শাহজাদপুরে পিকআপ ভর্তি বিপুল পরিমাণ অবৈধ চায়না দুয়ারি জাল জব্দ ও পুড়িয়ে ধ্বংস

শাহজাদপুরে পিকআপ ভর্তি বিপুল পরিমাণ অবৈধ চায়না দুয়ারি জাল জব্দ ও পুড়িয়ে ধ্বংস
ছবি: সংগৃহীত

সিরাজগঞ্জ ডেস্ক: শামীম হোসাইন / দিগন্ত বাংলা নিউজ

শাহজাদপুর (সিরাজগঞ্জ): দেশের নদী-নালা ও মুক্ত জলাশয়ের মৎস্য সম্পদ ধ্বংসকারী নিষিদ্ধ ও অবৈধ ‘চায়না দুয়ারি’ জালের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান নিয়েছে সিরাজগঞ্জের শাহজাদপুর থানা পুলিশ ও উপজেলা মৎস্য অধিদপ্তর। এরই ধারাবাহিকতায় শাহজাদপুরে গভীর রাতে এক বিশেষ অভিযান পরিচালনা করে একটি পিকআপ ভর্তি বিপুল পরিমাণ অবৈধ চায়না দুয়ারি জাল জব্দ করা হয়েছে। পরবর্তীতে জব্দকৃত এই বিশাল জালের চালানটি আগুনে পুড়িয়ে সম্পূর্ণ ধ্বংস করা হয়।

গত রবিবার (২৮শে জুন) সকাল বেলা শাহজাদপুর থানা চত্বরে স্থানীয় প্রশাসন, মৎস্য বিভাগ এবং পুলিশের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের উপস্থিতিতে আইনগত প্রক্রিয়া শেষে এই জালগুলো ভস্মীভূত করা হয়। ধ্বংসকৃত জালের আনুমানিক বাজার মূল্য প্রায় ৫ লক্ষ টাকা বলে প্রশাসন সূত্রে নিশ্চিত করা হয়েছে।

অভিযান ও জাল জব্দের নেপথ্য ঘটনা

থানা পুলিশ ও স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, গত শনিবার দিবাগত গভীর রাতে শাহজাদপুর উপজেলার বাঘাবাড়ি পশ্চিমপাড়া এলাকা হয়ে একটি পিকআপ ভ্যানে করে বিপুল পরিমাণ অবৈধ জালের একটি বড় চালান পাচার করা হচ্ছিল। বিষয়টি টের পেয়ে স্থানীয় সাধারণ জনগণ ও মৎস্যজীবীরা সন্দেহবশত পিকআপটি বাঘাবাড়ি বালুর পয়েন্ট নামক স্থানে আটকে দেয়। এরপর তাৎক্ষণিকভাবে বিষয়টি শাহজাদপুর থানা পুলিশকে অবহিত করা হয়।

আরও পড়ুন: আসিফ মাহমুদের সেই ফোনেই বদলে যায় সিদ্ধান্ত: অন্তর্বর্তী সরকার গঠনের নেপথ্য গল্প শোনালেন ড. ইউনূস

খবর পাওয়ার পরপরই শাহজাদপুর থানার অফিসার ইনচার্জের নির্দেশনায় উপ-পরিদর্শক (এসআই) মিজানুর রহমানের নেতৃত্বে টহল পুলিশের একটি চৌকস দল দ্রুত ঘটনাস্থলে উপস্থিত হয়। পুলিশ সদস্যরা ঘটনাস্থলে পৌঁছে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে নেন এবং পিকআপ ভ্যান তল্লাশি করে বিপুল পরিমাণ অবৈধ চায়না দুয়ারি জাল উদ্ধার করতে সক্ষম হন। পরে জালসহ পরিবহনকারী পিকআপ ভ্যানটি জব্দ করে থানায় নিয়ে আসা হয়।

এক নজরে অভিযানের মূল তথ্য ও পরিসংখ্যান:

মৎস্য সম্পদ রক্ষায় পরিচালিত এই অভিযানের মূল বিষয়গুলো নিচে বিস্তারিত তুলে ধরা হলো:

  • অভিযানের সময়কাল: গত শনিবার দিবাগত গভীর রাতে বাঘাবাড়ি বালুর পয়েন্ট এলাকায় মূল অভিযানটি পরিচালিত হয়।

  • জব্দকৃত জালের পরিমাণ: পুলিশি তল্লাশিতে পিকআপ ভ্যান থেকে মোট ২৮টি বড় বড় বস্তা উদ্ধার করা হয়, যার ভেতরে সুকৌশলে লুকিয়ে রাখা ২২৪ পিস ক্ষতিকর চায়না দুয়ারি জাল পাওয়া যায়।

  • আনুমানিক বাজার মূল্য: জব্দকৃত জালের আনুমানিক বাজার মূল্য প্রায় ৫ লক্ষ টাকা নির্ধারণ করেছে স্থানীয় মৎস্য বিভাগ।

  • ধ্বংসের স্থান ও সময়: রবিবার সকালে শাহজাদপুর থানা চত্বরের ভেতরে সবার সম্মুখে প্রকাশ্যে আগুনে পুড়িয়ে এই জালগুলো চিরতরে ধ্বংস করা হয়।

  • উপস্থিত কর্মকর্তা ব্যক্তিবর্গ: জাল পুড়িয়ে ধ্বংস করার সময় উপস্থিত ছিলেন শাহজাদপুর উপজেলা মৎস্য কর্মকর্তা ইলোরা ইয়াসমিন, শাহজাদপুর থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) মোঃ সাইফুল ইসলাম এবং অভিযানের নেতৃত্ব দেওয়া উপ-পরিদর্শক (এসআই) মিজানুর রহমানসহ পুলিশের অন্যান্য সদস্যরা।

প্রশাসনের বক্তব্য ও কঠোর হুঁশিয়ারি

এই সফল অভিযান ও অবৈধ জাল ধ্বংসের বিষয়ে শাহজাদপুর থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) মোঃ সাইফুল ইসলাম গণমাধ্যমকে বলেন, "আমরা গোপন সংবাদের ভিত্তিতে এবং স্থানীয়দের সহযোগিতায় বাঘাবাড়ি থেকে পিকআপ ভর্তি এই অবৈধ জালের চালানটি আটক করি। উপজেলা নির্বাহী অফিসারের (ইউএনও) আইনি নির্দেশনা এবং উপজেলা মৎস্য কর্মকর্তার প্রত্যক্ষ উপস্থিতিতে মৎস্য আইন অনুযায়ী আমরা এই ক্ষতিকর জালগুলো পুড়িয়ে ধ্বংস করেছি। মৎস্য সম্পদ ও জীববৈচিত্র্য ধ্বংসকারী যেকোনো অবৈধ জালের ব্যবহার ও পরিবহনের বিরুদ্ধে আমাদের এই কঠোর অভিযান ভবিষ্যতেও অব্যাহত থাকবে।"

আরও পড়ুন: নতুন প্রযুক্তির ক্ষেপণাস্ত্র ও রকেট লঞ্চারের সফল পরীক্ষা চালাল উত্তর কোরিয়া

অন্যদিকে, শাহজাদপুর উপজেলা মৎস্য কর্মকর্তা ইলোরা ইয়াসমিন এই জালের ক্ষতিকারক দিক এবং এর তৈরি সিন্ডিকেট নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে বলেন:

  • আইনি নিষেধাজ্ঞা: বাংলাদেশে চায়না দুয়ারি এবং কারেন্ট জালের উৎপাদন, পরিবহন, মজুত, বিপণন এবং ব্যবহার সম্পূর্ণভাবে নিষিদ্ধ ও আইনগত দণ্ডনীয় অপরাধ।

  • উৎপাদন ও পাচারের রুট: অনুসন্ধানে জানা গেছে, পার্শ্ববর্তী ফরিদপুর জেলার ভাঙ্গুরা অঞ্চলসহ দেশের কিছু নির্দিষ্ট এলাকায় গোপনে এসব ক্ষতিকর জাল তৈরি করা হয়। পরবর্তীতে নদীপথ ও সড়কপথ ব্যবহার করে এগুলো দেশের বিভিন্ন জেলা-উপজেলায় পাচার করা হয়।

  • ধারাবাহিক তৎপরতা: শাহজাদপুর উপজেলা মৎস্য বিভাগ অত্যন্ত তৎপর। গত সপ্তাহেও পুলিশের সহায়তায় বিপুল পরিমাণ অবৈধ চায়না দুয়ারি জাল আটক করে একইভাবে পুড়িয়ে ধ্বংস করা হয়েছিল।

  • জনসচেতনতার আহ্বান: দেশের মৎস্য সম্পদ ও দেশীয় প্রজাতির মাছ রক্ষায় সাধারণ জনগণকে সবার আগে সচেতন হতে হবে। নিজ এলাকায় এই ধরনের অবৈধ জাল দেখামাত্রই প্রশাসনকে তথ্য দিয়ে সহায়তা করার অনুরোধ জানান তিনি।

পরিবেশবিদ ও মৎস্য বিশেষজ্ঞদের মতে, এই চায়না দুয়ারি জালকে "নদীর ক্যানসার" বলা চলে। কারণ এই জালের বুনন এতটাই সূক্ষ্ম যে, নদীর তলদেশ দিয়ে এটি পেতে রাখলে ছোট-বড় কোনো মাছ, এমনকি মাছের ডিম বা পোনাও এর হাত থেকে রক্ষা পায় না। ফলে নদী ও মুক্ত জলাশয়ের প্রাকৃতিক জীববৈচিত্র্য চরম হুমকির মুখে পড়ছে। শাহজাদপুর প্রশাসন ও মৎস্য বিভাগের এই সময়োপযোগী অভিযানকে সাধুবাদ জানিয়েছেন স্থানীয় সচেতন মহল ও প্রকৃত মৎস্যজীবীরা।

নিউজের সূত্র: শাহজাদপুর থানা পুলিশ ও উপজেলা মৎস্য কর্মকর্তার কার্যালয়ের প্রেস বিজ্ঞপ্তি।

Post a Comment

আপনার মূল্যবান মতামত আমাদের জানান। কোনো উসকানিমূলক বা অশালীন মন্তব্য করা থেকে বিরত থাকুন।

নবীনতর পূর্বতন