আন্তর্জাতিক ডেস্ক: শামীম হোসাইন / দিগন্ত বাংলা নিউজ
উত্তর কোরিয়ার নামপো বন্দরনগরীতে অত্যাধুনিক যুদ্ধজাহাজ ‘চোয়ে হিয়ন’–এর কমিশনিং অনুষ্ঠানে নৌবাহিনীকে পারমাণবিক শক্তিতে বলীয়ান করার ঘোষণা দিচ্ছেন কিম জং উন।
পিয়ংইয়ংয়ের নতুন সামরিক চাল: নৌবাহিনীকে পারমাণবিক অস্ত্রে সজ্জিত করছেন কিম জং উন, সমুদ্র কাঁপাতে আসছে ১০ হাজার টনের দানবীয় যুদ্ধজাহাজ
পূর্ব এশিয়ার ভূ-রাজনৈতিক সমীকরণ এবং কোরিয় উপদ্বীপের জলসীমায় সামরিক উত্তেজনার পারদ এক ধাক্কায় বহুগুণ বাড়িয়ে দিলেন উত্তর কোরিয়ার শীর্ষ নেতা কিম জং উন। এবার তিনি তাঁর দেশের নৌবাহিনীকে (North Korean Navy) সরাসরি কৌশলগত পারমাণবিক অস্ত্রে সজ্জিত করার এক চরম ও সুদূরপ্রসারী পরিকল্পনার কথা বিশ্বমঞ্চে ঘোষণা করেছেন। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এবং দক্ষিণ কোরিয়ার যৌথ সামরিক মহড়া ও প্রভাবকে রুখে দিতে পিয়ংইয়ং এখন সমুদ্রপৃষ্ঠে নিজেদের সামরিক শ্রেষ্ঠত্ব প্রমাণের জন্য মরিয়া হয়ে উঠেছে। পারমাণবিক সমরাস্ত্রের পাশাপাশি উত্তর কোরিয়ার নৌ-বহরকে আধুনিকায়ন করতে ১০ হাজার টন ওজনের নতুন প্রজন্মের বিশালাকার কৌশলগত যুদ্ধজাহাজ (Tactical Warships) নির্মাণের এক মেগা প্রজেক্টের ঘোষণাও দিয়েছেন এই কমিউনিস্ট নেতা।
গত বুধবার (২৪ জুন ২০২৬) উত্তর কোরিয়ার অত্যন্ত প্রভাবশালী ও রাষ্ট্রীয় সংবাদ সংস্থা কোরিয়ান সেন্ট্রাল নিউজ এজেন্সি তথা কেসিএনএ (KCNA) তাদের এক বিশেষ প্রতিবেদনে এই চাঞ্চল্যকর সামরিক পদক্ষেপের তথ্যটি বিশ্ববাসীর সামনে প্রকাশ করে। প্রতিবেদনে বলা হয়, উত্তর কোরিয়ার পশ্চিমাঞ্চলীয় কৌশলগত নামপো বন্দরনগরীতে (Nampo Port) আয়োজিত ‘চোয়ে হিয়ন’ নামের ৫ হাজার টন শ্রেণির একটি অত্যাধুনিক ও যুদ্ধংদেহী যুদ্ধজাহাজের আনুষ্ঠানিক নৌ-বহরে অন্তর্ভুক্তি বা কমিশনিং অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্য দিতে গিয়ে কিম জং উন এই হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করেন। তাঁর এই নতুন ঘোষণা সিউল এবং ওয়াশিংটনের প্রতিরক্ষা দপ্তরে নতুন করে উদ্বেগের জন্ম দিয়েছে।
## নিখুঁতভাবে এগোচ্ছে পারমাণবিক মিশন: সমুদ্রের বুকেও সদা প্রস্তুত পিয়ংইয়ং
নামপো বন্দরের বিশাল সামরিক প্যারেড ও জাঁকজমকপূর্ণ অনুষ্ঠানে কিম জং উন তাঁর দেশের নৌ-প্রকৌশলী এবং নৌবাহিনীর কর্মকর্তাদের ভূয়সী প্রশংসা করেন। তিনি স্পষ্ট ভাষায় জানিয়ে দেন যে, স্থলভাগের পাশাপাশি এখন সমুদ্রের বুকেও উত্তর কোরিয়াকে কেউ স্পর্শ করার সাহস পাবে না। নিজের দূরদর্শী সামরিক পরিকল্পনার কথা উল্লেখ করে কিম জং উন বলেন:
আরও পড়ুন: মার্কিন ইতিহাসে নজিরবিহীন মোড়: এবার ট্রাম্পের বিরুদ্ধে আইসিসির ৩ বিচারকের আইনি যুদ্ধ
"আমাদের নৌবাহিনীকে সম্পূর্ণ প্রথাগত অস্ত্রের গণ্ডি থেকে বের করে পারমাণবিক অস্ত্রে সজ্জিত করার যে বিশেষ কর্মসূচি আমরা হাতে নিয়েছিলাম, তা আমাদের পূর্ব নির্ধারিত পরিকল্পনা অনুযায়ী অত্যন্ত নির্ভুল ও নিখুঁতভাবে সামনের দিকে এগিয়ে চলছে। এটি কেবল একটি সাধারণ সামরিক আধুনিকায়ন নয়, বরং আমাদের সার্বভৌমত্ব রক্ষার তাগিদে এটি একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ কৌশলগত ঐতিহাসিক পদক্ষেপ। এর ফলে আমাদের রাষ্ট্রের পারমাণবিক শক্তি কেবল ভূমিতেই সীমাবদ্ধ থাকবে না, বরং সমুদ্রের তলদেশ ও উপরিভাগ থেকে যেকোনো বহুমুখী ও কার্যকর সামরিক অভিযানের জন্য আমাদের পারমাণবিক প্রতিরোধ ব্যবস্থা সর্বদা প্রস্তুত (Sada Proস্তুত) থাকবে।"
উল্লেখ্য, উত্তর কোরিয়ার সামরিক থিংক ট্যাংকগুলো দীর্ঘদিন ধরেই এমন একটি নৌ-কৌশল তৈরি করার চেষ্টা করছিল, যার মাধ্যমে আমেরিকার দূরপাল্লার যুদ্ধজাহাজগুলোকে কোরিয় জলসীমার বাইরে আটকে রাখা যায়। কিমের এই বক্তব্য প্রমাণ করে যে, উত্তর কোরিয়া এখন সফলভাবে ছোট আকারের পারমাণবিক ওয়ারহেড বা ক্ষেপণাস্ত্র যুদ্ধজাহাজে মোতায়েন করার প্রযুক্তিগত সক্ষমতা অর্জন করে ফেলেছে।
## ‘চোয়ে হিয়ন’ থেকে ‘কাং কোন’: উত্তর কোরিয়ার নৌ-পরাশক্তি হয়ে ওঠার মেগা রোডম্যাপ
এর আগেও পিয়ংইয়ংয়ের সামরিক কমান্ডের পক্ষ থেকে দাবি করা হয়েছিল যে, সদ্য নৌ-বহরে যুক্ত হওয়া ৫ হাজার টনী ‘চোয়ে হিয়ন’ (Choe Hyon) যুদ্ধজাহাজটি তাদের দেশের ইতিহাসের সবচেয়ে শক্তিশালী এবং আধুনিক সব মারণাস্ত্রে সজ্জিত করা হয়েছে। সামরিক গোপনীয়তা বজায় রেখে গত এপ্রিল মাসেই কিম জং উন নিজে স্বশরীরে উপস্থিত থেকে এই অত্যাধুনিক জাহাজটি থেকে একটি অত্যন্ত শক্তিশালী ও দূরপাল্লার ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্র (Cruise Missile) পরীক্ষার সরাসরি মাঠ পর্যায়ের তদারকি করেছিলেন। সেই সফল পরীক্ষার ধারাবাহিকতাতেই এবার জাহাজটিকে পূর্ণাঙ্গ সামরিক অপারেশনে নামানো হলো।
কিম জং উন অনুষ্ঠানে তাঁর ভবিষ্যৎ নৌ-রোডম্যাপের ঘোষণা দিয়ে জানান যে, ‘চোয়ে হিয়ন’–এর সফল কমিশনিংয়ের পর খুব দ্রুতই তাদের পরবর্তী ডেস্ট্রয়ার ‘কাং কোন’ (Kang Kon)-কে আনুষ্ঠানিক সামরিক কার্যক্রমে যুক্ত করা হবে। তবে উত্তর কোরিয়ার মূল লক্ষ্য আরও বড়। পিয়ংইয়ং এখন থেকে পর্যায়ক্রমে ১০ হাজার টন শ্রেণির বিশালাকার ও দানবীয় কৌশলগত যুদ্ধজাহাজ নির্মাণ ও সমুদ্রের ফ্রন্টলাইনে মোতায়েন করার কাজ শুরু করবে। কিম আরও প্রকাশ করেন যে, উত্তর কোরিয়া প্রতিবছর ‘চোয়ে হিয়ন’–এর চেয়েও আরও উন্নত ও আধুনিক প্রযুক্তিসম্পন্ন অন্তত দুটি করে মেগা যুদ্ধজাহাজ নির্মাণের বার্ষিক লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেছে, যার মধ্যে একটি হবে সম্পূর্ণ ১০ হাজার টনের বিশালাকার ক্রুজার (Cruiser)।
## ১০ হাজার টনের দানবীয় যুদ্ধজাহাজ: আমেরিকা ও দক্ষিণ কোরিয়াকে প্রকাশ্য চ্যালেঞ্জ
আন্তর্জাতিক সামরিক বিশ্লেষক ও নৌ-প্রকৌশলীদের মতে, ১০ হাজার টন শ্রেণির একটি যুদ্ধজাহাজের আকার ও ক্ষমতা সাধারণ কোনো বিষয় নয়। এই আকারের যুদ্ধজাহাজগুলো সাধারণত বিশ্বের এক নম্বর পরাশক্তি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের নৌবাহিনীর প্রধান চালিকাশক্তি ‘আর্লেই বার্ক’ (Arleigh Burke) শ্রেণির ডেস্ট্রয়ার কিংবা দক্ষিণ কোরিয়ার নৌবাহিনীর গর্ব ‘সেজং দ্য গ্রেট’ (Sejong the Great) শ্রেণির মেগা যুদ্ধজাহাজের সমপর্যায়ের ও সমকক্ষ হয়ে থাকে। এই দানবীয় আকৃতির যুদ্ধজাহাজগুলো সাধারণত লম্বায় ১৫০ থেকে ১৭০ মিটার পর্যন্ত দীর্ঘ হয়ে থাকে, যা সমুদ্রের বুকে এক একটি ভাসমান সামরিক দুর্গের মতো কাজ করে।
আরও পড়ুন: কাজিপুরে যমুনা নদীতে ডুবে দুই মাদরাসা ছাত্রের মর্মান্তিক মৃত্যু
এসব আধুনিক যুদ্ধজাহাজে একসাথে শত শত বিমান বিধ্বংসী মিসাইল, টর্পেডো, সাবমেরিন বিধ্বংসী রকেট এবং দূরপাল্লার পারমাণবিক ব্যালেস্টিক বা ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্র মোতায়েন করার মতো বিশাল হাঙ্গার ও লঞ্চিং প্যাড থাকে। উত্তর কোরিয়া যদি সফলভাবে প্রতি বছর এই ধরণের ১০ হাজার টনী ক্রুজার বা ডেস্ট্রয়ার সাগরে নামাতে পারে, তবে তা মার্কিন নেভির জন্য এশিয়া-প্যাসিফিক অঞ্চলে এক বিশাল কৌশলগত মাথাব্যথার কারণ হয়ে দাঁড়াবে।
## একনজরে উত্তর কোরিয়ার নতুন নৌ-সামরিক সক্ষমতা ও ভবিষ্যৎ মেগা পরিকল্পনা
পাঠকদের সুবিধার্থে এবং কিম জং উনের ঘোষিত নতুন নৌ-কৌশল ও উত্তর কোরিয়ার ভবিষ্যৎ সামরিক প্রস্তুতি একনজরে সহজে অনুধাবন করার জন্য নিচে একটি বিশেষ আধুনিক তথ্য সারণী প্রদান করা হলো:
| সামরিক প্যারামিটার ও প্রজেক্টসমূহ | সুনির্দিষ্ট বিবরণ ও কৌশলগত আন্তর্জাতিক খতিয়ান |
| মূল সামরিক ঘোষণা | উত্তর কোরিয়ার নৌবাহিনীকে সরাসরি পারমাণবিক অস্ত্রে সজ্জিতকরণ। |
| ঘোষণার সুনির্দিষ্ট স্থান ও সময় | নামপো বন্দরনগরী; ২৪ জুন ২০২৬ (বুধবার)। |
| সদ্য কমিশন্ড হওয়া যুদ্ধজাহাজ | ৫ হাজার টন শ্রেণির অত্যাধুনিক যুদ্ধজাহাজ ‘চোয়ে হিয়ন’। |
| ভবিষ্যৎ ডেস্ট্রয়ারের নাম | খুব শীঘ্রই আনুষ্ঠানিক কার্যক্রমে যুক্ত হতে যাওয়া ‘কাং কোন’। |
| পরবর্তী মেগা প্রজেক্টের লক্ষ্য | ১০ হাজার টন ওজনের নতুন প্রজন্মের কৌশলগত যুদ্ধজাহাজ নির্মাণ। |
| বার্ষিক উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রা | প্রতি বছর ‘চোয়ে হিয়ন’ থেকে উন্নত অন্তত ২টি মেগা যুদ্ধজাহাজ তৈরি। |
| আন্তর্জাতিক সমকক্ষতা | মার্কিন ‘আর্লেই বার্ক’ ও দক্ষিণ কোরিয়ার ‘সেজং দ্য গ্রেট’ শ্রেণির সমপর্যায়। |
| জাহাজের গড় দৈহিক আকৃতি | সাধারণত সমুদ্রের বুকে প্রায় ১৫০ থেকে ১৭০ মিটার দীর্ঘ। |
## দুই কোরিয়ার জলসীমায় শক্তির ভারসাম্যহীনতা ও ভবিষ্যৎ সংঘাতের তীব্র আশঙ্কা
বর্তমানে দুই কোরিয়ার নৌবাহিনীর শক্তির দিকে তাকালে এক বিশাল সামুদ্রিক ভারসাম্যহীনতা স্পষ্ট ধরা পড়ে। আন্তর্জাতিক বিভিন্ন সামরিক থিংক ট্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে দক্ষিণ কোরিয়ার অত্যাধুনিক নৌবাহিনীর বহরে ৫ হাজার টনের চেয়ে বেশি ওজনের উন্নত যুদ্ধজাহাজের সংখ্যা ১০টিরও বেশি। বিপরীতে, উত্তর কোরিয়ার সামরিক ভাণ্ডারে এই ক্যাটাগরির যুদ্ধজাহাজ রয়েছে মাত্র দুটি। এই বিশাল প্রযুক্তিগত ও সংখ্যাগত ঘাটতি দূর করতেই কিম জং উন এখন সংখ্যার চেয়ে 'পারমাণবিক শক্তির গুণগত মান' বা কোয়ালিটির ওপর বেশি জোর দিচ্ছেন। অর্থাৎ, উত্তর কোরিয়ার যুদ্ধজাহাজের সংখ্যা কম হলেও সেগুলোতে পারমাণবিক সমরাস্ত্র যুক্ত করে তারা দক্ষিণ কোরিয়া ও আমেরিকার বিশাল নৌ-বহরকে এক নিমেষেই রুখে দেওয়ার কৌশল বা ডেডলক (Deadlock) তৈরি করছে।
সামরিক বিশেষজ্ঞরা গভীর উদ্বেগের সাথে আশঙ্কা করছেন যে, কিম জং উনের এই নতুন ও আগ্রাসী ঘোষণার পর বিতর্কিত কোরিয় জলসীমায় (বিশেষ করে উত্তর সীমানা রেখা বা NLL অঞ্চলে) দুই দেশের নৌবাহিনীর মধ্যে মুখোমুখি সংঘর্ষের ঝুঁকি ও উত্তেজনা আগের চেয়ে বহুগুণ বেড়ে যাবে। পিয়ংইয়ংয়ের এই শক্তি প্রদর্শনের জবাবে দক্ষিণ কোরিয়া ও আমেরিকাও তাদের যৌথ নৌ-মহড়া আরও জোরদার করবে, যা সমগ্র পূর্ব এশিয়া অঞ্চলকে একটি সম্ভাব্য যুদ্ধের দিকে ঠেলে দিতে পারে।
বিশ্বের পরাশক্তিগুলোর সামরিক চাল, উত্তর কোরিয়ার পারমাণবিক মিশনের গোপন অন্দরমহলের খবর, গ্লোবাল ডিফেন্স ও আন্তর্জাতিক ভূ-রাজনীতির প্রতিটি নির্ভরযোগ্য ও প্রফেশনাল খবরাখবর সবার আগে শতভাগ ইউনিক উপায়ে আপনাদের সামনে নিয়মিত তুলে রাখতে ‘দিগন্ত বাংলা নিউজ’ পোর্টাল সর্বদা প্রতিশ্রুতিবদ্ধ।

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন
আপনার মূল্যবান মতামত আমাদের জানান। কোনো উসকানিমূলক বা অশালীন মন্তব্য করা থেকে বিরত থাকুন।