কর্ণফুলীতে নোঙর করা ফিশিং ট্রলারে বিকট বিস্ফোরণ: ৬ নাবিক দগ্ধ, ২ জনের অবস্থা আশঙ্কাজনক

কর্ণফুলীতে নোঙর করা ফিশিং ট্রলারে বিকট বিস্ফোরণ: ৬ নাবিক দগ্ধ, ২ জনের অবস্থা আশঙ্কাজনক
ছবি: সংগৃহীত

জাতীয় ডেস্ক: শামীম হোসাইন / দিগন্ত বাংলা নিউজ

চট্টগ্রাম: দেশের প্রধান বাণিজ্যিক প্রবেশদ্বার চট্টগ্রামের বুক চিরে বয়ে যাওয়া কর্ণফুলী নদীতে নোঙর করে রাখা একটি গভীর সমুদ্রে মাছ ধরার যান্ত্রিক নৌযানে বা ফিশিং ভেসেলে এক ভয়াবহ ও আকস্মিক অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটেছে। নৌযানটির অভ্যন্তরীণ ইঞ্জিন কক্ষে হঠাৎ তীব্র শব্দে শক্তিশালী বিস্ফোরণ ঘটে এবং মুহূর্তের মধ্যে পুরো ইঞ্জিন রুমে দাউ দাউ করে আগুন ছড়িয়ে পড়ে। এই প্রলয়ংকরী ও অনাকাঙ্ক্ষিত অগ্নিদুর্ঘটনায় নৌযানটির ভেতরে অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ দায়িত্বে নিয়োজিত থাকা ছয়জন পেশাদার নাবিক, ক্রু ও প্রকৌশলী শরীরের বিভিন্ন অংশ পুড়ে গিয়ে মারাত্মকভাবে অগ্নিদগ্ধ হয়েছেন। দগ্ধদের উদ্ধার করে তাৎক্ষণিকভাবে স্থানীয় হাসপাতালে নেওয়া হলেও তাদের মধ্যে দুইজনের শারীরিক অবস্থা অত্যন্ত আশঙ্কাজনক ও সংকটাপন্ন হওয়ায় উন্নত চিকিৎসার জন্য জরুরি ভিত্তিতে রাজধানী ঢাকায় স্থানান্তরের প্রক্রিয়া শুরু করা হয়েছে। আজ মঙ্গলবার (৩০ জুন, ২০২৬) বেলা পৌনে ১টার দিকে চট্টগ্রামের সদরঘাট সংলগ্ন কর্ণফুলী নদীর সাম্পানঘাট এলাকায় এই শিউরে ওঠার মতো নৌ দুর্ঘটনাটি ঘটে।

আরও পড়ুন: সরিষাবাড়ীতে মাদ্রাসা থেকে ফেরার পথে পুকুরে ডুবে শিক্ষার্থীর মর্মান্তিক মৃত্যু

কর্ণফুলী নদীর বুকে ঘটে যাওয়া এই আকস্মিক অগ্নিকাণ্ডের ঘটনায় গভীর সমুদ্রে মাছ আহরণকারী ওই বড় ট্রলারের দায়িত্বপ্রাপ্ত ক্যাপ্টেন জুবায়ের মাহমুদ নগরের সদরঘাট থানায় গিয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে একটি সাধারণ ডায়েরি বা জিডি নথিভুক্ত করেছেন। পুলিশের কাছে দায়ের করা সাধারণ ডায়েরির বিবরণ ও নৌ পুলিশ সূত্রে জানা গেছে যে, ওই বিশেষ ফিশিং ট্রলারটি গভীর বঙ্গোপসাগরে দীর্ঘ দিন মাছ শিকারের কার্যক্রম সফলভাবে শেষ করে গত ২৯শে জুন বেলা ২টার দিকে কর্ণফুলী নদীর সদরঘাটের সাম্পানঘাট এলাকায় এসে পৌঁছায়। নদী তীরের কাছাকাছি এসে তারা ট্রলারটিকে নদীর নিরাপদ সীমানার মধ্যে মুরিং বয়ায় শক্তভাবে নোঙর করে রাখেন। কিন্তু নোঙর করার পরদিন অর্থাৎ আজ মঙ্গলবার দুপুর পৌনে ১টার দিকে ট্রলারের একেবারে তলদেশে অবস্থিত প্রধান ইঞ্জিন কক্ষের ভেতর থেকে হঠাৎ একটি অত্যন্ত বিকট ও কানফাটানো শব্দের সৃষ্টি হয়। বিস্ফোরণের সাথে সাথেই পুরো ইঞ্জিন রুমে আগুনের লেলিহান শিখা দাউ দাউ করে জ্বলতে শুরু করে।

ইঞ্জিন রুমের সেই বদ্ধ ও অন্ধকারাচ্ছন্ন পরিবেশের মধ্যে আকস্মিক বিস্ফোরণ ও আগুনের কারণে সেখানে দায়িত্বরত নাবিকেরা কোনো কিছু বুঝে ওঠার আগেই মারাত্মকভাবে অগ্নিদগ্ধ হন। এই ভয়াবহ অগ্নিদুর্ঘটনায় যারা শরীরের বিভিন্ন অংশ পুড়ে গিয়ে গুরুতর জখম হয়েছেন তারা হলেন, জাহাজের প্রধান প্রকৌশলী আশিকুজ্জামান তামিম, গ্রিজার পদে কর্মরত মো. রুবেল ও শাহ আলম, উইন্স অপারেটর হিসেবে নিয়োজিত নিজাম উদ্দিন, পেশাদার ডুবুরি মো. রাসেল এবং সাধারণ নাবিক ছিদ্দিক আহমেদ। বিস্ফোরণের পর জাহাজের ওপরের ডেক ও আশেপাশে থাকা অন্যান্য সহকর্মীরা দ্রুত সাহসিকতার সাথে ইঞ্জিন রুমে প্রবেশ করে আগুন কিছুটা নিয়ন্ত্রণে আনেন এবং দগ্ধ ছয়জনকে অচেতন ও রক্তাক্ত অবস্থায় উদ্ধার করে দ্রুত নদী পাড়ে নিয়ে আসেন। সেখান থেকে তাদের দ্রুততম সময়ে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ বা চমেক হাসপাতালের বার্ন ও প্লাস্টিক সার্জারি ইউনিটে নিয়ে গিয়ে ভর্তি করা হয়।

আরও পড়ুন: অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে সর্বোচ্চ দুর্নীতি: জাতীয় সংসদে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর কঠোর বার্তা

চট্টগ্রামের নৌ পুলিশের সদরঘাট থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মিজানুর রহমান এই মর্মান্তিক দুর্ঘটনার বিষয়টি গণমাধ্যমের কাছে নিশ্চিত করেছেন। তিনি জানান যে, কর্ণফুলী নদীতে নোঙর করা ট্রলারের ইঞ্জিন কক্ষে গ্যাস বা যান্ত্রিক গোলযোগের কারণে বিস্ফোরণটি ঘটেছে বলে প্রাথমিকভাবে ধারণা করা হচ্ছে। উদ্ধারকৃত ছয়জন ভুক্তভোগীর মধ্যে দুইজনের শরীরের সিংহভাগ অংশ আগুনে পুড়ে যাওয়ায় তাদের বর্তমান অবস্থা অত্যন্ত আশঙ্কাজনক এবং লাইফ সাপোর্টের প্রয়োজনীয়তা দেখা দিয়েছে। চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের চিকিৎসকদের জরুরি পরামর্শ ও বোর্ডের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী সেই দুই আশঙ্কাজনক রোগীকে উন্নত চিকিৎসার জন্য এয়ার অ্যাম্বুলেন্স বা বিশেষ ব্যবস্থাপনায় অতি দ্রুত ঢাকায় পাঠানোর প্রস্তুতি সম্পন্ন করা হচ্ছে। বাকি চারজন চিকিৎসাধীন নাবিক চমেক হাসপাতালের বার্ন ইউনিটে নিবিড় পর্যবেক্ষণে রয়েছেন এবং নৌ পুলিশ ঘটনার প্রকৃত কারণ উদঘাটনে বিস্তারিত তদন্ত শুরু করেছে।

নিউজের সূত্র: চট্টগ্রাম নৌ পুলিশ সদরঘাট থানা ও চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ (চমেক) হাসপাতালের বার্ন ইউনিটের জরুরি বিভাগ।

Post a Comment

আপনার মূল্যবান মতামত আমাদের জানান। কোনো উসকানিমূলক বা অশালীন মন্তব্য করা থেকে বিরত থাকুন।

নবীনতর পূর্বতন