অপরাধ ডেস্ক: শামীম হোসাইন / দিগন্ত বাংলা নিউজ
রংপুর অঞ্চলে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের (ডিএনসি) একজন মাঠপর্যায়ের কর্মচারীর বিরুদ্ধে মাদক মামলার ভয়ভীতি দেখিয়ে এবং জব্দকৃত অবৈধ আলামতের পরিমাণ নথিপত্রে কম প্রদর্শন করার প্রতিশ্রুতি দিয়ে অভিনব কায়দায় ঘুষ নেওয়ার এক চাঞ্চল্যকর অভিযোগ উঠেছে। মাদক মামলার মূল আসামি করার হাত থেকে রেহাই দিতে এবং উদ্ধার হওয়া মাদকের পরিমাণ খাতাকলমে কমিয়ে দেখানোর বিনিময় মূল্য হিসেবে দুপুরের ভাত খাওয়ার বা লাঞ্চ করার অজুহাতে ১০ হাজার টাকা ঘুষ গ্রহণ করেছেন মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর রংপুর বিভাগীয় গোয়েন্দা কার্যালয়ের সিপাহি আল-আমিন। সরকারি পোশাকে এবং দপ্তরের ক্ষমতার অপব্যবহার করে সাধারণ মানুষের কাছ থেকে এই টাকা হাতিয়ে নেওয়ার একটি গোপন ভিডিও এবং মোবাইল ফোনের অডিও কথোপকথনের রেকর্ড সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়েছে। এই বিতর্কিত ও লজ্জাজনক অডিও-ভিডিও সামাজিক মাধ্যমে ভাইরাল হওয়ার পর পুরো রংপুর জেলা জুড়ে সাধারণ মানুষের মাঝে তীব্র ক্ষোভ ও ব্যাপক চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়েছে।
আরও পড়ুন: কর্ণফুলীতে নোঙর করা ফিশিং ট্রলারে বিকট বিস্ফোরণ: ৬ নাবিক দগ্ধ, ২ জনের অবস্থা আশঙ্কাজনক
ঘটনার বিবরণে জানা গেছে যে, গত ২৫ জুন দুপুরের দিকে রংপুর বিভাগীয় মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের বিশেষ গোয়েন্দা শাখার একটি আভিযানিক দল গোপন সংবাদের ভিত্তিতে মিঠাপুকুর উপজেলার অন্তর্গত বলদিপুকুর অভিরাম নুরপুর গুচ্ছগ্রামে এক ঝটিকা অভিযান পরিচালনা করে। ওই বিশেষ অভিযানের সময় স্থানীয় চোলাইমদ ব্যবসায়ী ও পেশায় ভ্যানচালক আফজাল হোসেনের বসতবাড়িতে তল্লাশি চালায় ডিএনসির টিম। তল্লাশিকালে আফজালের শোবার ঘরের খাটের নিচ থেকে আনুমানিক ১০ লিটার দেশীয় চোলাইমদ এবং বিপুল পরিমাণ অর্থাৎ প্রায় ৬০০ লিটার মদ তৈরির কাঁচামাল বা উপকরণ (ওয়াস) উদ্ধার ও জব্দ করা হয়। পরবর্তীতে ঘটনাস্থল থেকেই ভ্যানচালক আফজাল হোসেনকে আইনগতভাবে আটক করে মিঠাপুকুর মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর (খ) সার্কেল অফিসে নিয়ে আসা হয়।
আটককৃত আফজাল হোসেনের দরিদ্র পরিবারের সদস্যরা ও নিকটাত্মীয়রা আইনি সহায়তার জন্য মিঠাপুকুর সার্কেল অফিসে ছুটে এলে তাদের ওপর মানসিক চাপ সৃষ্টি করতে শুরু করেন আভিযানিক দলের অন্যতম সক্রিয় সদস্য সিপাহি আল-আমিন। তিনি আফজালের স্বজনদের নানাভাবে ভয়ভীতি ও মিথ্যা মামলার হুমকি দেখাতে শুরু করেন। এমনকি আফজালের ছেলেদেরও এই মাদক চোরাচালান মামলায় সরাসরি আসামি হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করা হবে এমন ভয়ংকর হুমকি দিয়ে তিনি ১০ হাজার টাকা নগদ ঘুষ দাবি করেন। শেষ পর্যন্ত আইনি হয়রানির চরম আতঙ্ক থেকে নিজেদের বাঁচাতে এবং জব্দ তালিকায় উদ্ধার হওয়া মাদকের পরিমাণ কাগজে-কলমে অনেক কম দেখানোর মৌখিক শর্তে সিপাহি আল-আমিনের অনৈতিক প্রস্তাবে রাজি হতে বাধ্য হন আফজালের ছেলে আসাদুল ও তার অন্যান্য স্বজনরা।
সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে অতি সম্প্রতি ভাইরাল হওয়া সেই গোপন ভিডিও এবং মোবাইল ফোনের কল রেকর্ডিংয়ের কথোপকথনে দেখা যায় যে, সিপাহি আল-আমিন দুপুরে লাঞ্চ করার বা পেটপুরে ভাত খাওয়ার কথা বলে ইতোমধ্যে অগ্রিম ৫ হাজার টাকা নেওয়ার বিষয়টি নিজের মুখেই অকপটে স্বীকার করছেন। অন্যদিকে, ভিডিওর বাকি অংশে দেখা যায় তাঁরই মনোনীত ও বিশ্বস্ত এক মধ্যস্থতাকারী ব্যক্তি মিঠাপুকুর মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর (খ) সার্কেল অফিসের প্রধান ফটকের সামনে প্রকাশ্য দিবালোকে দাঁড়িয়ে আফজালের ছেলে আসাদুলের কাছ থেকে ঘুষের বাকি টাকার অংশটি অত্যন্ত চতুরতার সাথে গ্রহণ করছেন।
এই অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনার বিষয়ে চরম ক্ষোভ প্রকাশ করে ভুক্তভোগী আসাদুল জানান যে, তাদের পুরো পরিবারকে মাদক মামলায় জড়িয়ে দেওয়ার এক ভয়ংকর মনস্তাত্ত্বিক ফাঁদ তৈরি করেছিলেন ওই সিপাহি। পরে নিশ্চিত জেল-হাজত ও আইনি ঝামেলা থেকে নিজেদের রক্ষা করতে এবং জব্দকৃত আলামতের পরিমাণ কাগজপত্রে কমিয়ে রাখার মৌখিক শর্তে দুপুরে ভাত খাওয়ার খরচ হিসেবে তারা বিকাশের মাধ্যমে জরুরি ভিত্তিতে টাকা এনে উনার মনোনীত ব্যক্তির হাতে তুলে দেন। টাকা পরিশোধের পর সিপাহি আল-আমিনকে ফোনে যোগাযোগ করা হলে তিনি টাকা পাওয়ার বিষয়টি নিশ্চিত করেন এবং পুরো লেনদেনের বিষয়টি গোপন রাখতে কঠোরভাবে নির্দেশ দেন।
আরও পড়ুন: সিন্ধুর পানিতে হাত দিলে হাত কেটে দেওয়া হবে: ভারতকে পাকিস্তানের চরম হুমকি
ডিএনসির এই কর্মচারীর বিরুদ্ধে ওঠা ঘুষের প্রকাশ্য অভিযোগ এবং সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ভাইরাল হওয়া ভিডিওর সত্যতা জানতে সিপাহি আল-আমিনের সাথে যোগাযোগ করা হলে তিনি নিজের অপরাধের জন্য বিন্দুমাত্র অনুতাপ বা দুঃখ প্রকাশ করেননি। উল্টো সরকারি পদের তীব্র দম্ভ প্রকাশ করে তিনি গণমাধ্যমকর্মীদের উদ্দেশ্য করে বলেন যে, তাঁর হাতের মুঠোয় অনেক সাংবাদিক আছে এবং তারা চাইলে নিউজ করতে পারেন। তিনি দীর্ঘ চার বছর ধরে একই কর্মস্থলে বহাল তবিয়তে আছেন বলেও দম্ভোক্তি প্রকাশ করেন। এ বিষয়ে রংপুর বিভাগীয় গোয়েন্দা শাখার উপ-পরিচালক দিলারা রহমান জানান যে, পুরো বিষয়টি ইতোমধ্যে তাদের প্রশাসনিক নজরে এসেছে এবং একটি সুনির্দিষ্ট তদন্ত সাপেক্ষে দোষী সাব্যস্ত ব্যক্তির বিরুদ্ধে বিভাগীয় ও কঠোর আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।
নিউজের সূত্র: মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর (ডিএনসি) রংপুর বিভাগীয় গোয়েন্দা কার্যালয়ের মিডিয়া সেল এবং মিঠাপুকুর ভুক্তভোগী পরিবারের জবানবন্দি।

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন
আপনার মূল্যবান মতামত আমাদের জানান। কোনো উসকানিমূলক বা অশালীন মন্তব্য করা থেকে বিরত থাকুন।