পুনরুদ্ধার, উত্তরণ ও পুনর্গঠন: অর্থনীতিকে ৩ ধাপে সাজানোর ঘোষণা প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের

পুনরুদ্ধার, উত্তরণ ও পুনর্গঠন: অর্থনীতিকে ৩ ধাপে সাজানোর ঘোষণা প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের
ছবি: সংগৃহীত

জাতীয় ডেস্ক: শামীম হোসাইন / দিগন্ত বাংলা নিউজ

ঢাকা: বাংলাদেশের সামগ্রিক অর্থনৈতিক ব্যবস্থায় শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনতে এবং একটি বৈষম্যহীন সমাজ বিনির্মাণে বড় ধরনের কাঠামোগত পরিবর্তনের ঘোষণা দিয়েছে সরকার। দেশের বর্তমান অর্থনৈতিক পরিস্থিতি বিবেচনা করে এটিকে মূলত তিনটি সুনির্দিষ্ট ধাপে সাজানোর মহাপরিকল্পনা গ্রহণ করা হয়েছে। এই তিনটি ধাপ হলো— অর্থনীতি পুনরুদ্ধার, উত্তরণ এবং চূড়ান্ত পুনর্গঠন।

আজ সোমবার (২৯ জুন, ২০২৬) ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের চলমান দ্বিতীয় অধিবেশনে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এক ভাষণে এই কথা জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। সংসদ অধিবেশনে সমাপনী ও বাজেট পরবর্তী আলোচনায় অংশ নিয়ে তিনি সরকারের এই দূরদর্শী অর্থনৈতিক ভাবনার কথা দেশবাসীর সামনে তুলে ধরেন।

সংসদ ও জনগণের প্রত্যাশা

প্রধানমন্ত্রী তার ভাষণে সংসদীয় গণতন্ত্রের গুরুত্ব এবং জনগণের আস্থার কথা স্মরণ করেন। তিনি বলেন, "এই সংসদে সরকারি দল ও বিরোধী দলের মধ্যে বিভিন্ন জনগুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে যেমন ঐকমত্য রয়েছে, ঠিক তেমনি কিছু বিষয়ে স্বাভাবিক গণতান্ত্রিক দ্বিমতও রয়েছে। তবে সবচেয়ে বড় বিষয় হলো, আমরা এই সংসদের মাধ্যমে দেশের আপামর জনসাধারণের মনে একটি নতুন আশার সঞ্চার করতে সক্ষম হয়েছি।"

তিনি আরও যোগ করেন, "যদিও বিগত দিনগুলোতে আমরা সংসদে ভবিষ্যতের চেয়ে অতীত রাজনীতি নিয়ে কিছুটা বেশি সময় ব্যয় করেছি, যা হয়তো এড়ানো যেত। কিন্তু দেশের মানুষ অতীত নয়, বরং ভবিষ্যৎ নিয়ে কথা শুনতে চায়। তারা জানতে চায় আগামী দিনের বাংলাদেশ কেমন হবে এবং আমাদের সরকার সেই ভবিষ্যতের দিকেই সবচেয়ে বেশি নজর দিচ্ছে।

আরও পড়ুন: শাহজাদপুরে পিকআপ ভর্তি বিপুল পরিমাণ অবৈধ চায়না দুয়ারি জাল জব্দ ও পুড়িয়ে ধ্বংস

এবারের জীবনবান্ধব বাজেট ও জনগণের স্বস্তি

চলতি অর্থবছরের বাজেটকে নিছক কোনো প্রথাগত বা বার্ষিক আয়-ব্যয়ের হিসাব হিসেবে দেখতে নারাজ সরকারপ্রধান। তিনি এটিকে একটি মানবিক ও কল্যাণমুখী রাষ্ট্র গঠনের হাতিয়ার হিসেবে উল্লেখ করেন। প্রধানমন্ত্রী বলেন:

  • জীবনবান্ধব বাজেট: এবারের জাতীয় বাজেটটি কোনো বিশেষ গোষ্ঠীর জন্য নয়, এটি মূলত সাধারণ ও পিছিয়ে পড়া মানুষের কল্যাণে নিবেদিত একটি জীবনবান্ধব বাজেট।

  • শুল্ক প্রত্যাহার: দেশের সাধারণ ও নিম্ন আয়ের মানুষকে নিত্যপণ্যের বাজারে স্বস্তি দিতে সরকার ইতিমধ্যে চাল, ডাল, তেলসহ অত্যন্ত জরুরি ৬১টি নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের ওপর থেকে আমদানি শুল্ক সম্পূর্ণ প্রত্যাহার করে নিয়েছে।

  • বাজার নিয়ন্ত্রণে সফলতা: প্রতি বছর বাজেট পেশ করার আগে ও পরে দেশের বাজারে নিত্যপণ্যের দাম যেভাবে লাফিয়ে লাফিয়ে বাড়ত, সরকারের কার্যকর পদক্ষেপের কারণে এবার তার ব্যতিক্রম ঘটেছে। বাজেটের প্রভাবে বাজারে কোনো কৃত্রিম সংকট বা মূল্যবৃদ্ধি ঘটেনি।

বিগত সরকারের ঋণের বোঝা ও আগামী দিনের চ্যালেঞ্জ

দেশের অর্থনীতিকে সচল করার ক্ষেত্রে বড় বাধাগুলোও সংসদের সামনে অকপটে স্বীকার করেছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। তিনি বলেন, "দেশের সাধারণ জনগণের অকুণ্ঠ সমর্থনের কারণেই আজ আমরা এই পবিত্র সংসদে দাঁড়িয়ে দেশের উন্নয়নে ভূমিকা রাখার সুযোগ পেয়েছি। তবে আমাদের মনে রাখতে হবে, অতীতে একের পর এক অপ্রয়োজনীয় ও অতিরিক্ত ব্যয়বহুল প্রকল্প বাস্তবায়ন করতে গিয়ে বিপুল পরিমাণ বৈদেশিক ঋণ নেওয়া হয়েছে।"

তিনি আক্ষেপ প্রকাশ করে বলেন, "বিগত সরকারের চাপিয়ে দেওয়া এই বিশাল ঋণের বোঝা এ দেশের সাধারণ জনগণকে আরও বহু বছর ধরে বয়ে বেড়াতে হবে। তবে আমাদের সরকার এই ঋণের জাল থেকে দেশকে বের করে এনে আত্মনির্ভরশীল করার চেষ্টা করছে।"

ন্যায়ভিত্তিক মানবিক অর্থনীতির মূল লক্ষ্যসমূহ

প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান সংসদে অর্থনীতির চাকা সচল রাখা এবং কর্মসংস্থান সৃষ্টির বিষয়ে সরকারের সুনির্দিষ্ট লক্ষ্যগুলো বুলেট আকারে উপস্থাপন করেন:

আরও পড়ুন: নৌবাহিনীকে পারমাণবিক অস্ত্রে সাজানোর ঘোষণা কিম জং উনের

  • ন্যায়ভিত্তিক অর্থনীতি: এবারের বাজেটের মূল লক্ষ্য হচ্ছে দেশে একটি সম্পূর্ণ ন্যায়ভিত্তিক, মানবিক এবং অন্তর্ভুক্তিমূলক অর্থনৈতিক কাঠামো গড়ে তোলা, যেখানে ধনী-দরিদ্রের বৈষম্য কমে আসবে।

  • শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনা: বিভিন্ন খাতে চলমান অব্যবস্থাপনা দূর করে দেশের ভঙ্গুর অর্থনীতিতে ধীরে ধীরে পূর্ণ শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনাই এই বাজেটের মূল চালিকাশক্তি।

  • চাকা গতিশীল করা: নতুন বিনিয়োগ আকর্ষণ, দেশীয় উৎপাদন বৃদ্ধি এবং ব্যাপক হারে কর্মসংস্থান সৃষ্টি করার মাধ্যমে স্থবির হয়ে পড়া অর্থনীতির চাকাকে দ্রুত গতিশীল করা হবে।

  • উন্নয়ন বাজেট বৃদ্ধি: সম্পদের নানাবিধ সীমাবদ্ধতা থাকা সত্ত্বেও জনগণের কল্যাণের কথা বিবেচনা করে এবারের উন্নয়ন বাজেট আরও ৫০ হাজার কোটি টাকা বাড়ানো হয়েছে।

  • তরুণদের উদ্যোক্তা তৈরি: দেশের তরুণ সমাজকে আর চাকরির পেছনে ছুটতে হবে না। সরকার এমন একটি পরিবেশ ও অর্থনৈতিক ভিত গড়তে চায়, যাতে তরুণরা সহজ শর্তে ঋণ ও সুবিধা পেয়ে নিজেই নিজের কর্মসংস্থান ও নতুন উদ্যোগ তৈরি করতে পারে।

  • উৎপাদনমুখী বিনিয়োগ: আগামী দিনের অর্থনীতি আর কেবল ঋণনির্ভর থাকবে না, বরং তা হবে সম্পূর্ণ উৎপাদন ও প্রকৃত বিনিয়োগ নির্ভর।

প্রধানমন্ত্রী দৃঢ়তার সাথে উল্লেখ করেন যে, জনগণের ট্যাক্সের প্রতিটি টাকা শুধুমাত্র জনগণের প্রত্যক্ষ কল্যাণে এবং দেশের টেকসই উন্নয়নে ব্যয় নিশ্চিত করতে সরকার বদ্ধপরিকর। পুনরুদ্ধার, উত্তরণ ও পুনর্গঠনের এই ত্রিমাত্রিক পরিকল্পনার মাধ্যমে বাংলাদেশ খুব দ্রুতই একটি সমৃদ্ধশালী রাষ্ট্রে পরিণত হবে বলে তিনি আশাবাদ ব্যক্ত করেন।

নিউজের সূত্র: ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের দ্বিতীয় অধিবেশনের কার্যবিবরণী ও প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের প্রেস উইং।

Post a Comment

আপনার মূল্যবান মতামত আমাদের জানান। কোনো উসকানিমূলক বা অশালীন মন্তব্য করা থেকে বিরত থাকুন।

নবীনতর পূর্বতন