন্ত্রী হিমন্ত বিশ্ব শর্মা জানিয়েছেন, রাজ্য সরকার কেন্দ্রীয় কর্তৃপক্ষের সাথে নিবিড় যোগাযোগ বজায় রাখছে এবং প্রয়োজনীয় সব ধরনের সহায়তা প্রদান করা হচ্ছে। দুর্ঘটনার সুনির্দিষ্ট কারণ—যান্ত্রিক ত্রুটি, মানুষের ভুল নাকি অন্য কোনো কারিগরি জটিলতা—তা তদন্ত রিপোর্টের পরই নিশ্চিত হওয়া যাবে।
আসামের আকাশে সামরিক দুর্ঘটনার উদ্বেগ উল্লেখ্য যে, সাম্প্রতিক সময়ে আসামের আকাশসীমায় সামরিক বিমান দুর্ঘটনার হার উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। এর কয়েক মাস আগেই কার্বি আংলং জেলায় একটি সুখোই এসইউ-৩০এমকেআই যুদ্ধবিমান বিধ্বস্ত হয়েছিল, যেখানে দুই পাইলট প্রাণ হারান। পরপর এমন দুটি বড় দুর্ঘটনার ফলে বিমান বাহিনীর নিরাপত্তা প্রটোকল এবং এএন-৩২ বিমানের মতো পুরনো প্রজন্মের বিমানগুলোর সক্ষমতা নিয়ে সামরিক বিশ্লেষকদের মধ্যে বিতর্কের সৃষ্টি হয়েছে।
দিগন্ত বাংলার বিশ্লেষণ ভারতের মতো দেশের সামরিক সক্ষমতা বজায় রাখতে বিমান বাহিনীর আধুনিকায়ন ও নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণ অত্যন্ত জরুরি। আজ যে পাঁচজন সেনা সদস্য দেশের জন্য প্রাণ দিলেন, তাদের পরিবারের কাছে এ ক্ষতি কোনোভাবেই পূরণীয় নয়। আমরা আশা করব, তদন্ত প্রতিবেদনে প্রকৃত ঘটনা উঠে আসবে এবং ভবিষ্যতের জন্য প্রয়োজনীয় নিরাপত্তা ব্যবস্থা নিশ্চিত করা হবে। দিগন্ত বাংলা নিউজ এই ঘটনায় শোকসন্তপ্ত পরিবারগুলোর প্রতি গভীর সমবেদনা জানাচ্ছে এবং ঘটনার প্রতিটি আপডেট নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করছে।


একটি মন্তব্য পোস্ট করুন
আপনার মূল্যবান মতামত আমাদের জানান। কোনো উসকানিমূলক বা অশালীন মন্তব্য করা থেকে বিরত থাকুন।