সাভার (ঢাকা): ২০২৪ সালের ঐতিহাসিক ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থানের পর বাংলাদেশে যে নতুন রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক অধ্যায়ের সূচনা হয়েছিল, তার নেপথ্যে ছিল এক রোমাঞ্চকর এবং আবেগঘন ইতিহাস। শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর চরম এক অনিশ্চয়তার মুহূর্তে কীভাবে নোবেল শান্তি পুরস্কার বিজয়ী অর্থনীতিবিদ ড. মুহাম্মদ ইউনূস রাষ্ট্র পরিচালনার কঠিন দায়িত্ব কাঁধে তুলে নিয়েছিলেন, সেই অজানা গল্প এবার নিজেই প্রকাশ্যে আনলেন তিনি। ড. ইউনূস জানিয়েছেন, তাকে এই গুরুদায়িত্ব গ্রহণে রাজি করানোর পেছনে প্রধান ও সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকাটি পালন করেছিলেন বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের অন্যতম শীর্ষ নেতা ও অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সাবেক উপদেষ্টা আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়া।
গতকাল রবিবার (২৮ জুন, ২০২৬) সাভারের জিরাবোতে অবস্থিত সামাজিক কনভেনশন সেন্টারে এক জমকালো অনুষ্ঠানে ড. ইউনূস এই স্মৃতিচারণ করেন। ইউনুস সেন্টার এবং গ্রামীণ গ্রুপ যৌথভাবে আয়োজিত ১৬তম ‘সোশ্যাল বিজনেস ডে’ (সামাজিক ব্যবসা দিবস) এর তিন দিনব্যাপী উৎসবের সমাপনী অধিবেশনে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি ছাত্র আন্দোলনের তীব্রতা ও সরকার গঠনের সেই নাটকীয় মুহূর্তগুলো তুলে ধরেন।
ফ্রান্সের ফোন কল এবং আসিফের নাছোড়বান্দা অনড় অবস্থান
ড. মুহাম্মদ ইউনূস তার বক্তব্যে ২০২৪ সালের ৫ই আগস্টের পরবর্তী সময়ের বিবরণ দিয়ে বলেন, "আসিফ মাহমুদই সেই অকুতোভয় তরুণ, যে আমাকে এই দায়িত্ব নিতে আক্ষরিক অর্থেই বাধ্য করেছিল।" তিনি জানান, যখন বাংলাদেশে ছাত্র-জনতার বিপ্লবের মুখে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা দেশত্যাগ করেন, তখন তিনি নিজে বাংলাদেশে ছিলেন না। প্যারিস অলিম্পিকে বিশেষ আমন্ত্রণে অংশ নিতে তিনি সে সময় ফ্রান্সে অবস্থান করছিলেন। দেশে চলমান তীব্র রাজনৈতিক শূন্যতার মাঝে আসিফ মাহমুদ বারবার ফ্রান্সে তার ব্যক্তিগত ফোনে যোগাযোগ করার চেষ্টা করতে থাকেন।
আরও পড়ুন:অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে সর্বোচ্চ দুর্নীতি: জাতীয় সংসদে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর কঠোর বার্তা
শুরুর দিকে এই প্রস্তাব পাওয়ার পর ড. ইউনূস বেশ দ্বিধাদ্বন্দ্বে ছিলেন এবং দায়িত্ব নিতে অস্বীকৃতি জানিয়েছিলেন। সেই মুহূর্তের কথোপকথন স্মরণ করে নোবেলজয়ী এই অর্থনীতিবিদ বলেন, "আমি আসিফকে বারবার বোঝাচ্ছিলাম যে, তোমরা রাষ্ট্র পরিচালনার জন্য অন্য কোনো উপযুক্ত ব্যক্তিকে খুঁজে নাও। আমি এই ধরনের শাসনতান্ত্রিক বা রাজনৈতিক কাজের জন্য একদমই উপযুক্ত নই। জীবনভর আমি শুধু সেই কাজগুলোই করেছি, যা করতে আমি স্বাচ্ছন্দ্য ও আনন্দ পাই। রাষ্ট্র পরিচালনার মতো কঠিন ও জটিল কাজ আমার জন্য নয়।"
কিন্তু তরুণ সমাজ যে ততক্ষণে দেশের ভবিষ্যৎ নির্ধারণের দায়িত্ব ড. ইউনূসের ওপর সঁপে দেওয়ার চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলেছে, তা আসিফের জবাবে স্পষ্ট ছিল। ড. ইউনূস বলেন, "আমার অনীহা দেখে আসিফ অত্যন্ত আবেগপ্রবণ ও দৃঢ় কণ্ঠে বলেছিল— 'স্যার, অনেক দেরি হয়ে যাচ্ছে। পুরো দেশের মানুষ একটি নিয়মতান্ত্রিক সরকার এবং আইন-শৃঙ্খলার জন্য অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করছে। আপনি রাজি হচ্ছেন না বলেই আজ তিন দিন ধরে দেশে কোনো সরকার নেই, চারদিকে এক ধরনের শূন্যতা বিরাজ করছে। এই অবস্থায় আপনি আমাদের ফিরিয়ে দিতে পারেন না।' তরুণের এই দেশপ্রেম এবং ব্যাকুলতা আমার মনের সিদ্ধান্ত বদলে দিতে বাধ্য করে।"
"প্রথম ফ্লাইটেই চলে আসুন"
তরুণ নেতৃত্বের এই অবিচল আস্থা ও দেশের ক্রান্তিকালের কথা চিন্তা করে অবশেষে ড. মুহাম্মদ ইউনূস দায়িত্ব গ্রহণে সম্মতি প্রদান করেন। সম্মতি দেওয়ার ঠিক পরের মুহূর্তেই আসিফ মাহমুদের পেশাদারিত্ব ও ক্ষিপ্রতার কথা উল্লেখ করে ড. ইউনূস বলেন, "আমি হ্যাঁ বলার সাথে সাথেই আসিফ আমাকে আর এক মুহূর্ত সময় নষ্ট না করার অনুরোধ জানায়। সে সরাসরি বলে— 'স্যার, আপনি রাজি হয়েছেন এটাই আমাদের সবচেয়ে বড় পাওয়া। এবার দয়া করে যত দ্রুত সম্ভব বিমানের টিকিট কেটে বাংলাদেশে চলে আসুন। কোনো বিলম্ব নয়, প্রথম ফ্লাইটেই আপনাকে আমরা ঢাকার মাটিতে দেখতে চাই।'"
নাহিদ ইসলামকে নিয়ে ড. ইউনূসের আবেগঘন মন্তব্য: "সে নিজেই একটি ইতিহাস"
বক্তব্যের এক পর্যায়ে ড. মুহাম্মদ ইউনূস জুলাই-আগস্ট গণঅভ্যুত্থানের আরেক শীর্ষ নেতা এবং অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সাবেক উপদেষ্টা নাহিদ ইসলামের সাহসিকতার ভূয়সী প্রশংসা করেন। নাহিদের লড়াকু ভূমিকার প্রতি সম্মান জানিয়ে তিনি বলেন, "নাহিদকে কেবল একজন সাধারণ তরুণ বা ব্যক্তি হিসেবে মূল্যায়ন করলে ভুল হবে। সে আসলে কোনো ব্যক্তি নয়, সে নিজেই একটি জীবন্ত ইতিহাস।"
আরও পড়ুন: দুর্নীতি রুখতে ৫০০ ও ১০০০ টাকার নোট বাতিলের প্রস্তাব সংসদে
তিনি তৎকালীন স্বৈরাচারী শাসকগোষ্ঠী ও তাদের নিরাপত্তা বাহিনীর নির্মম দমন-পীড়নের চিত্র স্মরণ করে বলেন, "আন্দোলন দমানোর জন্য তৎকালীন সরকার সব ধরনের হিংস্র পথ বেছে নিয়েছিল। নির্বিচারে সাধারণ মানুষকে হত্যা করা হয়েছে, বুলেটের আঘাতে ঝাঁঝরা করে দেওয়া হয়েছে শিক্ষার্থী ও তাদের সহকর্মীদের বুক। মাত্র তিন সপ্তাহের ব্যবধানে রাজপথে প্রায় ১ হাজার ৪০০ তরুণ ও সাধারণ মানুষ বুকের তাজা রক্ত ঢেলে শহীদ হয়েছেন। এমন ভয়াবহ ও মৃত্যুর উপত্যকায় দাঁড়িয়েও নাহিদ এবং তার সহযোদ্ধারা রাজপথ ছেড়ে যাননি। নাহিদ ছিল সবার সামনে থেকে নেতৃত্ব দেওয়া সেই নির্ভীক সেনানী।"
সোশ্যাল বিজনেস ডে ও নতুন বাংলাদেশের রূপরেখা
১৬তম সামাজিক ব্যবসা দিবসের সমাপনী এই অনুষ্ঠানে দেশ-বিদেশের বহু বিশিষ্ট গবেষক, অর্থনীতিবিদ ও সামাজিক উদ্যোক্তারা উপস্থিত ছিলেন। ড. ইউনূস তার দীর্ঘ বক্তব্যে কেবল অতীতের স্মৃতিচারণই করেননি, বরং তরুণ প্রজন্মের হাত ধরে যে 'নতুন বাংলাদেশ' বা 'দ্বিতীয় স্বাধীনতা' অর্জিত হয়েছে, তাকে টেকসই করার আহ্বান জানান। তিনি উল্লেখ করেন, তরুণদের এই আত্মত্যাগ তখনই সার্থক হবে যখন একটি বৈষম্যহীন, শোষণমুক্ত এবং সামাজিক ব্যবসায় সমৃদ্ধ বাংলাদেশ গড়ে তোলা সম্ভব হবে।
অনুষ্ঠানে সমাপনী বক্তব্যে উপস্থিত অতিথিরা ড. ইউনূসের এই নেপথ্য ঘটনা শোনার পর করতালির মাধ্যমে সাধুবাদ জানান এবং তরুণ সমাজ যেভাবে একটি দেশের ক্রান্তিলগ্নে সঠিক সিদ্ধান্ত নিয়েছিল, তার প্রশংসা করেন।
নিউজের সূত্র: দিগন্ত বাংলা নিউজ স্পেশাল ডেস্ক ও ইউনুস সেন্টারের প্রেস বিজ্ঞপ্তি।

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন
আপনার মূল্যবান মতামত আমাদের জানান। কোনো উসকানিমূলক বা অশালীন মন্তব্য করা থেকে বিরত থাকুন।